সংস্কৃতসাহিত্যাকাশে কালিদাস ও রবীন্দ্রনাথ, দুই প্রতিভার পুনর্মূল্যায়ন- একটি পর্যবেক্ষণ – ড. অভিষেক দাস 

কালিদাস এমনি এক বিরল প্রতিভা, যিনি দেশ-কালের উর্ধ্বে উঠে জ্ঞানের আলোর পরিপূর্ণতাকে স্পর্শ করেছিলেন। স্বীয় রচনায় বৌদ্ধিক ও আধ‍্যাত্মিক সাফল্যের মণিকাঞ্চনযোগ নির্মাণ করতে পেরেছিলেন, তাই বহু শতাব্দী অতিক্রান্ত হলে ও পাঠকসমাজ সশ্রদ্ধ চিত্তে তাঁকে স্মরণ করে আসছে। কালিদাস রয়েছেন ভারতীয় সংস্কৃতির মূলে। ডাকটিকিট থেকে  সন্মানপ্রদান এমনকি কালিদাস মহোৎসব সাড়ম্বরে পালনের মধ্যে দিয়ে সে কথা স্পষ্ট। তাঁর কাব‍্যের সুরভি অনাগতকাল পর্যন্ত বিস্তৃত থাকবে।

রবীন্দ্রনাথ ছিলেন একজন বিখ্যাত কবি, দার্শনিক, নাট্যকার, অভিনেতা, উপন্যাস-লেখক, প্রবন্ধ, ছোটগল্পের রচয়িতা, সমালোচক, গায়ক, চিত্রশিল্পী, শিল্পী, গানের রচয়িতা, আদর্শ শিক্ষকের পাশাপাশি নৃত্য-নাট্যকার। তিনি বৈদিক সাহিত্য, স্মৃতি, তন্ত্র, দর্শন, মহাকাব্য, ধ্রুপদী সংস্কৃত সাহিত্য, ইতিহাস, পুরাণ, পালি, প্রাকৃত, অবদানশতক ইত্যাদির উপর ভিত্তি করে সৃষ্টির মালা গেঁথেছেন।

তাঁর প্রধান সৃষ্টি বাংলায় হলেও সমস্ত আধুনিক ভারতীয় ভাষায় অনূদিত। শৈশবে তিনি উপনিষদ থেকে মন্ত্র পাঠ করতেন এবং উপনয়নের পরে গায়ত্রী মন্ত্র পাঠের সময় তিনি মুগ্ধ হন। সংস্কৃত সাহিত্যের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা, তাঁর পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিলেন, যিনি তাঁকে গীতা এবং গীতগোবিন্দমের প্রতি তাঁর আগ্রহ বৃদ্ধি করেছিলেন। পণ্ডিত রামসর্বস্ব ভট্টাচার্য তাঁকে অভিজ্ঞানশকুন্তলম্ এর পাঠ দেন।

সাংস্কৃতিক পরিবেশের প্রভাবে তিনি শান্তিনিকেতনে আশ্রম স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন এবং সংস্কৃত সাহিত্যের কিছু গ্রন্থ যেমন রঘুবংশম্, কুমারসম্ভবম্ ইত্যাদি অনুবাদ করেন। তিনি রামায়ণের উপর ভিত্তি করে দুটি গীতিকাব্য বাল্মীকি-প্রতিভা এবং কালমৃগয়া রচনা করেন। আবার, বাল্মীকি-প্রতিভা সংস্কৃতে অনুবাদ করেছেন ডক্টর বি. রাঘবন, সাহিত্য আকাদেমি, নিউ দিল্লি, ১৯৬৬ থেকে সংস্কৃত রবীন্দ্রমে প্রকাশিত হয়|

রবীন্দ্রনাথের সুরে বর্ষার বেদগান অচ্ছা বদাতবসং বহুশ্রুত। শ্লোকটি ঋগ্বেদের (৫.৮৩.১) একটি অত্যন্ত সুপ্রসিদ্ধ ও সুন্দর মন্ত্র, যাতে বৃষ্টি ও মেঘের দেবতা পর্জন্যের স্তুতি করা হয়েছে।

পর্জন্য উত্সব বা বর্ষা মঙ্গলের জন্য এই মন্ত্রে সুরারোপ করেছেন রবীন্দ্রনাথ –

अच्छा वद तवसं गीर्भिराभिः स्तुहि पर्जन्यं नमसा विवास। कनिक्रदहृषभो जीरदानू रेतो दधात्योषधीषु गर्भम् ।।১

 অন্যত্র রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন-

‘ মেঘদূত ছাড়া নববর্ষার কাব্য কোন সাহিত্যে কোথাও নাই। ইহাতে অন্তর্বেদনা নিত্য কালের ভাষায় লিখিত হইয়া গেছে। প্রকৃতির সাংবাত্সরিক মেঘোত্সবের অনির্বচনীয় কবিত্বগাথা মানবের ভাষায় বাঁধা পড়িয়াছে।’২

ভালো অনুবাদ শুধুমাত্র মূলরচনার প্রতিনিধিত্ব করে না। বরং অনুবাদকের ব‍্যক্তিত্বের স্বাদ পাঠককে করায়। সাহিত্যের উদ্দেশ্য হল আনন্দ সৃষ্টি। রবীন্দ্রনাথ যখন মেঘদূতের অনুবাদ করলেন, সেই অনূদিত সাহিত‍্য শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। রসিকসমাজ তাতে তৃপ্ত হয়েছে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘মানসী’ কাব্যগ্রন্থের বিখ্যাত ‘মেঘদূত’ কবিতায় কালিদাসের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে  সেই ‘আষাঢ়ের প্রথম দিবস’-কে স্মরণ করে লিখেছিলেন –

“কবিবর , কবে কোন বিস্মৃত বরষে 
কোন্ পুণ্য আষাঢের প্রথম দিবসে 
লিখেছিলে মেঘদূত ! মেঘমন্দ্র শ্লোক
বিশ্বের বিরহী যত সকলের শোক 
রাখিয়াছে আপন আঁধার স্তরে স্তরে 
সঘনসংগীতমাঝে পুঞ্জীভূত ক’রে ৷
ছিন্ন করি কালের বন্ধন 
সেই দিন ঝরে পড়েছিল অবিরল 
চিরদিবসের যেন রুদ্ধ অশ্রুজল 
আর্দ্র করি তোমার উদার শ্লোকরাশি ৷
ভারতের পূর্বশেষে 
আমি বসে আছি সেই শ্যামবঙ্গদেশে 
যেথা জয়দেব কবি কোন্ বর্ষাদিনে 
দেখেছিল দিগন্তের তমালবিপিনে 
শ্যামচ্ছায়া , পুর্ণ মেঘে মেদুর অম্বর ৷
আজি অন্ধকার দিবা , বৃষ্টি ঝরঝর ,
দূরন্ত পবন অতি — আক্রমণে তার 
অরণ্য উদ্যতবাহু করে হাহাকার ৷”৩

কালিদাসের কাব্য ও নাটকের সৌন্দর্য, বিশেষ করে ‘শকুন্তলা’ ও ‘মেঘদূত’, রবীন্দ্রনাথকে গভীরভাবে মুগ্ধ করেছিল। তিনি কালিদাসের সাহিত্য নিয়ে ‘প্রাচীন সাহিত্য’ গ্রন্থে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন এবং ‘চৈতালি’ কাব্যে ‘কালিদাসের প্রতি’ কবিতাটি রচনা করে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন।

মহাকবি কালিদাসের প্রতি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গভীর শ্রদ্ধা ও মুগ্ধতার প্রকাশ ঘটেছে তাঁর অমর কবিতা “কালিদাসের প্রতি”-তে। ১৮৯৬ সালে (আশ্বিন ১৩০৩ বঙ্গাব্দ) প্রকাশিত ‘চৈতালী’ কাব্যগ্রন্থে এই কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত হয়।কবিতাটিতে রবীন্দ্রনাথ কালিদাসকে কোনো রাজসভার সাধারণ কবি হিসেবে দেখেননি, বরং তাঁকে অলকার চিরানন্দময় অধিবাসী হিসেবে কল্পনা করেছেন। কবি সুন্দরভাবে বর্ণনা করেছেন কীভাবে বর্ষার মেঘের মৃদঙ্গ ধ্বনি ও বিদ্যুতের ছন্দে মহাদেব যখন তাণ্ডব নৃত্য করতেন, তখন কালিদাস কৈলাসে বসে বন্দনা গান গাইতেন। গান শেষে দেবী পার্বতী প্রসন্ন হয়ে তাঁর নিজের কানের ময়ূরের পালক (বর্হ) কালিদাসের চূড়ায় বা মাথায় পরিয়ে দিতেন।

আজ তুমি কবি শুধু, নহ আর কেহ—
কোথা তব রাজসভা, কোথা তব গেহ,
কোথা সেই উজ্জয়িনী—কোথা গেল আজ
প্রভু তব, কালিদাস, রাজ-অধিরাজ।
কোনো চিহ্ন নাহি কারো। আজ মনে হয়
ছিলে তুমি চিরদিন চিরানন্দময়
অলকার অধিবাসী। সন্ধ্যাভ্রশিখরে
ধ্যান ভাঙি উমাপতি ভূমানন্দভরে
নৃত্য করিতেন যবে, জলদ সজল
গর্জিত মৃদঙ্গরবে, তড়িৎ চপল
ছন্দে ছন্দে দিত তাল, তুমি সেই ক্ষণে
গাহিতে বন্দনাগান—গীতিসমাপনে
কর্ণ হতে বর্হ খুলি স্নেহহাস্যভরে
পরায়ে দিতেন গৌরী তব চূড়া-‘পরে।৪

কালিদাসের কাব্যকে যথাযথ ভাবে স্পর্শ করতে পেরেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। কালিদাসের সৃষ্টিকে অবলম্বন করে রবীন্দ্রনাথ যে নতুন সৃষ্টি করেছেন, তাও কালোত্তীর্ণ হয়েছে।

 কালিদাস উত্তরমেঘে লিখলেন-

হস্তে লীলাকমলমলকে বালকুন্দানুবিদ্ধং।
নীত্বা লোধ্রপ্রসবরজসা পাণ্ডুতামাননশ্রীঃ।।
চূড়াপাশে নবকুরুবকং চারুকর্ণে শিরীষং।
সীমন্তে চ তদুপগমজং যত্র নীপং বধূনাম্। ৭১
রবীন্দ্রনাথের ভাষায় –
মুখে তার লোধ্ররেণু, লীলাপদ্ম হাতে,
কর্ণমূলে কুন্দকলি, কুরুবক মাথে,
তনুদেহে রক্তাম্বর নীবিবন্ধে বাঁধা,
চরণে নুপূরখানি বাজে আধা আধা।
বসন্তের দিনে
ফিরেছিনু বহুদূরে পথ চিনে চিনে।৫

 রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘কল্পনা’ কাব্যগ্রন্থের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবিতা হলো ‘স্বপ্ন’।  ১৩০৪ বঙ্গাব্দের ৯ই জ্যৈষ্ঠ বোলপুরে বসে কবি এই কবিতাটি রচনা করেন। এই রোমান্টিক কবিতায় মহাকালের পটভূমিতে এক অপরূপ কাল্পনিক ও স্বপ্নময় পরিবেশ ফুটে উঠেছে, যেখানে কবি তাঁর পূর্বজন্মের প্রিয়তমাকে খুঁজতে উজ্জয়িনীপুর ও শিপ্রানদীর তীরে ফিরে যান।স্বপ্নের প্রেক্ষাপট ও মূলভাব এই কবিতায় কবি এক মায়াময় জগতের কল্পনা করেছেন। তাঁর মানসচেতনায় ভেসে ওঠে অতীতকালের উজ্জয়িনী নগরী, যেখানে মহাকাল মন্দিরে গম্ভীর মন্দ্রে সন্ধ্যারতি বাজছে। কবির অবচেতন মন সেই প্রাচীন বসন্তের দিনে, জনশূন্য পথে পূর্বজন্মের প্রথমা প্রিয়ার স্মৃতি রোমন্থন করে। কবিতাটি যেন নিছকই এক স্বপ্ন, যার মাধ্যমে প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যের প্রতি কবির গভীর অনুরাগ ও রোমান্টিক সৌন্দর্যচেতনা প্রকাশিত হয়েছে।কবিতার উল্লেখযোগ্য পংক্তি-

“দূরে বহুদূরে স্বপ্নলোকে উজ্জয়িনীপুরেখুঁজিতে গেছিনু কবে/ শিপ্রা নদী পারে মোর পূর্বজনমের প্রথমা প্রিয়ারে।”৬

 রবীন্দ্রনাথ বারে বারে মানসপথে হেঁটে বেরিয়েছেন, ফিরে গেছেন কালিদাসের যুগে। দুজনেই সৌন্দর্যের পূজারী। দুজনেই বিরহের মধ্যে প্রেমের পূর্ণতা দেখেছেন। কালিদাস নিজেই যেন বিরহী যক্ষ। বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো অবস্থান করেছেন।

রবীন্দ্রনাথের মধ্যে বিরহী সত্তার করুণ রাগিনী নব নব সুরে বেজে উঠেছে।

রজনীর অন্ধকার 
উজ্জয়িনী করি দিল লুপ্ত একাকার।
দীপ দ্বারপাশে 
কখন নিবিয়া গেল দুরন্ত বাতাসে।
শিপ্রা নদী তীরে 
আরতি থামিয়া গেল শিবের মন্দিরে।৭

কালিদাসের জীবনী নিয়ে বহু জনশ্রুতি রয়েছে। সেই সব কাহিনী নিয়ে বিংশশতাব্দীর সংস্কৃতসাহিত্যসাধকেরা সংস্কৃত ভাষায়  একাধিক কাব‍্য রচনা করেছেন। যেমন  নিত‍্যানন্দ মুখোপাধ‍্যায়, রমা চৌধুরী প্রমুখ। অনুবাদের ভাষা সরল সংস্কৃত, সহজবোধ‍্য, আকর্ষণীয়। অনুষ্টুপাদি ছন্দে রচিত  বিভিন্ন শ্লোক উপমা, রূপক, শ্লেষ প্রভৃতি অলংকারে অলংকৃত। প্রসাদাদি গুণে সজ্জিত। 

মহাকবি কালিদাসের ‘অভিজ্ঞান শকুন্তলম’ নাটকটি পড়ে মুগ্ধ হয়ে বিশ্বখ্যাত জার্মান কবি ও সাহিত্যিক ইয়োহান ভোলফগাং ফন গ্যেটে (Johann Wolfgang von Goethe) বিখ্যাত প্রশংসা-কবিতাটি রচনা করেন ।গ্যেটের বিখ্যাত উক্তিটি এখানে প্রণিধানযোগ্য –

Wills du die Blüthe des frühen, die Früchte des späteren Jahres,Wills du was reizt und entzückt, wills du was sättigt und hält,Wills du den Himmel, die Erde, mit Einem Namen begreifen;Nenn’ ich, Sakuntala, Dich, und so ist Alles gesagt.

বাংলায় সেই উক্তিটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিম্নোক্তভাবে অনুবাদ করেছেন:”কেহ যদি তরুণ বৎসরের ফুল ও পরিণত বৎসরের ফল, কেহ যদি মর্ত্য ও স্বর্গ একত্রে দেখিতে চায়, তবে ‘শকুন্তলা’য় তাহা পাইবে।”রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘প্রাচীন সাহিত্য’ নামক প্রবন্ধ গ্রন্থের ‘শকুন্তলা’ প্রবন্ধে এই অসাধারণ উদ্ধৃতিটি ব্যবহার করে কালিদাসের কাব্যের সার্থকতা ও সৌন্দর্যের বিশ্লেষণ করেছিলেন।৮

 তথ্যসূত্র 

১. ঋগ্বেদ ৫.৮.৩.১

২. রবীন্দ্রনাথরচনাবলী, চতুর্থখণ্ড; সুলভ সংস্করণ, বিশ্বভারতী, পৌষ ১৪১০

৩. মেঘদূত, মানসী

৪. কালিদাসের প্রতি, চৈতালি 

৫. ৭১ নং শ্লোক, উত্তরমেঘ, মেঘদূত, কালিদাস।  রবীন্দ্রনাথের অনুবাদ -স্বপ্ন, কল্পনা।

৬. স্বপ্ন, কল্পনা 

৭. স্বপ্ন, কল্পনা 

৮. Ancient Classics: Goethe on Shakuntala https://share.google/5v3AFibWJecBOpQ3q

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনুবাদ -সমালোচনা-সাহিত্য-–-প্রাচীন-সাহিত্য6শকুন্তলা-BengaliSEM-4CC-9-by-HR.pdf https://share.google/6LV4aV8LVH9mleDV3


ড. অভিষেক দাস 
সহকারী অধ্যাপক
সংস্কৃত বিভাগ
বিবেকানন্দ কলেজ ঠাকুরপুকুর
কলকাতা ৬৩

Please email your comments/suggestions to soumyanetra.convergence@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *