চেনা অচেনায় ঋতা দি: একটি  শিক্ষণীয় প্রতিবেদন – ড. দেবদাস মণ্ডল

আমাদের সকলের পরম শ্রদ্ধেয়া অধ্যাপিকা ড. ঋতা চট্টোপাধ্যায় (আর,সি ম্যাডাম)থেকে ঋতা দি -হয়ে ওঠার এই জার্ণি  কোন একদিনে তৈরি হয় নি| বহুদিনের শ্রদ্ধা, সান্নিধ্য, বিশ্বাস আর ভরসা থেকেই এই সম্পর্কের উত্তরণ| সময়টা মোটামুটি ২০০২-০৩ হবে, আমরা তখন এম. এ. প্রথমবর্ষ| বোধহয় তার  দু‘ এক বছর আগে অধ্যাপিকা ঋতা চট্টোপাধ্যায়(আর.সি ম্যাডাম) রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যাদবপুরে আসেন| সেমেস্টার সিস্টেম তখন চালু হয় নি, সম্ভবত, দ্বিতীয় পত্রে সংস্কৃত দুটি নাটক পাঠ্য ছিল- একটি মৃচ্ছকটিকম, অন্যটি উত্তররামচরিতম| মৃচ্ছকটিকম পড়াবেন আর.সি ম্যাডাম আর উত্তররামচরিতম পড়াতেন এন.বি ম্যাডাম| সকলের প্রিয় এন.বি ম্যাডাম- অধ্যাপিকা নন্দিতা দি(বন্দ্যোপাধ্যায়)| সত্যি-এককথায় অসাধারণ, কোন তুলনা নেই| যেমন পড়াতেন তেমনি স্নেহবাত্সল্যভাব ছিল সবার প্রতি| বিভাগে পি,পি ম্যাডাম যেমন অতিশয় সাদামাটা, ভীষণ কড়া প্রকৃতির, ঠিক তার বিপরীতে আর.সি ম্যাডাম ছিলেন খুবই ঠাণ্ডা স্বভাবের, সাজগোজে  অত্যন্ত পরিপাটি এবং খুব সুন্দর, দেখলেই কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার মত! তাঁর গাড়ি থেকে শাড়ি, পেন বা ডায়েরি সবকিছুতেই একটা ম্যাচিং ম্যাচিংভাব থাকতো| সবেতেই ছিল একটা আভিজাত্যের ছাপ| চলন বলন একেবারে বিদেশী স্টাইলে| পড়াশুনা থেকে নানা কাজে কর্মেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত ধীর, স্থির ও খুতখুঁতে স্বভাবের| মৃচ্ছকটিকের তিনি আমাদের গোটা কয়েক ক্লাস নিয়েছিলেন| খুব ধরে ধরে পড়াতেন, খুব সুন্দর বোঝাতেন| খুব ভালো লাগতো ওঁনার ক্লাস করতে| ম্যাডাম বলতেন না বুঝতে পারলে সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞাসা করতে, তাঁর কথায় -‘আমারা পডেছি বিষ্ণুপদ ভট্টাচার্য, কালীপদ তর্কাচার্যদের মত বিখ্যাত সব পণ্ডিতদের কাছে, আর তোমারা পড়ছ আমাদের কাছে| খুব সত্ত্বর সবাইকে আপন করে নেওয়ার একটা মনোভাব ছিল তাঁর, সকলের প্রায় নামেই চিনতেন, কিন্তু ম্যাডাম আসতেন কম, বহুদিন একেবারে আসেনও নি| তারপর একদিন  বি.জি ম্যাডাম এসে জানালেন এবার থেকে উনিই মৃচ্ছকটিকের ক্লাস নেবেন|  সকলের মনেহল- ‘ইস ভালোই তো ছিল, আবার বি.জি. ম্যাডাম! কারণ বি.জি ম্যাডামের কাছে আগে আমরা অভিজ্ঞানশকুন্তল, কারক, ভাষাতত্ত্ব, মেঘদূত সবই পড়েছি| আসলে উনি একটু রাশভারি প্রকৃতির| একটু এদিক ওদিক হলেই গেলো, একেবারে চারতলা থেকে ছুড়ে ফেলার হুমকি| আচ্ছা, কেন ক্লাস নেবেন না আর.সি ম্যাডাম? খোঁজখবর নিয়ে জানাগেল ম্যাডামের স্বামী না কী খুবই অসুস্থ| কী আর করা যাবে! আমারা আর আর. সি. ম্যাডামকে পেলাম না| পরে পি.জি টু-তে গিয়ে আমার স্পেশাল পেপার অন্য হয়েযায়| আর.সি ম্যাডাম ছিলেন কাব্যে স্পেশাল, আমি চলেযাই স্মৃতি ও এপিগ্রাফি গ্রুপে| যদিও কাব্য ভালোই লাগত বরাবর| যাইহোক, পড়াকালীনই শুনেছিলাম একজন পি.এইচ.ডি স্কলার দাদাকে নাকী আর.সি ম্যাডাম আর পি.এইচ.ডি করাবেন না, কারণ সে নাকী ওঁনার নোটপত্র কীসব চুরি করেছে, না, ম্যাডামের সঙ্গে কিছু একটা বাজে ব্যবহার করেছে| যাইহোক, তখন বুঝতে পারিনি বা বোঝার চেষ্টাও করেনি কিছু| কিন্তু স্কলারদের নিয়ে এইধরণের সমস্যা ম্যাডামের আজীবন পিছু ছাড়েনি- বোধহয় এখান থেকেই তার সূচনা ছিল| আমারা এম. এ. পাস করেই এস.এস.সি দিয়ে স্কুলে চাকরি করতে চলেগেলাম| তাই আর.সি. ম্যাডামের সঙ্গে আর সেভাবে কোন যোগাযোগ ছিল না|

যাদবপুরে ফিরে আসলাম  ২০০৯ সালে, এসিস্ট্যান্ট প্রফেসার হিসাবে| প্রথম প্রথম আমার বসার ঘর ছিল না কয়েক বছর| ক্লাস নেওয়ার পর একদিক ওদিক করে কখন যে কার ঘরে গিয়ে বসে পড়তাম তার ঠিক নেই| যেখানেই থাকি নির্দিষ্ট সময়ে চায়ের আড্ডায় অবশ্যই থাকা চাই| চায়ের আড্ডা বশত অধ্যাপিকা শর্বাণীদির তত্ত্বাবধানে| একে একে সবাই জড়ো হতেন সেখানে| জানাগেল-প্রদ্যোত বাবু, শর্বাণী দি, ঋতা দি সকলেই বন্ধু ছিলেন- কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসমেট| অনেক সময় ঋতা দি নিজের ফ্লাক্সে স্পেশাল চা নিয়েও চায়ের আড্ডায় চলে আসতেন| কী নেই সেই আড্ডায়? সেখানে নানান আলোচনায় বাড়ির কথা থেকে শাস্ত্রের কথা মিলেমিশে সব একাকার হয়ে যেত| মাঝে মধ্যে বিজয়া দির রসালো গল্পে হাসির রোল পড়ে যেত সবার মধ্যে, সকল গুরুজনদের মাঝে আমার মুখ টিপে হাসি ছাড়া গত্যন্তর ছিল না| আমার অস্বস্তির হাসিতে ঋতা দি মৃদু হেসে যেন কিছুটা সমাল দেওয়ার জন্য বলতেন -‘বিজয়া তুমি এবার থামবে? তোমার মুখে তো কিছু আটকায় না| দেখছো না এখানে দেবদাস আছে| দেবদাস তুই কিন্তু বড়োদের কথায় একদম কান দিস না|’ আমিও সকলের সামনে বসেই বলতাম –‘না দিদি| একদম না|’ প্রথম প্রথম আমি চা খেতাম না, ওঁনাদের সকলের পীড়াপীড়িতেই চা খাওয়ার অভ্যেসটা তৈরি হয়ে যায়| 

ঋতাদির সুগার ছিল অত্যন্ত পরিমাণে, নির্দিষ্ট সময়ে ইনসুলিন নিতে হত তাঁর, তাই হয়তো নিয়ম করে কিছুটা খাওয়ার অভ্যেস ছিল| কখনো তিনি হয়তো নিজের ঘরে একান্তে বসে চা খাচ্ছেন-এমন সময় কোন কিছু জানতে বা এমনি হয়তো গেছি| উনি বলতেন- ও দেবদাস! বোস!’ -বসলাম| ‘কিখবর বল?’ না দিদি এমনি এলাম| ঋতা দি  খাচ্ছেন বা খেতে যাওয়ার আগে যেন আমার সম্মতি নিতেই বলতেন- “আমি একটু খাচ্ছি রে! খাবি একটু?” আমি বলতাম -না দিদি| তবুও উনি নিজের স্যান্ডুইস থেকে কিছুটা কেটে দিয়ে বলতেন- এই নে খা| -একটু অস্বস্তি হলেও ওঁনার কথা রাখতে নিতাম| আবার যেহেতু উনি সুগার ফ্রি চা খেতেন, আমি তা খেতাম না| তাই উনি আবার সুগার ফ্রি কয়েকটা বড়ি মিশিয়ে দিতেন আমার চায়ের সঙ্গে| খেতে খেতে কতো না গল্প হত কে জানে| জিজ্ঞাসা’ করতেন- পি.এইচ.ডি কাজ কতদূর? আমি বলতাম-চলছে, তিনি বিষয় জিজ্ঞাসা করতেন, খুটিয়ে বাড়ির খবরাখবর নিতেন, বাড়িতে কে কে কেমন আছেন? বাড়িতে যাই কী না? ইত্যাদি| এভাবে নানান গল্পগুজবের মাঝে কবে যে তাঁর অতি স্নেহের ও বিশ্বাসের পাত্র হয়ে গিয়েছিলাম তা কে জানে? খাওয়ার আগে সামনে কেউ থাকলে তার সম্মতি নিয়ে খাওয়ার যে ভদ্রতাবোধ তখন কিছু না বুঝতে পারলেও এখন আমার স্কলারদের সামনে কিছু খেতে গেলে দিদির কথাই যেন মনে পড়ে আর সকলের সঙ্গে একটু ভাগ করে খাওয়ার আনন্দটাও উপভোগ করি|

ঋতা দি-কে খুব ভালোকরে চিনতে পেরেছিলাম ওঁনার সঙ্গে একটি রিফ্রেসার কোর্সের কো-অর্ডিনেটর হওয়ার সূত্র ধরে| তখন একুশ দিন ধরে এই কোর্সটি চলত| কিন্তু তার পরিকল্পনা হত তারও প্রায় একমাস দেড়মাস আগে থেকে| রিফ্রেসার কোর্সের কোন পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না আমার| কিন্তু এসব কিছু না ভেবে অভিজ্ঞ কেউ না থাকতে চাওয়ায় ঋতাদির সঙ্গে আমাকেই যুগ্ম ভাবে কো অর্ডিনেটর রাখা হয়| সদ্য জয়েন করার পর ঋতা দির মত ব্যক্তির সঙ্গে এই কাজে রত হওয়া ছিল আমার মত একজন খামখেয়ালি ও আনকোরা ব্যক্তির পক্ষে অতি চ্যালেঞ্জিং একটা ব্যাপার| সর্বদা ভয়ে ভয়ে থাকতাম, কখন যে কী ভুল করে ফেলি! যেহেতু সেই অর্থে কিছুই জানি না| দিদি যেসব প্লান পরিকল্পনা করতেন, আমাকে বলতেন, আর আমি বুঝি না বুঝি সায় দিয়ে বলতাম- ঠিক আছে দিদি| এভাবে চলত সবকিছু| কোথায় কোর্সটি হবে? তার জায়গা ঠিক করা থেকে বক্তা ঠিক করা, পেন, ব্যাগ দেওয়া- সব আলোচনাই হত একের পর এক| তারপর  কী খাওয়া দাওয়া হবে? রিসোর্সপারসনদের কতকরে সাম্মানিক দেওয়া হবে? কত কো-অর্ডিনেটর ফি? হিসাবপত্র কীভাবে পেশ করতে হবে? সবকিছুর একটা নিয়মও বলে দেওয়া হল কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে| দিদি তাঁর ডায়রিতে একের পর এক সব নোট করে রাখতেন, আর আমাকে কী কী পরবর্তীদিনে করতে হবে তার একটা নির্দেশও দিতেন| সেগুলি যথাসাধ্য পালন করার চেষ্টা করেছিলাম মাত্র| এত সাজিয়ে-গুছিয়ে কাজ করার মানসিকতা-সত্যি দিদির কাছ থেকে বহু কিছু শেখার ছিল|

দিদির পরিচিতি লেভেল ছিল অন্যমাত্রায়| রিসোর্সপারসন হিসাবে কাদের কে উনি ডাকেন নি? প্রথিতযশা ভাইস-চ্যান্সেলর হিসাবে রাধাবল্লভ ত্রিপাঠী, পবিত্র সরকার, সুরঞ্জন দাস থেকে শুরু করে রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত, সোহিনী সেনগুপ্ত, সৌমিত্র বসু, অলোকানন্দা রায়, মহুয়া মুখোপাধ্যায়, নন্দিনী ভৌমিক বহু সেলিব্রটি, সুকান্তচৌধুরী, সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়, বাসব চৌধুরীর মত বহু শিক্ষাবিদ-এই রিফ্রেসার কোর্সে রিসোর্সপারসন হিসাবে ছিলেন, তেমনি বহুগুণী অধ্যাপক/ অধ্যাপিকাও এই কোর্সে অংশগ্রহণ করেছিলেন- সবমিলিয়ে  মণিকাঞ্চন যোগে ঐ কোর্সটি সত্যিই অতিপ্রাণবন্ত ও হৃদয়গ্রাহী হয়েছিল তা আজও কেউ অস্বীকার করতে পারেন না| আর এই সবকিছুর মূলে ছিল ঋতাদির  সুপরিকল্পনা, আর আমার ছিল সেটাকে বাস্তবায়িত করার অদম্য প্রয়াস- সবমিলেমিশে খুব ভালোই অভিজ্ঞতা হয়েছিল| এতসব বিশিষ্টব্যক্তিদের উপস্থিতি, তাঁদের থাকা-খাওয়ার যথাযোগ্য ব্যবস্থা করতে দিদি কোন কার্পণ্য করতেন না কখনো| এমন কী যেসব ক্ষেত্রে অফিসিয়ালি বাধ্যবাধকতা থাকত সেসব দিদি নিজে থেকেই খরচা করতেন| দিদি বলতেন- ‘আমি যখন বাইরে যাই, ওঁনারা আমাকে সবকিছুই স্পেশাল ব্যবস্থা করেন, আমি তো অত কিছু করতে পারবো না, কিন্তু যতটা পারি- চেষ্টা করি| তারপর -“আপরিতোষাদ্বিদুষাং ন সাধু মন্যে প্রয়োগবিজ্ঞানম|’ পণ্ডিতব্যক্তিদের সন্তোষবিধান না হওয়া পর্যন্ত আমাদের কার্য কতটা সফল হল তা বোঝা যাবে না| 

দিদির অতি কাছ থেকে তাঁর সততা ও সরলতাকে উপলব্ধি করেছি| সম্মাননীয় ব্যক্তিদের কীভাবে সম্মান করতে হয় তা দিদির আতিথেয়তা থেকে বুঝেছি| আর একটা জিনিষ খুব শিক্ষণীয়, তা হল তাঁর কৃতজ্ঞতাবোধ, যেকোন কাজে ছোট হোন বা বড়- কারও কাছ থেকে তিনি যা কিছু  সহযোগিতা পেয়েছেন অকৃপণ চিত্তে তা তিনি স্বীকার করেছেন| এছাড়া দিদির ছিল অতুলনীয় কর্মনিষ্ঠা| ঐ বয়সেও চোখের যা পরিস্থিতি, অত্যধিক সুগার প্রভৃতিতেও কর্মে লেগে থাকা ও কাজটি যাতে সর্বাঙ্গীণ সুন্দর হয় তার জন্য নিরন্তর লেগে থাকার মনোভাব, কর্মে তত্পরতা, গভীর মনোনিবেশ ও একাগ্রতা- একজন শিক্ষার্থী হিসাবে, নবীন অধ্যাপক হিসাবে আমার কাছে সেসব ছিল অতি শিক্ষণীয় বিষয়| কী করে কোন অনুষ্ঠানকে কত সুন্দর করে তোলা যায়, কোন অনুষ্ঠান করতে হলে কত খুটিনাটি বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হয় তা ঋতা দির সঙ্গে না থাকলে জানা সম্ভব হত না| এসব কাজের মধ্য দিয়ে একটা আত্মবিশ্বাস গড়ে ওঠে| সেই আত্মবিশ্বাস আর অভিজ্ঞতা থেকেই হয়তো পরবর্তীকালে বহু সেমিনার সফলভাবে সম্পন্ন করতে পেরেছি|

হ্যাঁ, যেকথা হচ্ছিল যে, ঐ রিফ্রেসার কোর্সটির বিষয় ছিল ‘সৌন্দর্যতত্ত্ব|’ টানা একুশদিনের এতবড় একটা অনুষ্ঠানে যাতে কারো একঘেয়ামী না লাগে তারজন্য বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে যেমন বিবিধ বিষয় ঠিক করা এবং সেই অনুসারে সেই বিষয়ে পারদর্শী, স্বনামধন্য ব্যক্তিরাও এসে তাঁদের বক্তব্য বা প্রয়োগকলা প্রদর্শন -এককথায় অনবদ্য| রিসোর্সপারসনদের প্রতিটি বক্তব্যের শেষে একটা সুন্দর মূল্যায়ন করে সমগ্র অনুষ্ঠানটিকে একটি অন্যমাত্রায় পৌঁছে দিতেন ঋতা দি| দিদির মননে চিন্তনে মিশেছিল কালিদাস ও রবীন্দ্রনাথের ভাবনা| তিনি যে অতভালো রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে জানতেন তা অনেকেই হয়তো জানতেন না| সত্যি অসাধারণ সুর, তাল, লয় ছন্দ সম্পর্কিত ধারণা ছিল তাঁর| কেউ বেসুরো গান গাইলেই হেসে ফেলতেন| বিভাগের অনেককিছু কাজ হয়তো দিদি এডিয়ে চলতেন বা উপযাজক হিসাবে কাজের দায়িত্ব নিতেন না, তবে তিনি কোন কাজের দায়িত্ব যদি একবার নিতেন বা বিশেষত একাডেমিক কাজের ক্ষেত্রে তাহলে সেই দায়িত্ব যে কত নিষ্ঠার সঙ্গে তিনি পালন করতেন তা তাঁর সান্নিধ্যে না থাকলে উপলব্ধি করা যেত না| 

ঋতা দির স্নেহ-বাত্সল্য মনে রাখার মত| তবে এবিষয়ে তাঁর ক্ষেত্রে একটা অভিযোগ হল- তিনি যাকে স্নেহ করবেন, তার প্রতি অন্যজন যদি একটু দরদ দেখাতেন তাতে যেন দিদির একটু মান-অভিমান হত| সেজন্য হয়তো তিনি অনেক সময় মুখভার করে থাকতেন, বা তার প্রতি কিছুটা হলেও একটু তীর্যকভঙ্গিতে কথা বলতেন| অনেকে সেটা বুঝতেই পারতো না বা অন্যভাবে নিত হয়তো, বা তাঁকে এড়িয়ে চলত| দিদির স্নেহের বন্ধনে কেউ আবদ্ধ হলে তাঁর জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করে যেতেন কীভাবে অন্তত তার সামন্য হলেও একটু উপকার করা যায়| শিউলী দিকেও খুব স্নেহ করতেন ঋতা দি| শিউলী দির কথায়- তাঁর যখন ম্যাটার্নিটি লিভ চলছিল ঋতা দি নিজেই গিয়ে তাঁর বাড়িতে পরীক্ষার খাতা পৌঁছে দিয়েছিলেন| এতকিছুর মধ্যে প্রতিবছর আমার মেয়ে দিশারীর জন্মদিন দিদি মনে করিয়ে দিতেন, কখনো বা তাঁর জন্য বিশেষ কিছু উপহারও পাঠিয়ে দিতেন| সত্যি ভাবাযায়? যতটা সম্ভব চেষ্টা করেছি তাঁর কথার অবাধ্য না হতে, যেকোনভাবে সেই স্নেহের বন্ধন অটুট রাখতে|

ঋতাদির বিনয়মাহাত্ম্য, আত্মমর্যাদা ও মানবিকতাবোধের কথা বলে শেষ করা যাবে না| তিনি যেমন সবাইকে সম্মান করতেন, ভালোবাসতেন, তেমনি কারো কাছ থেকে কোন অপ্রত্যাশিত অপমান তিনি কোনোভাবেই সহ্য করতে পারতেন না| কেউ একটু ভারি ম্যাজাজে কিছু বললে বা এড়িয়ে চললে তিনি ভীষণ আঘাত পেতেন| যদি কয়েকদিন দিদির সঙ্গে দেখা না হত হঠাত দেখা হলে তিনি বলতেন- ‘কীরে দেবদাস তোর কী কিছু হয়েছে? না, আমি আবার কী করলাম?” ইত্যাদি| এমন অনেক ঘটনায় অনেক সময় বলতেন আবার অনেক সময় বলতেন না কিছুই| চুপচাপ হয়ে যেতেন-একান্তে হয়তো বড়ই কষ্ট পেতেন| তাঁর কথা থেকে বোঝা যেত তিনি বড় আঘাত পেয়েছেন- তিনি যাদের উপর বেশি ভরসা করতেন, যাদের বেশি ভালোবাসতেন, যাদের বিশ্বাস করতেন, একান্তভাবে নিজের করে নিতেন তাঁদের কাছ থেকে| তাঁর অধীন গবেষকদের তিনি নতুন নতুন বিষয় বলেছেন, পথ দেখিয়েছেন কীভাবে কাজ করতে হয়| তাঁর পরিচিত সকলের কাছে তাদের পরিচিতি করে দিয়েছেন, নিজের ভাব-ভাবনা তিলে তিলে দান করেছেন, প্রয়োজনে আর্থিক সহায়তা করেছেন- তারাই শেষপর্যন্ত তাঁর সাথে খারাপ ব্যবহার করেছেন| অবজ্ঞা করেছেন, অবহেলা করেছেন, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেছেন, সর্বোপরি তাঁর নানাভাবে বদনাম করেছেন| দিদি এটা মেনে নিতে পারেন নি, কোনভাবেই| কথা প্রসঙ্গে এসব বলতে বলতে তিনি কখনো সখনো অঝোরে কেঁদেও ফেলেছেন| সেই মানুষটা পৃথিবীতে আজ আর নেই, কিন্তু যা্দের জন্য দিদির এই অকারণে চোখের জল পড়েছে তারা নিশ্চয়ই ভালো আছেন| ভালো থাকবেন -এটাই স্বাভাবিক| কারণ তিনি তো মনেপ্রাণে কখনোই তাঁদের কোন ক্ষতি চান নি তাই| যাদের তিনি বেশি ভালোবেসেছেন, অসহায় ভেবেছেন, অর্থিক সহায়তা করেছেন, তারাই তাঁর সঙ্গে বেশি প্রতারণা করেছেন| তাঁর ভালো মানষিকতার সুযোগ নিয়েছেন, তাঁর অপ্রকাশিত গবেষণাকে নিজের বলে প্রচার চালানোর চেষ্টা করেছেন| সর্বোপরি যাদের তিনি নিজের বাড়িতে যাতাযাতের সুযোগ দিয়েছেন, আর্থিক সাশ্রয়ের কিছু ব্যবস্থা করেছেন তাঁর অবর্তমানে তাঁরা কত জিনিষ আত্মসাত করেছেন তার ঠিক নেই| ছিঃ| ধ্বিকার জানাই এহেন মানুষের সান্নিধ্যে থেকে এরূপ নীচ মানষিকতা ছিল যাদের তাদেরকে|

দিদির কাছ থেকে যেটা শেখার তা হল গুরুজনদের প্রতি শ্রদ্ধা আর গুণীজনদের কদর করা| তিনি বলতেন- ‘কর্তারঃ সুলভা লোকে বিজ্ঞাতারস্তু দুর্লভাঃ|’ এই জগতে অনেক গুণীজন আছেন কিন্তু তাদের সমাদর জানানো লোকজনের বড়ই অভাব| দিদি নিজেই ছিলেন একজন গুণীব্যক্তি, তাই তিনি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, বক্তৃতায়, নিজের লেখার মাধ্যমে তিনি সর্বদা গুণিজনদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছেন| সাধারণ জিনিসগুলি তাঁদের বর্ণনায় অসাধরণ বলে অনুভূত হয়েছে| যেন তাঁর চেতনার রঙে পান্না হত সবুজ চুনি হয়ে উঠত রাঙা হয়ে| বহু সংস্কৃত পণ্ডিতদের অনালোচিত কাজকর্ম, সৃষ্টিসম্ভারকে তিনি প্রচারের আলোকে নিয়ে এসেছিলেন| সেগুলি নিয়ে আলোচনা করতে, গবেষণা করতে পরবর্তী প্রজন্মকে পথ দেখিয়েছেন| আধুনিক সংস্কৃত সাহিত্যচর্চার তিনি এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে দিয়েছেন নতুন গবেষকদের কাছে| 

শুধুতাই নয়, নতুন প্রজন্মকে নানাভাষায় শিক্ষিত করতে, কবিতা, গান নাটক প্রভৃতি বিষয়ে পারদর্শী করে তুলতে ‘কনভারজেন্স’ নামে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভাবনা ভেবেছেন| তিনি আজ সশরীরে হয়তো নেই, কিন্তু তিনি বেঁচে আছেন তাঁর কাজের মাধ্যমে, তাঁর ভাবনার মাধ্যমে, তাঁর বহু সৃষ্টিকর্মের মাধ্যমে| তিনি মহাভারতের এই কথাকে খুবই গুরুত্ব দিয়ে বলতেন–‘ন হি মনুষ্যাৎ শ্রেষ্ঠতরং কিঞ্চিৎ| মানুষের থেকে এই জগতে কিছুই বড় নয়| মানুষের ভালোর জন্য তিনি যেমন আজীবন ভেবেছেন, সেই মানুষের কর্মের, মানুষের গুণের, মানুষের সৃষ্টির জয়গানই গেয়েছেন তাঁর আধুনিক সংস্কৃত সাহিত্য গবেষণাকর্মের মাধ্যমে| কিন্তু সেই মানুষেরা বা পরবর্তী প্রজন্ম ঋতাদির মহানুভবতার ও গবেষণাকর্মের মূল্যায়ন কতটা করছেন? বা করবেন? সেটাই এখন ভাবার বিষয়|

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য- অধ্যাপিকা ড. ঋতা চট্টোপাধ্যায়ের স্মরণে অন্বীক্ষা (সম্পাদনা-অধ্যাপক ড. তপনশংকর ভট্টাচার্য্য ও অধ্যাপিকা ড. কাকলী ঘোষ) যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০২৩ সালে প্রকাশিত হয়েছে| ঋতায়ণী, (সম্পাদনা-অধ্যাপিকা ড. তপতী মুখার্জী, অধ্যাপক ড. অরুণরঞ্জন মিশ্র ও অধ্যাপক ড. শুভ্রজিত সেন ) সংস্কৃত পুস্তক ভাণ্ডার থেকে ২০২৫ সালে প্রকাশিত হয়েছে|

………………………

ড. দেবদাস মণ্ডল, সহ-অধ্যাপক, সংস্কৃত বিভাগ, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়

Please email your comments/suggestions to soumyanetra.convergence@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *