কালিদাস এমনি এক বিরল প্রতিভা, যিনি দেশ-কালের উর্ধ্বে উঠে জ্ঞানের আলোর পরিপূর্ণতাকে স্পর্শ করেছিলেন। স্বীয় রচনায় বৌদ্ধিক ও আধ্যাত্মিক সাফল্যের মণিকাঞ্চনযোগ নির্মাণ করতে পেরেছিলেন, তাই বহু শতাব্দী অতিক্রান্ত হলে ও পাঠকসমাজ সশ্রদ্ধ চিত্তে তাঁকে স্মরণ করে আসছে। কালিদাস রয়েছেন ভারতীয় সংস্কৃতির মূলে। ডাকটিকিট থেকে সন্মানপ্রদান এমনকি কালিদাস মহোৎসব সাড়ম্বরে পালনের মধ্যে দিয়ে সে কথা স্পষ্ট। তাঁর কাব্যের সুরভি অনাগতকাল পর্যন্ত বিস্তৃত থাকবে।
রবীন্দ্রনাথ ছিলেন একজন বিখ্যাত কবি, দার্শনিক, নাট্যকার, অভিনেতা, উপন্যাস-লেখক, প্রবন্ধ, ছোটগল্পের রচয়িতা, সমালোচক, গায়ক, চিত্রশিল্পী, শিল্পী, গানের রচয়িতা, আদর্শ শিক্ষকের পাশাপাশি নৃত্য-নাট্যকার। তিনি বৈদিক সাহিত্য, স্মৃতি, তন্ত্র, দর্শন, মহাকাব্য, ধ্রুপদী সংস্কৃত সাহিত্য, ইতিহাস, পুরাণ, পালি, প্রাকৃত, অবদানশতক ইত্যাদির উপর ভিত্তি করে সৃষ্টির মালা গেঁথেছেন।
তাঁর প্রধান সৃষ্টি বাংলায় হলেও সমস্ত আধুনিক ভারতীয় ভাষায় অনূদিত। শৈশবে তিনি উপনিষদ থেকে মন্ত্র পাঠ করতেন এবং উপনয়নের পরে গায়ত্রী মন্ত্র পাঠের সময় তিনি মুগ্ধ হন। সংস্কৃত সাহিত্যের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা, তাঁর পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিলেন, যিনি তাঁকে গীতা এবং গীতগোবিন্দমের প্রতি তাঁর আগ্রহ বৃদ্ধি করেছিলেন। পণ্ডিত রামসর্বস্ব ভট্টাচার্য তাঁকে অভিজ্ঞানশকুন্তলম্ এর পাঠ দেন।
সাংস্কৃতিক পরিবেশের প্রভাবে তিনি শান্তিনিকেতনে আশ্রম স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন এবং সংস্কৃত সাহিত্যের কিছু গ্রন্থ যেমন রঘুবংশম্, কুমারসম্ভবম্ ইত্যাদি অনুবাদ করেন। তিনি রামায়ণের উপর ভিত্তি করে দুটি গীতিকাব্য বাল্মীকি-প্রতিভা এবং কালমৃগয়া রচনা করেন। আবার, বাল্মীকি-প্রতিভা সংস্কৃতে অনুবাদ করেছেন ডক্টর বি. রাঘবন, সাহিত্য আকাদেমি, নিউ দিল্লি, ১৯৬৬ থেকে সংস্কৃত রবীন্দ্রমে প্রকাশিত হয়|
রবীন্দ্রনাথের সুরে বর্ষার বেদগান অচ্ছা বদাতবসং বহুশ্রুত। শ্লোকটি ঋগ্বেদের (৫.৮৩.১) একটি অত্যন্ত সুপ্রসিদ্ধ ও সুন্দর মন্ত্র, যাতে বৃষ্টি ও মেঘের দেবতা পর্জন্যের স্তুতি করা হয়েছে।
পর্জন্য উত্সব বা বর্ষা মঙ্গলের জন্য এই মন্ত্রে সুরারোপ করেছেন রবীন্দ্রনাথ –
‘ মেঘদূত ছাড়া নববর্ষার কাব্য কোন সাহিত্যে কোথাও নাই। ইহাতে অন্তর্বেদনা নিত্য কালের ভাষায় লিখিত হইয়া গেছে। প্রকৃতির সাংবাত্সরিক মেঘোত্সবের অনির্বচনীয় কবিত্বগাথা মানবের ভাষায় বাঁধা পড়িয়াছে।’২
ভালো অনুবাদ শুধুমাত্র মূলরচনার প্রতিনিধিত্ব করে না। বরং অনুবাদকের ব্যক্তিত্বের স্বাদ পাঠককে করায়। সাহিত্যের উদ্দেশ্য হল আনন্দ সৃষ্টি। রবীন্দ্রনাথ যখন মেঘদূতের অনুবাদ করলেন, সেই অনূদিত সাহিত্য শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। রসিকসমাজ তাতে তৃপ্ত হয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘মানসী’ কাব্যগ্রন্থের বিখ্যাত ‘মেঘদূত’ কবিতায় কালিদাসের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে সেই ‘আষাঢ়ের প্রথম দিবস’-কে স্মরণ করে লিখেছিলেন –
“কবিবর , কবে কোন বিস্মৃত বরষে কোন্ পুণ্য আষাঢের প্রথম দিবসে লিখেছিলে মেঘদূত ! মেঘমন্দ্র শ্লোক বিশ্বের বিরহী যত সকলের শোক রাখিয়াছে আপন আঁধার স্তরে স্তরে সঘনসংগীতমাঝে পুঞ্জীভূত ক’রে ৷ ছিন্ন করি কালের বন্ধন সেই দিন ঝরে পড়েছিল অবিরল চিরদিবসের যেন রুদ্ধ অশ্রুজল আর্দ্র করি তোমার উদার শ্লোকরাশি ৷ ভারতের পূর্বশেষে আমি বসে আছি সেই শ্যামবঙ্গদেশে যেথা জয়দেব কবি কোন্ বর্ষাদিনে দেখেছিল দিগন্তের তমালবিপিনে শ্যামচ্ছায়া , পুর্ণ মেঘে মেদুর অম্বর ৷ আজি অন্ধকার দিবা , বৃষ্টি ঝরঝর , দূরন্ত পবন অতি — আক্রমণে তার অরণ্য উদ্যতবাহু করে হাহাকার ৷”৩
কালিদাসের কাব্য ও নাটকের সৌন্দর্য, বিশেষ করে ‘শকুন্তলা’ ও ‘মেঘদূত’, রবীন্দ্রনাথকে গভীরভাবে মুগ্ধ করেছিল। তিনি কালিদাসের সাহিত্য নিয়ে ‘প্রাচীন সাহিত্য’ গ্রন্থে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন এবং ‘চৈতালি’ কাব্যে ‘কালিদাসের প্রতি’ কবিতাটি রচনা করে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন।
মহাকবি কালিদাসের প্রতি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গভীর শ্রদ্ধা ও মুগ্ধতার প্রকাশ ঘটেছে তাঁর অমর কবিতা “কালিদাসের প্রতি”-তে। ১৮৯৬ সালে (আশ্বিন ১৩০৩ বঙ্গাব্দ) প্রকাশিত ‘চৈতালী’ কাব্যগ্রন্থে এই কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত হয়।কবিতাটিতে রবীন্দ্রনাথ কালিদাসকে কোনো রাজসভার সাধারণ কবি হিসেবে দেখেননি, বরং তাঁকে অলকার চিরানন্দময় অধিবাসী হিসেবে কল্পনা করেছেন। কবি সুন্দরভাবে বর্ণনা করেছেন কীভাবে বর্ষার মেঘের মৃদঙ্গ ধ্বনি ও বিদ্যুতের ছন্দে মহাদেব যখন তাণ্ডব নৃত্য করতেন, তখন কালিদাস কৈলাসে বসে বন্দনা গান গাইতেন। গান শেষে দেবী পার্বতী প্রসন্ন হয়ে তাঁর নিজের কানের ময়ূরের পালক (বর্হ) কালিদাসের চূড়ায় বা মাথায় পরিয়ে দিতেন।
আজ তুমি কবি শুধু, নহ আর কেহ— কোথা তব রাজসভা, কোথা তব গেহ, কোথা সেই উজ্জয়িনী—কোথা গেল আজ প্রভু তব, কালিদাস, রাজ-অধিরাজ। কোনো চিহ্ন নাহি কারো। আজ মনে হয় ছিলে তুমি চিরদিন চিরানন্দময় অলকার অধিবাসী। সন্ধ্যাভ্রশিখরে ধ্যান ভাঙি উমাপতি ভূমানন্দভরে নৃত্য করিতেন যবে, জলদ সজল গর্জিত মৃদঙ্গরবে, তড়িৎ চপল ছন্দে ছন্দে দিত তাল, তুমি সেই ক্ষণে গাহিতে বন্দনাগান—গীতিসমাপনে কর্ণ হতে বর্হ খুলি স্নেহহাস্যভরে পরায়ে দিতেন গৌরী তব চূড়া-‘পরে।৪
কালিদাসের কাব্যকে যথাযথ ভাবে স্পর্শ করতে পেরেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। কালিদাসের সৃষ্টিকে অবলম্বন করে রবীন্দ্রনাথ যে নতুন সৃষ্টি করেছেন, তাও কালোত্তীর্ণ হয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘কল্পনা’ কাব্যগ্রন্থের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবিতা হলো ‘স্বপ্ন’। ১৩০৪ বঙ্গাব্দের ৯ই জ্যৈষ্ঠ বোলপুরে বসে কবি এই কবিতাটি রচনা করেন। এই রোমান্টিক কবিতায় মহাকালের পটভূমিতে এক অপরূপ কাল্পনিক ও স্বপ্নময় পরিবেশ ফুটে উঠেছে, যেখানে কবি তাঁর পূর্বজন্মের প্রিয়তমাকে খুঁজতে উজ্জয়িনীপুর ও শিপ্রানদীর তীরে ফিরে যান।স্বপ্নের প্রেক্ষাপট ও মূলভাব এই কবিতায় কবি এক মায়াময় জগতের কল্পনা করেছেন। তাঁর মানসচেতনায় ভেসে ওঠে অতীতকালের উজ্জয়িনী নগরী, যেখানে মহাকাল মন্দিরে গম্ভীর মন্দ্রে সন্ধ্যারতি বাজছে। কবির অবচেতন মন সেই প্রাচীন বসন্তের দিনে, জনশূন্য পথে পূর্বজন্মের প্রথমা প্রিয়ার স্মৃতি রোমন্থন করে। কবিতাটি যেন নিছকই এক স্বপ্ন, যার মাধ্যমে প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যের প্রতি কবির গভীর অনুরাগ ও রোমান্টিক সৌন্দর্যচেতনা প্রকাশিত হয়েছে।কবিতার উল্লেখযোগ্য পংক্তি-
“দূরে বহুদূরে স্বপ্নলোকে উজ্জয়িনীপুরেখুঁজিতে গেছিনু কবে/ শিপ্রা নদী পারে মোর পূর্বজনমের প্রথমা প্রিয়ারে।”৬
রবীন্দ্রনাথ বারে বারে মানসপথে হেঁটে বেরিয়েছেন, ফিরে গেছেন কালিদাসের যুগে। দুজনেই সৌন্দর্যের পূজারী। দুজনেই বিরহের মধ্যে প্রেমের পূর্ণতা দেখেছেন। কালিদাস নিজেই যেন বিরহী যক্ষ। বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো অবস্থান করেছেন।
কালিদাসের জীবনী নিয়ে বহু জনশ্রুতি রয়েছে। সেই সব কাহিনী নিয়ে বিংশশতাব্দীর সংস্কৃতসাহিত্যসাধকেরা সংস্কৃত ভাষায় একাধিক কাব্য রচনা করেছেন। যেমন নিত্যানন্দ মুখোপাধ্যায়, রমা চৌধুরী প্রমুখ। অনুবাদের ভাষা সরল সংস্কৃত, সহজবোধ্য, আকর্ষণীয়। অনুষ্টুপাদি ছন্দে রচিত বিভিন্ন শ্লোক উপমা, রূপক, শ্লেষ প্রভৃতি অলংকারে অলংকৃত। প্রসাদাদি গুণে সজ্জিত।
মহাকবি কালিদাসের ‘অভিজ্ঞান শকুন্তলম’ নাটকটি পড়ে মুগ্ধ হয়ে বিশ্বখ্যাত জার্মান কবি ও সাহিত্যিক ইয়োহান ভোলফগাং ফন গ্যেটে (Johann Wolfgang von Goethe) বিখ্যাত প্রশংসা-কবিতাটি রচনা করেন ।গ্যেটের বিখ্যাত উক্তিটি এখানে প্রণিধানযোগ্য –
Wills du die Blüthe des frühen, die Früchte des späteren Jahres,Wills du was reizt und entzückt, wills du was sättigt und hält,Wills du den Himmel, die Erde, mit Einem Namen begreifen;Nenn’ ich, Sakuntala, Dich, und so ist Alles gesagt.
বাংলায় সেই উক্তিটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিম্নোক্তভাবে অনুবাদ করেছেন:”কেহ যদি তরুণ বৎসরের ফুল ও পরিণত বৎসরের ফল, কেহ যদি মর্ত্য ও স্বর্গ একত্রে দেখিতে চায়, তবে ‘শকুন্তলা’য় তাহা পাইবে।”রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘প্রাচীন সাহিত্য’ নামক প্রবন্ধ গ্রন্থের ‘শকুন্তলা’ প্রবন্ধে এই অসাধারণ উদ্ধৃতিটি ব্যবহার করে কালিদাসের কাব্যের সার্থকতা ও সৌন্দর্যের বিশ্লেষণ করেছিলেন।৮
“We made art and culture out of the mud and the asphalt and the concrete.”
The phrase relies on the assumption that individuals have a single, static place of origin. In reality, human history is defined by migration, cultural exchange, and globalization.Psychologically, belonging is a fundamental human need. True belonging is not restricted by borders, ethnicity, or nativity. Instead, it is found where individuals feel safe, esteemed , and cherished for their contributions. It is tied to shared human values, civic participation, and mutual respect rather than the geographic lottery of where one was born. Ultimately, the assertion of where someone belongs is best defined by the individual rather than imposed by society.
If we read Namesake, we can understand how a migrated family urged to gain their individual belongingness. The mother Ashima always believes that only Kolkata can give her that, on the other hand her husband, Ashoke, although misses his ‘home’, remains a bit confused and crowded himself in echoing the culture of New York City….
In ‘There There’, Tommy Orange rips away the stereotype of the “historical” Indian to show what it feels like to belong to a place that tries to pretend you do not exist. For Orange’s characters, it means their original homes were taken, altered, and paved over so much that the “there” they belong to no longer exists…
Lisa Ko’s novel ‘The Leavers’ ,Deming Guo is an 11-year-old boy living in the Bronx with his mother, Polly, an undocumented Chinese immigrant. One day Polly leaves for work and never comes home. Adrift, Deming is eventually adopted by two white professors. The new family moves to upstate New York, and Deming is renamed Daniel, sparking a search for identity and cultural history…
The Last Lesson” is a poignant short story by Alphonse Daudet, set during the Franco-Prussian War. Franz, who usually dislikes his French classes, arrives at school dreading a scolding for not preparing his participle lesson. Instead, he finds the atmosphere solemn, his teacher M. Hamel dressed in his finest Sunday clothes, and the village elders seated at the back of the room as a sign of respect as that was the last of their French learning. M. Hamel delivers a moving speech explaining that their native language is a “key to their prison”….
Brené Brown’s research, notably in her TED talk and writings like ‘Braving the Wilderness’, argues that true belonging is not passive; it requires the courage to stand alone, self-acceptance, and vulnerability. Similarly, bell hooks writes about the power of inclusive, emotionally attached communities where everyone’s unique background and voice is valued.
Nora Krug’s graphic memoir, “ Belonging: A German Reckons with History and Home” , explores cultural and ancestral belonging by investigating her family’s involvement in World War II. It asks how geography and inherited history shape our personal identity.
David Whyte’s poem “The House of Belonging” treats belonging as an inner temple of adult aloneness—a fundamental place of origin that starts with connecting to oneself. He writes,
“This is the temple of my adult aloneness and I belong to that aloneness as I belong to my life.
There is no house like the house of belonging.”
Jibanananda Das is the ultimate poet of Bengali nature and spatial belonging. His poem– “Abar Asibo Phire” (I Shall Return Again) views belonging as an eternal connection to the geography of Bengal that even death cannot break. While Nazrul is known as the “Rebel Poet,” his writings on belonging focus heavily on communal harmony and collective human identity.
“হিন্দু না ওরা মুসলিম ?” ওই জিজ্ঞাসে কোন্ জন?
কান্ডারী ! বল ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা’র”
(“Who asks if they are Hindu or Muslim? Captain! Say instead that humans are drowning, the children of my mother!). On the other hand Rabindranath Tagore’s concept of belongingness rejects narrow political borders, instead viewing connection as a spiritual harmony between the individual, the natural world, and global humanity.In his short story ‘The Homecoming’, he highlights the deep human need for unconditional love. He portrays a young boy who gets physically and emotionally separated from his village, demonstrating how a lack of emotional support completely breaks the human spirit.
“মা, আমার ছুটি হয়েছে মা, এখন আমি বাড়ি যাচ্ছি।”(Mother, the holidays have come, mother; I am going home now.) This is the final utterance of Phatik.
There are thousands of writings which show how it feels if you are not valued for yourself. Nowadays we’re shifting towards synthetic belonging. AI fundamentally changes how we relate to our own roots by acting as both a mirror and a filter. This root refers to both our cultural trajectory as a community and our individuality.
Belongingness is far more than a comforting feeling; it is a fundamental human necessity that drives our social structures and individual well-being. Throughout life, the search for acceptance within families, cultures, and peer groups shapes our identity and mental health. While the modern world often fosters isolation, actively building inclusive spaces allows individuals to thrive. Ultimately, true belonging is a two-way street: it requires communities to open their doors with empathy, and individuals to embrace their authentic selves. Therefore if you ask me what does it mean to me, I would say—
“হৃদয়ের যে কোণে অভিনয় লাগে না, সেটাই আমাদের আপন ঠিকানা।”
(The corner of the heart where no acting is required, that is our true address.)
Moumita Ghosh is a teacher at St Joseph’s school, Murshidabad. She loves to learn new languages. She has been associated with Convergence right from its inception, and has been an extremely committed teacher of German at Convergence. She teaches the language at different levels here.
রাজা রামমোহন রায়ের জন্মের দুইশত বাহান্ন বছর অতিক্রান্ত। এই পুণ্যভূমি ভারতে বহু মনীষী ও যুগমানবের মতো রামমোহনের আবির্ভাবও উল্লেখযোগ্য এবং ঐতিহাসিক। তবু রামমোহন রায়ের মনীষা, ভাবধারা ও পূর্ণাঙ্গ জীবনকাহিনি সাধারণ মানুষের মধ্যে বহুল প্রচারিত হয়নি। জনসাধারণের মধ্যে তিনি ব্রাহ্মধর্মের প্রবক্তা ও দেশ থেকে সতীদাহ প্রথা নিবারণের পথপ্রদর্শক রূপেই খ্যাত হয়েছেন। তাঁর জীবনের নানা কর্মকাণ্ডের সঙ্গে পরিচয় খুব বেশি লোকের নেই। আধুনিক ভারতের পুনর্জাগরণের সূচনা যিনি করেছিলেন, তিনিই কিন্তু রাজা রামমোহন রায়। ‘রাজা’ উপাধিটি তিনি লাভ করেন দিল্লির বাদশা বাহাদুর শাহের (দ্বিতীয়) কাছ থেকে।
আড়াইশো বছরেরও পূর্বে যখন রামমোহন রায় জন্ম গ্রহণ করেছিলেন, তখন যে ভারতবর্ষ ছিল তার থেকে আজ ভারত জ্ঞানে-বিজ্ঞানে অনেক উন্নত। রামমোহন সমাজকে উন্নত করার চেষ্টা করে গেছেন আজীবন। সমাজ সংস্কারের কাজে যে কোনও বাধাকে তিনি অতিক্রম করে গেছেন তাঁর ক্ষুরধার যুক্তি ও মেধার সহায়তায়। দৃঢ় চিত্তের জন্য তিনি তাঁর সাধনায় অবিচল থেকেছেন। ধর্ম ও সমাজ সংক্রান্ত অন্যায়-অবিচারের প্রতিবাদ এবং যুক্তি দিয়ে সত্য উদঘাটনের চেষ্টায় তাঁকে অনেক বক্রোক্তি সহ্য করতে হয়েছিল, এমনকি পরিবার পরিজন থেকে পরিত্যক্ত হয়েছিলেন, তবু তিনি তাঁর সিদ্ধান্তে অটল থেকেছেন। দেশের লোক তো দূরের কথা, তাঁর নিকট পরিজন— পিতা-মাতা স্বয়ং তাঁর বিরোধিতা করেছেন। যাঁরা যুগপ্রবর্তক হয়ে আসেন যুগ তাঁদের চিনতে পারে না, বুঝতে পারে না। রামমোহন কার্যত ঈশ্বরে অবিশ্বাসী ছিলেন না, শুধু ধর্মের মিথ্যা খোলস দূর করতে চেয়েছিলেন। ধর্মান্ধতার বন্ধন থেকে মুক্তির জন্য বিজ্ঞানভিত্তিক ও যুক্তিবাদী শিক্ষার প্রসারের চেষ্টা করেছিলেন তিনি আর এই চেষ্টাই তাঁর আধুনিকতার প্রমাণ। তাই নিঃসন্দেহে এ কথা বলা যায় যে ভারতবর্ষে আধুনিকতার জনক ছিলেন রামমোহন।
রামমোহন যে সময়ে জন্মেছিলেন, সে সময়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ভারতে তখন মধ্যযুগের শেষ আর আধুনিক যুগের শুরু, সেই সন্ধিক্ষণে রামমোহনের শুভ আবির্ভাব। রামমোহন কোনও ধর্মগুরু ছিলেন না, তিনি বিভিন্ন ভাষা শিখে বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ গভীরভাবে অধ্যয়ন করে ধর্মের সত্য রূপটি উপলব্ধি করতে চেয়েছিলেন, অন্যদের তা জানাতে চেয়েছিলেন। সব ধর্মগ্রন্থের মূল কথা এক: ঈশ্বর এক এবং অদ্বিতীয়। কিন্তু ধর্মগুরুরা অহেতুক আচার-বিচারকে প্রাধান্য দিয়ে, ধর্মের দোহাই দিয়ে মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেছেন, যার ফলস্বরূপ সারা পৃথিবীতে মারামারি, হানাহানি, শারীরিক ও মানসিক কষ্টের সূত্রপাত।
শুধু ভারতেই নয়, ইংলন্ডের সমাজেও তখন পরিবর্তনের ঢেউ উঠেছে। শিল্প বিপ্লবের শুরু হয়েছে। ভারতে বাদশাহী আমলের শেষ পর্যায় ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির স্থাপন। দেশে তখন ইংরেজদের শাসন কায়েম হয়েছে; জাতিভেদ, নানারকম ধর্মীয় অনুশাসন, কুসংস্কার, অশিক্ষা, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, কুলীনপ্রথা, স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রীদের সহমরণের ধর্মীয় পুণ্যলাভের নামে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা, ব্রাহ্মণ-পুরোহিতদের দাপট, অন্ত্যজ গরীব মানুষদের হীন চোখে দেখা ইত্যাদি নানারকম সামাজিক অবক্ষয় চলছিল। এমতাবস্থায় রামমোহনের জন্ম হল গোঁড়া হিন্দু ব্রাহ্মণ পরিবারে।
১৭৭২ সালের (মতান্তরে ১৭৭৪) ২২শে মে হুগলি জেলার খানাকুল-কৃষ্ণনগরের রাধানগর গ্রামে রামমোহন জন্মগ্রহণ করেন। পিতা রামকান্ত রায় ছিলেন পরম বৈষ্ণব এবং মা (ফুলঠাকুরাণী) তারিণী দেবী ছিলেন শৈব পরিবারের। তারিণী দেবী প্রচণ্ড ব্যক্তিত্বময়ী ছিলেন। পুত্র রামমোহন মায়ের ব্যক্তিত্বময় ও জেদি চরিত্রটি লাভ করেছিলেন। তৎকালীন সমাজে বহুবিবাহের রীতি অনুযায়ী রামকান্তের তিনটি বিবাহ। প্রথমা স্ত্রী সুভদ্রা নিঃসন্তান ছিলেন। দ্বিতীয়া স্ত্রী তারিণী দেবীর দুই পুত্র ও এক কন্যা: জ্যেষ্ঠ জগমোহন ও কনিষ্ঠ পুত্র রামমোহন। তৃতীয়া স্ত্রী রামমণিদেবী রামলোচন রায়ের মাতা ছিলেন।
তদানীন্তন সময়ে রামমোহনের পরিবারের অনেকেই মুর্শিদাবাদের মুসলমান রাজসরকারের অধীনে চাকরি করতেন। সেই সুবাদে রামমোহনের পিতা রামকান্ত রায় প্রচুর ধনসম্পত্তির অধিকারী হয়েছিলেন। রামমোহনের প্রপিতামহ কৃষ্ণচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় নবাবের কাছ থেকে সম্মানসূচক ‘রায় রায়ান’ উপাধি লাভ করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে রামমোহনের বংশ রায়ান বাদ দিয়ে ‘রায়’ উপাধি ব্যবহার করতেন।
প্রচলিত বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহের প্রথা অনুযায়ী রামমোহনেরও বাল্যবয়সে তিনটি বিবাহ হয়। প্রথম বিবাহ হয় রামমোহনের আট বছর বয়সে, স্ত্রীর বয়স অজানা এবং তিনি অকালপ্রয়াত। নয় বছরে রামমোহনের দ্বিতীয় বিয়ে। এক বছরের মধ্যে পিতা রামমোহনের তৃতীয় বিবাহ দিয়ে দেন। শৈশবে বংশের রীতি অনুযায়ী রামমোহন কৃষ্ণভক্ত ছিলেন। কিন্তু অল্পবয়স থেকে কাশী, পাটনা, তিব্বত ইত্যাদি নানা স্থানে গিয়ে আরবী, ফার্সী, উর্দু, সংস্কৃত শাস্ত্র পড়ে তিনি হিন্দু ধর্মের পৌত্তলিকতার প্রতি আস্থা হারান। গোঁড়া হিন্দু ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তান হয়ে পৌত্তলিকতায় অবিশ্বাসী হওয়াতে ধর্মপ্রবণ মাতা-পিতা তা মেনে নিতে পারলেন না। পুত্র দুর্দান্ত মেধাবী, তরুণ বয়সেই বিভিন্ন ভাষায় পারদর্শী হয়ে উঠলেন। তবু পিতা-মাতা বিধর্মী পুত্রকে গৃহ থেকে নির্মমভাবে বিতাড়িত করেন। তাতে যেন ‘শাপে বর’ হল। তিনি আরও গভীরভাবে হিন্দু ধর্মের গূঢ় তত্ত্ব জানতে আগ্রহী হলেন।
রামমোহন রায়কে আজ আমাদের আরো ভালভাবে জানবার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। আজও আমরা তাঁর চিন্তাধারাকে প্রকৃত উপলব্ধি করতে পারি নি। দেশ ও দেশের জনসাধারণকে কোন্ উত্তরণের পথে তিনি নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, তা তাঁর কৈশোর থেকে বাকি জীবনচর্যার মাধ্যমে বোঝা যাবে।
রামমোহন জীবনের প্রথম চৌদ্দ বছর রাধানগরে ছিলেন। সেখানকার গুরুমহাশয়ের পাঠশালায় বাংলা শেখার সঙ্গে সঙ্গে একজন মৌলভীর কাছে ফারসি শেখেন। ফারসি ভাষায় ব্যুৎপত্তি লাভের জন্য তাঁকে তৎকালীন ইসলামি শিক্ষার পীঠস্থান পাটনায় পাঠানো হয়। তিনি সেখানে কোরান ও ইসলাম ধর্মতত্ত্ব আয়ত্ত করেন। ফারসি ভাষায় সুফিদের গ্রন্থ পাঠ করে তাঁর মনে প্রচলিত ধর্ম সম্পর্কে নানারকম প্রশ্ন জাগে। চৌদ্দ বছর বয়সে রামমোহন নন্দকুমার বিদ্যালংকার, যিনি পরবর্তীকালে ‘হরিহরানন্দ তীর্থস্বামী কূলাবধূত’ নামে খ্যাত হন, তাঁর কাছে সংস্কৃত শাস্ত্র এবং তন্ত্র শাস্ত্র শিক্ষা লাভ করেন। পাটনা থেকে ফিরে তিনি হিন্দুদের মূর্তিপূজা আর হিন্দু সমাজের নানা সংস্কার সম্বন্ধে বই লেখেন। হিন্দুদের মূর্তিপূজা সম্পর্কিত বই লেখার ফলস্বরূপ গোঁড়া রক্ষণশীল পিতার বিরাগভাজন হতে হল তাঁকে। বাড়ি থেকে পিতা কর্তৃক বিতাড়িত হয়ে তিনি বিভিন্ন স্থান ঘুরতে ঘুরতে তিব্বত যান, সেখানে বৌদ্ধধর্ম শাস্ত্রে জ্ঞানার্জন করেন। সেখানেও লামার সঙ্গে বিবাদ হয়, যেহেতু তিনি লামাকে জীবন্ত দেবতারূপে মানতে পারেন নি। সেখানে তাঁর জীবন সংশয় হয়। তিব্বত থেকে ফিরলে বাবা রামকান্ত পুত্রকে পুনরায় গৃহে প্রবেশাধিকার দেন। এবার তিনি বারাণসী গিয়ে হিন্দুশাস্ত্র অধ্যয়ন করলেন এবং অতি অল্প সময়ে স্মৃতি, পুরাণ ইত্যাদি শাস্ত্রে অগাধ জ্ঞান অর্জন করেন।
এরপরেই শুরু হয় রামমোহনের দ্বন্দ্ব। আশৈশব পারিবারিক বৈষ্ণব ধর্মে লালিত তাঁর মনে পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে এক নিরাকার শক্তির অনুভূতি পরিব্যাপ্ত হয়। মাঝে মধ্যেই পিতার সঙ্গে তর্ক-বিতর্ক হত। রামমোহনের হিন্দু ধর্মের সকল কুসংস্কার ও কুপ্রথার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোয় ক্রুদ্ধ ও দুঃখিত পিতা পুনরায় রামমোহনকে গৃহ থেকে বিতাড়িত করেন।
১৮০৩ সালে পিতা রামকান্তের মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পূর্বে পিতা তিন সন্তানের মধ্যে সম্পত্তি ভাগ করে দিয়ে যান। কিন্তু পুত্র পিতা প্রদত্ত সম্পত্তি গ্রহণ করেন নি। পুত্র প্রকাশ্যে পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে মতবাদ প্রকাশ করাতে ক্রুদ্ধ জননী বিধর্মী পুত্রকে আইনের সাহায্যে সম্পত্তিচ্যুত করার জন্য সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেন। রামমোহন মামলায় জয়ী হন। তিনি যে বিধর্মী তা প্রমাণিত হয় নি। রামমোহন বন্ধু গর্ডন সাহেবকে বিলাতে থাকাকালীন চিঠি লিখেছিলেন, তাতে তিনি তাঁর জীবন কাহিনি সংক্ষেপে লেখেন: “আমার সমস্ত তর্ক বিতর্কে আমি কখন হিন্দুধর্মকে আক্রমণ করি নাই। উক্ত নামে যে বিকৃত ধর্ম প্রচলিত, তাহাই আমার আক্রমণের বিষয় ছিল।” তিনি প্রাচ্য দর্শনকে শ্রদ্ধা জানিয়ে পাশ্চাত্য শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে ভারতের পুনর্জাগরণ সম্ভব বলে মনে করেছিলেন। তাঁর ধর্মীয় চিন্তা ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে তিনি ইসলাম, সুফিবাদ ও খ্রিস্টধর্ম এবং উপনিষদের একেশ্বরবাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন।
প্রথমে রামমোহন মুর্শিদাবাদে উডফোর্ড সাহেবের সহযোগী, তারপর তিনি ডিগবি সাহেবের বাবু বা দেওয়ান রূপে রামগড়, যশোর, ভাগলপুর এবং রংপুরে কাজ করেছেন। ১৮১৪ সাল পর্যন্ত ডিগবি সাহেবের অধীনে চাকরি করার সময়ে তিনি ইংরেজি ভালোভাবে শেখেন। ইংরেজি পত্র-পত্রিকা ও অন্যান্য লেখা পাঠ করে তিনি ইংলন্ডের শিল্পবিপ্লবের সময়ের চিন্তাধারা সম্পর্কে অবহিত হন।
১৮১৪ সালে রামমোহন কলকাতায় এসে বসবাস শুরু করলেন। সেই সময় থেকেই প্রকৃতপক্ষে তিনি তাঁর জীবনের সময়, অর্থ, শরীর ও মন দেশ ও দশের মঙ্গলের জন্য উৎসর্গ করলেন। ১৮১৫ সালে তিনি তাঁর মানিকতলার বাসভবনে ‘আত্মীয় সভা’ নামে একটি সভা গঠন করেন। অল্পবয়স থেকেই রামমোহন প্রচলিত ধর্মের অসারতা উপলব্ধি করেছিলেন। খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারকেরা ভারতের জনসাধারণকে বর্বর, অসভ্য ভাবতেন, তাদের সভ্য করার উদ্দেশ্যে খ্রিস্টান ধর্মমত প্রচার করতেন। রামমোহন উপলব্ধি করলেন এমন ধর্ম থাকা উচিত যাতে ঈশ্বরের মূর্তি থাকবে না, ভেদবিচার থাকবে না, অথচ তার মূল থাকবে ভারতের সুপ্রাচীন ধর্মীয় সংস্কৃতিতে। মূর্তি বিরোধী অভেদতত্ত্ব প্রচারের উদ্দেশ্যেই তাঁর এই ‘আত্মীয় সভা’ গঠন। নিরাকার ঈশ্বরের প্রার্থনা করার জন্য রামমোহনের উদ্যোগে ১৮২৮-এ ‘ব্রাহ্মসমাজ’ প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮১৫ থেকে ১৮১৭ সালের মধ্যে রামমোহন বেদান্ত গ্রন্থ, কেনোপনিষদ, ঈশোপনিষদ, কঠোপনিষদ, মান্ডুক্যোপনিষদ, মুন্ডকোপনিষদ ইত্যাদি বাংলা অনুবাদ সহ পুস্তকাকারে প্রকাশ ও প্রচার করেন। তিনি বেদান্ত ও উপনিষদকে ধর্ম ও সমাজ সংস্কারের কাজে অস্ত্র রূপে গ্রহণ করেন। হিন্দু ধর্মের মূলে কী আছে তা জানার জন্য নিজে শাস্ত্র অধ্যয়ন করে তিনি দেখলেন, বেদান্তে বা উপনিষদে জাতিভেদ, বর্ণভেদ, মূর্তিপূজা সমর্থিত হয় নি। বেদান্ত মতে ঈশ্বর জগৎময় এক অদৃশ্য সত্তা, সমস্ত প্রাণী ও সমস্ত পদার্থে তা পরিব্যাপ্ত। প্রচলিত ধর্মের বিরুদ্ধে রামমোহনের সংগ্রামের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল পরাধীন ভারতে অশিক্ষা, কুসংস্কারাচ্ছন্ন, ধর্মের মোহাবিষ্ট ভারতীয়দের বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়ন সাধন। উন্নয়নকেই রামমোহন সর্বাধিক প্রাধান্য দিয়েছেন। তাই তিনি ১৮২৩ সালে গভর্নর জেনারেল লর্ড আমহার্স্টকে লেখা চিঠিতে এই দাবি জানান যে ভারতীয়দের প্রাচ্যবিদ্যা চর্চার সঙ্গে ইউরোপীয় জ্ঞান-বিজ্ঞানের পরিচয় ঘটাতে হবে। ‘আত্মীয় সভা’র অধিবেশনে সিদ্ধান্ত হয়, ভারতীয় হিন্দুদের জন্য একটি উত্তম মানের স্কুল স্থাপন করা হবে। হিন্দু বিদ্যালয়ের জন্য শহরের গণ্যমান্য ও ধনীরা অর্থদানে রাজি হলেন কিন্তু সেই উদ্যোগ মাঝপথে থমকে গেল রামমোহনের ধর্মীয় সংস্কারমূলক মতামতে বিক্ষুব্ধ কিছু মানুষের বিরোধিতায়। তাঁরা ঘোষণা করলেন, রামমোহন যদি হিন্দু বিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকেন, তাহলে তাঁরা হিন্দু বিদ্যালয় স্থাপনে সহযোগী হবেন না। রামমোহন চান কর্ম, দেশের সর্বাত্মক উন্নতি। তাঁর জন্য কোনও মহৎ কার্য বাধা প্রাপ্ত হবে, তা তাঁর কাম্য নয়; তাই তিনি সরে দাঁড়ালেন হিন্দু বিদ্যালয় স্থাপনের কর্মকাণ্ডের থেকে। ভবিষ্যতে এই হিন্দু বিদ্যালয় ‘হিন্দু কলেজ’ বা ‘প্রেসিডেন্সি কলেজ’ রূপে জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রসিদ্ধ পীঠস্থান হয়। ১৮২২ সালে রামমোহন নিজের অর্থ ব্যয় করে হেদুয়া অঞ্চলে ‘এ্যাংলো হিন্দু স্কুল’ স্থাপন করেছিলেন।
শিক্ষা ছাড়া রামমোহন বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন সংবাদ মাধ্যমের প্রসারকে। নিজে তিনি তিনটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। মীরাৎ-উল-আখবার ফার্সিভাষায়, ইংরেজি ভাষায় ‘ব্রাহ্মনিকাল্ ম্যাগাজিন-ব্রাহ্মণ সেবধি’ এবং বাংলা ভাষায় ‘সংবাদ কৌমুদী’। শুধু সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠাই নয়, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা খর্বের ব্যাপারেও তিনি প্রতিবাদ করেন। লর্ড ওয়েলেসলি সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করলে তিনি তার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠেন।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও ছিল তাঁর সজাগ দৃষ্টি। তিনি বুঝেছিলেন ইংরেজ কোম্পানির শাসনকালে দেশের মানুষের দারিদ্র্য বেড়ে চলেছে। বিদেশী মূলধনে ভারতে শিল্পোন্নয়নের সম্ভাবনা হতে পারে এই ভাবনায় তিনি ও তাঁর সহযোগী বন্ধুরা (যেমন দ্বারকানাথ ঠাকুর) নীল চাষকে সমর্থন করেছিলেন। রামমোহন জমিদারি ব্যবস্থায় কিছু সংস্কার সাধনের চেষ্টা করেন। নিজে বড় তালুকদার হয়েও জমিদারদের, তালুকদারদের এবং রাজস্ব আদায়কারীদের প্রজাশোষণের কথা তুলে ধরেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন জমিদারদের মতো প্রজাদের সঙ্গেও ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ হোক, তাহলে জমিদারদের উৎপীড়ন কমবে।
রামমোহনের সমাজ-সংস্কার প্রচেষ্টার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ সাফল্য হল সতীদাহ নিবারণ। মুঘল সাম্রাজ্যের পতন ও ইংরেজদের এদেশে একাধিপত্য প্রতিষ্ঠার পরে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে সতীদাহ বৃদ্ধি পেয়েছিল। রামমোহনের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা জগমোহনের মৃত্যুর পর তাঁর দ্বিতীয়া স্ত্রীকে সহমরণে যেতে হয়েছিল। এ ঘটনা রামমোহনকে দগ্ধ করে। তিনি সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে প্রথাটি বন্ধ করতে চেয়েছিলেন। হিন্দুশাস্ত্র ঘেঁটে বের করেছিলেন, কোথাও পতির মৃত্যুর পর স্ত্রীদের সহমরণের কথা উল্লিখিত হয় নি। রামমোহনের নিরলস প্রচেষ্টার পরিণামস্বরূপ ১৮২৯ সালে লর্ড বেন্টিক সতীদাহকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে ঘোষণা করলেন ও আইন প্রণয়ন করে চিরতরে তা বন্ধ করলেন।
ধর্ম, শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারে রামমোহনের যেমন আগ্রহ, তেমনি ইউরোপ, আমেরিকার গণতান্ত্রিক কার্যকলাপ সম্পর্কেও ছিল সমান আগ্রহ। বিদেশের খবরাখবরও তিনি রাখতেন। তিনটি কারণে তিনি ইংল্যান্ড সফর করেন। প্রথম কারণটি হল তৎকালীন দিল্লির সম্রাট দ্বিতীয় আকবরের পক্ষ থেকে ইংল্যান্ডের রাজার হাতে স্মারকলিপি প্রদান। স্মারকলিপিতে ছিল দিল্লির নিকটবর্তী কতকগুলি জমিদারির রাজস্বে বাদশাদের নিজের অধিকারের স্বীকৃতি আদায় করা। দ্বিতীয় কারণ সতীদাহ প্রথা নিবারণ বিষয়ক একটি স্মারকলিপি ইংল্যান্ডের ‘হাউস অব কমন্সে’ দাখিল করা। তৃতীয়ত, ‘হাউস অব কমন্সে’র আসন্ন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সনদ পুনঃপ্রদান বিষয়ক আলোচনায় যোগ দেওয়া। ইংল্যান্ডে তিনি যথেষ্ট সম্মান অর্জন করেছিলেন। সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতার দেশ ফ্রান্স সম্পর্কে রামমোহনের কৌতূহল ছিল। ১৮৩২ সালে তিনি প্যারিস যান এবং স্বয়ং রাজা লুই তাঁকে সম্মানিত করেন। ফ্রান্স থেকে তিনি ব্রিস্টলে ফিরে আসেন, সেখানে থাকাকালীন তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। ১৮৩৩ সালে ২৭ সেপ্টেম্বর ব্রিস্টলে এই মহামানবের জীবনদীপ চিরতরে নির্বাপিত হল। ভারতমাতার কৃতী সন্তানকে শেষ সম্মান জানানোর সুযোগ আর ভারতবাসী পেল না।
সময়ের দাবি মেনে রাজা রামমোহন রায়ের সমাজ সংস্কার বর্তমান সময়েও প্রাসঙ্গিকতা হারায় নি। ঊনবিংশ শতাব্দীতে কুসংস্কারের বিরুদ্ধে, জাতিভেদের বিরুদ্ধে, ধর্মধ্বজীদের বিরুদ্ধে রামমোহনের বিদ্রোহ যেমন দুঃসাহসিক পদক্ষেপ ছিল, তেমনি বর্তমান সময়েও তাঁর প্রাসঙ্গিকতা প্রবলভাবে উপলব্ধ হয়। এই একবিংশ শতাব্দীতে যখন প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানে দেশ অগ্রসরমান, তখন আরো বেশি বেশি আমরা ধর্মকে, পৌত্তলিকতাকে প্রাধান্য দিচ্ছি। ধর্মের সারবস্তুতে মনোযোগী না হয়ে আচার বিচারকে প্রাধান্য দিচ্ছি। “সবার উপরে মানুষ সত্য” ভুলে গিয়ে দেশের নেতারা ধর্ম নিয়ে পড়েছেন, ধর্মের বাহানা দিয়ে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধিতে মন দিয়েছেন। দেশের মঙ্গল, দেশের মানুষের মঙ্গল চিন্তা বাহুল্যমাত্র। রাজা রামমোহন রায় সম্পর্কে যত পড়ছি, তত বিস্মিত হচ্ছি। কোন ধাতুর মানুষ ছিলেন তিনি? মনের মধ্যে নানা প্রশ্ন জেগে উঠছে। একবিংশ শতাব্দীর ভারতের মানুষের দিকে তাকিয়ে দেখি, ভারতবাসীর মনোজগতে বিশেষ পরিবর্তন আসে নি, সংস্কার হয় নি। সতীদাহ প্রথা নেই, কিন্তু পণের জন্য ও নানা কারণে আজও মেয়েদের পুড়িয়ে মারা হয়। মেয়েরা অন্দরমহল থেকে তাদের কর্মজগত বহির্বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে পেরেছে। স্থলে, জলে, অন্তরীক্ষে মেয়েরা তাদের মেধা ও শক্তির পরিচয় দিচ্ছে, পুরুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলছে। তবু মেয়েদের নিরাপত্তা নেই। সভ্যতার উন্নতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ধর্ষণ, নারী নির্যাতন। ভারতীয় রাজনীতিতে আজ ঘুণ ধরেছে। রামমোহন চেয়েছিলেন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের শিক্ষার মিলন, যুক্তিবাদ, “ধর্মের বেশে মোহ” যেন এসে না ধরে; অথচ বাস্তবে দেখি জনসাধারণ বিজ্ঞানকে ছেড়ে, যুক্তিকে বাদ দিয়ে মাদুলি, কবচ, ধাগা ধারণেই বিশ্বাসী। ভীরুপ্রাণ আমরা কঠিন অসুখ থেকে মুক্তি পেতে ডাক্তারের পরিবর্তে যাই মা মনসার থানে, ওঝার কাছে। বিপদ থেকে রক্ষা পেতে করি মানত। যত দুর্বল হচ্ছি ততই বেড়ে চলেছে কালী, শিব, দুর্গা, কৃষ্ণ ছাড়াও অসংখ্য দেবদেবীর শরণাপন্ন হওয়া। হাসপাতাল, বিদ্যায়াতনের বদলে বড় বড় মন্দির তৈরিতে ব্যস্ত হচ্ছি। আমাদের দেশে যুগ যুগ ধরে এত মহাপুরুষ, মনীষী থাকা সত্ত্বেও আমরা তাঁদের দেখিয়ে দেওয়া পথে চলি না। এখনো আবার যদি আমরা রাজা রামমোহন রায়ের চর্চা করি, আবার আমরা ফিরে পাব আমাদের মনোবল, আত্মবিশ্বাস ও সৎসাহস— যার ওপর ভিত্তি করে আমরা ও আমাদের নবীন প্রজন্ম গৌরবময় নব্য ভারতের দিকে অগ্রসর হতে পারবে। যদি ধর্মপ্রাণ ভারতীয়রা যুক্তিগ্রাহ্য ধর্মাচরণ করে এবং রামমোহনের চিন্তাধারাকে অনুধাবন করতে পারে, তবে নিশ্চিতভাবে আমাদের মেধা ও শক্তিকে যথাযথ কাজে লাগিয়ে আমরা বিশ্বে অনুসরণকারী দেশ রূপে গণ্য হতে পারব। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যথার্থই রামমোহনকে “ভারতপথিক বলে অভিহিত করেছিলেন। রাজা রামমোহন রায় অবশ্যই ছিলেন প্রকৃত মানব দরদী।
রামমোহন রায় সম্পর্কিত প্রবন্ধ লিখতে গিয়ে আমি যে সব তথ্য জেনে উপকৃত হয়েছি, তা পেয়েছি তিনটি গ্রন্থ থেকে। সর্বপ্রথম উল্লেখ করতে হয় শ্রী নগেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘মহাত্মা রাজা রামমোহন রায় জীবন চরিত’। দ্বিতীয় বইটি শ্রী তাপস ভৌমিকের সম্পাদনায় ‘কোরক’ প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত ‘সার্ধ-দ্বিশতবর্ষে রামমোহন রায়’ এবং তৃতীয় বইটি রাজা ভট্টাচার্যের দ্বারকানাথ ঠাকুরকে অবলম্বন করে রচিত উপন্যাস ‘দ্বারকানাথ: পরাধীন দেশের রাজপুত্র’।
Swati Parrack has done her M. Phil in Sanskrit, Degree and Diploma in German and Hindi languages. She has been associated with Convergence right from its inception and has been teaching German at various levels here.
আমাদের সকলের পরম শ্রদ্ধেয়া অধ্যাপিকা ড. ঋতা চট্টোপাধ্যায় (আর,সি ম্যাডাম)থেকে ঋতা দি -হয়ে ওঠার এই জার্ণি কোন একদিনে তৈরি হয় নি| বহুদিনের শ্রদ্ধা, সান্নিধ্য, বিশ্বাস আর ভরসা থেকেই এই সম্পর্কের উত্তরণ| সময়টা মোটামুটি ২০০২-০৩ হবে, আমরা তখন এম. এ. প্রথমবর্ষ| বোধহয় তার দু‘ এক বছর আগে অধ্যাপিকা ঋতা চট্টোপাধ্যায়(আর.সি ম্যাডাম) রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যাদবপুরে আসেন| সেমেস্টার সিস্টেম তখন চালু হয় নি, সম্ভবত, দ্বিতীয় পত্রে সংস্কৃত দুটি নাটক পাঠ্য ছিল- একটি মৃচ্ছকটিকম, অন্যটি উত্তররামচরিতম| মৃচ্ছকটিকম পড়াবেন আর.সি ম্যাডাম আর উত্তররামচরিতম পড়াতেন এন.বি ম্যাডাম| সকলের প্রিয় এন.বি ম্যাডাম- অধ্যাপিকা নন্দিতা দি(বন্দ্যোপাধ্যায়)| সত্যি-এককথায় অসাধারণ, কোন তুলনা নেই| যেমন পড়াতেন তেমনি স্নেহবাত্সল্যভাব ছিল সবার প্রতি| বিভাগে পি,পি ম্যাডাম যেমন অতিশয় সাদামাটা, ভীষণ কড়া প্রকৃতির, ঠিক তার বিপরীতে আর.সি ম্যাডাম ছিলেন খুবই ঠাণ্ডা স্বভাবের, সাজগোজে অত্যন্ত পরিপাটি এবং খুব সুন্দর, দেখলেই কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার মত! তাঁর গাড়ি থেকে শাড়ি, পেন বা ডায়েরি সবকিছুতেই একটা ম্যাচিং ম্যাচিংভাব থাকতো| সবেতেই ছিল একটা আভিজাত্যের ছাপ| চলন বলন একেবারে বিদেশী স্টাইলে| পড়াশুনা থেকে নানা কাজে কর্মেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত ধীর, স্থির ও খুতখুঁতে স্বভাবের| মৃচ্ছকটিকের তিনি আমাদের গোটা কয়েক ক্লাস নিয়েছিলেন| খুব ধরে ধরে পড়াতেন, খুব সুন্দর বোঝাতেন| খুব ভালো লাগতো ওঁনার ক্লাস করতে| ম্যাডাম বলতেন না বুঝতে পারলে সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞাসা করতে, তাঁর কথায় -‘আমারা পডেছি বিষ্ণুপদ ভট্টাচার্য, কালীপদ তর্কাচার্যদের মত বিখ্যাত সব পণ্ডিতদের কাছে, আর তোমারা পড়ছ আমাদের কাছে| খুব সত্ত্বর সবাইকে আপন করে নেওয়ার একটা মনোভাব ছিল তাঁর, সকলের প্রায় নামেই চিনতেন, কিন্তু ম্যাডাম আসতেন কম, বহুদিন একেবারে আসেনও নি| তারপর একদিন বি.জি ম্যাডাম এসে জানালেন এবার থেকে উনিই মৃচ্ছকটিকের ক্লাস নেবেন| সকলের মনেহল- ‘ইস ভালোই তো ছিল, আবার বি.জি. ম্যাডাম! কারণ বি.জি ম্যাডামের কাছে আগে আমরা অভিজ্ঞানশকুন্তল, কারক, ভাষাতত্ত্ব, মেঘদূত সবই পড়েছি| আসলে উনি একটু রাশভারি প্রকৃতির| একটু এদিক ওদিক হলেই গেলো, একেবারে চারতলা থেকে ছুড়ে ফেলার হুমকি| আচ্ছা, কেন ক্লাস নেবেন না আর.সি ম্যাডাম? খোঁজখবর নিয়ে জানাগেল ম্যাডামের স্বামী না কী খুবই অসুস্থ| কী আর করা যাবে! আমারা আর আর. সি. ম্যাডামকে পেলাম না| পরে পি.জি টু-তে গিয়ে আমার স্পেশাল পেপার অন্য হয়েযায়| আর.সি ম্যাডাম ছিলেন কাব্যে স্পেশাল, আমি চলেযাই স্মৃতি ও এপিগ্রাফি গ্রুপে| যদিও কাব্য ভালোই লাগত বরাবর| যাইহোক, পড়াকালীনই শুনেছিলাম একজন পি.এইচ.ডি স্কলার দাদাকে নাকী আর.সি ম্যাডাম আর পি.এইচ.ডি করাবেন না, কারণ সে নাকী ওঁনার নোটপত্র কীসব চুরি করেছে, না, ম্যাডামের সঙ্গে কিছু একটা বাজে ব্যবহার করেছে| যাইহোক, তখন বুঝতে পারিনি বা বোঝার চেষ্টাও করেনি কিছু| কিন্তু স্কলারদের নিয়ে এইধরণের সমস্যা ম্যাডামের আজীবন পিছু ছাড়েনি- বোধহয় এখান থেকেই তার সূচনা ছিল| আমারা এম. এ. পাস করেই এস.এস.সি দিয়ে স্কুলে চাকরি করতে চলেগেলাম| তাই আর.সি. ম্যাডামের সঙ্গে আর সেভাবে কোন যোগাযোগ ছিল না|
যাদবপুরে ফিরে আসলাম ২০০৯ সালে, এসিস্ট্যান্ট প্রফেসার হিসাবে| প্রথম প্রথম আমার বসার ঘর ছিল না কয়েক বছর| ক্লাস নেওয়ার পর একদিক ওদিক করে কখন যে কার ঘরে গিয়ে বসে পড়তাম তার ঠিক নেই| যেখানেই থাকি নির্দিষ্ট সময়ে চায়ের আড্ডায় অবশ্যই থাকা চাই| চায়ের আড্ডা বশত অধ্যাপিকা শর্বাণীদির তত্ত্বাবধানে| একে একে সবাই জড়ো হতেন সেখানে| জানাগেল-প্রদ্যোত বাবু, শর্বাণী দি, ঋতা দি সকলেই বন্ধু ছিলেন- কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসমেট| অনেক সময় ঋতা দি নিজের ফ্লাক্সে স্পেশাল চা নিয়েও চায়ের আড্ডায় চলে আসতেন| কী নেই সেই আড্ডায়? সেখানে নানান আলোচনায় বাড়ির কথা থেকে শাস্ত্রের কথা মিলেমিশে সব একাকার হয়ে যেত| মাঝে মধ্যে বিজয়া দির রসালো গল্পে হাসির রোল পড়ে যেত সবার মধ্যে, সকল গুরুজনদের মাঝে আমার মুখ টিপে হাসি ছাড়া গত্যন্তর ছিল না| আমার অস্বস্তির হাসিতে ঋতা দি মৃদু হেসে যেন কিছুটা সমাল দেওয়ার জন্য বলতেন -‘বিজয়া তুমি এবার থামবে? তোমার মুখে তো কিছু আটকায় না| দেখছো না এখানে দেবদাস আছে| দেবদাস তুই কিন্তু বড়োদের কথায় একদম কান দিস না|’ আমিও সকলের সামনে বসেই বলতাম –‘না দিদি| একদম না|’ প্রথম প্রথম আমি চা খেতাম না, ওঁনাদের সকলের পীড়াপীড়িতেই চা খাওয়ার অভ্যেসটা তৈরি হয়ে যায়|
ঋতাদির সুগার ছিল অত্যন্ত পরিমাণে, নির্দিষ্ট সময়ে ইনসুলিন নিতে হত তাঁর, তাই হয়তো নিয়ম করে কিছুটা খাওয়ার অভ্যেস ছিল| কখনো তিনি হয়তো নিজের ঘরে একান্তে বসে চা খাচ্ছেন-এমন সময় কোন কিছু জানতে বা এমনি হয়তো গেছি| উনি বলতেন- ও দেবদাস! বোস!’ -বসলাম| ‘কিখবর বল?’ না দিদি এমনি এলাম| ঋতা দি খাচ্ছেন বা খেতে যাওয়ার আগে যেন আমার সম্মতি নিতেই বলতেন- “আমি একটু খাচ্ছি রে! খাবি একটু?” আমি বলতাম -না দিদি| তবুও উনি নিজের স্যান্ডুইস থেকে কিছুটা কেটে দিয়ে বলতেন- এই নে খা| -একটু অস্বস্তি হলেও ওঁনার কথা রাখতে নিতাম| আবার যেহেতু উনি সুগার ফ্রি চা খেতেন, আমি তা খেতাম না| তাই উনি আবার সুগার ফ্রি কয়েকটা বড়ি মিশিয়ে দিতেন আমার চায়ের সঙ্গে| খেতে খেতে কতো না গল্প হত কে জানে| জিজ্ঞাসা’ করতেন- পি.এইচ.ডি কাজ কতদূর? আমি বলতাম-চলছে, তিনি বিষয় জিজ্ঞাসা করতেন, খুটিয়ে বাড়ির খবরাখবর নিতেন, বাড়িতে কে কে কেমন আছেন? বাড়িতে যাই কী না? ইত্যাদি| এভাবে নানান গল্পগুজবের মাঝে কবে যে তাঁর অতি স্নেহের ও বিশ্বাসের পাত্র হয়ে গিয়েছিলাম তা কে জানে? খাওয়ার আগে সামনে কেউ থাকলে তার সম্মতি নিয়ে খাওয়ার যে ভদ্রতাবোধ তখন কিছু না বুঝতে পারলেও এখন আমার স্কলারদের সামনে কিছু খেতে গেলে দিদির কথাই যেন মনে পড়ে আর সকলের সঙ্গে একটু ভাগ করে খাওয়ার আনন্দটাও উপভোগ করি|
ঋতা দি-কে খুব ভালোকরে চিনতে পেরেছিলাম ওঁনার সঙ্গে একটি রিফ্রেসার কোর্সের কো-অর্ডিনেটর হওয়ার সূত্র ধরে| তখন একুশ দিন ধরে এই কোর্সটি চলত| কিন্তু তার পরিকল্পনা হত তারও প্রায় একমাস দেড়মাস আগে থেকে| রিফ্রেসার কোর্সের কোন পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না আমার| কিন্তু এসব কিছু না ভেবে অভিজ্ঞ কেউ না থাকতে চাওয়ায় ঋতাদির সঙ্গে আমাকেই যুগ্ম ভাবে কো অর্ডিনেটর রাখা হয়| সদ্য জয়েন করার পর ঋতা দির মত ব্যক্তির সঙ্গে এই কাজে রত হওয়া ছিল আমার মত একজন খামখেয়ালি ও আনকোরা ব্যক্তির পক্ষে অতি চ্যালেঞ্জিং একটা ব্যাপার| সর্বদা ভয়ে ভয়ে থাকতাম, কখন যে কী ভুল করে ফেলি! যেহেতু সেই অর্থে কিছুই জানি না| দিদি যেসব প্লান পরিকল্পনা করতেন, আমাকে বলতেন, আর আমি বুঝি না বুঝি সায় দিয়ে বলতাম- ঠিক আছে দিদি| এভাবে চলত সবকিছু| কোথায় কোর্সটি হবে? তার জায়গা ঠিক করা থেকে বক্তা ঠিক করা, পেন, ব্যাগ দেওয়া- সব আলোচনাই হত একের পর এক| তারপর কী খাওয়া দাওয়া হবে? রিসোর্সপারসনদের কতকরে সাম্মানিক দেওয়া হবে? কত কো-অর্ডিনেটর ফি? হিসাবপত্র কীভাবে পেশ করতে হবে? সবকিছুর একটা নিয়মও বলে দেওয়া হল কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে| দিদি তাঁর ডায়রিতে একের পর এক সব নোট করে রাখতেন, আর আমাকে কী কী পরবর্তীদিনে করতে হবে তার একটা নির্দেশও দিতেন| সেগুলি যথাসাধ্য পালন করার চেষ্টা করেছিলাম মাত্র| এত সাজিয়ে-গুছিয়ে কাজ করার মানসিকতা-সত্যি দিদির কাছ থেকে বহু কিছু শেখার ছিল|
দিদির পরিচিতি লেভেল ছিল অন্যমাত্রায়| রিসোর্সপারসন হিসাবে কাদের কে উনি ডাকেন নি? প্রথিতযশা ভাইস-চ্যান্সেলর হিসাবে রাধাবল্লভ ত্রিপাঠী, পবিত্র সরকার, সুরঞ্জন দাস থেকে শুরু করে রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত, সোহিনী সেনগুপ্ত, সৌমিত্র বসু, অলোকানন্দা রায়, মহুয়া মুখোপাধ্যায়, নন্দিনী ভৌমিক বহু সেলিব্রটি, সুকান্তচৌধুরী, সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়, বাসব চৌধুরীর মত বহু শিক্ষাবিদ-এই রিফ্রেসার কোর্সে রিসোর্সপারসন হিসাবে ছিলেন, তেমনি বহুগুণী অধ্যাপক/ অধ্যাপিকাও এই কোর্সে অংশগ্রহণ করেছিলেন- সবমিলিয়ে মণিকাঞ্চন যোগে ঐ কোর্সটি সত্যিই অতিপ্রাণবন্ত ও হৃদয়গ্রাহী হয়েছিল তা আজও কেউ অস্বীকার করতে পারেন না| আর এই সবকিছুর মূলে ছিল ঋতাদির সুপরিকল্পনা, আর আমার ছিল সেটাকে বাস্তবায়িত করার অদম্য প্রয়াস- সবমিলেমিশে খুব ভালোই অভিজ্ঞতা হয়েছিল| এতসব বিশিষ্টব্যক্তিদের উপস্থিতি, তাঁদের থাকা-খাওয়ার যথাযোগ্য ব্যবস্থা করতে দিদি কোন কার্পণ্য করতেন না কখনো| এমন কী যেসব ক্ষেত্রে অফিসিয়ালি বাধ্যবাধকতা থাকত সেসব দিদি নিজে থেকেই খরচা করতেন| দিদি বলতেন- ‘আমি যখন বাইরে যাই, ওঁনারা আমাকে সবকিছুই স্পেশাল ব্যবস্থা করেন, আমি তো অত কিছু করতে পারবো না, কিন্তু যতটা পারি- চেষ্টা করি| তারপর -“আপরিতোষাদ্বিদুষাং ন সাধু মন্যে প্রয়োগবিজ্ঞানম|’ পণ্ডিতব্যক্তিদের সন্তোষবিধান না হওয়া পর্যন্ত আমাদের কার্য কতটা সফল হল তা বোঝা যাবে না|
দিদির অতি কাছ থেকে তাঁর সততা ও সরলতাকে উপলব্ধি করেছি| সম্মাননীয় ব্যক্তিদের কীভাবে সম্মান করতে হয় তা দিদির আতিথেয়তা থেকে বুঝেছি| আর একটা জিনিষ খুব শিক্ষণীয়, তা হল তাঁর কৃতজ্ঞতাবোধ, যেকোন কাজে ছোট হোন বা বড়- কারও কাছ থেকে তিনি যা কিছু সহযোগিতা পেয়েছেন অকৃপণ চিত্তে তা তিনি স্বীকার করেছেন| এছাড়া দিদির ছিল অতুলনীয় কর্মনিষ্ঠা| ঐ বয়সেও চোখের যা পরিস্থিতি, অত্যধিক সুগার প্রভৃতিতেও কর্মে লেগে থাকা ও কাজটি যাতে সর্বাঙ্গীণ সুন্দর হয় তার জন্য নিরন্তর লেগে থাকার মনোভাব, কর্মে তত্পরতা, গভীর মনোনিবেশ ও একাগ্রতা- একজন শিক্ষার্থী হিসাবে, নবীন অধ্যাপক হিসাবে আমার কাছে সেসব ছিল অতি শিক্ষণীয় বিষয়| কী করে কোন অনুষ্ঠানকে কত সুন্দর করে তোলা যায়, কোন অনুষ্ঠান করতে হলে কত খুটিনাটি বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হয় তা ঋতা দির সঙ্গে না থাকলে জানা সম্ভব হত না| এসব কাজের মধ্য দিয়ে একটা আত্মবিশ্বাস গড়ে ওঠে| সেই আত্মবিশ্বাস আর অভিজ্ঞতা থেকেই হয়তো পরবর্তীকালে বহু সেমিনার সফলভাবে সম্পন্ন করতে পেরেছি|
হ্যাঁ, যেকথা হচ্ছিল যে, ঐ রিফ্রেসার কোর্সটির বিষয় ছিল ‘সৌন্দর্যতত্ত্ব|’ টানা একুশদিনের এতবড় একটা অনুষ্ঠানে যাতে কারো একঘেয়ামী না লাগে তারজন্য বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে যেমন বিবিধ বিষয় ঠিক করা এবং সেই অনুসারে সেই বিষয়ে পারদর্শী, স্বনামধন্য ব্যক্তিরাও এসে তাঁদের বক্তব্য বা প্রয়োগকলা প্রদর্শন -এককথায় অনবদ্য| রিসোর্সপারসনদের প্রতিটি বক্তব্যের শেষে একটা সুন্দর মূল্যায়ন করে সমগ্র অনুষ্ঠানটিকে একটি অন্যমাত্রায় পৌঁছে দিতেন ঋতা দি| দিদির মননে চিন্তনে মিশেছিল কালিদাস ও রবীন্দ্রনাথের ভাবনা| তিনি যে অতভালো রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে জানতেন তা অনেকেই হয়তো জানতেন না| সত্যি অসাধারণ সুর, তাল, লয় ছন্দ সম্পর্কিত ধারণা ছিল তাঁর| কেউ বেসুরো গান গাইলেই হেসে ফেলতেন| বিভাগের অনেককিছু কাজ হয়তো দিদি এডিয়ে চলতেন বা উপযাজক হিসাবে কাজের দায়িত্ব নিতেন না, তবে তিনি কোন কাজের দায়িত্ব যদি একবার নিতেন বা বিশেষত একাডেমিক কাজের ক্ষেত্রে তাহলে সেই দায়িত্ব যে কত নিষ্ঠার সঙ্গে তিনি পালন করতেন তা তাঁর সান্নিধ্যে না থাকলে উপলব্ধি করা যেত না|
ঋতা দির স্নেহ-বাত্সল্য মনে রাখার মত| তবে এবিষয়ে তাঁর ক্ষেত্রে একটা অভিযোগ হল- তিনি যাকে স্নেহ করবেন, তার প্রতি অন্যজন যদি একটু দরদ দেখাতেন তাতে যেন দিদির একটু মান-অভিমান হত| সেজন্য হয়তো তিনি অনেক সময় মুখভার করে থাকতেন, বা তার প্রতি কিছুটা হলেও একটু তীর্যকভঙ্গিতে কথা বলতেন| অনেকে সেটা বুঝতেই পারতো না বা অন্যভাবে নিত হয়তো, বা তাঁকে এড়িয়ে চলত| দিদির স্নেহের বন্ধনে কেউ আবদ্ধ হলে তাঁর জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করে যেতেন কীভাবে অন্তত তার সামন্য হলেও একটু উপকার করা যায়| শিউলী দিকেও খুব স্নেহ করতেন ঋতা দি| শিউলী দির কথায়- তাঁর যখন ম্যাটার্নিটি লিভ চলছিল ঋতা দি নিজেই গিয়ে তাঁর বাড়িতে পরীক্ষার খাতা পৌঁছে দিয়েছিলেন| এতকিছুর মধ্যে প্রতিবছর আমার মেয়ে দিশারীর জন্মদিন দিদি মনে করিয়ে দিতেন, কখনো বা তাঁর জন্য বিশেষ কিছু উপহারও পাঠিয়ে দিতেন| সত্যি ভাবাযায়? যতটা সম্ভব চেষ্টা করেছি তাঁর কথার অবাধ্য না হতে, যেকোনভাবে সেই স্নেহের বন্ধন অটুট রাখতে|
ঋতাদির বিনয়মাহাত্ম্য, আত্মমর্যাদা ও মানবিকতাবোধের কথা বলে শেষ করা যাবে না| তিনি যেমন সবাইকে সম্মান করতেন, ভালোবাসতেন, তেমনি কারো কাছ থেকে কোন অপ্রত্যাশিত অপমান তিনি কোনোভাবেই সহ্য করতে পারতেন না| কেউ একটু ভারি ম্যাজাজে কিছু বললে বা এড়িয়ে চললে তিনি ভীষণ আঘাত পেতেন| যদি কয়েকদিন দিদির সঙ্গে দেখা না হত হঠাত দেখা হলে তিনি বলতেন- ‘কীরে দেবদাস তোর কী কিছু হয়েছে? না, আমি আবার কী করলাম?” ইত্যাদি| এমন অনেক ঘটনায় অনেক সময় বলতেন আবার অনেক সময় বলতেন না কিছুই| চুপচাপ হয়ে যেতেন-একান্তে হয়তো বড়ই কষ্ট পেতেন| তাঁর কথা থেকে বোঝা যেত তিনি বড় আঘাত পেয়েছেন- তিনি যাদের উপর বেশি ভরসা করতেন, যাদের বেশি ভালোবাসতেন, যাদের বিশ্বাস করতেন, একান্তভাবে নিজের করে নিতেন তাঁদের কাছ থেকে| তাঁর অধীন গবেষকদের তিনি নতুন নতুন বিষয় বলেছেন, পথ দেখিয়েছেন কীভাবে কাজ করতে হয়| তাঁর পরিচিত সকলের কাছে তাদের পরিচিতি করে দিয়েছেন, নিজের ভাব-ভাবনা তিলে তিলে দান করেছেন, প্রয়োজনে আর্থিক সহায়তা করেছেন- তারাই শেষপর্যন্ত তাঁর সাথে খারাপ ব্যবহার করেছেন| অবজ্ঞা করেছেন, অবহেলা করেছেন, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেছেন, সর্বোপরি তাঁর নানাভাবে বদনাম করেছেন| দিদি এটা মেনে নিতে পারেন নি, কোনভাবেই| কথা প্রসঙ্গে এসব বলতে বলতে তিনি কখনো সখনো অঝোরে কেঁদেও ফেলেছেন| সেই মানুষটা পৃথিবীতে আজ আর নেই, কিন্তু যা্দের জন্য দিদির এই অকারণে চোখের জল পড়েছে তারা নিশ্চয়ই ভালো আছেন| ভালো থাকবেন -এটাই স্বাভাবিক| কারণ তিনি তো মনেপ্রাণে কখনোই তাঁদের কোন ক্ষতি চান নি তাই| যাদের তিনি বেশি ভালোবেসেছেন, অসহায় ভেবেছেন, অর্থিক সহায়তা করেছেন, তারাই তাঁর সঙ্গে বেশি প্রতারণা করেছেন| তাঁর ভালো মানষিকতার সুযোগ নিয়েছেন, তাঁর অপ্রকাশিত গবেষণাকে নিজের বলে প্রচার চালানোর চেষ্টা করেছেন| সর্বোপরি যাদের তিনি নিজের বাড়িতে যাতাযাতের সুযোগ দিয়েছেন, আর্থিক সাশ্রয়ের কিছু ব্যবস্থা করেছেন তাঁর অবর্তমানে তাঁরা কত জিনিষ আত্মসাত করেছেন তার ঠিক নেই| ছিঃ| ধ্বিকার জানাই এহেন মানুষের সান্নিধ্যে থেকে এরূপ নীচ মানষিকতা ছিল যাদের তাদেরকে|
দিদির কাছ থেকে যেটা শেখার তা হল গুরুজনদের প্রতি শ্রদ্ধা আর গুণীজনদের কদর করা| তিনি বলতেন- ‘কর্তারঃ সুলভা লোকে বিজ্ঞাতারস্তু দুর্লভাঃ|’ এই জগতে অনেক গুণীজন আছেন কিন্তু তাদের সমাদর জানানো লোকজনের বড়ই অভাব| দিদি নিজেই ছিলেন একজন গুণীব্যক্তি, তাই তিনি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, বক্তৃতায়, নিজের লেখার মাধ্যমে তিনি সর্বদা গুণিজনদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছেন| সাধারণ জিনিসগুলি তাঁদের বর্ণনায় অসাধরণ বলে অনুভূত হয়েছে| যেন তাঁর চেতনার রঙে পান্না হত সবুজ চুনি হয়ে উঠত রাঙা হয়ে| বহু সংস্কৃত পণ্ডিতদের অনালোচিত কাজকর্ম, সৃষ্টিসম্ভারকে তিনি প্রচারের আলোকে নিয়ে এসেছিলেন| সেগুলি নিয়ে আলোচনা করতে, গবেষণা করতে পরবর্তী প্রজন্মকে পথ দেখিয়েছেন| আধুনিক সংস্কৃত সাহিত্যচর্চার তিনি এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে দিয়েছেন নতুন গবেষকদের কাছে|
শুধুতাই নয়, নতুন প্রজন্মকে নানাভাষায় শিক্ষিত করতে, কবিতা, গান নাটক প্রভৃতি বিষয়ে পারদর্শী করে তুলতে ‘কনভারজেন্স’ নামে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভাবনা ভেবেছেন| তিনি আজ সশরীরে হয়তো নেই, কিন্তু তিনি বেঁচে আছেন তাঁর কাজের মাধ্যমে, তাঁর ভাবনার মাধ্যমে, তাঁর বহু সৃষ্টিকর্মের মাধ্যমে| তিনি মহাভারতের এই কথাকে খুবই গুরুত্ব দিয়ে বলতেন–‘ন হি মনুষ্যাৎ শ্রেষ্ঠতরং কিঞ্চিৎ| মানুষের থেকে এই জগতে কিছুই বড় নয়| মানুষের ভালোর জন্য তিনি যেমন আজীবন ভেবেছেন, সেই মানুষের কর্মের, মানুষের গুণের, মানুষের সৃষ্টির জয়গানই গেয়েছেন তাঁর আধুনিক সংস্কৃত সাহিত্য গবেষণাকর্মের মাধ্যমে| কিন্তু সেই মানুষেরা বা পরবর্তী প্রজন্ম ঋতাদির মহানুভবতার ও গবেষণাকর্মের মূল্যায়ন কতটা করছেন? বা করবেন? সেটাই এখন ভাবার বিষয়|
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য- অধ্যাপিকা ড. ঋতা চট্টোপাধ্যায়ের স্মরণে অন্বীক্ষা (সম্পাদনা-অধ্যাপক ড. তপনশংকর ভট্টাচার্য্য ও অধ্যাপিকা ড. কাকলী ঘোষ) যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০২৩ সালে প্রকাশিত হয়েছে| ঋতায়ণী, (সম্পাদনা-অধ্যাপিকা ড. তপতী মুখার্জী, অধ্যাপক ড. অরুণরঞ্জন মিশ্র ও অধ্যাপক ড. শুভ্রজিত সেন ) সংস্কৃত পুস্তক ভাণ্ডার থেকে ২০২৫ সালে প্রকাশিত হয়েছে|
………………………
ড. দেবদাস মণ্ডল, সহ-অধ্যাপক, সংস্কৃত বিভাগ, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়
The suburb where I grew up in, remained quite uneventful throughout the year. Aside from a few stray rumours and formulaic gossip, not much drama cropped up around there. Until the summers arrived and the gravel roads began sticking to the soles of people’s shoes and the metal fence that surrounded a tiny rugged field started to look like vibrating tuning forks from afar, during the daytime.
Summers in the suburbs are notoriously long, irksome and humid. The affluent ones are somewhat shielded by air conditioning while the rest struggle to cope with the effects of the hot exhaust air being belched out of a variety of cooling devices. The summer heat has a certain intoxicating effect on everyone. One can see people losing their temper the moment they step out of their homes, losing control of their motor skills if they stayed in the sun too long, and chugging lots of fluid after they are back inside the comfort of their homes. Even cats and dogs, forgetting their fabled animosity, are seen huddled inside whatever nook and cranny is available that provides respite from the very real heat.
Emotions are at an all time high during suburban summers. With decreasing attention span and patience, the only thing that can successfully pacify a hot-headed, sweaty person is a plate of perfectly ripe mangoes, maybe with the lure of a second helping as well.
The mangoes, the sticky and grungy feeling, the high temperatures was quite commonplace in our semi-town. The unique event arrived a little later in the season.
Just like bougainvillea petals that sprout from the tips of the branches, the most queer looking shops cropped up during the last week of the first month of the year, according to the Bengali calendar. This was only the teaser to the actual bloom that was coming our way. The shops were a mere structure fashioned out of bamboo and huge water-proof plastics and were home to mountains of fried snacks like sand-roasted peanuts, salty cashews, green peas that were definitely not naturally tinted and many more. Men in sleeveless shirts with holes in them spent the whole day tending to their sweet and savoury goodies. No one really knew where these men or their shops came from or even bothered to ask. We simply accepted their appearance like we accepted the flora and fauna of the summer season.
On the very first day of the hottest month of the year a tiny fair sprung up on the people back home— like a pink periwinkle shrub growing on a random patch of the ground, its head jutting out in between tar and bricks. This was no surprise for the folks, rather a highly curated annual affair cued right in time when the heat became unbearable and the humans craved some distraction while they waited for the first signs of rain.
More than the fair itself it’s the anticipation that excited me more. First, van-loads of bamboo and canvas were unloaded followed by pieces of metal structure that would be assembled into merry-go-rounds for kids followed by the wares that the sellers would be putting on display soon. The rugged field that looked like a bald spot on the map, would become the epicentre of all the fair-action.
The actual fair lasted for only three days but the days leading up to it and the days after the frenzy had passed, fuelled our quiet town’s grapevine for weeks. It wasn’t too shabby for the suburb-mice and their much awaited Cinderella moment. At the strike of the metaphorical gong the crowd arrived in multitudes. Human bodies packed into narrow streets and alleyways. Public transport was banned for several hours in the evening while the highly public event remained in full swing. The only priority was the fair and all those who came to make it the biggest sensation of the year.
The fair was a living, breathing creature that let its presence known from quite a distance. The local club, handling the logistics, would be blasting welcome greetings and warnings, over giant megaphones, lining the main street, all in the same breath which could be heard from at least half a mile away. As one stepped closer to the grounds, one became a part of the creature. No matter how many times one had the fortune to experience this affair, everyone had this starry-eyed look on their faces as they scanned the shops to begin the haul.
And there was a lot to choose from.
Kitchen equipment and imitation jewellery were always a big hit. The women couldn’t get enough of the tea cups. When I was younger I would get impatient with the waiting while my mother tried to choose between two black cups. As I grew up I realised the activity was weirdly calming and eventually joined the club. Fake flowers to adorn the fake wood vases, toy fans imported from China, miniature statues of superheroes like Spiderman and Gautam Buddha sitting side by side, keychains— everything that was cheap and in trend were on display for sale.
Good business and fussy children aside, there was one other constant— street food. There were the staples, ice cream booths, multicoloured popsicles corner, nine chat shops with thirty seven kinds of mixtures between them with varying degrees of hot and tart flavours, momo dumplings with underwhelming fillings, egg rolls, pop corn and cotton candy stalls and hot jalebis for dessert. Fair food came with a fair bit of gamble and the prerequisite of a tough tummy.
The real fun, however, was in the stroll, preferably in amicable company. The right company meant you could let the extrovert drive a hard bargain, let the tasteful one pick the prettier necklace, let the famished lead the group to the faloodah man’s cart and promise to be there at the same time next year.
The entire neighbourhood would be in attendance, without fail. That was the law. It was sometimes hard to believe so many people lived where I lived. They took casual leaves from work, called off classes, missed out on appointments and cut corners on domestic duties to gather at this yearly spectacle called a fair.
Esha Ganguly
17.06.26
Esha is an aspiring journalist. She is a part-time introvert and a full-time dreamer who sees the world through the lens of her favourite authors and filmmakers. She often seeks refuge in her “mind place” and music while figuring out life in all its chaos and glory— with a head full of stories to tell and a book in her bag, for company.
সত্যি কথা বলতে কি, প্রথমদিকে বিষ্ণুভূষণের ওপর আমার কেমন যেন একটা রাগই ছিল। ফিজিক্স অনার্সের মেরিট লিস্ট বেরোতেই আমরা চমকে উঠেছিলাম। সুদীপ ফার্স্ট হয়নি। আমাদের প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকেও অন্য কেউ ফার্স্ট হয়নি, এমন কি কলকাতার কোন কলেজেরও কেউ নয়। ফার্স্ট হয়েছে মেদিনীপুরের এক অজ্ঞাতনামা কলেজের কে এক বিষ্ণুভূষণ গড়াই। বিষ্ণুর ওপর তখনই আমার কেমন একটা রাগ হয়েছিল। অস্বীকার করতে পারি না, ওকে দেখার জন্য একটা প্রবল আগ্রহও অনুভব করেছিলাম।
আমরা অনেকেই রেডিও ফিজিক্সে ভর্তি হলাম। লিস্টে বিষ্ণুরও নাম দেখলাম। প্রথমদিন ক্লাসে এন সি সবাইয়ের পরিচয় নিচ্ছিলেন। যে ছেলেটি নিজেকে বিষ্ণুভূষণ বলে পরিচয় দিল তাকে দেখে আমি নিতান্ত নিরাশ হলাম। বেঁটে ক্ষয়া ক্ষয়া চেহারা, ইস্ত্রি না করা হাফ হাতা সাদা সার্টের মধ্যে থেকে দুটো রোগা রোগা হাত বেরিয়ে এসেছে। সবুজ রঙের একটা সস্তা টেরিকটের প্যান্টের মধ্যে সার্টটা গোঁজা। না, এগুলো দেখে আমি হতাশ হই নি। আমি হতাশ হলাম তার মুখ দেখে। মুখে বুদ্ধির চিহ্নমাত্র নেই। যেটা আছে সেটাকে অনেকে বলবে সরলতার ছাপ। তবে আমার নিজস্ব অভিজ্ঞতায় দেখেছি এই সমস্ত তথাকথিত সরল লোকেরা অনেক সময়ই বেশ জটিল হয়, কখনো কখনো কুটিলও বটে। তবে বিশেষ ঘটনার মুখোমুখি না হলে সেটা বেরিয়ে আসে না।
ক্লাস শুরু হওয়ার কয়েকদিন পরের কথা। এন সি বোর্ডে একটা কঠিন ডিডাকশন করছেন। সবাই মন দিয়ে টুকছে, কিন্তু কেউই বিশেষ কিছু বুঝছে বলে মনে হয় না। শুধু বিষ্ণুভূষণ খানিকটা টোকার পর বোর্ডের দিকে চেয়ে বসে আছে। একটু পরে এন সি থামলেন। বোর্ডের দিকে ভ্রূ কুঁচকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। ইতিমধ্যে বিষ্ণু উঠে দাঁড়িয়েছে। সেদিকে চোখ পড়তেই এন সি বললেন, ‘কি, কিছু বলবে?’
‘স্যার মাঝখানের স্টেপে একটা ভুল রয়েছে।’
ঠিক কোন স্টেপে ভুলটা হয়েছে এন সি ধরতে পারছিলেন না। বিষ্ণুকে বোর্ডে ডাকলেন। বিষ্ণু ভুলটা দেখিয়ে দিয়ে চলে আসছিল। হঠাৎ এন সি -র কী মনে হল, বললেন, ‘তুমি ডিডাকশনটা করতে পারবে?’ বিষ্ণু কিছু না বলে চকটা তুলে নিল এবং একবারও না থেমে ডিডাকশনটা শেষ করে ফেলল। সেই শুরু। মাস খানেক পর থেকে, এন সি-র মুখে বিষ্ণু ছাড়া আর কোন কথা নেই। অন্য প্রফেসররাও কিছু দিনের মধ্যেই বিষ্ণুকে চিনে ফেললেন। তবে ছাত্ররাই বোধহয় ছাত্রদের সবচেয়ে বেশি চেনে, হয়ত প্রফেসরদের চেয়েও বেশি। ততদিনে আমরা বুঝে গেছি যে, বিষ্ণুর সঙ্গে সুদীপের কোন তুলনাই হয় না। সুদীপও পড়াশুনায় খুব ভাল, অত্যন্ত মেধাবী ছেলে। কিন্তু হাজার চেষ্টা করলেও ও কোনদিন বিষ্ণু হতে পারবে না। বিষ্ণু অন্য জিনিস। বি টেক ফার্স্ট ইয়ারেই বিষ্ণু কয়েকটা পেপার পাবলিশ করল। সেগুলো আমাদের বোধগম্য হল না, কিন্তু প্রফেসররা চমকে উঠলেন। বি টেক-এর সেকেন্ড ইয়ারে বিষ্ণু আর এক কাণ্ড করল। একটা পেপারে দেখাল কীভাবে কম্পিউটারে কিছু কিছু ক্যালকুলেশনের সময় অনেক কমিয়ে দেওয়া যায়। চারিদিকে হৈ হৈ পড়ে গেল। আই বি এম, আই এস আই-এর হোমড়া- চোমড়ারা ছুটে এলেন বিষ্ণুর বক্তৃতা শুনতে। বিষ্ণু বি টেক-এ ফার্স্ট হল, সুদীপ সেকেন্ড। বিষ্ণু ভর্তি হল এম টেক-এ। উদ্দেশ্য এন সি-র আন্ডারে রিসার্চ করা। এম টেকের ফার্স্ট ইয়ারে এম আই টি থেকে এন সি-কে বলে পাঠাল রিসার্চের জন্য এক জনের নাম রেকমেন্ড করে পাঠানোর জন্য। এন সি বিন্দুমাত্র চিন্তা না করে বিষ্ণুর নাম পাঠালেন। বিষ্ণু যাবে অবশ্য এম টেক শেষ করে।
এম টেকের ফার্স্ট ইয়ারের পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর আমরা কয়েকজন বিষ্ণুকে ধরলাম সিনেমা দেখানোর জন্য। এক রবিবার দুপুরে, আমরা সদলবলে গেলাম মিনারে ‘সোনার কেল্লা’ দেখতে। সিনেমা শেষে, হল থেকে বেরিয়ে অমর বলল, ‘চ, আমার মাসির বাড়ি যাওয়া যাক। মাসির সঙ্গে একটু দরকার আছে, আর চা-টাও জুটে যাবে ওখানে। তারপর আড্ডা হবে অন্য কোথাও।’
‘তোর মাসির বাড়িটি কোথায়?’ অসীম জানতে চাইল।
‘এই তো কীর্তি মিত্র লেনে।’
‘তোর মাসির মুখ দেখার জন্য আমি অদ্দূর হাঁটতে পারব না। মাসতুতো বোন-টোন থাকে তো বল।’
অমর কোন উত্তর দিল না, শুধু একটু মুচকি হাসল।
মাসির বাড়ির বাইরের ঘরে ঢুকেই অমর হাঁক দিল, ‘ঝুমা,ঝুমা।’ একটা বছর ১৮/১৯-র মেয়ে বেড়িয়ে এল।
‘কী হল! চেঁচাচ্ছ কেন?’
‘যা, আমাদের জন্যে চা নিয়ে আয়।’
‘ওরে বাবা। আমার একদম সময় নেই। সুপ্তির সঙ্গে সিনেমা যাব বলে।’
‘সিনেমা! কোথায়?’
‘দর্পণা। ‘দিল কা পেয়ার’।’
‘হা। ওর তো টিকিটই পাওয়া যাচ্ছে না।’
‘আমি আগে থেকেই টিকিট কাটিয়ে রেখেছি। দেখবে?’
ঝুমা টিকিট নিয়ে এল। অমর গম্ভীর মুখে টিকিটটা পরীক্ষা করে প্যান্টের পকেটে পুরল।
‘এই অমরদা কী হচ্ছে কি! দাও টিকিটটা।’
‘দেব দেব, চা-টা নিয়ে আয় আগে।’ ঝুমা ধুপধাপ করে চা করতে চলে গেল।
চা-টা খেয়ে, বাইরে বেরিয়ে অসীম ঘোষণা করল ওর কোন চান্স নেই। আমরা সমস্বরে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেন?’
‘দেখছিস না, কেস বিষ্ণুর সঙ্গে। একদম নীরবে, চোখে চোখে কথা।’
তারপর দুদিন বিষ্ণু কলেজে এল না। বিষ্ণু কোনদিন কলেজ কামাই করে না। আমরা একটু চিন্তিত হয়ে পড়লাম। তারপর দিন বিষ্ণু এল। মুখটা একদম শুকিয়ে গেছে। আমরা জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী হয়েছে, রে?’ প্রথমে কিছুতেই কিছু বলবে না। অনেক জেরার পর শেষকালে প্রকাশ পেল যে, বিষ্ণু ঝুমার প্রেমে পড়েছে। কথাটা শুনে, অসীম সেই যে হো হো করে হাসতে শুরু করল, সে হাসি আর থামে না। এদিকে বিষ্ণুর চোখ ছলছল করছে, যে কোন মুহূর্তে কেঁদে ফেলতে পারে। আমি তাড়াতাড়ি অসীমকে ধমক দিয়ে থামিয়ে দিলাম।
বিষ্ণুকে বললাম, ‘যা, তুই ক্লাসে যা। আমরা ক্যান্টিন থেকে ঘুরে যাচ্ছি।’ বিষ্ণু চলে গেল। অসীমের হাসি তখনও থামেনি। আমি অসীমকে বললাম, ‘খুব তো হাসছিস, এখন কী হবে?’
‘কী আর হবে; দু-চার দিন পরে সব ঠিক হয়ে যাবে।’
দু-চার দিন পরে, কিন্তু সব ঠিক হল না। পরের তিনদিন বিষ্ণু কলেজেই এল না। একদিন বিকেলে আমরা ওর বাড়িতে ছুটলাম। ও তখন আমহার্স্ট স্ট্রিটে একটা ঘর নিয়ে থাকত, নিজেই রান্না করে খেত। গিয়ে দেখি ও একটা চাদর চাপা দিয়ে জানলার দিকে তাকিয়ে বিছানায় শুয়ে আছে। গায়ে হাত দিয়ে দেখি গা গরম, বেশ জ্বর আছে। আমাদের দেখে বলল, ‘ঝুমাকে না পেলে আমি মরে যাব।’ অমর ওকে অনেক করে বোঝাল – তুই ঝুমাকে কী বিয়ে করবি! ওতো রাজেশ খান্না, ধর্মেন্দ্র, জিনাত আমন, হেমা মালিনী ছাড়া আর কিছুই জানে না। কোন রকমে হায়ার সেকেন্ডারিটা টপকেছে, পার্ট ওয়ান পার হতে পারবে কিনা যথেষ্ট সন্দেহ আছে। কিন্তু অমরের বোঝানো, অসীমের ধমকানি কিছুতেই কিছু হল না। বিষ্ণুর সেই এক কথা – ‘ঝুমাকে না পেলে আমি মরে যাব।’
বিষ্ণুর বাড়ি থেকে বেড়িয়ে হাঁটতে হাঁটতে কফি হাউসে এসে পড়েছি। কয়েক কাপ কফি ধ্বংসের পর ঠিক হল যে, আগামীকাল অমর মাসির বাড়ি গিয়ে ঝুমাকে একটু হিন্টস দিয়ে দেখবে। কিন্তু পরের দিন অমরের মুখ দেখেই আমরা বুঝলাম, কেস কেঁচে গেছে। ঝুমা নাকি বলেছে, ঐ ক্যাবলা ছেলেটাকে বিয়ে করতে যাব কোন দুঃখে। অমর বলল, ‘তবে একটু আশা আছে। মাসিমা ব্যাপারটায় খুব ইন্টারেস্টেড।’ কয়েকদিন আমাদের ক্লাস-ফ্লাস মাথায় উঠল। বিষ্ণু কলেজে আসছে না। অমর ঘুম থেকে উঠেই মাসির বাড়িতে ফিট- ঝুমাকে বোঝানোর চেষ্টা করছে। মাঝে মাঝে কলেজে আসছে। ক্যান্টিনে লেটেস্ট ডেভেলপমেন্ট নিয়ে আলোচনা চলছে। বিকেলে আমরা আবার তিনজন ছুটছি বিষ্ণুর বাড়িতে, ওকে যথাসম্ভব ডিসকারেজ করছি। চার দিনের দিন দুপুর বেলা অমর হঠাৎ লাফাতে লাফাতে এসে ঘোষণা করল, ‘গুরু হয়ে গেছে, ঝুমা রাজী হয়েছে।’ আমরা তৎক্ষণাৎ ছুটলাম বিষ্ণুর বাড়িতে।
বিষ্ণু যথারীতি চাদর চাপা দিয়ে বিছানায় শুয়ে আছে। অমর তাড়াতাড়ি ভেতরে ঢুকে বলল, ‘এই বিষ্ণু, ঝুমা রাজী হয়েছে।’ বিষ্ণু ধড়মড় বিছানায় উঠে বসে, ওর সেই লাজুক হাসি হেসে বলল, ‘আমি জানতাম, সেদিন ওর চোখ দেখেই বুঝেছিলাম, ও আমাকে ভালোবাসে।’ আমি কলেজ টিমের উইকেট কিপার ছিলাম। রিফ্লেক্সটা সেদিন খুব কাজে লেগেছিল। বিষ্ণুর ঘরের চৌকাটের কাছ থেকেই অসীমের মুখে হাত চাপা দিয়ে ওকে বাইরে নিয়ে চলে গেলাম। ও দু হাতে আমার হাতটা ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বলল, ‘তুই আমায় ছেড়ে দে, আমাকে একটু হাসতে দে, নইলে পেট ফেটে মরে যাব।’
আমার ওপর ভার পড়ল, বিষ্ণুর বাবাকে ব্যাপারটা জানানোর। অমর পারবে না। এই কদিনের টানাপোড়নে ও ভীষণ ক্লান্ত বলে জানাল। আর অসীমের ওপর বিষ্ণুর তেমন ভরসা নেই। অগত্যা আমি। আমি অবশ্য বিষ্ণুর বাড়ি যাওয়ার সময় অসীমকে সঙ্গে নিলাম। কারণ আমি জানতাম, অসীমের উপস্থিত বুদ্ধি আমার চেয়ে অনেক বেশি। বিষ্ণুরা মেদিনীপুরের বেশ অবস্থাপন্ন পরিবার। কিন্তু পরিবারের কেউই, মায় বিষ্ণুর ভাইবোনেরা পর্যন্ত, স্কুলের গণ্ডি পেরোয়নি। এর মধ্যে থেকে বিষ্ণু যে কীভাবে বেরিয়ে এসেছে, সেটা ভগবানই জানেন। বিষ্ণুর বন্ধু শুনে ওর বাবা আমাদের খুব সমাদর করে নিয়ে গিয়ে বসালেন। লোক ডাকিয়ে এনে গাছ থেকে ডাব পাড়ালেন, পুকুর থেকে মাছ ধরালেন। আম, জাম, পেয়ারা, কলাও এসে গেল বাগান থেকে। কিন্তু দুপুরবেলা খাওয়া-দাওয়ার পর আসল কথাটা বলতেই, উত্তেজনায় চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে গর্জন করে উঠলেন বিষ্ণুর বাবা, ‘কী দিতে পারবে ঐ মেয়ের বাবা? বিষ্ণুর বিয়ে দিয়ে অন্তত এক লাখ ক্যাশ ঘরে আনব। অন্য জিনিসের কথা তো বাদই দিলাম।’ ভদ্রলোক তখনও দাঁড়িয়েই আছেন। আমি ঠিক এদিক দিয়ে আক্রমণের আশঙ্কা করিনি, একটু হকচকিয়ে গেলাম। অসীম একবার আড়চোখে আমার মুখটা দেখে নিল। তারপর খুব শান্ত কণ্ঠে ভদ্রলোককে বলল, ‘কিন্তু আপনি আর বাধা দিয়ে কী করবেন, ওরা তো রেজেস্ট্রি করেই ফেলেছে। তবে আপনার কোন অনুষ্ঠান করার ইচ্ছে থাকতে পারে তাই…’ ভদ্রলোক ধপ করে চেয়ারে বসে পড়লেন। বাঁ হাতে কপালটা চেপে ধরলেন।
এরপর বিষ্ণুর বাবা পর পর কয়েকদিন কলকাতায় এলেন। আমাদের মধ্যস্ততায় ঝুমাদের বাড়ির সঙ্গে কথাবার্তা সমস্ত পাকা হয়ে গেল। মাস তিনেক পরে বিয়ে হবে। আমরা বরানগরে দু ঘরের একটা ছোট ফ্ল্যাট যোগাড় করে দিলাম। বিয়ের পর ওরা ওখানেই থাকবে। পয়সাকড়ির কোন অসুবিধে হল না। বিষ্ণুর বাবা ওর মাসোহারাও অনেক বাড়িয়ে দিলেন। বিষ্ণু আবার কলেজে আসা-যাওয়া শুরু করল। আমরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। তখন যদি দেখতে পেতাম ভবিষ্যতের গর্ভে কী লুকিয়ে আছে।
প্রথম মাসে বিষ্ণুর আচরণে খুব অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। মাঝে মাঝে কলেজ কেটে সিনেমা – অবশ্যই হিন্দি সিনেমা – দেখতে যেত ঝুমার সঙ্গে। আমরা ইয়ার্কি মারলেও ওটাকে খুব সিরিয়াসলি নিইনি। বিষ্ণুর মত জিনিয়াসের রোজ ক্লাস না করলেও চলে।
এরও মাসখানেক পরের ঘটনা। সায়েন্স কলেজের সিঁড়ি দিয়ে নামছি। ঝর্ণাদি আমায় ডাকলেন। ঝর্ণাদি এন সি-র আন্ডারে রিসার্চ করেন। আমাদের কলেজের দীপকদার সঙ্গে ওঁর বিয়ে হয়েছে। দুজনেই খুব ভালো পড়াশুনায়। দীপকদা তখন এক বছরের জন্য আমেরিকায় গেছেন। ঝর্ণাদি অত্যন্ত সপ্রতিভ। সেদিন দেখি উনি হাসছেন, রীতিমত হাসছেন, হাসি চেপে রাখতে বেশ কষ্ট হচ্ছে। বললেন, “‘একটু আগে বিষ্ণু এসেছিল আমার কাছে।’
‘বিষ্ণু! ও তো আজ ক্লাসে আসেনি।’ আমি বললাম।
ঝর্ণাদি ও প্রসঙ্গে না গিয়ে বললেন, ‘ল্যাবোরেটারিতে কাজ করছিলাম, এমন সময় বিষ্ণু এসে হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, “দীপকদা আপনাকে ছেড়ে এতদিন আছেন কী করে?” আচমকা প্রশ্নটা শুনে আমি একটু ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। সামলে নিয়ে বললাম, ‘‘আসলে এ কথাটা কোনদিন ভেবে দেখেনি।’’ তারপরেই ও বলল, ‘‘আপনার খুব কষ্ট হয় না?’’ আমি ওর মুখের দিকে ভাল করে তাকিয়ে দেখলাম। না, ঠাট্টা করছে না। আমি মুখটাকে খুব গম্ভীর করে বললাম, ‘‘হ্যাঁ ভাই, ভীষণ কষ্ট হয়।’’ ও বিজ্ঞের মত মাথা নাড়ল। তারপর জানলার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘‘ঝুমারও তাহলে নিশ্চয়ই খুব কষ্ট হচ্ছে। ও দার্জিলিং গেছে ওদের বাড়ির লোকেদের সঙ্গে, তাই পাঁচদিন আমার সঙ্গে ওর দেখা হবে না।’’ এই সমস্ত বলে বিষ্ণু চলে যাচ্ছিল, হঠাৎ দরজার কাছ থেকে ফিরে এসে বলল, ‘‘আচ্ছা ঝর্ণাদি, একেই কি বিরহ বলে?’” ঝর্ণাদি হাসতে হাসতে একটু বেসামাল হয়ে গিয়েছিলেন, সিঁড়িটা ধরে সামলে নিলেন।
যখন বিষ্ণুর বিয়ের কথাবার্তা চলছে, তখন আমরা ওদের দুজনের বিবাহ পরবর্তী জীবনের পরস্পরের সঙ্গে আলোচনার টপিক নিয়ে কিঞ্চিত চিন্তিত ছিলাম। তাই তখন ঠিক হয়েছিল যে, রেডিও-ফিজিক্স ডিপার্টমেন্ট থেকে আমরা বিষ্ণুকে একটা বিশেষ যন্ত্র উপহার দেব, যার দুদিকে থাকবে দুটো টেলিফোন। আর মাঝখানে থাকবে এক ব্ল্যাক বক্স। একদিকের টেলিফোনে জীনাত আমনের ঠিকুজি-কুষ্টি পড়লে অন্যদিকে সলিড স্টেট ফিজিক্সের লেকচার শোনা যাবে। আবার অন্যদিকে স্যাটেলাইট কমিউনিকেশন সম্বন্ধে বললে, এ প্রান্তে ধর্মেন্দ্রর পূর্বতন এবং বর্তমান প্রেমিকাদের নাড়ি-নক্ষত্র জানা যাবে। কিন্তু বিয়ের ঠিক আগে, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অনেকেই ঐ যন্ত্রের উপযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলল। তাই আমরা ঐ যন্ত্রটা না দিয়ে একটা প্রেশার কুকার এবং রান্না-বান্নার কিছু সরঞ্জাম উপহার দিলাম।
বিয়ের পর বিষ্ণু মাস খানেক কলেজেই এল না। পনেরো দিনের মাথায় অমর দুপুর বেলায় একবার ওদের বাড়ি গিয়েছিল। দূর থেকে দেখে, ঝুমা দোতলার ব্যালকনিতে বসে চুল শুকোচ্ছে আর বিষ্ণু একটু দূরে একটা মোড়ায় বসে নিবিষ্ট চিত্তে তাই দেখছে। এক মাস পরে অবশ্য বিষ্ণু কলেজে আসা শুরু করল। তবে রোজ আসত না – এই সপ্তাহে তিন চার দিন আর কি। সেশান্যাল কাজ জমা দেয় না সময়মত। প্রায়ই লাস্ট ডেট পেরিয়ে যায়, বিষ্ণু নির্বিকার। প্রফেসরদের যে বিরক্তিটা চাপা ছিল, এবার সেটা প্রকাশ্যেই দেখা দিতে লাগল। ব্যাপারটা চরমে উঠল, যেদিন এন সি আমাকে ডেকে পাঠালেন। এন সির ঘরে গিয়ে দেখি সুদীপ বসে আছে। এন সি সুদীপকে বললেন, ‘তাহলে, ঐ কথাই রইল।’ সুদীপ আমার দিকে তাকিয়ে একটু হেসে বেরিয়ে গেল। সুদীপ খুবই ভালো ছেলে, তবে ওকে আমার কোনকালেই তেমন পছন্দ হয় না। মনে হয় ওর মনভোলানো হাসি, মার্জিত ব্যবহার, সুন্দর কথাবার্তার পেছনে একটা সুক্ষ্ম শঠতা লুকিয়ে আছে। এন সি আমাকে বসতে বললেন না, ড্রয়ার থেকে একটা ল্যাব রিপোর্ট বার করে আমার হাতে দিলেন। বিষ্ণুর রিপোর্ট। দুপাতা উল্টেই আমি চমকে উঠলাম। আগোছালো ভাবে স্টেপল করা সিটগুলোর মধ্যে ওটা কীভাবে এসেছিল, ভগবান জানেন। সিটটাতে অত্যন্ত অপটু হাতে একটা মেয়ের ছবি আঁকা আর তার চারপাশে সমস্ত পাতা জুড়ে কয়েকশো বার ঝুমার নাম লেখা। এন সি এক ঝটকায় সেটা কেড়ে নিলেন, ছুঁড়ে ফেললেন ওয়েস্ট পেপার বাস্কেটের মধ্যে। একটু পরে নিজেকে সামলে নিয়ে গম্ভীরভাবে বললেন, আমি ভাবছি বিষ্ণুর বদলে সুদীপকেই এম আই টি-তে পাঠাব।
আমি কোন কথা না বলেই বেরিয়ে এলাম। বিষ্ণুকে তখন সামনে পেলে কী হত জানি না। একটা অন্ধ রাগ আমার মধ্যে গজরাচ্ছিল। বিষ্ণুর জায়গায় আমি সুদীপকে কিছুতেই কল্পনা করতে পারছিলাম না। ব্যাপারটার একটা হেস্তনেস্ত করার জন্য আমি বিষ্ণুর বাড়ি ছুটলাম। সন্ধেবেলায় বরানগরে পৌঁছে দেখি বিষ্ণুর ফ্ল্যাটে তালা ঝুলছে। পাশের ফ্ল্যাটের ভদ্রমহিলা বললেন, ওরা গেছে ‘তিন দুষমন’ দেখতে। পরের দিন গিয়ে দেখি, সেদিনও ফ্ল্যাট তালাবন্ধ। এদিন পাশের বাড়ির ভদ্রমহিলাও কোন সাহায্য করতে পারলেন না। সেদিন আমি ঠিক করেছি কিছুতেই ফিরে যাব না। যত রাত্রিই হোক বিষ্ণুর সঙ্গে দেখা করব। বরানগরে আমার আর এক বন্ধু থাকে। তার বাড়িতেই বসে রইলাম আর এক ঘণ্টা অন্তর এসে দেখে যেতে লাগলাম বিষ্ণু ফিরেছে কিনা। রাত সাড়ে দশটার সময় দেখি, বিষ্ণুর ফ্ল্যাটে আলো জ্বলছে। বিষ্ণুকে কীভাবে গালাগাল দেব সেটা মনে মনে গুছিয়ে নিয়ে ওপরে উঠে গেলাম। দরজা খোলা, বাইরের ঘরে বিষ্ণু নেই। বেডরুমে গিয়ে দেখি বিষ্ণু বিছানার ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে কাঁদছে। ডাকতেই ধড়মড় করে উঠে বসল। বিষ্ণুর সে মূর্তি দেখে আমি চমকে উঠলাম। চুলগুলো উসকোখুসকো। শুকনো মুখ। লাল ফোলা ফোলা চোখ। আমি কেন জানি না, হঠাৎ জিজ্ঞেস করলাম, ‘ঝুমা কোথায়?’ বিষ্ণু এমন করে ‘নেই’ বলল যে, একটা আশঙ্কায় আমার সর্ব শরীর কেঁপে উঠল। বিষ্ণু আমাকে জড়িয়ে ধরে হাঁউমাঁউ করে কেঁদে উঠল। আমি অনেক কষ্টে ওর কাছ থেকে যা উদ্ধার করলাম তা হল- ঝুমা দিন সাতেকের জন্য বাপের বাড়ি গেছে। বিষ্ণু তখনও আমার কাঁধে মাথা রেখে সমানে কেঁদে চলেছে। আমার যা বলার ছিল বিষ্ণুকে, যা অনেকবার মনে মনে পুনরাবৃত্তি করে প্রায় মুখস্থ হয়ে গেছে, তার কিছুই বলা হল না। আমি বিষ্ণুর পিঠে হাত রেখে সামনের দিকে তাকিয়ে রইলাম। ড্রেসিং টেবিলের ওপর রাখা ঝুমার ছবিটা চোখে পড়ল। ঝুমা হাসছে। তবে সে হাসির অর্থ আমি বুঝতে পারলাম না।
রূপক বিশ্বাস ইঞ্জিনিয়ার। যাদবপুর। কর্মজীবন থেকে অবসর নিয়েছেন।
হেনরি ডেভিড থরো আমেরিকার এক দার্শনিক কবি। ইনি জন্মেছিলেন ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে আর মারা যান ১৮৬২ খ্রিস্টাব্দে। বিশ্বের ইতিহাসে এঁর অনন্য অবদান। ইনিই অহিংস আইন অমান্য ধারণার প্রবর্তক। এঁর চিন্তাভাবনা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে ভবিষ্যত প্রজন্মকে। এঁর চিন্তার সূত্র ধরেই ভারতবর্ষে মহাত্মা গান্ধী এবং আমেরিকাতে মার্টিন লুথার কিং তাঁদের কার্যধারা অনেকাংশেই পরিচালিত করেছিলেন। সরল জীবনযাপনের তত্ত্বকে তিনি তাঁর নিজের জীবনযাপন দিয়ে প্রকাশ করেছিলেন।
নিজের জীবনকে আবিষ্কার করবার জন্য মাত্র আঠাশ বছর বয়সে তিনি তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক চাকরি ছেড়ে ম্যাসাচুসেটসের কনকর্ড এলাকায় ওয়াল্ডেন পন্ডের ধারে পৌঁছেছিলেন। সেখানে নিজের বসবাসের জন্য এক কক্ষ বিশিষ্ট একটি বাড়ি নিজের হাতে নির্মাণ করেছিলেন। সে বাড়ির দেওয়াল তাঁর নিজের হাতে গাঁথা। সে বাড়ির দরজা জানালা তাঁর নিজের হাতে বানানো। জীবন ধারণ করতেন ছুতোরের কাজ করে। সর্বকালের এক সেরা দার্শনিক হার্ভাডের কৃতি ছাত্র তিনি জীবনের এই পর্বে আশপাশের গ্রামে কাঠের কাজের সরঞ্জাম কাঁধে বয়ে নিয়ে গিয়ে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে ছুতোরের কাজ করতেন। তিনি এই পরীক্ষামূলক জীবনযাপন করেন ১৮৪৫ থেকে ১৮৪৭ খ্রিস্টাব্দ অবধি।
জীবন নিয়ে তাঁর পরীক্ষার দলিল তিনি রেখে গেছেন তাঁর ডায়েরির পাতায়। সেই ডায়েরিই ওয়াল্ডেন নাম নিয়ে বই হিসেবে প্রকাশিত হয় ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে। সেই বই প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে তার আবেদন নিয়ে বিশ্বের ভাবুক সমাজ আলোড়িত হয়ে ওঠে। দেঁতো ভদ্রতাকে তিনি এতটাই অপছন্দ করতেন যে অবাধ্যতাকে তিনি বিশেষ গুণ হিসেবে মেনেছিলেন। বাধ্যতাকে তিনি একধরনের দাসত্ব বলে মনে করতেন। (Disobedience is the true foundation of liberty. The obedient must be slaves.) এই বোধ থেকেই তাঁর মাথায় সিভিল ডিসবিডিয়েন্সের তত্ত্ব জন্মেছিল। যা ভাবীকালের বিশ্ব রাজনীতিতে গভীর প্রভাব বিস্তার করে।
Henri David Thoreau. His writing is ‘Walden Pond’. The memory of reading that book remains intact. Carrying a mat from home once I reached by the side of a pond to read it in solitude. I was in school then. When I just finished reading the book the last rays of the day disappeared. The day ended. The book had just been perfectly fitted with the size of the day! Today, after forty years, reaching the very Walden Pond I again saw that day that was as shiny as a tuberose in the sun, as smooth as a big apple on a winter day!
হেনরি ডেভিড থরো। এঁর লেখা বই ‘ওয়াল্ডেন পণ্ড’। এই বইটা পড়ার স্মৃতি অমৃতময় হয়ে আছে। একদিন বাড়ি থেকে একটা সতরঞ্চি নিয়ে এক পুকুর পাড়ে হাজির হয়েছিলাম নিরিবিলিতে বইটা পড়ব বলে। তখন স্কুলে পড়ি। পড়তে পড়তে সন্ধ্যা হয়ে এল। শেষ লাইনটা যখন পড়লুম ঠিক সেই মুহূর্তে দিনের আলোর শেষ নিশানাটুকু মিলিয়ে গেল। দিন ফুরল। সব কিছু যেন মাপে-মাপে এঁটে গেল! আজ চল্লিশ বছর পরে সত্যিকারের ওয়াল্ডেন পণ্ডের ধারে এসে সেই দিনটাকে সূর্যের আলোয় ঝলমলে একটা রজনীগন্ধার স্তবকের মতো, শীতদিনের একটা মসৃণ আপেলের মতো আবার দেখতে পেলুম।
বেশ কয়েক বছর আগে পরিবেশ ও জৈব কৃষি নিয়ে কাজ করা এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থায় মাসখানেকের অতিথি হয়ে হাজির হয়েছিলাম। সংস্থাটি চালান কয়েকজন আমেরিকান মহিলা। সংস্থার অবস্থান উইসকনসিন প্রদেশে। জায়গাটা কানাডার সীমান্তে। তিন দিকে পাহাড় আর বাকিটা কাঁটাতারে ঘেরা কয়েকশো একর জায়গা ঘিরে গড়ে উঠেছে এঁদের আশ্রম। আশ্রমের নাম সানফ্লাওয়ার ভ্যালি। আশ্রমে চাষবাস, পশুপালন হয়। সেসব আশ্রমিকরাই করেন। আমি যখন সেখানে গিয়েছিলাম তখন সেখানে আমিই একমাত্র পুরুষ আবাসিক ছিলাম।
আমাকে থাকতে দেওয়া হয়েছিল চার বেডরুমের একটা দুতলা কটেজে। দুতলায় দক্ষিণমুখী ঘরটায় ছিলাম আমি। দুতলার অন্য দুটো বেডরুমে দুই তরুণী থাকতো। তারা শিকাগোর কোনো এক কলেজে পড়াশোনা করতো। কোনো একটা দুমাসের এ্যাকাডেমিক ট্রেনিংয়ের ব্যাপারে তারা সেখানে জুটেছিল। কটেজের একতলায় একটামাত্র বেডরুম ছিল। সেই রুমে থাকতো আরেক তরুণী। সে ছিল আফ্রিকান। সেও দুতলার তরুণী দুটির সঙ্গে একই কলেজে পড়ে।
আশ্রমিকরা সকলেই উচ্চশিক্ষিতা। সকালে চায়ের আসরে আর দুপুরে ও সন্ধ্যাবেলায় লাঞ্চ ও ডিনারের জমায়েতে আশ্রমিক এবং উপস্থিত অতিথিদের মধ্যে নানা বিষয়ে সংলাপ হয়। সে সবের মান যথেষ্ট উঁচুদরের। আশ্রমিকরা নানান ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসেছেন। সেই কারণে না চাইতেও নানা সংস্কৃতির মধ্যে একধরনের সমন্বয় এখানে ঘটেই চলে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলির জন্য আশ্রমের একটা টিলার উপরে খোলা আকাশের নিচে একটা এ্যাম্ফিথিয়েটারও আছে। যে সময়টায় আমি ওখানে ছিলাম সেইসময় আফ্রিকা, দক্ষিণ ও উত্তর আমেরিকার লোকসঙ্গীত নিয়ে ওয়ার্কশপ এবং জলসাও চলছিল।
এলাকাটা প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকা। আশ্রমের দুতিন মাইলের মধ্যে অন্য কোনো গ্রাম নেই। কয়েকশো বছর আগেও এই এলাকায় বাস করতেন আমেরিকান আদিবাসীরা। তারপর উন্নয়ন হলে যা হবার তাই হয়েছে। আদিবাসীরা অধিকাংশেই হারিয়ে গেছেন। তাঁদের মধ্যে আত্মমর্যাদাহীন কেউ কেউ ইউরোপীয় উদ্বাস্তুদের মধ্যে সুকৌশলে ভিড়ে গিয়ে আমেরিকার নানা অঞ্চলে বাস নিয়ে জাতে উঠেও পড়েছেন।
সেদিন আফ্রিকান ড্রাম বাজানোর উপর শিক্ষামূলক ওয়ার্কশপ চলছিল। ওয়ার্কশপে অংশ নিয়েছিলেন এলাকার পঞ্চাশ ষাট মাইলের মধ্যে যেসমস্ত গ্রামবাসী আছে তাদের প্রতিনিধিরা। যেহেতু শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান চলছে তাই আফ্রিকান ড্রাম বাজানোর মাতোয়ারা ভাবটা তেমন নেই। মাঝে মাঝে মনোযোগে আলগা দেওয়া যাচ্ছে। সেই আলগা অবসরে মাঝে মাঝে প্রতিবেশি গ্রামের আমেরিকান আদিবাসী বিল গ্রিনডিয়ারের সঙ্গে দু’একটা কথা চালিয়ে যেতে পারছি। আমেরিকান ইন্ডিয়ানদের নিয়ে সাম্প্রতিক কালে জেরি মান্দেরের লেখা ‘ইন দ্য এ্যাবসেন্স অফ দ্য স্যাক্রেড’ বইটির কথা বিলের কাছে উত্থাপণ করলাম আমি, অমনি বিল ও জেনেট – জেনেট বিলের পার্টনার – দু’জনেই, খুব উৎসাহিত হয়ে উঠলেন। ওঁরা যেন ধরেই নিলেন যে, আমি আমেরিকান ইন্ডিয়ানদের অনেক খবরই রাখি এবং তাঁদের সমাজ-সংস্কৃতিকে পছন্দ করি। ওঁদের ধরে নেওয়াটা অবশ্য খুব ভুলও নয়। তাঁদের সংস্কৃতি নিয়ে দু’চারটে কথা চলতে চলতেই বিল খুশি হয়ে বললেন, এত কাছেই তো রয়েছেন এখন, চলে আসুন একদিন আমাদের ফার্মে।
আমি যেন এই নিমন্ত্রণের জন্যই অপেক্ষা করছিলাম, বললাম, সে তো খুব ভাল কথা। কবে যাব? তিনি একটু ভেবে নিয়ে বললেন, আগামীকাল? আমি বললাম, আগামীকাল তো এখানে বড়ো অনুষ্ঠান আছে! তার পরে কোনো একটা দিন? তিনি আবার একটু ভেবে বললেন, আগামীকাল তো জেনেটকে সঙ্গে নিয়ে আমি আসছিই। প্রোগ্রাম শেষ হলে নাহয় সকলে মিলে একসঙ্গেই যাব। আমি বললাম, তাহলে বেটিনার সঙ্গে কথা বলে রাখতে হয়। বেটিনা সানফ্লাওয়ার ভ্যালির অধ্যক্ষা। আমার কথাটা শুনেই আমার হাত শক্তভাবে ধরে উঁচু গলায় বেটিনাকে হাঁক পেড়ে তিনি বললেন, হে বেটিনা, টুমরো এ্যাফটার দ্য প্রোগ্রাম অরণি উড লিভ সানফ্লাওয়ার ভ্যালি উইথ এ্যাস টু বি উইথ এ্যাস ফর আ হৌল ডেই। বেটিনা খুশি মনে বললেন, ও ইটস ওয়ন্ডরফুল!
সেদিন ওয়ার্কশপ চলাকালীন মিলওয়াকি, ম্যাডিসন আর বারাবু থেকে বেশ কিছু মানুষ এসে হাজির হলেন, এবং, এদিক ওদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে অনুষ্ঠান শুনতে থাকলেন। যাঁরা এলেন তাঁদের মধ্যে ম্যাডিসনের গীতিকার ও গায়ক জেসন মুন, আর, তাঁর টিন এজার সন্তান গিলকে আমি চিনতে পারলাম। চিনতে পারলাম ম্যাডিসনবাসী বেটিনার কমবয়সী বান্ধবী মেলোডি নামধারী এক ভদ্রমহিলাকেও এবং তাঁর ষোড়শী কন্যা রেইনকে। জেসনের ছেলে গিল ও মেলোডির মেয়ে রেইন এসেই কোণে বসে এমন গল্প জুড়ল যেন এখানে দ্বিতীয় আর কেউ নেই। এলেন মিলওয়াকির বেঞ্জামিন রাস। রাসের সঙ্গে আরও পাঁচজন ত্রিশ অনূর্দ্ধ্ব যুবক এবং এক যুবতীও এলেন। বেঞ্জামিনের সহযাত্রীরা সকলেই এককালে নিকারাগুয়ার বাসিন্দা ছিলেন। এঁরা সকলেই হয়ত নন-রেসিডেন্ট নিকারাগুয়ান টাইপ। নিকারাগুয়ানরা আগামীকাল ভিক্টর নিয়েতোর সঙ্গে গানের দলে থাকবেন।
আসর শেষ হলে বিল ও জেনেট ফিরে গেলেন তাঁদের ফার্মে। বাকিরা যাঁকে যে কটেজ দেওয়া হয়েছে, সেই কটেজে পৌঁছে গেলেন। আমি, ভিক্টর নিয়েতো, বেঞ্জামিন রাস, ওমর আর নিয়েতোর পাঁচ নিকারাগুয়ান সহযোগী যুবক এবং এক যুবতী রাত্রিবাসের জন্য সেদিনের মতো পাইন কটেজের উদ্দেশে রওনা দিলাম। পাইন কটেজে ঢুকেই ঘুম পেয়েছে ঘোষণা দিয়ে বেঞ্জামিন একটি ঘরে, এবং সেই যুবতী আর একটি ঘরে ঘুমোতে চলে গেলেন। আমিও ঘুমোবার অভিপ্রায় জানিয়ে, আমার ঘরের দিকে এগোলে ভিক্টর পথ আটকে বললেন, আরে চলেছ কোথায়? এবার তো আমাদের প্রোগ্রাম শুরু!
ভিক্টর আমাকে টেনে নিয়ে এলেন ড্রয়িংরুমের সোফা অবধি। তারপর তিনি ‘ওমর’ বলে হাঁক ছাড়লেন জমিদারি স্টাইলে। সামনে এসে হাসিমুখে দাঁড়াল ওমর। তিনি সস্নেহে ওমরকে নির্দেশ দিয়ে বললেন, ড্রিংকসগুলো বের করো। ভিক্টর নিজের ব্যাকপ্যাক থেকে কয়েক কেজি চিকেন পকোড়া বের করে, সেগুলো ওভেনে গরম করতে কিচেনে গেলেন। বাকি যুবকরা তখন বাদ্যযন্ত্রগুলোকে বের করে ফাঁকা চেয়ার ও টেবিলের উপর রাখতে থাকলেন।
সকলের গলা খানিকটা ভিজলে, হঠাৎ গা ঝাড়া দিয়ে উঠে, ভণিতা বাদ দিয়েই, টেবিল থেকে তাঁর গিটারখানা হাতে তুলে তার তারে ঝংকার দিয়ে ঝাড়া গলায় স্পানিশ গান ধরলেন ভিক্টর। গানের সঙ্গে গিটারের ঝংকারে নাচও এসে গেল তাঁর। ওমর ও বাকিরা নিজের নিজের বাদ্যযন্ত্র বাজাচ্ছিলেন। ভিক্টরের গানের সঙ্গে তাঁদের মধ্যে নাচের ভাবের সংক্রমণ হল। আমি হাতে তালি দিচ্ছিলাম দেখে ওমর এক পলক বাজনা থামিয়ে, একটা ব্যাগ থেকে খঞ্জনির মতো একটা জিনিস বের করে আমার হাতে ধরিয়ে দিলেন। যত সময় যায়, ভিক্টরের গলা তত খুলতে থাকে। একবার ভাবলাম এত রাতে এত হুল্লোড় কি ঠিক? তখুনি মনে হল যে, এখানে পড়শি কোথায়, কাকে উৎপাত করা হবে! মার্গ্রেটের কটেজও এখান থেকে অন্তত তিনশো মিটার দূরে, জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে এখানকার শব্দ সেখানে পৌঁছানো বেশ শক্ত।
ভিক্টরের গান সুরে ও ছন্দের ওঠাপড়ায় এমন সাবলীল হয়ে উঠল যে, কোনো ভিনদেশি গান শুনছি এই ভাবটাই আমার রইল না আর। তাঁর গান শেষ হলেই তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, এই গানটা কি অশান্ত সাগরের তীরে দাঁড়িয়ে, কিংবা, সাগরের কিনারা বেয়ে নৌকো বাইতে বাইতে গাইবার মতন মাঝিদের গান? ভিক্টর তাঁর গিটার সোফায় নামিয়ে আনন্দে লাফিয়ে উঠে, এবং, জোরে হাত তালি দিয়ে বললেন, চমৎকার! এই দুটোই – এগুলো মাঝিমাল্লাদের গাইবার গানই বটে। আর এই গানও ছোটো নদীতে নয়, সাগরের তীর ছেড়ে জলে নেমে মাঝিদের ভেসে চলার গান, তাও বটে। আমার আন্দাজ মিলে গেছে জেনে বুক ফুলে উঠল আমার।
ভাল শ্রোতা পেয়ে এখন ভিক্টরকে আর কে পায়। একের পর এক গান গেয়ে ও নেচে চললেন তিনি। আমার মনে হল, তিনি যে পাইন কটেজে এসেই গলা ভিজিয়েছেন এমন নয়। এখনও এক গান শেষ করে আরেকটা গান ধরবার মুখে, তিনি গলাটা একটু ভিজিয়ে নিচ্ছেন। বাকিদেরও সেই অবস্থা। এঁরা যেন সকলেই কলেজের হোস্টেলজীবনে আছেন এখন। মনে হচ্ছে, এই গলা ভিজানোর কাজটা মিলওয়াকি থেকে আসার পথে গাড়িতেই শুরু করেছিলেন এঁরা। নাহলে এত আবেগ আসছে কোথা থেকে? গানগুলোয় উচ্চারিত স্প্যানিশ শব্দগুলোর অর্থ উদ্ধার না করতে পারলেও, এবং, গানের ও বাজনাগুলোর সঙ্গে অপরিচিত হলেও, সেগুলো আমি রীতিমতো উপভোগ করতে লাগলাম।
ভিক্টর পর পর গান গেয়ে একসময় হাঁপিয়ে উঠলেন। তখন বাকিরা শুরু করল। আমিও গাইতে পারি বলে, ভিক্টরের আমাকেও গাইতে বললেন। আমি বললাম, আমার গানের কথা তো আপনারা বুঝবেন না, আর কথা না বুঝলে এই গানের স্বাদও পাবেন না। ভিক্টর বললেন, গানের আবার কথা কি, গুলি মারো ওসবে, তুমি গান ধরো। আমি দুটো রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইলাম। প্রথমে, ‘তোমার খোলা হাওয়া লাগিয়ে পালে টুকরো করে কাছি/ আমি ডুবতে রাজি আছি’ এবং, পরে, ‘বিশ্বসাথে যোগে যেথায় বিহারো/ সেইখানে যোগ তোমার সাথে আমারো’। নিকারাগুয়ান বাজনাগুলো আমার গানের সঙ্গে বেশ মিলে গেল। গান শেষ হলে, গানগুলোর অর্থ জানতে চাইলেন ভিক্টর। অর্থগুলো বললাম। অর্থ শুনে ভিক্টর বললেন, টেগোর ইজ গ্রেট। এক পলক চুপ করে থেকে ঝপ করে আমাকে বললেন, কাল যখন এ্যাম্ফি থিয়েটারে আমার দল গান গাইবে তখন, তোমাকেও এই দুটো গান গাইতে হবে, রিহার্স্যাল তো এখন হয়েই গেল। শুনে আমি উত্তেজিত বোধ করলাম, প্ল্যানটা রোমহর্ষক ঠেকল।
দেওয়াল ঘড়ির কাঁটায় রাত তিনটে দেখাচ্ছে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ভিক্টর বললেন, আফটার টেগোর দেয়ার কান্ট বি এনিমোর সংস! ওমর বলল, এখন ঘুমোতে না গেলে কালকে স্টেজে ঘুমোতে হবে। অবশেষে যে যার ঘরে ঘুমুতে গেলাম। পরের দিন ঘুম ভেঙে ওমরের গাড়িতে সানফ্লাওয়ার ভ্যালি পৌঁছে দেখি সেখানে বনেদি বাড়ির উৎসবের চেহারা। কে কোথায় কি করছেন তার হদিশ মেলা ভার। ইসাবেলা, হ্যাওলি, বেটিনা প্রভৃতিদের কাউকেই দেখছি না, তাঁরা নানা কাজে জড়িয়ে আছেন। পঞ্চাশ একশো মাইলের ভিতর সানফ্লাওয়ার ভ্যালির শুভার্থী যাঁরা আছেন, তাঁরা অনেকেই এসে উপস্থিত হচ্ছেন। সকাল সাড়ে দশটায় ফোদের আফ্রিকান ড্রাম বিটিং অনুষ্ঠান। আজকের দিনে সর্বক্ষণের রান্নার দায়িত্বে আছেন ভিক্টরের স্ত্রী, মেলোডি, মিলওয়াকির বেঞ্জামিন রাস এবং এই সকলকে নেতৃত্ব দিয়ে ডাইনিং টেবিলের উপর রান্না করা খাবার সারাদিনই থেকে থেকে সাজিয়ে রাখছেন মার্গ্রেট।
(২)
ব্রেকফাস্ট শেষ হতে অতি সৌম্যদর্শন, মধ্যবয়সী এক আমেরিকান ভদ্রলোক ডাইনিং হলে প্রবেশ করলেন। তাঁকে দেখে মেলোডি কৌতুকে করে বললেন, এই যে, ডেভিস, আছেন কেমন! ডেভিস মেলোডির সঙ্গে যেসব কথা বললেন তার কোনো মানে বুঝতে পারলাম না। তাঁদের সব কথাই ইঙ্গিতের ভাষায়। ডেভিস একে একে সকলের সঙ্গেই কথা বললেন। যাঁর সঙ্গেই তিনি কথা বলছেন, কথা শেষ হতেই তাঁর হাতে একটা কাগজের প্যাকেট গুঁজে দিছেন। দেখলাম সেই প্যাকেটের ভিতরে আছে চারটে পেন্সিল, একটা পেন্সিল কাটার, উইসকনসিন স্টেটের একটা ম্যাপ, এবং, একটা বড়ো চকোলেট। তিনি মার্গ্রেটের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করতেই মার্গ্রেট তাঁর সঙ্গে আমার আলাপ করিয়ে দিয়ে, টি-রুমের দিকে হাত তুলে, এবং, চোখ টিপে হেসে ডেভিসকে বললেন, যাও, আগে এক কাপ চা লাগাও।
ডেভিস টি-রুমের দিকে এগোলে মার্গ্রেট পিছন থেকে আমাকেও চোখ টিপলেন। মার্গ্রেটের ইশারার অর্থ আমি বুঝতে পারলাম না। ডেভিসের কোন চা পছন্দ জিজ্ঞেস করে সেই চায়ের টি-ব্যাগ দুটো কাপে ডুবিয়ে ওভেনে বসালাম। ডেভিসকে তাঁর কাপ এগিয়ে দিয়ে, নিজের কাপ হাতে নিয়ে কোথায় কি চলছে বুঝবার জন্য বাইরে গেলাম। বেরুবার মুখে আমার হাতেও একটা কাগজের প্যাকেট ধরালেন ডেভিস, যার ভিতরে সেই চারটে পেন্সিল, একটা পেন্সিল কাটার, উইসকনসিনের একটা ম্যাপ, এবং, একটা বড়ো চকোলেট রয়েছে। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম যে, আমি ডাইনিং হলের উপর দিয়ে বেরুনোর সঙ্গে সঙ্গেই মেলোডি ও মিসেস ভিক্টরের পিছু পিছু ঘুরে কথা বলতে থাকলেন ডেভিস।
গেটের বাইরে, পিচ রাস্তার ধারে, পার্ক করে রাখা গাড়ির সংখ্যা বেড়ে গেছে। আশ্রমের ভিতরে অনেক নতুন মুখও দেখা যাচ্ছে। অনেকেই চারপাশে তাকাতে তাকাতে পাহাড়ের উপরের দিকে যেখানে এ্যাম্ফি থিয়েটারের স্টেজ, সেইদিকে যাচ্ছেন। তাঁদের যাওয়ার পথে কোথাও ঘাস-ঢাকা রাস্তার উপরে রাজহাসের দল মন্থর ছন্দে হেঁটে বেড়াচ্ছে, কোথাও পায়ে-চলা পথের অল্প দূরে গায়ে মোটা কম্বলের মতো লোমের ভার নিয়ে, হৃষ্টপুষ্ট ভেড়ার দল সার দিয়ে তৃণভোজের উৎসব করছে, কোথাও পাহাড়ের ঢালে পেটানো চেহারার দু’তিনটে ঘোড়া ঝকঝকে রোদের মধ্যে গাছগাছালির আলোছায়ায় মনের সুখে জগিং করছে। এই রাজহাঁস, এই ভেড়ার পাল, আর, এই ঘোড়াদের পরিবার – সকলেই সানফ্লাওয়ার ভ্যালির স্থায়ী সদস্য। এখানকার সব বাসিন্দাদের সঙ্গেই এইসব প্রাণীদের বোঝাপড়া আছে, প্রত্যেকের সঙ্গে প্রত্যেকের ভাব-বিনিময়ও হয়।
আমিও দলের পিছু পিছু এ্যাম্ফি থিয়েটারে পৌঁছালাম। সেখানে সানফ্লাওয়ার ভ্যালিতে প্রস্তুত জ্যাম, জেলি, আচার, ফ্রুট জুস, বেকারিজাত সামগ্রীর প্রদর্শনী দিয়েছেন এমা ম্যাকগ্যারি ও দেব। প্রদর্শনীর পাশে স্ন্যাকস ও চায়ের স্টলও দিয়েছেন তাঁরা। খোলা জায়গায় অনেকেই ইতস্তত ঘুরে বেড়াচ্ছেন। একটা ম্যাপল গাছের নিচে কিশোর গিল এবং কিশোরী রেইন নিজেদের জগৎ বানিয়ে নিয়ে বিভোর হয়ে আছে। দক্ষিণের দিকে বড়ো আপেল গাছের তলাটা ভাল করে পরিষ্কার করে সুতির কার্পেট পাতা আছে। কার্পেটের উপর রাজ্যের আফ্রিকান মিউজিক্যাল ইন্সট্রুমেন্ট রাখা রয়েছে। আফ্রিকার মিস্টার ফোদে, স্টেলা ও ম্যাগি এমাদের টি স্টলের সামনে একটা বেঞ্চে বসে আছেন। চা পান করতে করতে নিশ্চিন্ত আরামে তাঁরা নিজেদের মধ্যে কথা বলে যাচ্ছেন। বুঝতে পারলাম যে, আফ্রিকান ড্রাম বিটিংয়ের অনুষ্ঠান এ্যাম্ফি থিয়েটারের মঞ্চে না হয়ে, খোলা আকাশের নিচে এই আপেল গাছের তলাতেই হবে।
এখনকার আপাতত ঢিমে-তেতালা ভাব লক্ষ করে বুঝলাম যে, অনুষ্ঠান শুরু হতে কিছুটা দেরিই হবে। সেইটা বুঝে আবার ডাইনিং হলেই ফিরে গেলাম এই আন্দাজ করে যে, সেখানেও এখন মজাদার কিছু চলছে। ডাইনিং হলে পৌঁছে দেখলাম যে, হল একেবারে ফাঁকা। অনুমান করলাম যে, সেখানে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা তাহলে এ্যাম্ফিথিয়েটারেই চলে গেছেন। আমি যে রাস্তা ধরে পাহাড় থেকে নেমেছি তাঁরা হয়ত সেই রাস্তা দিয়ে না উঠে, অন্য রাস্তা ধরেছেন।
(৩)
ডাইনিং হল শুনশান দেখে পাশের লাইব্রেরি কাম মিউজিয়াম রুমে ঢুকলাম। সেখানে মেঝের উপর শুয়ে আছে ব্রায়ান। বেটিনা ও ইসাবেলা নিঃশব্দে তার পা ড্রেসিং করছেন। এতটাই নিঃশব্দে যে তাঁরা যে এখানে আছেন তা আমি ডাইনিং হলে বসে থেকেও বুঝতে পারি নি। ব্রায়ান কাতর দৃষ্টিতে এই দুই মহিলার দিকে মাঝে মাঝে তাকাচ্ছে। আমাকে দেখে সহসা রাগ নিয়ে ইসাবেলা বললেন, আপনি কি আমরা যতক্ষণ না ফিরি ব্রায়ানের কাছে একটু থাকতে পারবেন? তাঁর রাগের কারণ ধরতে না পারলেও স্বাভাবিক স্বরে বললাম, না পারার তো কোনো কারণ নেই।
আমার উত্তর পেয়ে ইসাবেলা এবার ফেটে পড়ে বললেন, আমরা রেইন আর গিলকে বলেছিলাম, তোমরা তো গল্পই করবে, তো, আমরা যতক্ষণ না ফিরি, তোমরা নাহয় ব্রায়ানের কাছেই বসে গল্পটা কোরো! ওদের কাণ্ডজ্ঞান দেখুন, কাউকে কিচ্ছুটি না বলে, ব্রায়ানকে একা ফেলে, দু’জনেই কোথায় কেটে পড়েছে – ননসেন্স! ইসাবেলার রাগের কারণটা এবার বোঝা গেল।
ব্রায়ানের পায়ের ঘা বিশ্রীরকমের বেড়েছে, মনে হয় ক্যান্সারের পচনের মতো একটা ব্যাপার শুরু হয়েছে। এই মুহূর্তে তার কেবল শুশ্রূষাই প্রয়োজন। এই পরিস্থিতিতে ইসাবেলা অস্থির হতেই পারেন। তিনি একা নন, বেটিনাও। ইসাবেলা যখন রাগ দেখালেন, তখন বেটিনা চুপ করে থেকে ইসাবেলার রাগকে যেন সমর্থনই করলেন। ঘরের মধ্যে তেমন আলো হাওয়া নেই দেখে ইসাবেলা ও বেটিনা দু’জনে মিলে ধরাধরি করে এবার কার্পেট সমেত ব্রায়ানকে তুলে নিয়ে ডাইনিংরুম, টি-রুম পেরিয়ে পার্কের ম্যাপল গাছের ছায়ায় গিয়ে নামালেন। এখন ইসাবেলা হেসে বললেন, আপনি দোলনায় দোল খেতে পারেন, যত খুশি চা পান করতে পারেন যতক্ষণ না আমরা ফিরছি, কেমন!
তাঁরা বেরিয়ে পড়লেন। সানফ্লাওয়ার ভ্যালির সামনে দিয়ে যে পিচ রাস্তা গেছে সেই রাস্তা ধরে আপে ও ডাউনে এগিয়ে যাবেন তাঁরা। এই রাস্তার উপরে যেখানে কোনো শাখা রাস্তা মিশেছে, বা, যেখান থেকে কোনো শাখা রাস্তা বেরিয়ে গেছে সেইসব সংযোগস্থলে, সানফ্লাওয়ার ভ্যালি পৌঁছানোর পথনির্দেশিকার প্ল্যাকার্ড পুঁতবেন তাঁরা। এতে আজকের অনুষ্ঠানে প্রথমবারের জন্য যাঁরা যোগ দিতে আসবেন তাঁদের ড্রাইভিংয়ের সুবিধা হবে।
দেখা গেল, ইসাবেলার কথা মতোই আমি দোলনায় বসে চায়ে সুখের চুমুক দিচ্ছি। গ্রীষ্মদুপুরের বেশ একটা জোরালো অথচ মিষ্টি হাওয়া উঠেছে, আকাশ যতটা পরিষ্কার হতে পারে ততটাই পরিষ্কার। এই পরিবেশে ব্রায়ান কিছুটা সুস্থ বোধ করল, তার আচ্ছন্নতা কিছুটা কমল। এক একবার চোখ খুলে তাকালও। আমি মাঝে মাঝে কার্পেটে টান দিয়ে, সরে যাওয়া ছায়ার দিকে তাকে সরিয়ে দিতে থাকলাম। তাতে সে খুশি হচ্ছিল। গতকালের বিকেল থেকে তার দিকে কেউই আর তাকাবার সময় পাচ্ছেন না। সব মিলিয়ে তার এখন খুব সঙ্কট।
দোলনায় বসে সানফ্লাওয়ার ভ্যালির গেটটা পরিষ্কার দেখা যায়। ইসাবেলা ও বেটিনার পথ চেয়ে নজর রেখেছি সেইদিকে। তাঁরা না ফিরলে আমি নড়তে পারছি না। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গেট দিয়ে অতিথিদের আনাগোনাও বাড়ল। কেউ গেটের বাইরে গাড়ি পার্ক করছেন, কেউ গাড়ি নিয়ে সোজা ভিতরে এসে ফাঁকা জায়গায় পার্ক করছেন। দেখতে দেখতে গাছের ছায়া সরতে সরতে পাঁচ ফুট দূরে সরে গেল। আমিও কার্পেটের কোণা ধরে টেনে ব্রায়ানকে পাঁচ ফুট সরিয়ে দিয়েছি। এখন একেবারে দোলনার নিচে এসে গেছে সে। তার আর যন্ত্রণা নেই, ওষুধের প্রভাবে সে ঘুমোচ্ছে এখন।
আজ লাঞ্চের ব্যবস্থা নেই। ভারী ব্রেকফাস্টের আয়োজন ছিল সকালে। তার পরেও কারুর খিদে পেলে সে মনের মতো কিছু খাবার ডাইনিং টেবিলেই পেয়ে যাবে। ফলমূল, বেকারির পাউরুটি, চিকেন ফ্রাই – এইসব বস্তু প্রচুর পরিমাণে রাখা আছে সেখানে। আজকের মূল খাওয়া বিকেল ছটায় এ্যাম্ফি থিয়েটারের লনের বুফে ডিনারে। সকলের জন্যই উন্মুক্ত আমিষ নিরামিষ দু’ধরনের ডিনার থাকবে। ডিনারের সুষ্ঠু ব্যববস্থাপনার জন্য সেখানে নিযুক্ত থাকবেন আজকের ভল্যান্টিয়াররা। তাঁদের সহযোগিতা করবেন এখানকার এমা, দেব, হ্যাওলি, ল্যারি, মর্গ্যান, মিসেস ভিক্টর, মেলোডি ও মার্গ্রেট। শুনছি যে, এই নির্জন আবাসে আজ শিল্পী কুশীলব বাদ দিয়েও বেশ কয়েকশো মানুষের উপস্থিতি ঘটবে। সানফ্লাওয়ার ভ্যালির পক্ষে এই সমাগমকে বড়োসড়ো সমাগমই বলা যায়।
বেলা দুটোয় ইসাবেলা ও বেটিনা ফিরলেন। তাঁদের মেজাজ এখন অনেকটাই হাল্কা। গাড়ি থেকে নেমেই তাঁরা সোজা এলেন পার্কে। ব্রায়ান তখন আরামে ঘুমোচ্ছে। দু’জনেই আমাকে অনেক করে ধন্যবাদ দিয়ে, ব্রায়ানের গায়ে হাত বুলোতে থাকলেন। আদর খেয়ে ঘুম ভেঙে স্বাভাবিক দৃষ্টিতে ব্রায়ান তাকাল তাঁদের দিকে। ইসাবেলা আক্ষেপ করে আমাকে বললেন, দুঃখিত, আপনাকে অনেকক্ষণ আটকে রাখলাম। আপনাকে অনেক, অনেক ধন্যবাদ। আপনি এবার নিশ্চিন্তে যেখানে খুশি যান। আমি স্মিত হাসলাম। তাঁরা দু’জনে ব্রায়ানের কার্পেট স্টেচার বওয়ার মতো দু’দিক থেকে ধরে তাকে বিল্ডিংয়ের ভিতরে নিয়ে গেলেন।
এতক্ষণে এ্যাম্ফি থিয়েটার জমে উঠেছে ভেবে, এবার সেখানেই হাজির হলাম। আপেল গাছের নিচে ফোদের দলের আফ্রিকান ড্রাম বিটিংয়ের আসর রীতিমতো জমে উঠেছে ফেখলাম, তাঁরা বাজাতে বাজাতে নাচছেন, শ্রোতা দর্শকরারেও অনেকটা দূর দিয়ে ঘিরে চওড়া বৃত্তরচনা করে, চারধারে গোল হয়ে বাজনাও শুনছেন, এবং, নাচছেনও। বৃত্তটা চওড়া হওয়ার জন্য যাঁরা দূরে দাঁড়িয়ে-বসে আছেন, অনুষ্ঠানটা তাঁদের কারুরই নজরের আড়াল হচ্ছে না। মাঠও সমতল নয়, অনেকটা উটের পিঠের মতো সবদিকে ঢালযুক্ত, সেইজন্য একটা প্রাকৃতিক গ্যালারি সৃষ্টি হয়েছে। মাঠের মাঝখানে একটা ঢাউস চেয়ারে হেলান দিয়ে, আধ-শোয়া হয়ে বসে আছেন পেন্সিল গিফট করনেওলা ডেভিস। তিনি এক হাতে বোতল উঁচু করে থেকে থেকে বিয়ারে চুমুক দিচ্ছেন, আর, অন্য হাতে ধরে আছেন জ্বলন্ত সিগারেট।
চেয়ারটা ডেভিস সঙ্গে করেই নিয়ে এসেছেন। সেটা হাওয়া ভরা চেয়ার। হাওয়া খুলে নিলে সেটা প্লাস্টিক শিট। চেয়ার বলতে দুটো হাতল, আর, পিছনে ঠেস দেওয়ার একটা হাওয়ার তাকিয়া। হাতলগুলোও হাওয়ার তাকিয়া, প্রতিটি তাকিয়া পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত। ডেভিসের ঠিক পিছনে বসেছেন বছর ত্রিশেক এক সুন্দরী। সুন্দরীর নিজের লাইটার খারাপ হওয়ায়, ডেভিসের লাইটারটা চাইলেন। ডেভিস বিয়ারের বোতল পাশে রেখে, এবং, সিগারেট ঠোঁটে চেপে রেখে তাঁর চেয়ারে পাশ ফিরে শুলেন। লাইটার হাতছাড়া না করে, সেটিকে ফস করে জ্বালিয়ে নায়িকার দিকে মেলে ধরলেন। নায়িকা মুখে সিগারেট নিয়ে ঝুঁকে নিজের সিগারেট ধরিয়ে নিয়ে, ডেভিসকে ‘থ্যাংকস’ দিলেন। ডেভিস নায়কোচিত ভঙ্গিতে একটা স্মিত হাসি ছাড়লেন। ডেভিসকে দেখে মজা লাগল, তাঁর সঙ্গে আলাপ করবার ইচ্ছা হল।
একটা ফাইবারের চেয়ার টেনে নিয়ে, আমি ডেভিসের পাশে গিয়ে বসলাম। শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর, ডেভিস আমাকে সিগারেট অফার করলেন। সেটা না নেওয়ায় তখন একটা চকোলেট দিলেন। জানলাম যে, তিনি পঞ্চাশ মাইল দূর থেকে আসছেন। সংসারে তাঁর কে কে আছেন প্রশ্ন করতে, তিনি বললেন যে, সবাই চোর বলে তিনি কাউকে বিয়ে করতে পারেন নি, এবং, বিয়ে করেন নি বলে তাঁর ছেলেমেয়ে হয় নি। তিনি একটা পেন্সিল কারখানার মালিক। গান শুনতে এসেছেন এখন, কিন্তু ভয় যে, এই ফাঁকে বাড়িতে কেউ তালা না ভাঙে। আমার দিকে আঙুল তুলে চোখে একটা চড়া দুষ্টু হাসি নিয়ে বললেন যে, তাঁর ধারণা যে আমার মতোই দেখতে শুনতে একেবারে নিপাট ভদ্রলোকরাই সুযোগ বুঝে বাড়ির তালা ভাঙে। তাঁর কথায় অপমানিত বোধ করব, না মজা পাব, বুঝে উঠতে পারলাম না।
সানফ্লাওয়ার ভ্যালি জুড়ে আজ যে উৎসবের মেজাজ, তাতে ডেভিসের মতো একজন মানুষকে পেয়ে উৎসাহ বাড়ল আমার।
আর কিছুক্ষণ পরেই, ঠিক বিকেল পাঁচটায়, শুরু হবে গানের অনুষ্ঠান। গান যাঁরা গাইবেন, তাঁরা কেউই মূলস্রোতের শিল্পী নন। তাঁরা গাইবেন কান্ট্রি সংস, আমরা যাকে লোকগীতি বলি আর কি। তার মধ্যে গণসঙ্গীতজাতীয় গানও থাকবে। আমেরিকান ইন্ডিয়ান শিল্পীরাও যোগ দেবেন, তাঁরা আদিবাসীদের গান গাইবেন। প্রথম শিল্পী মাইক জনসন ও সম্প্রদায়। তাঁরা মঞ্চে থাকবেন ছটা অবধি। ছটা থেকে সাতটা অবধি চলবে বুফে ডিনার। একক শিল্পীরা একের পর এক মঞ্চে উঠবেন ডিনারের পর। ভিক্টর নিয়েতো তাঁর দল নিয়ে সাড়ে আটটায় মঞ্চে উঠবেন। অর্থাৎ আমিও ওই সময় মঞ্চে উঠব। এই নিয়ে নার্ভাস বোধ হতে লাগল।
পৌনে পাঁচটায় এলেন বিল ও জেনেট। তাঁদের আজকের চেহারা কালকের থেকে পুরো আলাদা। সভাস্থলের লোকজনকে এক একবার কঠিন দৃষ্টিতে লক্ষ করছেন, এবং, কেউ সম্ভাষণ করলে দেঁতো হেসে সৌজন্য সারছেন তাঁরা। ব্যতিক্রম কেবল আমি। আমার চোখে চোখ পড়তে, তাঁরা স্বাভাবিকভাবে হাসলেন। ইশারায় তাঁদের কাছে ডাকলেন আমাকে। তাঁরা ঘাসের উপরই বসেছিলেন। আমি তাঁদের পাশে গিয়ে বসলাম। বিল মাথা ঝুঁকিয়ে আমার কানে কানে বললেন, তাহলে আজকের অনুষ্ঠান শেষ হলেই আমরা বেরুচ্ছি, এবং, আপনি আমাদের সঙ্গে যাচ্ছেন। আমি বললাম, একদম।
মঞ্চে মাইক জনসন ও তাঁর দল উঠেছেন। গানের মাঝখানে হঠাৎ বাজনা থামিয়ে মাইক অডিয়েন্সকে বললেন, এখানে যাঁরা প্রেমে পড়ে আছেন, তাঁরা হাত তুলে জানান দিন। তিনি অডিয়েন্সের এক দিক থেকে আরেক দিকে তাঁর নজর ঘোরাতে থাকলেন। নির্দিষ্ট লক্ষ্যে তাঁর দৃষ্টি দাঁড়িয়ে গেলে, সকলেই মঞ্চের দিক থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকালেন। আমিও তাকালাম। দেখলাম, আপেল গাছের চওড়া ডালের আনুভূমিক অংশে পা ঝুলিয়ে, অনেকটা রাধাকৃষ্ণের মতো, গিল ও রেইন পাশপাশি বসা এবং তাদের দু’জনেরই হাত তোলা। মাইক মঞ্চ থেকে তাদের অভিনন্দন জানিয়ে বললেন, পরের গানটা তোমাদের জন্য। তখনই মঞ্চের সব বাজনা বেজে উঠল। মাইক ডিগবাজি খেয়ে মঞ্চের বিপরীত প্রান্তে চলে গিয়ে, সাপ যেমন ফণা তুলে ধরে তেমনিভাবে ফণা তুলে, চড়া গলায় গান ধরলেন। শ্রোতাদের মধ্যে অনেকেই মঞ্চের ঠিক নিচে ফাঁকা জায়গাটায় উদ্দাম নৃত্য জুড়লেন। নাচিয়েদের মধ্যে গিলের বাবা জেসন, এবং, রেইনের মা মেলডিকেও দেখলাম।
ঘড়ি না দেখেও এখানকার মানুষ সময়ানুবর্তী। আজও দেখলাম এত নাচানাচি পরেও মাইকের গান শেষ হল ঠিক ছটায়, আর, তখনই সকলে বুফেতে যোগ দিলেন। একে অন্যের সঙ্গে কথা বলতে বলতে, খোলা মাঠে ঘুরে ঘুরে সকলে ডিনার করতে থাকলেন, আমিও। কিন্তু, মঞ্চে উঠে আমার গান আছে বলে নার্ভাস লাগছে, মুখ দিয়ে কথা সরতে চাইছে না। ভিক্টর নিয়েতো ও তাঁর দলের প্রায় সবাইই আমেরিকান রুচির সঙ্গে পরিচিত, তাঁদের কথা আলাদা, কিন্তু আমার আমেরিকার শ্রোতাদের রুচি সম্বন্ধে কোনো ধারণাই নেই। একটাই ক্ষীণ ভরসা এইটা নিয়ে যে, যদি আমার গাওয়ায় খামতি ঘটে তাহলে ভিক্টর তাঁর যন্ত্রানুসঙ্গে সেটা কিছুটা হয়তো সামলে দেবেন। গতকাল ওঁদের বাজনার সঙ্গে আমার গান চমৎকার মিলে গিয়েছিল।
ডিনার মিটিয়েও আমি বিল ও জেনেটের পাশেই ঘাসের উপরে বসে রইলাম। এঁরা এখনও জানেন না যে, একটু বাদে আমিও মঞ্চে উঠব। ওঁদের বলি নি, কারণ ওঁরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত হলেও আজ আগাগোড়াই ওঁদের একটু ছাড়া-ছাড়া ভাব। এইটা দেখে একসময় বিলকে জিজ্ঞেসই করে বসলাম, কোনো কারণে আপনি কি এখন চিন্তিত আছেন? বিল ম্লান হেসে বললেন, সেরকম কিছু নয়। অনুষ্ঠান তো ভালই হচ্ছে – তবে, তবে … আমি আপনাকে পরেই বলব। বুঝতে পারলাম যে, কোনো একটা বিষয়ে তাঁর বেশ অসন্তোষ ঘটেছে। রহস্যের আঁচ পেয়ে আমার কৌতূহল বেড়ে গেল। আপাতত তা সংবরণ করে অনুষ্ঠানই দেখতে থাকলাম।
দেখলাম ওদিকে ডেভিস এখন চেয়ারের উপর তাঁর পেন্সিল ও চকোলেটে ভর্তি ব্যাগটা রেখে দিয়ে পায়চারি করতে করতে অনুষ্ঠান দেখছেন। যে সুন্দরী তাঁর কাছে সিগারেট ধরিয়েছিলেন তিনি অনুষ্ঠানে একা এসেছেন, সানফ্লাওয়ার ভ্যালির কেউই তাঁকে চেনেন না। এত সুন্দরী ও কমবয়সী কোনো মহিলা এদেশেও সচরাচর একা ঘোরেন না। বস্তুত সুন্দরীকে পায়চারি করতে দেখেই ডেভিসও তাঁর পাশে পাশে পায়চারি করছেন। জলের খালি বোতল ফেলার জন্য সুন্দরী যখন গারবেজ ক্যান খুঁজছেন, তখন তাঁর হাত থেকে বোতলটা একরকম ছিনিয়ে নিয়ে, তাঁকে টপকে ডেভিস সেটা ছুঁড়ে ফেললেন গারবেজের বাক্সে। ডেভিসের কাছ থেকে এই উপকারটা পেয়েই সুন্দরী দ্রুতবেগে পুনরায় ফিরে গেলেন নিজের চেয়ারে।
সুন্দরী নিজের চেয়ারে বসে পড়লে, ডেভিসও পায়চারি থামিয়ে ফিরে গেলেন নিজের চেয়ারে। তাঁর শখের চেয়ারটাকে এবার ঘাসের উপর পিছলে নিয়ে পিছনে সরিয়ে নিয়ে গেলেন সুন্দরীর চেয়ারের পাশে। সুন্দরী খুশি হলেন, কি বিরক্ত হলেন, বোঝা গেল না। ডেভিস মধ্যবয়সী হলেও কম সুপুরুষ নন। তাঁর প্রথম দর্শনে নারীদেরও যে মুগ্ধতা ঘটে এমন তিনি অভিজ্ঞতা করে থাকবেন। সুন্দরী রাজহাঁসের মতো ঘাড় তুলে অনুষ্ঠান দেখছিলেন। পরস্পরের খুব কাছাকাছি বসেও তাঁদের মধ্যে একটা দূরত্ব থেকেই গেল। দু’জনের চেয়ারের উচ্চতা আলাদা, ডেভিসের চেয়ার মাটি-লগ্ন – প্রায় একটা বিছানার মতো। অসমান উঁচু চেয়ারে বসে কথা বলার সুবিধা নেই বলে, ডেভিস তাঁর মাথাটা সুন্দরীর চেয়ারের দিকে পুরোপুরি হেলিয়ে দিলেন। কিন্তু মাথা বেশিক্ষণ শূন্যে থাকতে পারে না, একসময় তা সুন্দরীর কোলে আশ্রয় নিল। সুন্দরী বিনা বাক্যব্যয়ে, সহজভাবেই নিজের চেয়ারটা মঞ্চের দিকে আরও পাঁচ ছয় ফুট এগিয়ে নিলেন। একা হয়ে গিয়ে ডেভিস এবার পায়ের উপর পা তুলে, একটা সিগারেট ধরালেন।
ইসাবেলা থেকে শুরু করে বেটিনা অবধি সকলেই এই অনুষ্ঠানে হাজির, নেই শুধু প্রৌঢ়া ন্যান্সি। কাল বিকেলেই তাঁকে একবারের জন্য দেখেছি। মিস্টার ফোদে যে আপেল গাছের নিচে বাজিয়েছিলেন সেইখানে বসেছেন ইসাবেলা আর বেটিনা, তাঁদের পাশে ব্রায়ান। তাঁদের দু’জনেরই আজ জবরদস্ত সাজ, এমন সাজ তাঁদের আগে কখনও দেখি নি। সেই আপেল গাছের তলাতেই একটু দূরে বসেছেন হ্যাওলি, দেব। হাতে কারুকার্যখচিত একটা লাঠি, জিন্স ও টি-শার্ট পরে মার্গ্রেটও আছেন অডিয়েন্সে। দুই পাশে তাঁর দুই মেয়ে। মেয়েরা থাকেন মিলওয়াকিতে। মায়ের প্রতিষ্ঠানের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়ে সানফ্লাওয়ার ভ্যালিতে অতিথি হিসেবে এসেছেন তাঁরা। ওই আপেল গাছের ধারেকাছেই রয়েছেন ন্যান্সি ছাড়া সানফ্লাওয়ার ভ্যালির সব সদস্যই। এমা ওই গাছতলায় নেই, কিন্তু তিনিও এই অডিয়েন্সেই আছেন।
আপেল গাছের নিচে যাঁরা বসেছেন, তাঁরা সকলেই এমার বেড়ালের পরিচিত। যেখানে ইসাবেলা ও বেটিনা বসেছেন, সেখানে আপেল গাছের ঠিক উপরের একটা ডালে, দু’হাত দু’পা দিয়ে সেই ডালটাকে কোলবালিশের মতো জড়িয়ে ধরে, চোখ মঞ্চের দিকে রেখে, সেই বেড়াল অনুষ্ঠান দেখছে। মাঝেমাঝে সে সানফ্লাওয়ার ভ্যালির সদস্যদের সঙ্গে সংকেতে আলাপ চালাচ্ছে, এবং, ঘাড় ঘুরিয়ে এমার উপরে নজরও রাখছে। এমা বসেছেন মাঠের মাঝখানে। অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ফিলাডেলফিয়া থেকে এমার বয়ফ্রেন্ড এসেছেন। এমার সাজ আজ সবাইকে ছাড়িয়েছে। এমনিতেই তাঁর শরীর জুড়ে ট্যাটুর ফোয়ারা, তার সঙ্গে আজ যুক্ত হয়েছে মেটাল অক্সাইডের বড়ো বড়ো কানের দুল, গলার হার, হাতের বালা ইত্যাদি।
(৪)
মঞ্চে এখন গান গাইছেন জেসন মুন ও তাঁর দল। জেসনের গান বাজনা-নির্ভর নয়, তাঁর গানে আছে কথা ও সুর নিয়ে হাজার পরীক্ষা-নিরীক্ষা। পাশ্চাত্য সঙ্গীতে জ্ঞান না থাকলে সে-সবের স্বাদ পাওয়া মুস্কিল। এককালে মার্কিন মিলিটারিতে উচ্চপদে চাকরি-করা, এবং, গানের টানে সেই চাকরি ছেড়ে-দেওয়া এই জেসন গানের মাধ্যমে সমাজের মূলস্রোতের মিথ্যাচারের বিরুদ্ধেই বক্তব্য রাখেন। তিনি আমার পরিচিত বলে, না বুঝলেও তাঁর গান মন দিয়ে শুনলাম।
দেখতে দেখতে সওয়া আটটা বাজল। আমার গলা শুকিয়ে এসেছে, মঞ্চে ওঠার সময় হল বলে। আমার মঞ্চে ওঠবার কথা ভিক্টরের দল ছাড়া আর কেউ জানেন না। এবার গ্রিনরুমে হাজির হয়ে যে গান দুটো গাইব সেগুলোর অনুবাদ ভিক্টরের হাতে দিয়ে বললাম, আমার গানের ভাষা কেউ বুঝবে না, তাই আমি গান ধরার আগে আপনি যদি গানের মানেটা অডিয়েন্সকে ইংরিজিতে বলে দেন তাহলে খুব ভাল হয়। ভিক্টর গানের কথাগুলো মন দিয়ে পড়ে নিয়ে, কাগজটা ভাঁজ করে পকেটে রাখলেন।
এখন আমাকে অডিয়েন্সে ফিরে যেতে দেখে ভিক্টর বাধা দিয়ে বললেন, যাচ্ছেন কোথায় – এক সঙ্গেই মঞ্চে উঠতে হবে। আমি ইতস্তত করলে তিনি বোঝালেন, এখানে আলাদা করে কোনো শিল্পীকে একক অনুষ্ঠান করবার জন্য ডাকা যায় না। আপনাকে আমাদের সঙ্গেই মঞ্চে উঠতে হবে, আপনি আমাদের দলের লোক। অতএব তাঁর কথামতো যথাসময়ে তাঁর দলের সঙ্গে আমিও মঞ্চে উঠলাম। যে যার জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়বার পর ভিক্টর হাতে স্পিকার নিয়ে গুড ইভনিং বলতেই তুমুল হাততালি শুরু হল। হাততালি থামলে ভিক্টর ঝাড়া গলায় গান ধরলেন।
ভিক্টরের প্রথম দফার গান শেষ হলে, তিনি শ্রোতাদের কাছে আমার পরিচয় দিয়ে স্পিকারে আমার নাম ঘোষণা করলেন পরবর্তী শিল্পী হিসেবে। আলোকিত মঞ্চ থেকে অন্ধকার অডিয়েন্সে কে কোথায় কি করছেন বোঝা যায় না, তবু মনে হল ব্রায়ান যেখানে শুয়ে আছে সেখান থেকে উৎসাহভরা দু’চারটে সিটির আওয়াজ এল। আরও দু’একটা উৎসাহব্যঞ্জক সিটির আওয়াজ এদিক সেদিক থেকেও এল। আমার গান প্রথম লাইনটা পেরোলেই মঞ্চে নাচানাচি, দাপাদাপি শুরু হল। ওমরের হাতে একতারার মতো যে জিনিসটা ছিল সেটাকেই বাউলের মতো বাজিয়ে সে মঞ্চ জুড়ে লাফাতে লাগল। ভিক্টরের কাছে ছিল গুপিযন্ত্রের মতো একটা জিনিস – সেইটা তিনি বাউলের মতো বাজালেন। গান শেষ হতেই ভিক্টর যখন দ্বিতীয় গানটার মুখবন্ধ করতে যাবেন, অমনি সেই আপেল গাছের নিচের থেকে আবার দু’তিনটে গলার ‘ওয়ান মোর, ওয়ান মোর’ আওয়াজ আসতে লাগল।
আমার গানের পরে দলের বাকি গানগুলো হয়ে গেলে আমরা মঞ্চ থেকে নেমে এলাম। স্টেজ থেকে নামতেই বেটিনা ও ইসাবেলা আমাকে অভিনন্দন জানিয়ে আলিঙ্গন করলেন। আমার গান উতরে গেছে দেখে আমার আহ্লাদের সীমা রইল না। ঘড়িতে তখন সাড়ে নটা। অনুষ্ঠান চলবে আরও আধঘন্টা। ভিক্টরের দলবল রাতেই মিলওয়াকি ফিরবেন বলে তাঁরা সদলবলে গাড়িতে চড়ে বসলেন। ডাইনিংরুমে দশটার পর বিল আমার জন্য অপেক্ষা করবেন, আমি তাই ভিক্টরের গাড়িতে উঠে পড়লাম। তিনি আমাকে মেন বিল্ডিংয়ের পাশে নামিয়ে দিয়ে গেলেন।
এতক্ষণের স্নাবয়িক উত্তেজনায় ক্লান্ত হয়ে ভাবলাম হাতে যেটুকু সময় আছে তাতে এক কাপ চা পান করে বিলের সঙ্গে বেরিয়ে পড়তে পারব। মেন বিল্ডিংয়ের কাছে পৌঁছে দেখি, লনের উপর একটা ক্যাম্পার ভ্যানের পাশে ডেভিস পায়চারি করছেন একা। আমাকে দেখেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে তিনি বললেন, এই-যে, এখানে আপনি! আপনার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। বলেই, ফস করে একটা সিগারেট ধরালেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এক কাপ চা চলবে? তিনি বললেন, ও ইয়েস!
দু’কাপ চা নিয়ে দু’জনে ডাইনিংরুমে বসলাম। ডেভিসকে জিজ্ঞেস করলাম তিনি রাতে সানফ্লাওয়ার ভ্যালিতেই থাকবেন কিনা। তিনি বললেন, ওরে বাপরে, আমাকে ফিরতেই হবে, নাহলে চোরে বাড়ির তালা ভাঙবে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনি গাড়ি এনেছেন? তিনি বললেন, ওই তো, লনে রেখেছি।
চায়ে চুমুক দিয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করি তাঁর কী জরুরি কথা আমাকে বলবার ছিল। তিনি উদ্বিগ্ন মুখে আমাকে বললেন, ওই ভিক্টর আর জেসনের সঙ্গে সাবধানে মেলামেশা কোরো, ওরা চোর। ওরা মোটেও পরিবেশ সচেতন নয়, ওরা গাছ কাটে, ওরা … আমার বাধায় ডেভিস থেমে গেলেন। আমি বললাম, ওঁদের সঙ্গে আমার দেখাই হয় দু’চার বছর বাদে বাদে। এখানে এলে তবেই, তাও দু’একদিনের জন্যই। একটু থেমে বললাম, আমাকে তো এখন বেরোতে হবে। ওই যে বিল গ্রিনডিয়ার আছেন-না, ওঁর সঙ্গে এখুনি আমায় বেরোতে হবে। দাঁড়ান, আমার ব্যাগটা নিয়ে আসি।
ডাইনিং রুমের পাশের মিউজিয়াম কাম লাইব্রেরিতে আমার ব্যাগটা রাখা ছিল। সেখান থেকে সেটা নিয়ে এসে ডেভিসকে বললাম, চলুন। বিল এই ডাইনিং রুমের দিকে এলেই তাঁকে আমি ধরে নোব এই ভেবে ডাইনিংরুমের বাইরে এলাম। বাইরে এসে ডেভিসকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনার গাড়ি কোনটা? তিনি লনে পার্কিং করা ক্যাম্পার ভ্যানটা দেখালেন। আমি অবাক হয়ে বললাম, একা বেরুলেও আপনি এই ক্যাম্পার ভ্যান নিয়ে বেরোন নাকি? তিনি বললেন, আমার আর গাড়ি নেই। আমি বললাম, এই গাড়ির যা দাম তাতে তো পাঁচটা গাড়ি হয়ে যেত! তিনি শুকনো হেসে বললেন, এই ভ্যানটারই প্রয়োজন আমার। আমি বললাম, কি রকম? তিনি বললেন, আমি কখনও বাড়ির বাইরে রাত কাটাই না। আমার অনেক বড়ো বাড়ি আছে একটা, সেখানে অনেক তালাচাবি। সারাদিন কাজকর্ম করে বাড়ি ফিরে অত চাবিতালা খুলতে পারি না। তখন বাড়িরই লনে এই ক্যাম্পার ভ্যানে রাত কাটাই! আর অত বড়ো বাড়ি পরিষ্কার রাখাও দায়, এটা মোটামুটি কারুর সাহায্য না নিয়ে নিজেই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা যায়।
খানিক পরে এ্যাম্পি থিয়েটারের অনুষ্ঠান শেষ হয়ে যেতে সানফ্লাওয়ার ভ্যালি থেকে গাড়িগুলো একে একে বেরিয়ে যেতে শুরু করল। বিলের গাড়ি মেন বিল্ডিংয়ের দিকে বাঁক নিচ্ছে দেখে হাত তুলে দাঁড় করালাম। ডেভিসকে বিদায় জানিয়ে বিলের গাড়ির দিকে এগোলাম। বিল গাড়ি থেকে নেমে সামনের সিটের দরজা খুলে দাঁড়ালেন। গাড়িতে উঠতে যাব যেই, পিছন থেকে ডেভিস জোরে হাঁক দিয়ে বললেন, এক মিনিট দাঁড়ান। আমি থমকে দাঁড়ালাম। ডেভিস ছুটে এসে আমার হাতে একটা কাগজের প্যাকেট ধরালেন। প্যাকেটের মুখ ফাঁক করে দেখলাম সেই চারটে পেন্সিল, একটা পেন্সিল কাটার, উইসকনসিন স্টেটের একটা ম্যাপ, এবং, একটা বড়ো চকোলেট। তাঁকে জড়িয়ে ধরে বললাম, আবার দেখা হবে। তিনি বিলকে দেখিয়ে আবেগ নিয়ে আমাকে বললেন, এঁর সঙ্গ সুসঙ্গ, ইনি চোর নন, নিজের খাদ্য নিজে উৎপাদন করেন। তাঁর কথায় বিল হোহো করে হেসে উঠলেন।
(৫)
গেট থেকে বেরিয়ে মনরো কাউন্টির কান্ট্রি লাইব্রেরির রাস্তা ছেড়ে বাঁ দিকের ছোটো রাস্তায় আমাদের গাড়ি উঠল। এই রাস্তা ওয়াইল্ডক্যাট মাউন্টেন স্টেট পার্কের পাশ দিয়ে যায়। রাস্তা কোথাও সোজা নয়, আঁকাবাঁকা। এই বাঁ দিকে বেঁকছে, তো পরক্ষণেই ডান দিকে। চারদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার। গাড়ির হেডলাইটের আলোটুকু মাত্র সম্বল। অন্ধকারে হেডলাইটের আলো মুহূর্মুহূ দিক পরিবর্তন করে প্রেইরির ক্ষেতে আছড়ে আছড়ে পড়ছে। ঝোপঝাড়ের উপর চকিত আলো পড়ে, জঙ্গলটা যেন উল্টো দিক থেকে লাফিয়ে আমাদের ঘাড়ে এসে চড়তে চাইছে। শিরশিরে অনুভূতি হচ্ছিল তাতে। মিনিট দশেক এইরকম গিয়ে এক জায়গায় বাঁ দিকে একটা রাস্তা বেরিয়ে গেল। সেই রাস্তার মুখে গাড়ি থামিয়ে বিল বললেন, কিকাপু ভ্যালি রিজার্ভ স্টেট ন্যাচারাল এরিয়ায় ঢুকছি। আবার গা ছমছমে অনুভূতি হল আমার।
বাঁ দিকের রাস্তায় না গিয়ে গাড়ি এগুলো সোজা। আরও মিনিট দশেক পরে এক এ্যামিশ অঞ্চল পেরিয়ে আবার অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে গিয়ে একটা ফার্ম হাউসে পৌঁছালাম। পাহাড়ের উপর থেকে উপত্যকার ঢাল বেয়ে অল্প নেমে বিলের ফার্ম হাউস। বাড়িটা বড়োসড়ো, তবে আসবাবপত্রের বাহুল্যবর্জিত। এখানকার পক্ষে সময়টা গভীর রাত হওয়ায় জেনেট জিজ্ঞেস করলেন, এখন আপনি কিছু ড্রিঙ্ক করবেন, নাকি সোজা ঘুমুতে যাবেন। আমি শিশুর কণ্ঠ নকল করে মজা করে বললাম, ঘুমুতে। তাঁরা হাসলেন। বিল বললেন, খুব ভাল। তুমি আমেরিকানদের ফলো করো না। ভাল। – চলো তোমাকে তাহলে তোমার বাড়িতেই ড্রপ করে দিই।
পাহাড়ি রাস্তায় ঢাল বেয়ে, আরও অল্প একটু নেমে, একটা সাদা বাড়ির সামনে গাড়ি দাঁড়াল। জেনেট দৌড়ে গিয়ে বাড়ির বারান্দা পেরিয়ে উপত্যকামুখী ঘরের দরজা খুলে তার সামনে দাঁড়ালেন। অনেকগুলো ঘর নিয়ে সেই বাড়ি। ভিতরের দিকের একটা ঘরে আমাকে নিয়ে গিয়ে বললেন, এই ঘরে আপনি ঘুমাতে পারেন। জানালা দিয়ে হাল্কা চাঁদের আলোয় উপত্যকাটা চোখে পড়ছে। ঘরের এক কোণে টেবিল চেয়ার। টেবিলের উপর একটা বড়ো জামবাটিতে কিছু আপেল, কালো আঙুর, কমলালেবু ও কলা রয়েছে। বাটিটা দেখিয়ে জেনেট বললেন, খিদে পেলে ওইগুলো খেতে পারেন। অন্যপাশে ফ্রিজটা দেখিয়ে বললেন, ওর মধ্যে ওয়াইন আছে। পান করতে পারেন। বাড়িতে ফায়ার প্লেসও দেখলাম। সেটার দিকে আঙুল তুলে জেনেটকে জিজ্ঞেস করলাম, এটা চালু রাখতে তো প্রচুর কাঠ লাগে, না? তিনি বললেন, কাঠের তো অভাব নেই!
তাঁরা চলে গেলে, আলো নিভিয়ে জানালায় দাঁড়িয়ে জায়গাটাকে চাঁদের আলোয় দেখলাম। আভাসে মনে হল চারদিকে পাহাড়, মাঝখানে গোল উপত্যকা কড়াইয়ের ঢালের মতো নেমে গেছে। রাত্তিরটুকু ঘুমিয়ে নিয়ে পরের দিন অন্ধকার থাকতেই বেরিয়ে পড়লাম। কিছু দূর এগোবার পরেই ভোরের আলো ফুটল। পাকদণ্ডী বেয়ে নামতে নামতে উপত্যকার প্রায় নিম্নতম এলাকায় চলে গেলাম। একেবেরে নিচে অবধি যেতে পারলাম না। সেখানে উঁচু নিচু পাথর। উল্টোপথে আমার বাড়ির কাছে ফিরতে পাহাড়ের মাথায় রোদের আলো পড়ল। সেই আলোয় দেখলাম আমার বাড়ির দেওয়ালে বাইসন, হরিণ ও অন্যান্য প্রাণীদের মুখের ছবি আঁকা। ছবিগুলো বাস্তবানুগ নয়। কল্পনার মিশেলে রীতিমতো শিল্পবস্তু হয়ে উঠেছে সেগুলো।
এখান থেকে তিনশো মিটার মতো দূরে আরও একটা বাড়ির দেওয়ালের গায়ে এইরকম আঁকা দেখেছি। যে বাড়িতে আমি রয়েছি আর সেই বাড়িটা হুবহু একরকম। দুটো বাড়িতেই কেউ বাস করেন না। উপত্যকার আর একটু উপরে বিলের বাড়ি। এগুলো ছাড়া এই উপত্যকায় আর কোনো বাড়ি নেই। নিচের দিকে সিনেমা হলের মতো টালির ছাউনি একটা বিল্ডিং। বিলের বাড়ির সামনে গিয়ে দেখলাম উঠান সংলগ্ন কাঠের গোলায় বিল নিজে কাঠ চেরাই করছেন। জেনেটও রয়েছেন তাঁর সঙ্গে। বাড়ির সামনে আমাকে দেখে বিল চিৎকার করে সুপ্রভাত জানিয়ে সঙ্গে সঙ্গে মেশিন বন্ধ করে দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন।
বিস্মিত হয়ে আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, এত সকালেই কাজে লাগেন? তিনি হোহো করে হাসলেন। প্রায় সব কথাতেই তাঁর উচ্চহাসির উদ্রেক ঘটে। হাসি সামলে বললেন, আমাদের সব সময় কাজ এবং সব সময় বিশ্রাম। জেনেটকে জিজ্ঞেস করুন তিনি এখানে কী করছেন। জেনেটের মুখ লাল হল। বিলের কথা চাপা দিয়ে তিনি বললেন, চা চলবে? বলেই বাড়ির ভিতরে চলে গেলেন। তাঁর পিছু পিছু আমরাও গেলাম। সোফায় বসে আমি বিলকে জিজ্ঞেস করলাম, এই এত বড়ো উপত্যকায় কি আপনিই পরিবার নিয়ে থাকেন! বিল কিছুটা উপহাসের সুরে বললেন, পরিবার আর কোথায়? আছি শুধু আমি আর জেনেট। আর হ্যাঁ, ডেয়ারিতে থাকেন স্টুয়ার্ট, ব্যস।
আমি ভাবলাম পরিবারের প্রসঙ্গ তোলাটা ঠিক হয় নি আমার। সন্তান না থাকায় অনেকে দুঃখে থাকেন। প্রসঙ্গ পালটে জেরি মান্দেরের কথা আনলাম। সেটা কাজে দিল। তিনি বললেন ছেলেবেলায় তাঁর দুই ছেলেই জেরির ভক্ত ছিল, কিন্তু যেই তারা গার্লফ্রেন্ডদের সঙ্গে থাকতে লাগল, তখনই পালাল কানাডায়। এখন বুঝলাম যে এখানে বিলের বাড়ি ছাড়া অন্য দুটো বাড়ি তাঁর দুই ছেলের। কাল রাতে আমি যে বাড়িটায় ছিলাম সেটা বড়ো ছেলের, আর আরেকটু নিচের বাড়িটা ছোটো ছেলের। দুই ছেলে সন্তানের পিতা অবধি হয়ে গেছে। জেনেটের বয়স কত তাহলে? দেখে তো চল্লিশের বেশি লাগে না!
জেনেট চা নিয়ে এলে তাঁকে বললাম, আপনাকে দেখে তো মনে হয় আপনি এখনও বিয়ে করতে পারেন, সেখানে আপনার দুটো নাতি? জেনেট হেসে উঠলেন। হাসির তোড়ে যা বললেন তাতে জানলাম যে, এই দুই ছেলে তাঁর নয়, বিলের। বিলের দুই বান্ধবীর গর্ভে এই দুই ছেলের জন্ম। বিলের বয়স এখন পঁয়ষট্টি, তাঁর চল্লিশ। আজ থেকে চার বছর আগে ফার্মের কাজে জেনেট এখানে যোগ দেন। পরে বিলের সঙ্গে প্রেম। স্টুয়ার্টকে পাওয়ার পর তাঁর হাতে ফার্মের দায়িত্ব দিয়ে জেনেট বিলের সঙ্গে একত্র বসবাস করতে এই বাড়িতে চলে আসেন। তাঁদের এখন একটিই স্বপ্ন, সেটি হল একটি সন্তানলাভ করা। তবেই তাঁরা এই ফার্ম টিকিয়ে রাখার উৎসাহ পাবেন, নাহলে নয়।
শুনলাম যে আমার খাতিরে আজ ডেয়ারির স্টুয়ার্ট ও তাঁর দলবল লাঞ্চের নেমতন্নে আসবেন। স্টুয়ার্ট সঙ্গে নাচের দল আনবেন আমেরিকান ইন্ডিয়ানদের নাচের নমুনা দেখাতে। যথাসময়ে তাঁরা এলেন মাথায় মুরগির ঝুঁটির মতো পালক গুঁজে, কানের দু’পাশে শিং লাগিয়ে। বাজনার যন্ত্রগুলো আমাদের সাঁওতালদের মাদলের মতো, কিন্তু, তাঁদের নাচ অতি ক্ষিপ্র। লাঞ্চের সময় বিলকে জিজ্ঞেস করলাম, কাল সানফ্লাওয়ার ভ্যালির অনুষ্ঠানে অত বিরক্তমুখে ছিলেন কেন। বিল ভুরু কুঁচকে তাচ্ছিল্যভরে বললেন, বিরক্ত হব না? তুমি যদি জানতে এই বনজঙ্গলের, পাহাড়ের আর জমির মালিক ছিল তোমারই নিকট পূর্বপুরুষ, আর তাঁদের পাইকিরি হারে খুন করে যে আমেরিকাগিরি চলে তার উপর তোমার ধিক্কারই জন্মাত – বিশেষত আনন্দ ও ফূর্তির দিনে। বেশিদিন আগে নয়, এই চার পাঁচ পুরুষ আগেই গোটা অন্টারিও কাউন্টিটাই আমার পূর্বপুরুষের অধিকারে ছিল।
লাঞ্চের পরে স্টুয়ার্ট সহ নাচের দল এবং জেনেট, বিল আর আমি টানা আড্ডা দিলাম। সন্ধ্যার অল্প আগে বিল আমাকে সানফ্লাওয়ার ভ্যালির পাইন কটেজে নামিয়ে দিয়ে গেলেন।(সমাপ্ত)
গানের বাণী ও সুরের সমন্বয় রবীন্দ্রনাথের গানকে বিশেষ বৈশিষ্ট্য দিয়েছে। এইজন্য তাঁর প্রায় সব গানই শ্রোতাদের বিশেষ মনোযোগ দাবি করে। আজকে আপাতত তাঁর দুটি গান নিয়ে আমার অভিজ্ঞতার কথা বলব। প্রথম গানটা হল,
তোমার আসন শূন্য আজি, হে বীর পূর্ণ করো, ঐ যে দেখি বসুন্ধরা কাঁপল থরোথরো। বাজল তূর্য আকাশপথে– সূর্য আসেন অগ্নিরথে আকাশপথে, এই প্রভাতে দখিন হাতে বিজয়খড়্গ ধরো। ধর্ম তোমার সহায়, তোমার সহায় বিশ্ববাণী। অমর বীর্য সহায় তোমার, সহায় বজ্রপাণি। দুর্গম পথ সগৌরবে তোমার চরণচিহ্ন লবে সগৌরবে– চিত্তে অভয় বর্ম, তোমার বক্ষে তাহাই পরো॥
এই গানটা শুনে প্রথমে আমার মনে প্রশ্ন জেগেছিল যে, বীরকে তেজোদীপ্ত স্বরে আবাহন না করে কেন এমন নরম সুরে সম্বোধন করা হচ্ছে! মনে মনে তার কারণ খুঁজতে খুঁজতে এক অদ্ভুত সত্যের আভাস পেয়েছিলাম।
১৯২৯ সালের ১৩ই সেপ্টেম্বর স্বাধীনতাসংগ্রামী বিপ্লবী যতীন্দ্রনাথ দাস দীর্ঘ ৬৩ দিন অনশনের পর দাস মৃত্যুবরণ করেন। যে সময় তাঁর অনশন চলছিল শান্তিনিকেতনে সেইসময় কবির তত্ত্বাবধানে তপতী নাটকের মহড়া চলছিল। এই মৃত্যুসংবাদ পাওয়া মাত্রই কবি মহড়া বন্ধ করে উঠে গেলেন এবং আহত, অস্থির ও পীড়িত মন নিয়ে সেই রাত্রেই লিখে ফেলেছিলেন যে গান সেটা হল –
সর্ব খর্বতারে দহে তব ক্রোধদাহ— হে ভৈরব, শক্তি দাও, ভক্ত-পানে চাহো। দূর করো মহারুদ্র যাহা মুগ্ধ, যাহা ক্ষুদ্র— মৃত্যুরে করিবে তুচ্ছ প্রাণের উৎসাহ।। দুঃখের মন্থনবেগে উঠিবে অমৃত, শঙ্কা হতে রক্ষা পাবে যারা মৃত্যুভীত। তব দীপ্ত রৌদ্র তেজে নির্ঝরিয়া গলিবে যে প্রস্তরশৃঙ্খলোন্মুক্ত ত্যাগের প্রবাহ।।
কিন্তু এই গানের মেজাজে বীরের যে ছবি ফুটে উঠল তা সম্ভবত ঠিক তাঁর মনের মতোটি হল না। সাময়িক আঘাতের প্রতিক্রিয়ার তীব্রতায় গানের শুরুতেই ‘সর্ব খর্বতারে’ উচ্চারণটা ঘটে গেল তারসপ্তকের ‘গা’-এর অবলম্বনে। ক্রমশ বক্তব্য ‘যখন দূর করো মহারুদ্র যাহা মুগ্ধ যাহা তুচ্ছ’ – এইখানে পৌঁছাল, তখন স্বর তারসপ্তকের ‘পা’ অবধি চলে গেল। অনুমান করা যায় যে কবি তখন ভীষণ উত্তেজিত ছিলেন, হয়ত বলের বিরুদ্ধে বলকে দাঁড় করাতেই তাঁর মন চাইছিল। এমনকি ‘প্রস্তরশৃঙ্খলমুক্ত ত্যাগের প্রবাহ’-র মতো খটমট বাক্যকেও সুরের আগুনে গলিয়ে নেবার স্পর্ধা অনুভব করলেন! সব মিলিয়ে গানের মধ্যে একটা লম্ফঝম্প ভাব প্রকাশ পেয়েই গেল।
যেহেতু কাঙ্ক্ষিত বীরের এইরকম ছবি এঁকে তাঁর মন ঠিক তেমন ভরেনি, তাই এই গানটি লেখার দু’একদিনের মধ্যেই তিনি ‘প্রলয়নাচন নাচলে যখন আপন ভুলে, হে নটরাজ’ গানটি লিখে নতুন করে সুরে ফুটিয়ে তুলতে চাইলেন তাঁর মনের মতো বীরের ছবি। সেই করতে গিয়ে ‘সর্ব খর্বতারে দহে তব ক্রোধদাহ’ গানটিতে যে চড়া ভাব ছিল তা এখানে অনেকটা শান্ত ও সৌম্য হয়ে উঠল বটে। ভৈরবের ক্রোধদাহের প্রার্থনা আর নেই এখানে। এখানে এমন আশ্বাসে ভরা বাণীও এলঃ ‘রবির আলো ছাড়া পেল আকাশ পারে/ শুনিয়ে দিল অভয়বাণী ঘর ছাড়ারে।/ আপন স্রোতে আপনি মাতে সাথি হল আপন সাথে/ সব-হারা যে সব পেল তার কূলে কূলে।’
‘প্রলয়নাচন নাচলে যখন’ গানটা লিখে অনেকটাই নিজের স্বভাবে ফিরেছিলেন যেন, তবু পুরোপুরি আরামটা তখনও যেন হয়নি। এই গানটি রচনার সম্ভবত পরের দিনই তিনি ‘তোমার আসন শূন্য আজি হে বীর পূর্ণ করো’ গানটি লিখে বসলেন।
কী ছন্দে এই বীরকে কবি সম্বোধন করলেন? ‘তোমার আসন’ এর ‘তোমার’ উচ্চারণটা ‘সা’-এ স্থির থাকল, তারপর আসনটাকে একটু উঁচু স্বরে উচ্চারণ করে সেটাকে তুলে ধরা হল, অর্থাৎ বোঝানো হল যে, উঁচু-র আসন শূন্য রয়েছে। এতে উঁচু আসনটি যে শূন্য রয়েছে তা চোখে পড়ল। কবি প্রার্থনা করলেন যে সেই বীর এসে এই শূন্য আসনটি ‘পূর্ণ’ করুন। এই পূর্ণ শব্দটিতে কোমল স্বর লেগে গেল। অনুমান হয় যে কবি করুণার আবাহন করছেন, ক্ষমতার স্তব করছেন না।
গানটির ‘পূর্ণ করো’, ‘বিজয়খড়্গ ধরো’, এবং, ‘বক্ষে তাহাই পরো’ – এই বাক্যাংশগুলিতে ‘করো’, ‘ধরো’ এবং, ‘পরো’ এই ক’টি ক্রিয়াপদ রয়েছে। ‘করো’-র উচ্চারণ কোমল নি থেকে শুরু হয়ে কোমল গা ছুঁয়ে দীর্ঘ মাত্রায় উচ্চারিত হয়ে উঁচু থেকে নিচে গিয়ে আবার উঁচুতে ফিরে গেল। স্বরের এই প্রবাহকে যদি ছবিতে ন্যস্ত করা যায় তাহলে মনে হবে যেন স্বরপুঞ্জ ঘিরে ফুলের মতো একটা আদল তৈরি হল। কিংবা যেন শাঁখের মতো কিছু একটা বেজে উঠল। কিংবা করুণায় নত, কিন্তু গৌরবে উন্নত, বুদ্ধের মতো কোনো মুখচ্ছবি ফুটে উঠল।
সেই বীর শূন্য আসন পূর্ণ করলে কবি তাঁকে বলবেন ‘বিজয়খড়্গ ধরো।’ কবি জানেন যে ধর্ম এই বীরের সহায়। তাঁর সহায় বিশ্বের ‘বাণী’। ‘দুর্গম পথ’-এ তাঁর চরণচিহ্ন পড়বে ‘সগৌরবে’। সেই বীরকে সম্বোধন করে তিনি বলবেন, ‘চিত্তে অভয় বর্ম, তোমার বক্ষে তাহাই পরো।’ তিনি জানেন যে সেই বীরের চিত্তে অভয় বর্মই থাকে, সেটাই তাঁর বক্ষে ধারণ করা যথেষ্ট হবে। এই ‘ধরো’ আর ‘পরো’ – এই দুটি ক্রিয়াপদকেই অনুনয়ের সুরে স্বরের শেষ অংশকে উঁচু পর্দায় সরলভাবে উচ্চারণ করলেন ওঠা-পড়া-বিহীন স্বরে।
অর্থাৎ এই গানে উচ্চারিত তিনটি ক্রিয়াপদের উচ্চারণেই শান্ত ও মধুর ভাবকে রক্ষা করলেন তিনি।
সঙ্কট কালে যখন সব কিছু ওলটপালট হয়, জগৎ তোলপাড় হয়, তখন বীরের নেতৃত্ব না হলে চলে না। সেই সময় যদি দেখা যায় বীরের আসন শূন্য, তখন নৈরাজ্যের সমূহ সম্ভাবনা। আকাশপথে তখন যদি তূর্যও বাজে, সূর্যও যদি তখন ‘অগ্নিরথে আকাশপথে’ আসেন, তবু বীরের আসন শূন্য থাকলে কেবল মারামারি হানাহানিই হয়, যুদ্ধজয়ের গৌরব অর্জন হয় না।
‘সর্ব খর্বতারে দহে তব ক্রোধদাহ’ গানটিতে হাঁকডাক করে প্রচলিত বীরত্বের যে বন্দনা তিনি করেছেন তাকে চিরকালীন বীরত্বব্যঞ্জক কোনো ভাবে প্রকাশ করবার যে তাগিদ তাঁর মনে জেগেছিল সেটা ‘প্রলয়নাচন নাচলে যখন আপন ভুলে হে নটরাজ’ গানটি লিখেও পুরোপুরি মেটেনি। কিন্তু ‘তোমার আসন শূন্য আজি হে বীর পূর্ণ করো’ গানটির মাধ্যমে চিরকালীন বীরত্বের জয়গান গেয়ে নিজের স্বভাবধর্ম রক্ষা করে তিনি যেন শান্তি পেলেন। তাঁর কাছে আলেকজান্ডার বা জুলিয়াস সিজার প্রকৃত অর্থে বীর নন, তার কাছে বীর হলেন নিরস্ত্র বুদ্ধই। মনে হয় ‘তোমার আসন শূন্য আজি হে বীর পূর্ণ করো’ গানটার মধ্যে দিয়ে তিনি যেন বুদ্ধকেই বরণ করতে চাইলেন।
পরের গানটা হল —
কোন্ সে ঝড়ের ভুল ঝরিয়ে দিল ফুল, প্রথম যেমনি তরুণ মাধুরী মেলেছিল এ মুকুল, হায় রে॥ নব প্রভাতের তারা সন্ধ্যাবেলায় হয়েছে পথহারা। অমরাবতীর সুরযুবতীর এ ছিল কানের দুল, হায় রে॥ এ যে মুকুটশোভার ধন। হায় গো দরদী কেহ থাক যদি শিরে দাও পরশন। এ কি স্রোতে যাবে ভেসে– দূর দয়াহীন দেশে\ কোন্খানে পাবে কূল, হায় রে॥
এই গানটা ছেলেবেলাতেই শুনেছিলাম কিন্তু মনে তখন কোনো দাগ কাটেনি। শুধু অন্যান্য গানের তুলনায় এটি শুনতে কেবল কেমন যেন লেগেছিল। সেই কেমন যেন লাগাটা অস্পষ্টভাবে মনের অতলে কোথায় যেন সঞ্চিত হয়েই ছিল। ঘটনার কোনো পূর্বাপর নেই, একদিন হঠাতই এক অস্থানে গানটি যেন আমায় অধিকার করে বসল। সেই ঘটনাটি এবার বলি।
কিছুকাল আগে একসময় আমি আমেরিকার এক শহর থেকে আরেক শহর, এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রাম চষে বেড়াচ্ছি। ফিলাডেলফিয়ায় এ্যামট্র্যাক ট্রেনে চড়ে ল্যাঙ্কেস্টার স্টেশনে পৌঁছেছি। ট্রেন ল্যাঙ্কেস্টার পৌঁছানোর আগে রেললাইনের দুই ধারে মাইলের পর মেইল জমিতে পুরনো পদ্ধতিতে চাষবাস হচ্ছে চোখে পড়ল। লাঙলে জোতা চাষের ঘোড়া মাঠের উপরে ছুটছে, তাঁর পিছু পিছু তাগড়াই যুবক আমিশ চাষী হাল ধরে ছুটে ছুটে মাটি এফোঁড়ওফোঁড় করে চলেছে। এমন দৃশ্য জীবনে কখনও দেখিনি।
ট্রেন এসে পৌঁছাল ল্যাকেস্টার স্টেশনে। স্টেশন প্লাটফর্মটা বড়সড়, কিন্তু প্লাটফর্মে কিন্তু আমি ছাড়া আর অন্য কোনো জনপ্রাণী নেই। একটা বেঞ্চে একা বসে পড়লাম। কিছুক্ষণ পরে এক আমেরিকান পরিবার এসে বসল পাশের এক বেঞ্চে। রয়েছে স্বামী স্ত্রী ও তিনটি সন্তান। দুটি মেয়ে, একটি ছেলে। তারা বয়ঃসন্ধির বয়সে পৌছায়নি এখনও। পরিবারটির সঙ্গে লটবহর রয়েছে প্রচুর। অনেকগুলো স্যুটকেস, হোল্ডারে ভরা বিছানাপত্তর, এবং অজস্র টুকিটাকি জিনিস। লটবহরের ধরন দেখে বুঝলাম যে এঁরা চাষি পরিবার। এটা বুঝলাম এই কারণেও যে আমি আগেই জানতাম যে পেনসিলভেনিয়ার এই ল্যাঙ্কেস্টার অঞ্চলটি আমিশ সম্প্রদায় বসবাস করে।
দম্পতি ও শিশুগুলির মুখচোখ আর হাবভাব দেখে মনে হল তারা প্রমোদ ভ্রমণে কিংবা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে ক’দিনের জন্য বেড়াতে যাচ্ছে না। তারা সাদা চামড়ার আমেরিকান হলেও তাদের চেহারা ও সঙ্গের লটবহর দেখে মনে হল তারা গরিব মানুষই। একজন গড়পড়তা আমিশ মানুষ সচরাচর গরিবই হন। কারণ তাদের ধর্মাশ্রিত সামাজিক প্রথা অনুসারে তারা আমেরিকায় বাস করেও আজও ক্লাস নাইনের বেশি পড়াশোনা করে না, সরকারি বেসরকারি চাকরিবাকরিও করে না। তাদের দিন চলে চাষবাস ও পশুপালন এবং আনুসঙ্গিক কাজকর্ম করে। এমন ধরনের জীবিকায় থেকে খুব কম মানুষই ধনবান হতে পারে।
এরা নতুন ঠিকান সন্ধান করে অজানার উদ্দেশে পাড়ি দিচ্ছে এমন অনুমান করে কর্তাটির সঙ্গে আলাপ জমালাম। আলাপ হতে জানলাম যে আমার অনুমানই ঠিক। এখন তারা যাবে এই পেনসিলভানিয়া প্রদেশেরই পিটসবার্গের শহরতলির এক আমিশ গ্রামে যেখানে তারা নতুন বসতি স্থাপনের চেষ্টা করবে। এদের দেখে এবং এদের গন্তব্যের ধরন অনুমান করে এবং এই মুহূর্তে এদের আশা ও বেদনার স্পর্শ পাওয়ামাত্রই ওই ‘কোন সে ঝড়ের ভুল ঝড়িয়ে দিল ফুল’ গানটি আমার মনের সবটা জুড়ে অনুরণিত হতে লেগে গেল।
প্লাটফর্মে পিটসবার্গগামী টেনটা ঢুকল। আমরা একই কামরায় উঠে পড়লাম। ছানাপোনা সমেত পরিবারটি বসল সামনের দিকের সারিতে, পিছনে জানালার ধার বেছে আমি বসলাম নতুন পথের নতুন নতুন দৃশ্য দেখতে দেখতে এগোব বলে। বাইরের দৃশ্য দেখে চলেছি কিন্তু সমস্ত মন জুড়ে ওই ‘কোন সে ঝড়ের ভুল’ গানটা বেজেই চলেছে। জানালার ধারে বসে গানটা নিচু গলায় গাইছিলামও।
গানটির কথা একটু বলি। এটি কবির শেষ বয়সের রচনা, তাঁর বয়স তখন সাতাত্তর। গানটি কীর্তনাঙ্গের। অবশ্য কীর্তনাঙ্গের গান তিনি সারা জীবনই বেঁধেছেন। কীর্তনাঙ্গের সুর তাঁর বিশেষ প্রিয়ই ছিল। তবে গানের শব্দের মান রেখে সেগুলির উপর তিনি যে সুরের ছোঁয়া দিতেন তাতে তাঁর রচিত এই ধরনের গানগুলিতেও অনেক ক্ষেত্রে রবীন্দ্রায়ন ঘটে যেত। যেমন ঘটে গেছে এই গানেও।
গানটি শুরু হবার একটু পরেই গানের চরণ যখন ‘প্রথম যেমন তরুণ মাধুরী মেলেছিল এ মুকুল হায় রে’ অংশে এসে পৌঁছাল তখনই বেজে উঠল খোলের বোল। সেই বোল এত স্পষ্ট তা যেন কানে বেজে উঠল।
গানটি নিচু গলায় গাইতে গাইতে আমি ক্রমশ মজে উঠতেও থাকলাম। গাইতে গাইতে যখন ‘নব প্রভাতের তারা সন্ধ্যাবেলায় হয়েছে পথহারা’-য় পৌঁছেছি তখন সুরের ঠাট একেবারে রাবীন্দ্রিক। এখন যেন কীর্তনকে খুঁজে পাচ্ছি না! ‘নবপ্রভাতে’ যে তারা আকাশে শোভা পেত সেই তারা ‘সন্ধ্যাবেলায় হয়েছে পথহারা’ – এই সংবাদটা খুব আবেগের সঙ্গে উঁচু পর্দায় দেওয়া হল। বোঝাই যায় যে এই তারার পথ হারানোর ব্যথাটা বেশ গুরুতর। কিন্তু প্রকৃতি যেমন যুগপৎ নির্মম ও মধুরকে অবলীলায় পাশাপাশি স্থান দিয়ে দিতে পারে তেমনি এই বেদনাদায়ক সংবাদটুকু দেবার অব্যবহিত পরেই অপূর্ব মুন্সিয়ানার সঙ্গে আরোপিত সুরের কৌশলে নটীনৃত্যের পেলব অঙ্গভঙ্গী ফুটে উঠল পরের লাইন ‘অমরাবতীর সুরযুবতীর এ ছিল কানের দুল’-এ। এই পেলব অঙ্গভঙ্গির বন্দনায় আবার বেজে উঠল খোলের বোল!
কবিকে অনেক সময় একদিকে যেমন ছবির নেশা পেয়ে বসে, অন্যদিকে নাচের নেশাও তাঁকে পেয়ে বসে। এই গানের গীতিকার কবি তিনটি নৃত্যনাট্যের যখন রূপ দেন তখন তাঁর বয়স পঁচাত্তর পেরিয়ে গিয়েছিল। এই গানটি তিনি তাঁর রচিত নৃত্যনাট্য মায়ার খেলায় ব্যবহার করেছেন।
এতক্ষণ তো গানটি রবীন্দ্রসঙ্গীত ও কীর্তনের মধ্যে দিয়ে একভাবে আপন খেয়ালে চলছিল, এবং কতকগুলি ব্যথার কথা জানিয়ে যাচ্ছিল শুধু। যেমন, ফুল যখন তার তরুণ মাধুরী বিকশিত করতে যাবে সেই সময় সেটি কোনো এক ঝড়ের ভুলে সেটির ঝরে পড়া। তারপর নবপ্রভাতের তারার সন্ধ্যাবেলায় বিরহে দিশাহারা হয়ে যাওয়া। সেই ফুল নাকি অমরাবতীর সুরযুবতীর কানের দুল ছিল।
কিন্তু যখন সঞ্চারীতে এসে পৌঁছান গেল তখন গানের মধ্যেকার মূল আর্তিটা প্রকাশ পেয়ে উঠল। এখানে এসে জানা গেল যে, যে-ফুলটা ঝরে গেছে সেটা বাস্তবত কোনো মুকুটে শোভা পাবার মতন ধন। তাকে এমনভাবে ভূমিতলে পড়ে-থাকা অবস্থায় দেখতে পাওয়াটা খুব বেদনাদায়ক। সেজন্য তিনি নিচু গলায় মিনতির সুরে এখানে আবেদন করলেন, ‘হায় গো দরদী কেহ থাক যদি শিরে দাও পরশন।’
কিন্তু মিনতিটুকু জানিয়েই ক্ষান্ত হাওয়া গেল না। সংশয় ভরা মনে উঁচু পর্দায় আবার হাহাকার ধ্বনি উঠল – ‘এ কি স্রোতে যাবে ভেসে– দূর দয়াহীন দেশে।’ ট্রেনের কামরায় বসে আমিও তখন ছিন্নমূল এই পরিবারটিকে দেখতে পাচ্ছি, আর দেখতে পাচ্ছি ‘দূর দয়াহীন দেশে’ কোথায় ভেসে যাচ্ছে এই মুকুটশোভার ধন! এই ব্যাকুল প্রশ্ন রাবীন্দ্রিক সুরেই উচ্চারিত হল কিন্তু এখনই নির্মম উদাসীন প্রকৃতির খেয়ালে এই ব্যাকুল প্রশ্নের পরেই আবার অকস্মাৎ গানটির স্বাভাবিক চলনকে স্তম্ভিত করে দিয়ে ওই তীব্র প্রশ্নাত্মক অবস্থাতেই ফুটে উঠল নির্দায় খোলের বোল্ -‘কোন্খানে পাবে কূল, হায় রে॥‘
দুটি ভিন্ন ধারার সুরকে এমন সংক্ষিপ্ত পরিসরে পরস্পরের মধ্যে এমন দ্রবীভূত করে দেবার সামর্থ্যটা যেন ঐতিহাসিক!
গানটি যখন লেখা হয় তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আসন্ন এবং আগামী অনেক যুদ্ধের ছায়া আকাশে ঘনিয়ে উঠছিল। এই পর্বে কবি মানুষের জীবনের সবব্যাপী দুঃখ ও অমঙ্গলের বিষয়ে অতীব সচেতন হয়ে উঠেছিলেন,
ট্রেন ত্বরিত গতিতে এগিয়ে চলল অজানা পিটসবার্গের দিকে। গানটি আপনমনে গাইতে গাইতে আমার কেবলই মনে হতে লাগল যে এক লেলিহান ও নিরীশ্বর প্রশ্নকে কী করে ধরা গেল কীর্তনের মধুর বোলে? আমার বিস্ময়ের সীমা রইল না।
Paramesh Goswami, a mechanical engineer from IIT Kharagpur by training, is a renowned writer and scholar. He has penned his concerns for the environment on various platforms. Some of his books are: দ্বা সুপর্ণা (1992), আবার বৃন্দাবন (2011), Rhapsody of Rabindra Sangeet (2018), Glimpses (2020), এমনি করে ঘুরিব দূরে (2022). He is also the co-author of প্রগতি মরীচিকা (2006), জল (2014), and আদালত-মিডিয়া-সমাজ এবং ধনঞ্জয়ের ফাঁসি (2016) and other thought-provoking books. His wanderlust has taken him to all parts of the world but his writings are far removed from conventional travelogues. His experiences in distant lands and with varied people have literally made him a world citizen and he moves effortlessly across contours of not just physical features of the world, but also the human mind and emotions. His realisations and feelings can best be summarised in his own words, “পৃথিবীর তিন ভাগ জল আর এক ভাগ স্থল, এই কথা প্রায় সকলেই জানি, কিন্তু মানুষের মনের মধ্যে যে তিন ভাগ ভালোবাসা আর এক ভাগ ঔদাসিন্য আছে এই সত্যটা অন্তত আমার তেমন করে জানা ছিলো না ” (from the Introduction in his book এমনি করে ঘুরিব দূরে (2022)). Rabindra sangeet is his soulmate – he loves listening to and singing them.