রাজা রামমোহন রায়: একটি পর্যালোচনা  – স্বাতী পারেখ

রাজা রামমোহন রায়ের জন্মের  দুইশত বাহান্ন বছর অতিক্রান্ত। এই পুণ্যভূমি ভারতে বহু মনীষী ও যুগমানবের মতো রামমোহনের আবির্ভাবও উল্লেখযোগ্য এবং ঐতিহাসিক। তবু রামমোহন রায়ের মনীষা, ভাবধারা ও পূর্ণাঙ্গ জীবনকাহিনি সাধারণ মানুষের মধ্যে বহুল প্রচারিত হয়নি। জনসাধারণের মধ্যে তিনি ব্রাহ্মধর্মের প্রবক্তা ও দেশ থেকে সতীদাহ প্রথা নিবারণের পথপ্রদর্শক রূপেই খ্যাত হয়েছেন। তাঁর জীবনের নানা কর্মকাণ্ডের সঙ্গে পরিচয় খুব বেশি লোকের নেই। আধুনিক ভারতের পুনর্জাগরণের সূচনা যিনি করেছিলেন, তিনিই কিন্তু রাজা রামমোহন রায়। ‘রাজা’ উপাধিটি তিনি লাভ করেন দিল্লির বাদশা বাহাদুর শাহের (দ্বিতীয়) কাছ থেকে।

আড়াইশো বছরেরও পূর্বে যখন রামমোহন রায় জন্ম গ্রহণ করেছিলেন, তখন যে ভারতবর্ষ ছিল তার থেকে আজ ভারত জ্ঞানে-বিজ্ঞানে অনেক উন্নত। রামমোহন সমাজকে উন্নত করার চেষ্টা করে গেছেন আজীবন। সমাজ সংস্কারের কাজে যে কোনও বাধাকে তিনি অতিক্রম করে গেছেন তাঁর ক্ষুরধার যুক্তি ও মেধার সহায়তায়। দৃঢ় চিত্তের জন্য তিনি তাঁর সাধনায় অবিচল থেকেছেন। ধর্ম ও সমাজ সংক্রান্ত অন্যায়-অবিচারের প্রতিবাদ এবং যুক্তি দিয়ে সত্য উদঘাটনের চেষ্টায় তাঁকে অনেক বক্রোক্তি সহ্য করতে হয়েছিল, এমনকি পরিবার পরিজন থেকে পরিত্যক্ত হয়েছিলেন, তবু তিনি তাঁর সিদ্ধান্তে অটল থেকেছেন। দেশের লোক তো দূরের কথা, তাঁর নিকট পরিজন— পিতা-মাতা স্বয়ং তাঁর বিরোধিতা করেছেন। যাঁরা যুগপ্রবর্তক হয়ে আসেন যুগ তাঁদের চিনতে পারে না, বুঝতে পারে না। রামমোহন কার্যত ঈশ্বরে অবিশ্বাসী ছিলেন না, শুধু ধর্মের মিথ্যা খোলস দূর করতে চেয়েছিলেন। ধর্মান্ধতার বন্ধন থেকে মুক্তির জন্য বিজ্ঞানভিত্তিক ও যুক্তিবাদী শিক্ষার প্রসারের চেষ্টা করেছিলেন তিনি আর এই চেষ্টাই তাঁর আধুনিকতার প্রমাণ। তাই নিঃসন্দেহে এ কথা বলা যায় যে ভারতবর্ষে আধুনিকতার জনক ছিলেন রামমোহন।

রামমোহন যে সময়ে জন্মেছিলেন,  সে সময়টা খুব‌ই গুরুত্বপূর্ণ। ভারতে তখন মধ্যযুগের শেষ আর আধুনিক যুগের শুরু, সেই সন্ধিক্ষণে রামমোহনের শুভ আবির্ভাব। রামমোহন কোনও ধর্মগুরু ছিলেন না,  তিনি বিভিন্ন ভাষা শিখে বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ গভীরভাবে অধ্যয়ন করে ধর্মের সত্য রূপটি  উপলব্ধি করতে চেয়েছিলেন, অন্যদের তা জানাতে চেয়েছিলেন। সব ধর্মগ্রন্থের মূল কথা এক:  ঈশ্বর এক এবং অদ্বিতীয়। কিন্তু ধর্মগুরুরা অহেতুক আচার-বিচারকে প্রাধান্য দিয়ে, ধর্মের দোহাই দিয়ে মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেছেন, যার ফলস্বরূপ সারা পৃথিবীতে মারামারি, হানাহানি, শারীরিক ও মানসিক কষ্টের সূত্রপাত। 

শুধু ভারতেই নয়, ইংলন্ডের সমাজেও তখন পরিবর্তনের ঢেউ উঠেছে। শিল্প বিপ্লবের শুরু হয়েছে। ভারতে বাদশাহী আমলের শেষ পর্যায় ও  ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির স্থাপন। দেশে তখন ইংরেজদের শাসন কায়েম হয়েছে; জাতিভেদ, নানারকম ধর্মীয় অনুশাসন, কুসংস্কার, অশিক্ষা, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, কুলীনপ্রথা, স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রীদের সহমরণের ধর্মীয় পুণ্যলাভের নামে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা, ব্রাহ্মণ-পুরোহিতদের দাপট, অন্ত্যজ গরীব মানুষদের হীন চোখে দেখা ইত্যাদি নানারকম সামাজিক অবক্ষয় চলছিল।  এমতাবস্থায় রামমোহনের জন্ম হল গোঁড়া হিন্দু ব্রাহ্মণ পরিবারে।

 ১৭৭২ সালের (মতান্তরে ১৭৭৪)  ২২শে মে হুগলি জেলার খানাকুল-কৃষ্ণনগরের রাধানগর গ্রামে  রামমোহন জন্মগ্রহণ করেন। পিতা রামকান্ত রায় ছিলেন পরম বৈষ্ণব এবং মা (ফুলঠাকুরাণী) তারিণী দেবী  ছিলেন শৈব পরিবারের। তারিণী দেবী প্রচণ্ড ব্যক্তিত্বময়ী ছিলেন। পুত্র রামমোহন মায়ের ব্যক্তিত্বময় ও জেদি চরিত্রটি লাভ করেছিলেন। তৎকালীন সমাজে বহুবিবাহের রীতি অনুযায়ী রামকান্তের তিনটি বিবাহ।  প্রথমা স্ত্রী সুভদ্রা নিঃসন্তান ছিলেন। দ্বিতীয়া স্ত্রী তারিণী দেবীর দুই পুত্র ও এক কন্যা: জ্যেষ্ঠ জগমোহন ও কনিষ্ঠ পুত্র রামমোহন।  তৃতীয়া স্ত্রী রামমণিদেবী রামলোচন রায়ের মাতা ছিলেন।

তদানীন্তন সময়ে রামমোহনের পরিবারের অনেকেই মুর্শিদাবাদের মুসলমান রাজসরকারের অধীনে চাকরি করতেন। সেই সুবাদে রামমোহনের পিতা রামকান্ত রায় প্রচুর ধনসম্পত্তির অধিকারী হয়েছিলেন। রামমোহনের প্রপিতামহ কৃষ্ণচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় নবাবের কাছ থেকে সম্মানসূচক ‘রায় রায়ান’ উপাধি লাভ করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে রামমোহনের বংশ রায়ান বাদ দিয়ে ‘রায়’ উপাধি ব্যবহার করতেন।

প্রচলিত বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহের প্রথা অনুযায়ী রামমোহনেরও  বাল্যবয়সে তিনটি বিবাহ হয়। প্রথম বিবাহ হয় রামমোহনের আট বছর বয়সে, স্ত্রীর বয়স অজানা এবং তিনি অকালপ্রয়াত। নয় বছরে রামমোহনের দ্বিতীয় বিয়ে। এক বছরের মধ্যে পিতা রামমোহনের তৃতীয় বিবাহ দিয়ে দেন। শৈশবে বংশের রীতি অনুযায়ী রামমোহন কৃষ্ণভক্ত ছিলেন। কিন্তু অল্পবয়স থেকে কাশী, পাটনা, তিব্বত ইত্যাদি নানা স্থানে গিয়ে আরবী, ফার্সী, উর্দু, সংস্কৃত শাস্ত্র পড়ে তিনি হিন্দু ধর্মের পৌত্তলিকতার প্রতি আস্থা হারান। গোঁড়া হিন্দু ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তান হয়ে পৌত্তলিকতায় অবিশ্বাসী হওয়াতে ধর্মপ্রবণ মাতা-পিতা তা মেনে নিতে পারলেন না। পুত্র দুর্দান্ত মেধাবী, তরুণ বয়সেই বিভিন্ন ভাষায় পারদর্শী হয়ে উঠলেন। তবু পিতা-মাতা বিধর্মী পুত্রকে গৃহ থেকে নির্মমভাবে বিতাড়িত করেন। তাতে যেন ‘শাপে বর’ হল। তিনি আরও গভীরভাবে হিন্দু ধর্মের গূঢ় তত্ত্ব জানতে আগ্রহী হলেন।

রামমোহন রায়কে আজ আমাদের আরো ভালভাবে জানবার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। আজও আমরা তাঁর চিন্তাধারাকে প্রকৃত উপলব্ধি করতে পারি নি। দেশ ও দেশের জনসাধারণকে কোন্ উত্তরণের পথে তিনি নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, তা তাঁর কৈশোর থেকে বাকি জীবনচর্যার মাধ্যমে বোঝা যাবে।
      
রামমোহন জীবনের প্রথম চৌদ্দ বছর রাধানগরে ছিলেন। সেখানকার গুরুমহাশয়ের পাঠশালায় বাংলা শেখার সঙ্গে সঙ্গে একজন মৌলভীর কাছে ফারসি শেখেন। ফারসি ভাষায় ব্যুৎপত্তি লাভের জন্য তাঁকে তৎকালীন ইসলামি শিক্ষার পীঠস্থান পাটনায় পাঠানো হয়। তিনি সেখানে কোরান ও ইসলাম ধর্মতত্ত্ব আয়ত্ত করেন। ফারসি ভাষায় সুফিদের গ্রন্থ পাঠ করে তাঁর মনে প্রচলিত ধর্ম সম্পর্কে নানারকম প্রশ্ন জাগে। চৌদ্দ বছর বয়সে রামমোহন নন্দকুমার বিদ্যালংকার, যিনি পরবর্তীকালে ‘হরিহরানন্দ তীর্থস্বামী কূলাবধূত’ নামে খ্যাত হন, তাঁর কাছে সংস্কৃত শাস্ত্র এবং তন্ত্র শাস্ত্র শিক্ষা লাভ করেন। পাটনা থেকে ফিরে তিনি হিন্দুদের মূর্তিপূজা আর হিন্দু সমাজের নানা সংস্কার সম্বন্ধে বই লেখেন। হিন্দুদের মূর্তিপূজা সম্পর্কিত ব‌ই লেখার ফলস্বরূপ গোঁড়া রক্ষণশীল পিতার বিরাগভাজন হতে হল তাঁকে। বাড়ি থেকে পিতা কর্তৃক বিতাড়িত হয়ে তিনি বিভিন্ন স্থান ঘুরতে ঘুরতে তিব্বত যান, সেখানে বৌদ্ধধর্ম শাস্ত্রে জ্ঞানার্জন করেন। সেখানেও লামার সঙ্গে বিবাদ হয়, যেহেতু তিনি লামাকে জীবন্ত দেবতারূপে মানতে পারেন নি। সেখানে তাঁর জীবন সংশয় হয়। তিব্বত থেকে ফিরলে বাবা রামকান্ত পুত্রকে পুনরায় গৃহে প্রবেশাধিকার দেন। এবার তিনি বারাণসী গিয়ে হিন্দুশাস্ত্র অধ্যয়ন করলেন এবং অতি অল্প সময়ে স্মৃতি, পুরাণ ইত্যাদি শাস্ত্রে অগাধ জ্ঞান অর্জন করেন।

এরপরেই শুরু হয় রামমোহনের দ্বন্দ্ব। আশৈশব পারিবারিক বৈষ্ণব ধর্মে লালিত তাঁর মনে পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে এক নিরাকার শক্তির অনুভূতি পরিব্যাপ্ত হয়। মাঝে মধ্যেই পিতার সঙ্গে তর্ক-বিতর্ক হত। রামমোহনের হিন্দু ধর্মের সকল কুসংস্কার ও কুপ্রথার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোয় ক্রুদ্ধ ও দুঃখিত পিতা পুনরায় রামমোহনকে গৃহ থেকে বিতাড়িত করেন।

 ১৮০৩ সালে পিতা রামকান্তের মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পূর্বে পিতা তিন সন্তানের মধ্যে সম্পত্তি ভাগ করে দিয়ে যান। কিন্তু পুত্র পিতা প্রদত্ত সম্পত্তি গ্রহণ করেন নি। পুত্র প্রকাশ্যে পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে মতবাদ প্রকাশ করাতে ক্রুদ্ধ জননী বিধর্মী পুত্রকে আইনের সাহায্যে সম্পত্তিচ্যুত করার জন্য সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেন। রামমোহন মামলায় জয়ী হন। তিনি যে বিধর্মী তা প্রমাণিত হয় নি। রামমোহন বন্ধু গর্ডন সাহেবকে বিলাতে থাকাকালীন চিঠি লিখেছিলেন, তাতে তিনি তাঁর জীবন কাহিনি সংক্ষেপে লেখেন: “আমার সমস্ত তর্ক বিতর্কে আমি কখন হিন্দুধর্মকে আক্রমণ করি নাই। উক্ত নামে যে বিকৃত ধর্ম প্রচলিত, তাহাই আমার আক্রমণের বিষয় ছিল।” তিনি প্রাচ্য দর্শনকে শ্রদ্ধা জানিয়ে পাশ্চাত্য শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে ভারতের পুনর্জাগরণ সম্ভব বলে মনে করেছিলেন। তাঁর ধর্মীয় চিন্তা ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে তিনি ইসলাম, সুফিবাদ ও খ্রিস্টধর্ম এবং উপনিষদের একেশ্বরবাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন।

প্রথমে রামমোহন মুর্শিদাবাদে উডফোর্ড সাহেবের সহযোগী, তারপর তিনি ডিগবি সাহেবের বাবু বা দেওয়ান রূপে রামগড়, যশোর, ভাগলপুর এবং রংপুরে কাজ করেছেন। ১৮১৪ সাল পর্যন্ত ডিগবি সাহেবের অধীনে চাকরি করার সময়ে তিনি ইংরেজি ভালোভাবে শেখেন। ইংরেজি পত্র-পত্রিকা ও অন্যান্য লেখা পাঠ করে তিনি ইংলন্ডের শিল্পবিপ্লবের সময়ের চিন্তাধারা সম্পর্কে অবহিত হন।

১৮১৪ সালে রামমোহন কলকাতায় এসে বসবাস শুরু করলেন। সেই সময় থেকেই প্রকৃতপক্ষে তিনি তাঁর জীবনের সময়, অর্থ, শরীর ও মন দেশ ও দশের মঙ্গলের জন্য উৎসর্গ করলেন। ১৮১৫ সালে তিনি তাঁর মানিকতলার বাসভবনে  ‘আত্মীয় সভা’ নামে একটি সভা গঠন করেন। অল্পবয়স থেকেই রামমোহন প্রচলিত ধর্মের অসারতা উপলব্ধি করেছিলেন। খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারকেরা ভারতের জনসাধারণকে বর্বর, অসভ্য ভাবতেন, তাদের সভ্য করার উদ্দেশ্যে খ্রিস্টান ধর্মমত প্রচার করতেন। রামমোহন উপলব্ধি করলেন এমন ধর্ম থাকা উচিত যাতে ঈশ্বরের মূর্তি থাকবে না, ভেদবিচার থাকবে না, অথচ তার মূল থাকবে ভারতের সুপ্রাচীন ধর্মীয় সংস্কৃতিতে। মূর্তি বিরোধী অভেদতত্ত্ব প্রচারের উদ্দেশ্যেই তাঁর এই ‘আত্মীয় সভা’ গঠন। নিরাকার ঈশ্বরের প্রার্থনা করার জন্য রামমোহনের উদ্যোগে ১৮২৮-এ ‘ব্রাহ্মসমাজ’ প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮১৫ থেকে ১৮১৭ সালের মধ্যে রামমোহন বেদান্ত গ্রন্থ, কেনোপনিষদ, ঈশোপনিষদ, কঠোপনিষদ, মান্ডুক্যোপনিষদ, মুন্ডকোপনিষদ ইত্যাদি  বাংলা অনুবাদ সহ পুস্তকাকারে প্রকাশ ও প্রচার করেন। তিনি বেদান্ত ও উপনিষদকে ধর্ম ও সমাজ সংস্কারের কাজে অস্ত্র রূপে গ্রহণ করেন। হিন্দু ধর্মের মূলে কী আছে তা জানার জন্য নিজে শাস্ত্র অধ্যয়ন করে তিনি দেখলেন, বেদান্তে বা উপনিষদে জাতিভেদ, বর্ণভেদ, মূর্তিপূজা সমর্থিত হয় নি। বেদান্ত মতে ঈশ্বর জগৎময় এক অদৃশ্য সত্তা, সমস্ত প্রাণী ও সমস্ত পদার্থে তা পরিব্যাপ্ত। প্রচলিত ধর্মের বিরুদ্ধে রামমোহনের সংগ্রামের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল পরাধীন ভারতে অশিক্ষা, কুসংস্কারাচ্ছন্ন, ধর্মের মোহাবিষ্ট ভারতীয়দের বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়ন সাধন। উন্নয়নকেই রামমোহন সর্বাধিক প্রাধান্য দিয়েছেন। তাই তিনি ১৮২৩ সালে গভর্নর জেনারেল লর্ড আমহার্স্টকে লেখা চিঠিতে এই দাবি জানান যে ভারতীয়দের প্রাচ্যবিদ্যা চর্চার সঙ্গে ইউরোপীয় জ্ঞান-বিজ্ঞানের  পরিচয় ঘটাতে হবে। ‘আত্মীয় সভা’র অধিবেশনে সিদ্ধান্ত হয়, ভারতীয় হিন্দুদের জন্য একটি উত্তম মানের স্কুল স্থাপন করা হবে। হিন্দু বিদ্যালয়ের জন্য শহরের গণ্যমান্য ও ধনীরা অর্থদানে রাজি হলেন কিন্তু সেই উদ্যোগ মাঝপথে থমকে গেল রামমোহনের ধর্মীয় সংস্কারমূলক মতামতে বিক্ষুব্ধ কিছু মানুষের বিরোধিতায়। তাঁরা ঘোষণা করলেন, রামমোহন যদি হিন্দু বিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকেন, তাহলে তাঁরা হিন্দু বিদ্যালয় স্থাপনে সহযোগী হবেন না। রামমোহন চান কর্ম, দেশের সর্বাত্মক উন্নতি। তাঁর জন্য কোনও মহৎ কার্য বাধা প্রাপ্ত হবে, তা তাঁর কাম্য নয়; তাই তিনি সরে দাঁড়ালেন হিন্দু বিদ্যালয় স্থাপনের কর্মকাণ্ডের থেকে। ভবিষ্যতে এই হিন্দু বিদ্যালয় ‘হিন্দু কলেজ’ বা ‘প্রেসিডেন্সি কলেজ’ রূপে জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রসিদ্ধ পীঠস্থান হয়। ১৮২২ সালে রামমোহন নিজের অর্থ ব্যয় করে হেদুয়া অঞ্চলে ‘এ্যাংলো হিন্দু স্কুল’ স্থাপন করেছিলেন।

শিক্ষা ছাড়া রামমোহন বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন সংবাদ মাধ্যমের প্রসারকে। নিজে তিনি তিনটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। মীরাৎ-উল-আখবার ফার্সিভাষায়, ইংরেজি ভাষায় ‘ব্রাহ্মনিকাল্ ম্যাগাজিন-ব্রাহ্মণ সেবধি’  এবং বাংলা ভাষায় ‘সংবাদ কৌমুদী’। শুধু সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠাই নয়, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা খর্বের ব্যাপারেও তিনি প্রতিবাদ করেন। লর্ড ওয়েলেসলি সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করলে তিনি তার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠেন।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও ছিল তাঁর সজাগ দৃষ্টি।  তিনি বুঝেছিলেন ইংরেজ কোম্পানির শাসনকালে দেশের মানুষের দারিদ্র্য বেড়ে চলেছে। বিদেশী মূলধনে ভারতে শিল্পোন্নয়নের সম্ভাবনা হতে পারে এই ভাবনায় তিনি ও তাঁর সহযোগী বন্ধুরা (যেমন দ্বারকানাথ ঠাকুর) নীল চাষকে সমর্থন করেছিলেন। রামমোহন জমিদারি ব্যবস্থায় কিছু সংস্কার সাধনের চেষ্টা করেন। নিজে বড় তালুকদার হয়েও জমিদারদের, তালুকদারদের এবং রাজস্ব আদায়কারীদের প্রজাশোষণের কথা তুলে ধরেছিলেন।  তিনি চেয়েছিলেন জমিদারদের মতো প্রজাদের সঙ্গেও ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ হোক, তাহলে জমিদারদের উৎপীড়ন কমবে।

রামমোহনের সমাজ-সংস্কার প্রচেষ্টার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ  উদ্যোগ সাফল্য হল সতীদাহ নিবারণ। মুঘল সাম্রাজ্যের পতন ও ইংরেজদের এদেশে একাধিপত্য প্রতিষ্ঠার পরে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে সতীদাহ বৃদ্ধি পেয়েছিল। রামমোহনের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা জগমোহনের মৃত্যুর পর তাঁর দ্বিতীয়া স্ত্রীকে সহমরণে যেতে হয়েছিল। এ ঘটনা রামমোহনকে দগ্ধ করে।  তিনি সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে প্রথাটি বন্ধ করতে চেয়েছিলেন। হিন্দুশাস্ত্র ঘেঁটে বের করেছিলেন, কোথাও পতির মৃত্যুর পর স্ত্রীদের সহমরণের কথা উল্লিখিত হয় নি। রামমোহনের নিরলস প্রচেষ্টার পরিণামস্বরূপ ১৮২৯ সালে লর্ড বেন্টিক সতীদাহকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে ঘোষণা করলেন ও আইন প্রণয়ন করে চিরতরে তা বন্ধ করলেন।

ধর্ম, শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারে রামমোহনের যেমন আগ্রহ, তেমনি ইউরোপ, আমেরিকার গণতান্ত্রিক কার্যকলাপ সম্পর্কেও ছিল সমান আগ্রহ। বিদেশের খবরাখবরও তিনি রাখতেন। তিনটি কারণে তিনি ইংল্যান্ড সফর করেন।  প্রথম কারণটি হল তৎকালীন দিল্লির সম্রাট দ্বিতীয় আকবরের পক্ষ থেকে ইংল্যান্ডের রাজার হাতে স্মারকলিপি প্রদান। স্মারকলিপিতে ছিল দিল্লির নিকটবর্তী কতকগুলি জমিদারির রাজস্বে বাদশাদের নিজের অধিকারের স্বীকৃতি আদায় করা।   দ্বিতীয় কারণ সতীদাহ প্রথা নিবারণ বিষয়ক একটি স্মারকলিপি ইংল্যান্ডের ‘হাউস অব কমন্সে’ দাখিল করা। তৃতীয়ত, ‘হাউস অব কমন্সে’র আসন্ন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সনদ পুনঃপ্রদান বিষয়ক আলোচনায় যোগ দেওয়া। ইংল্যান্ডে তিনি যথেষ্ট সম্মান অর্জন করেছিলেন। সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতার দেশ ফ্রান্স সম্পর্কে রামমোহনের কৌতূহল ছিল। ১৮৩২ সালে তিনি প্যারিস যান এবং স্বয়ং রাজা লুই তাঁকে সম্মানিত করেন। ফ্রান্স থেকে তিনি ব্রিস্টলে ফিরে আসেন, সেখানে থাকাকালীন তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। ১৮৩৩ সালে ২৭ সেপ্টেম্বর ব্রিস্টলে এই মহামানবের জীবনদীপ চিরতরে নির্বাপিত হল। ভারতমাতার কৃতী সন্তানকে শেষ সম্মান জানানোর সুযোগ আর ভারতবাসী পেল না।

সময়ের দাবি মেনে রাজা রামমোহন রায়ের সমাজ সংস্কার বর্তমান সময়েও প্রাসঙ্গিকতা হারায় নি। ঊনবিংশ শতাব্দীতে কুসংস্কারের বিরুদ্ধে, জাতিভেদের বিরুদ্ধে, ধর্মধ্বজীদের বিরুদ্ধে রামমোহনের বিদ্রোহ যেমন দুঃসাহসিক পদক্ষেপ ছিল, তেমনি বর্তমান সময়েও তাঁর প্রাসঙ্গিকতা প্রবলভাবে উপলব্ধ হয়। এই একবিংশ শতাব্দীতে যখন প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানে দেশ অগ্রসরমান, তখন আরো বেশি বেশি আমরা ধর্মকে, পৌত্তলিকতাকে প্রাধান্য দিচ্ছি। ধর্মের সারবস্তুতে মনোযোগী না হয়ে আচার বিচারকে প্রাধান্য দিচ্ছি। “সবার উপরে মানুষ সত্য” ভুলে গিয়ে দেশের নেতারা ধর্ম নিয়ে পড়েছেন,  ধর্মের বাহানা দিয়ে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধিতে মন দিয়েছেন। দেশের মঙ্গল, দেশের মানুষের মঙ্গল চিন্তা বাহুল্যমাত্র। রাজা রামমোহন রায় সম্পর্কে যত পড়ছি, তত বিস্মিত হচ্ছি। কোন ধাতুর মানুষ ছিলেন তিনি? মনের মধ্যে নানা প্রশ্ন জেগে উঠছে। একবিংশ শতাব্দীর ভারতের মানুষের দিকে তাকিয়ে দেখি, ভারতবাসীর মনোজগতে বিশেষ পরিবর্তন আসে নি, সংস্কার হয় নি। সতীদাহ প্রথা নেই, কিন্তু পণের জন্য ও নানা কারণে আজ‌ও মেয়েদের পুড়িয়ে মারা হয়। মেয়েরা অন্দরমহল থেকে তাদের কর্মজগত বহির্বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে পেরেছে। স্থলে, জলে, অন্তরীক্ষে মেয়েরা তাদের মেধা ও শক্তির পরিচয় দিচ্ছে, পুরুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলছে। তবু মেয়েদের নিরাপত্তা নেই। সভ্যতার উন্নতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ধর্ষণ, নারী নির্যাতন। ভারতীয় রাজনীতিতে আজ ঘুণ ধরেছে। রামমোহন চেয়েছিলেন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের শিক্ষার মিলন, যুক্তিবাদ, “ধর্মের বেশে মোহ” যেন এসে না ধরে; অথচ বাস্তবে দেখি জনসাধারণ বিজ্ঞানকে ছেড়ে, যুক্তিকে বাদ দিয়ে মাদুলি, কবচ, ধাগা ধারণেই বিশ্বাসী। ভীরুপ্রাণ আমরা কঠিন অসুখ থেকে মুক্তি পেতে ডাক্তারের পরিবর্তে যাই মা মনসার থানে, ওঝার কাছে। বিপদ থেকে রক্ষা পেতে করি মানত। যত দুর্বল হচ্ছি ততই বেড়ে চলেছে কালী, শিব, দুর্গা, কৃষ্ণ ছাড়াও অসংখ্য দেবদেবীর শরণাপন্ন হওয়া। হাসপাতাল, বিদ্যায়াতনের বদলে বড় বড় মন্দির তৈরিতে ব্যস্ত হচ্ছি। আমাদের দেশে যুগ যুগ ধরে এত মহাপুরুষ, মনীষী থাকা সত্ত্বেও আমরা তাঁদের দেখিয়ে দেওয়া পথে চলি না। এখনো আবার যদি আমরা রাজা রামমোহন রায়ের চর্চা করি, আবার আমরা ফিরে পাব আমাদের মনোবল, আত্মবিশ্বাস ও সৎসাহস— যার ওপর ভিত্তি করে আমরা ও আমাদের নবীন প্রজন্ম  গৌরবময় নব্য ভারতের দিকে অগ্রসর হতে পারবে।  যদি ধর্মপ্রাণ ভারতীয়রা যুক্তিগ্রাহ্য ধর্মাচরণ করে এবং রামমোহনের চিন্তাধারাকে অনুধাবন করতে পারে, তবে নিশ্চিতভাবে আমাদের মেধা ও শক্তিকে যথাযথ কাজে লাগিয়ে আমরা বিশ্বে অনুসরণকারী দেশ রূপে গণ্য হতে পারব। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যথার্থই রামমোহনকে   “ভারতপথিক  বলে অভিহিত করেছিলেন। রাজা রামমোহন রায় অবশ্যই ছিলেন প্রকৃত মানব দরদী।

রামমোহন রায় সম্পর্কিত প্রবন্ধ লিখতে গিয়ে আমি যে সব তথ্য জেনে উপকৃত হয়েছি, তা পেয়েছি তিনটি গ্রন্থ থেকে। সর্বপ্রথম উল্লেখ করতে হয় শ্রী নগেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘মহাত্মা রাজা রামমোহন রায় জীবন চরিত’। দ্বিতীয় ব‌ইটি শ্রী তাপস ভৌমিকের সম্পাদনায় ‘কোরক’ প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত ‘সার্ধ-দ্বিশতবর্ষে রামমোহন রায়’ এবং তৃতীয় ব‌ইটি রাজা ভট্টাচার্যের দ্বারকানাথ ঠাকুরকে অবলম্বন করে রচিত উপন্যাস ‘দ্বারকানাথ: পরাধীন দেশের রাজপুত্র’।   


Swati Parrack has done her M. Phil in Sanskrit, Degree and Diploma in German and Hindi languages. She has been associated with Convergence right from its inception and has been teaching German at various levels here.

Please email your comments/suggestions to soumyanetra.convergence@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *