হেনরি ডেভিড থরো আমেরিকার এক দার্শনিক কবি। ইনি জন্মেছিলেন ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে আর মারা যান ১৮৬২ খ্রিস্টাব্দে। বিশ্বের ইতিহাসে এঁর অনন্য অবদান। ইনিই অহিংস আইন অমান্য ধারণার প্রবর্তক। এঁর চিন্তাভাবনা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে ভবিষ্যত প্রজন্মকে। এঁর চিন্তার সূত্র ধরেই ভারতবর্ষে মহাত্মা গান্ধী এবং আমেরিকাতে মার্টিন লুথার কিং তাঁদের কার্যধারা অনেকাংশেই পরিচালিত করেছিলেন। সরল জীবনযাপনের তত্ত্বকে তিনি তাঁর নিজের জীবনযাপন দিয়ে প্রকাশ করেছিলেন।
নিজের জীবনকে আবিষ্কার করবার জন্য মাত্র আঠাশ বছর বয়সে তিনি তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক চাকরি ছেড়ে ম্যাসাচুসেটসের কনকর্ড এলাকায় ওয়াল্ডেন পন্ডের ধারে পৌঁছেছিলেন। সেখানে নিজের বসবাসের জন্য এক কক্ষ বিশিষ্ট একটি বাড়ি নিজের হাতে নির্মাণ করেছিলেন। সে বাড়ির দেওয়াল তাঁর নিজের হাতে গাঁথা। সে বাড়ির দরজা জানালা তাঁর নিজের হাতে বানানো। জীবন ধারণ করতেন ছুতোরের কাজ করে। সর্বকালের এক সেরা দার্শনিক হার্ভাডের কৃতি ছাত্র তিনি জীবনের এই পর্বে আশপাশের গ্রামে কাঠের কাজের সরঞ্জাম কাঁধে বয়ে নিয়ে গিয়ে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে ছুতোরের কাজ করতেন। তিনি এই পরীক্ষামূলক জীবনযাপন করেন ১৮৪৫ থেকে ১৮৪৭ খ্রিস্টাব্দ অবধি।
জীবন নিয়ে তাঁর পরীক্ষার দলিল তিনি রেখে গেছেন তাঁর ডায়েরির পাতায়। সেই ডায়েরিই ওয়াল্ডেন নাম নিয়ে বই হিসেবে প্রকাশিত হয় ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে। সেই বই প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে তার আবেদন নিয়ে বিশ্বের ভাবুক সমাজ আলোড়িত হয়ে ওঠে। দেঁতো ভদ্রতাকে তিনি এতটাই অপছন্দ করতেন যে অবাধ্যতাকে তিনি বিশেষ গুণ হিসেবে মেনেছিলেন। বাধ্যতাকে তিনি একধরনের দাসত্ব বলে মনে করতেন। (Disobedience is the true foundation of liberty. The obedient must be slaves.) এই বোধ থেকেই তাঁর মাথায় সিভিল ডিসবিডিয়েন্সের তত্ত্ব জন্মেছিল। যা ভাবীকালের বিশ্ব রাজনীতিতে গভীর প্রভাব বিস্তার করে।
Henri David Thoreau. His writing is ‘Walden Pond’. The memory of reading that book remains intact. Carrying a mat from home once I reached by the side of a pond to read it in solitude. I was in school then. When I just finished reading the book the last rays of the day disappeared. The day ended. The book had just been perfectly fitted with the size of the day! Today, after forty years, reaching the very Walden Pond I again saw that day that was as shiny as a tuberose in the sun, as smooth as a big apple on a winter day!
হেনরি ডেভিড থরো। এঁর লেখা বই ‘ওয়াল্ডেন পণ্ড’। এই বইটা পড়ার স্মৃতি অমৃতময় হয়ে আছে। একদিন বাড়ি থেকে একটা সতরঞ্চি নিয়ে এক পুকুর পাড়ে হাজির হয়েছিলাম নিরিবিলিতে বইটা পড়ব বলে। তখন স্কুলে পড়ি। পড়তে পড়তে সন্ধ্যা হয়ে এল। শেষ লাইনটা যখন পড়লুম ঠিক সেই মুহূর্তে দিনের আলোর শেষ নিশানাটুকু মিলিয়ে গেল। দিন ফুরল। সব কিছু যেন মাপে-মাপে এঁটে গেল! আজ চল্লিশ বছর পরে সত্যিকারের ওয়াল্ডেন পণ্ডের ধারে এসে সেই দিনটাকে সূর্যের আলোয় ঝলমলে একটা রজনীগন্ধার স্তবকের মতো, শীতদিনের একটা মসৃণ আপেলের মতো আবার দেখতে পেলুম।
বেশ কয়েক বছর আগে পরিবেশ ও জৈব কৃষি নিয়ে কাজ করা এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থায় মাসখানেকের অতিথি হয়ে হাজির হয়েছিলাম। সংস্থাটি চালান কয়েকজন আমেরিকান মহিলা। সংস্থার অবস্থান উইসকনসিন প্রদেশে। জায়গাটা কানাডার সীমান্তে। তিন দিকে পাহাড় আর বাকিটা কাঁটাতারে ঘেরা কয়েকশো একর জায়গা ঘিরে গড়ে উঠেছে এঁদের আশ্রম। আশ্রমের নাম সানফ্লাওয়ার ভ্যালি। আশ্রমে চাষবাস, পশুপালন হয়। সেসব আশ্রমিকরাই করেন। আমি যখন সেখানে গিয়েছিলাম তখন সেখানে আমিই একমাত্র পুরুষ আবাসিক ছিলাম।
আমাকে থাকতে দেওয়া হয়েছিল চার বেডরুমের একটা দুতলা কটেজে। দুতলায় দক্ষিণমুখী ঘরটায় ছিলাম আমি। দুতলার অন্য দুটো বেডরুমে দুই তরুণী থাকতো। তারা শিকাগোর কোনো এক কলেজে পড়াশোনা করতো। কোনো একটা দুমাসের এ্যাকাডেমিক ট্রেনিংয়ের ব্যাপারে তারা সেখানে জুটেছিল। কটেজের একতলায় একটামাত্র বেডরুম ছিল। সেই রুমে থাকতো আরেক তরুণী। সে ছিল আফ্রিকান। সেও দুতলার তরুণী দুটির সঙ্গে একই কলেজে পড়ে।
আশ্রমিকরা সকলেই উচ্চশিক্ষিতা। সকালে চায়ের আসরে আর দুপুরে ও সন্ধ্যাবেলায় লাঞ্চ ও ডিনারের জমায়েতে আশ্রমিক এবং উপস্থিত অতিথিদের মধ্যে নানা বিষয়ে সংলাপ হয়। সে সবের মান যথেষ্ট উঁচুদরের। আশ্রমিকরা নানান ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসেছেন। সেই কারণে না চাইতেও নানা সংস্কৃতির মধ্যে একধরনের সমন্বয় এখানে ঘটেই চলে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলির জন্য আশ্রমের একটা টিলার উপরে খোলা আকাশের নিচে একটা এ্যাম্ফিথিয়েটারও আছে। যে সময়টায় আমি ওখানে ছিলাম সেইসময় আফ্রিকা, দক্ষিণ ও উত্তর আমেরিকার লোকসঙ্গীত নিয়ে ওয়ার্কশপ এবং জলসাও চলছিল।
এলাকাটা প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকা। আশ্রমের দুতিন মাইলের মধ্যে অন্য কোনো গ্রাম নেই। কয়েকশো বছর আগেও এই এলাকায় বাস করতেন আমেরিকান আদিবাসীরা। তারপর উন্নয়ন হলে যা হবার তাই হয়েছে। আদিবাসীরা অধিকাংশেই হারিয়ে গেছেন। তাঁদের মধ্যে আত্মমর্যাদাহীন কেউ কেউ ইউরোপীয় উদ্বাস্তুদের মধ্যে সুকৌশলে ভিড়ে গিয়ে আমেরিকার নানা অঞ্চলে বাস নিয়ে জাতে উঠেও পড়েছেন।
সেদিন আফ্রিকান ড্রাম বাজানোর উপর শিক্ষামূলক ওয়ার্কশপ চলছিল। ওয়ার্কশপে অংশ নিয়েছিলেন এলাকার পঞ্চাশ ষাট মাইলের মধ্যে যেসমস্ত গ্রামবাসী আছে তাদের প্রতিনিধিরা। যেহেতু শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান চলছে তাই আফ্রিকান ড্রাম বাজানোর মাতোয়ারা ভাবটা তেমন নেই। মাঝে মাঝে মনোযোগে আলগা দেওয়া যাচ্ছে। সেই আলগা অবসরে মাঝে মাঝে প্রতিবেশি গ্রামের আমেরিকান আদিবাসী বিল গ্রিনডিয়ারের সঙ্গে দু’একটা কথা চালিয়ে যেতে পারছি। আমেরিকান ইন্ডিয়ানদের নিয়ে সাম্প্রতিক কালে জেরি মান্দেরের লেখা ‘ইন দ্য এ্যাবসেন্স অফ দ্য স্যাক্রেড’ বইটির কথা বিলের কাছে উত্থাপণ করলাম আমি, অমনি বিল ও জেনেট – জেনেট বিলের পার্টনার – দু’জনেই, খুব উৎসাহিত হয়ে উঠলেন। ওঁরা যেন ধরেই নিলেন যে, আমি আমেরিকান ইন্ডিয়ানদের অনেক খবরই রাখি এবং তাঁদের সমাজ-সংস্কৃতিকে পছন্দ করি। ওঁদের ধরে নেওয়াটা অবশ্য খুব ভুলও নয়। তাঁদের সংস্কৃতি নিয়ে দু’চারটে কথা চলতে চলতেই বিল খুশি হয়ে বললেন, এত কাছেই তো রয়েছেন এখন, চলে আসুন একদিন আমাদের ফার্মে।
আমি যেন এই নিমন্ত্রণের জন্যই অপেক্ষা করছিলাম, বললাম, সে তো খুব ভাল কথা। কবে যাব? তিনি একটু ভেবে নিয়ে বললেন, আগামীকাল? আমি বললাম, আগামীকাল তো এখানে বড়ো অনুষ্ঠান আছে! তার পরে কোনো একটা দিন? তিনি আবার একটু ভেবে বললেন, আগামীকাল তো জেনেটকে সঙ্গে নিয়ে আমি আসছিই। প্রোগ্রাম শেষ হলে নাহয় সকলে মিলে একসঙ্গেই যাব। আমি বললাম, তাহলে বেটিনার সঙ্গে কথা বলে রাখতে হয়। বেটিনা সানফ্লাওয়ার ভ্যালির অধ্যক্ষা। আমার কথাটা শুনেই আমার হাত শক্তভাবে ধরে উঁচু গলায় বেটিনাকে হাঁক পেড়ে তিনি বললেন, হে বেটিনা, টুমরো এ্যাফটার দ্য প্রোগ্রাম অরণি উড লিভ সানফ্লাওয়ার ভ্যালি উইথ এ্যাস টু বি উইথ এ্যাস ফর আ হৌল ডেই। বেটিনা খুশি মনে বললেন, ও ইটস ওয়ন্ডরফুল!
সেদিন ওয়ার্কশপ চলাকালীন মিলওয়াকি, ম্যাডিসন আর বারাবু থেকে বেশ কিছু মানুষ এসে হাজির হলেন, এবং, এদিক ওদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে অনুষ্ঠান শুনতে থাকলেন। যাঁরা এলেন তাঁদের মধ্যে ম্যাডিসনের গীতিকার ও গায়ক জেসন মুন, আর, তাঁর টিন এজার সন্তান গিলকে আমি চিনতে পারলাম। চিনতে পারলাম ম্যাডিসনবাসী বেটিনার কমবয়সী বান্ধবী মেলোডি নামধারী এক ভদ্রমহিলাকেও এবং তাঁর ষোড়শী কন্যা রেইনকে। জেসনের ছেলে গিল ও মেলোডির মেয়ে রেইন এসেই কোণে বসে এমন গল্প জুড়ল যেন এখানে দ্বিতীয় আর কেউ নেই। এলেন মিলওয়াকির বেঞ্জামিন রাস। রাসের সঙ্গে আরও পাঁচজন ত্রিশ অনূর্দ্ধ্ব যুবক এবং এক যুবতীও এলেন। বেঞ্জামিনের সহযাত্রীরা সকলেই এককালে নিকারাগুয়ার বাসিন্দা ছিলেন। এঁরা সকলেই হয়ত নন-রেসিডেন্ট নিকারাগুয়ান টাইপ। নিকারাগুয়ানরা আগামীকাল ভিক্টর নিয়েতোর সঙ্গে গানের দলে থাকবেন।
আসর শেষ হলে বিল ও জেনেট ফিরে গেলেন তাঁদের ফার্মে। বাকিরা যাঁকে যে কটেজ দেওয়া হয়েছে, সেই কটেজে পৌঁছে গেলেন। আমি, ভিক্টর নিয়েতো, বেঞ্জামিন রাস, ওমর আর নিয়েতোর পাঁচ নিকারাগুয়ান সহযোগী যুবক এবং এক যুবতী রাত্রিবাসের জন্য সেদিনের মতো পাইন কটেজের উদ্দেশে রওনা দিলাম। পাইন কটেজে ঢুকেই ঘুম পেয়েছে ঘোষণা দিয়ে বেঞ্জামিন একটি ঘরে, এবং সেই যুবতী আর একটি ঘরে ঘুমোতে চলে গেলেন। আমিও ঘুমোবার অভিপ্রায় জানিয়ে, আমার ঘরের দিকে এগোলে ভিক্টর পথ আটকে বললেন, আরে চলেছ কোথায়? এবার তো আমাদের প্রোগ্রাম শুরু!
ভিক্টর আমাকে টেনে নিয়ে এলেন ড্রয়িংরুমের সোফা অবধি। তারপর তিনি ‘ওমর’ বলে হাঁক ছাড়লেন জমিদারি স্টাইলে। সামনে এসে হাসিমুখে দাঁড়াল ওমর। তিনি সস্নেহে ওমরকে নির্দেশ দিয়ে বললেন, ড্রিংকসগুলো বের করো। ভিক্টর নিজের ব্যাকপ্যাক থেকে কয়েক কেজি চিকেন পকোড়া বের করে, সেগুলো ওভেনে গরম করতে কিচেনে গেলেন। বাকি যুবকরা তখন বাদ্যযন্ত্রগুলোকে বের করে ফাঁকা চেয়ার ও টেবিলের উপর রাখতে থাকলেন।
সকলের গলা খানিকটা ভিজলে, হঠাৎ গা ঝাড়া দিয়ে উঠে, ভণিতা বাদ দিয়েই, টেবিল থেকে তাঁর গিটারখানা হাতে তুলে তার তারে ঝংকার দিয়ে ঝাড়া গলায় স্পানিশ গান ধরলেন ভিক্টর। গানের সঙ্গে গিটারের ঝংকারে নাচও এসে গেল তাঁর। ওমর ও বাকিরা নিজের নিজের বাদ্যযন্ত্র বাজাচ্ছিলেন। ভিক্টরের গানের সঙ্গে তাঁদের মধ্যে নাচের ভাবের সংক্রমণ হল। আমি হাতে তালি দিচ্ছিলাম দেখে ওমর এক পলক বাজনা থামিয়ে, একটা ব্যাগ থেকে খঞ্জনির মতো একটা জিনিস বের করে আমার হাতে ধরিয়ে দিলেন। যত সময় যায়, ভিক্টরের গলা তত খুলতে থাকে। একবার ভাবলাম এত রাতে এত হুল্লোড় কি ঠিক? তখুনি মনে হল যে, এখানে পড়শি কোথায়, কাকে উৎপাত করা হবে! মার্গ্রেটের কটেজও এখান থেকে অন্তত তিনশো মিটার দূরে, জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে এখানকার শব্দ সেখানে পৌঁছানো বেশ শক্ত।
ভিক্টরের গান সুরে ও ছন্দের ওঠাপড়ায় এমন সাবলীল হয়ে উঠল যে, কোনো ভিনদেশি গান শুনছি এই ভাবটাই আমার রইল না আর। তাঁর গান শেষ হলেই তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, এই গানটা কি অশান্ত সাগরের তীরে দাঁড়িয়ে, কিংবা, সাগরের কিনারা বেয়ে নৌকো বাইতে বাইতে গাইবার মতন মাঝিদের গান? ভিক্টর তাঁর গিটার সোফায় নামিয়ে আনন্দে লাফিয়ে উঠে, এবং, জোরে হাত তালি দিয়ে বললেন, চমৎকার! এই দুটোই – এগুলো মাঝিমাল্লাদের গাইবার গানই বটে। আর এই গানও ছোটো নদীতে নয়, সাগরের তীর ছেড়ে জলে নেমে মাঝিদের ভেসে চলার গান, তাও বটে। আমার আন্দাজ মিলে গেছে জেনে বুক ফুলে উঠল আমার।
ভাল শ্রোতা পেয়ে এখন ভিক্টরকে আর কে পায়। একের পর এক গান গেয়ে ও নেচে চললেন তিনি। আমার মনে হল, তিনি যে পাইন কটেজে এসেই গলা ভিজিয়েছেন এমন নয়। এখনও এক গান শেষ করে আরেকটা গান ধরবার মুখে, তিনি গলাটা একটু ভিজিয়ে নিচ্ছেন। বাকিদেরও সেই অবস্থা। এঁরা যেন সকলেই কলেজের হোস্টেলজীবনে আছেন এখন। মনে হচ্ছে, এই গলা ভিজানোর কাজটা মিলওয়াকি থেকে আসার পথে গাড়িতেই শুরু করেছিলেন এঁরা। নাহলে এত আবেগ আসছে কোথা থেকে? গানগুলোয় উচ্চারিত স্প্যানিশ শব্দগুলোর অর্থ উদ্ধার না করতে পারলেও, এবং, গানের ও বাজনাগুলোর সঙ্গে অপরিচিত হলেও, সেগুলো আমি রীতিমতো উপভোগ করতে লাগলাম।
ভিক্টর পর পর গান গেয়ে একসময় হাঁপিয়ে উঠলেন। তখন বাকিরা শুরু করল। আমিও গাইতে পারি বলে, ভিক্টরের আমাকেও গাইতে বললেন। আমি বললাম, আমার গানের কথা তো আপনারা বুঝবেন না, আর কথা না বুঝলে এই গানের স্বাদও পাবেন না। ভিক্টর বললেন, গানের আবার কথা কি, গুলি মারো ওসবে, তুমি গান ধরো। আমি দুটো রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইলাম। প্রথমে, ‘তোমার খোলা হাওয়া লাগিয়ে পালে টুকরো করে কাছি/ আমি ডুবতে রাজি আছি’ এবং, পরে, ‘বিশ্বসাথে যোগে যেথায় বিহারো/ সেইখানে যোগ তোমার সাথে আমারো’। নিকারাগুয়ান বাজনাগুলো আমার গানের সঙ্গে বেশ মিলে গেল। গান শেষ হলে, গানগুলোর অর্থ জানতে চাইলেন ভিক্টর। অর্থগুলো বললাম। অর্থ শুনে ভিক্টর বললেন, টেগোর ইজ গ্রেট। এক পলক চুপ করে থেকে ঝপ করে আমাকে বললেন, কাল যখন এ্যাম্ফি থিয়েটারে আমার দল গান গাইবে তখন, তোমাকেও এই দুটো গান গাইতে হবে, রিহার্স্যাল তো এখন হয়েই গেল। শুনে আমি উত্তেজিত বোধ করলাম, প্ল্যানটা রোমহর্ষক ঠেকল।
দেওয়াল ঘড়ির কাঁটায় রাত তিনটে দেখাচ্ছে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ভিক্টর বললেন, আফটার টেগোর দেয়ার কান্ট বি এনিমোর সংস! ওমর বলল, এখন ঘুমোতে না গেলে কালকে স্টেজে ঘুমোতে হবে। অবশেষে যে যার ঘরে ঘুমুতে গেলাম। পরের দিন ঘুম ভেঙে ওমরের গাড়িতে সানফ্লাওয়ার ভ্যালি পৌঁছে দেখি সেখানে বনেদি বাড়ির উৎসবের চেহারা। কে কোথায় কি করছেন তার হদিশ মেলা ভার। ইসাবেলা, হ্যাওলি, বেটিনা প্রভৃতিদের কাউকেই দেখছি না, তাঁরা নানা কাজে জড়িয়ে আছেন। পঞ্চাশ একশো মাইলের ভিতর সানফ্লাওয়ার ভ্যালির শুভার্থী যাঁরা আছেন, তাঁরা অনেকেই এসে উপস্থিত হচ্ছেন। সকাল সাড়ে দশটায় ফোদের আফ্রিকান ড্রাম বিটিং অনুষ্ঠান। আজকের দিনে সর্বক্ষণের রান্নার দায়িত্বে আছেন ভিক্টরের স্ত্রী, মেলোডি, মিলওয়াকির বেঞ্জামিন রাস এবং এই সকলকে নেতৃত্ব দিয়ে ডাইনিং টেবিলের উপর রান্না করা খাবার সারাদিনই থেকে থেকে সাজিয়ে রাখছেন মার্গ্রেট।
(২)
ব্রেকফাস্ট শেষ হতে অতি সৌম্যদর্শন, মধ্যবয়সী এক আমেরিকান ভদ্রলোক ডাইনিং হলে প্রবেশ করলেন। তাঁকে দেখে মেলোডি কৌতুকে করে বললেন, এই যে, ডেভিস, আছেন কেমন! ডেভিস মেলোডির সঙ্গে যেসব কথা বললেন তার কোনো মানে বুঝতে পারলাম না। তাঁদের সব কথাই ইঙ্গিতের ভাষায়। ডেভিস একে একে সকলের সঙ্গেই কথা বললেন। যাঁর সঙ্গেই তিনি কথা বলছেন, কথা শেষ হতেই তাঁর হাতে একটা কাগজের প্যাকেট গুঁজে দিছেন। দেখলাম সেই প্যাকেটের ভিতরে আছে চারটে পেন্সিল, একটা পেন্সিল কাটার, উইসকনসিন স্টেটের একটা ম্যাপ, এবং, একটা বড়ো চকোলেট। তিনি মার্গ্রেটের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করতেই মার্গ্রেট তাঁর সঙ্গে আমার আলাপ করিয়ে দিয়ে, টি-রুমের দিকে হাত তুলে, এবং, চোখ টিপে হেসে ডেভিসকে বললেন, যাও, আগে এক কাপ চা লাগাও।
ডেভিস টি-রুমের দিকে এগোলে মার্গ্রেট পিছন থেকে আমাকেও চোখ টিপলেন। মার্গ্রেটের ইশারার অর্থ আমি বুঝতে পারলাম না। ডেভিসের কোন চা পছন্দ জিজ্ঞেস করে সেই চায়ের টি-ব্যাগ দুটো কাপে ডুবিয়ে ওভেনে বসালাম। ডেভিসকে তাঁর কাপ এগিয়ে দিয়ে, নিজের কাপ হাতে নিয়ে কোথায় কি চলছে বুঝবার জন্য বাইরে গেলাম। বেরুবার মুখে আমার হাতেও একটা কাগজের প্যাকেট ধরালেন ডেভিস, যার ভিতরে সেই চারটে পেন্সিল, একটা পেন্সিল কাটার, উইসকনসিনের একটা ম্যাপ, এবং, একটা বড়ো চকোলেট রয়েছে। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম যে, আমি ডাইনিং হলের উপর দিয়ে বেরুনোর সঙ্গে সঙ্গেই মেলোডি ও মিসেস ভিক্টরের পিছু পিছু ঘুরে কথা বলতে থাকলেন ডেভিস।
গেটের বাইরে, পিচ রাস্তার ধারে, পার্ক করে রাখা গাড়ির সংখ্যা বেড়ে গেছে। আশ্রমের ভিতরে অনেক নতুন মুখও দেখা যাচ্ছে। অনেকেই চারপাশে তাকাতে তাকাতে পাহাড়ের উপরের দিকে যেখানে এ্যাম্ফি থিয়েটারের স্টেজ, সেইদিকে যাচ্ছেন। তাঁদের যাওয়ার পথে কোথাও ঘাস-ঢাকা রাস্তার উপরে রাজহাসের দল মন্থর ছন্দে হেঁটে বেড়াচ্ছে, কোথাও পায়ে-চলা পথের অল্প দূরে গায়ে মোটা কম্বলের মতো লোমের ভার নিয়ে, হৃষ্টপুষ্ট ভেড়ার দল সার দিয়ে তৃণভোজের উৎসব করছে, কোথাও পাহাড়ের ঢালে পেটানো চেহারার দু’তিনটে ঘোড়া ঝকঝকে রোদের মধ্যে গাছগাছালির আলোছায়ায় মনের সুখে জগিং করছে। এই রাজহাঁস, এই ভেড়ার পাল, আর, এই ঘোড়াদের পরিবার – সকলেই সানফ্লাওয়ার ভ্যালির স্থায়ী সদস্য। এখানকার সব বাসিন্দাদের সঙ্গেই এইসব প্রাণীদের বোঝাপড়া আছে, প্রত্যেকের সঙ্গে প্রত্যেকের ভাব-বিনিময়ও হয়।
আমিও দলের পিছু পিছু এ্যাম্ফি থিয়েটারে পৌঁছালাম। সেখানে সানফ্লাওয়ার ভ্যালিতে প্রস্তুত জ্যাম, জেলি, আচার, ফ্রুট জুস, বেকারিজাত সামগ্রীর প্রদর্শনী দিয়েছেন এমা ম্যাকগ্যারি ও দেব। প্রদর্শনীর পাশে স্ন্যাকস ও চায়ের স্টলও দিয়েছেন তাঁরা। খোলা জায়গায় অনেকেই ইতস্তত ঘুরে বেড়াচ্ছেন। একটা ম্যাপল গাছের নিচে কিশোর গিল এবং কিশোরী রেইন নিজেদের জগৎ বানিয়ে নিয়ে বিভোর হয়ে আছে। দক্ষিণের দিকে বড়ো আপেল গাছের তলাটা ভাল করে পরিষ্কার করে সুতির কার্পেট পাতা আছে। কার্পেটের উপর রাজ্যের আফ্রিকান মিউজিক্যাল ইন্সট্রুমেন্ট রাখা রয়েছে। আফ্রিকার মিস্টার ফোদে, স্টেলা ও ম্যাগি এমাদের টি স্টলের সামনে একটা বেঞ্চে বসে আছেন। চা পান করতে করতে নিশ্চিন্ত আরামে তাঁরা নিজেদের মধ্যে কথা বলে যাচ্ছেন। বুঝতে পারলাম যে, আফ্রিকান ড্রাম বিটিংয়ের অনুষ্ঠান এ্যাম্ফি থিয়েটারের মঞ্চে না হয়ে, খোলা আকাশের নিচে এই আপেল গাছের তলাতেই হবে।
এখনকার আপাতত ঢিমে-তেতালা ভাব লক্ষ করে বুঝলাম যে, অনুষ্ঠান শুরু হতে কিছুটা দেরিই হবে। সেইটা বুঝে আবার ডাইনিং হলেই ফিরে গেলাম এই আন্দাজ করে যে, সেখানেও এখন মজাদার কিছু চলছে। ডাইনিং হলে পৌঁছে দেখলাম যে, হল একেবারে ফাঁকা। অনুমান করলাম যে, সেখানে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা তাহলে এ্যাম্ফিথিয়েটারেই চলে গেছেন। আমি যে রাস্তা ধরে পাহাড় থেকে নেমেছি তাঁরা হয়ত সেই রাস্তা দিয়ে না উঠে, অন্য রাস্তা ধরেছেন।
(৩)
ডাইনিং হল শুনশান দেখে পাশের লাইব্রেরি কাম মিউজিয়াম রুমে ঢুকলাম। সেখানে মেঝের উপর শুয়ে আছে ব্রায়ান। বেটিনা ও ইসাবেলা নিঃশব্দে তার পা ড্রেসিং করছেন। এতটাই নিঃশব্দে যে তাঁরা যে এখানে আছেন তা আমি ডাইনিং হলে বসে থেকেও বুঝতে পারি নি। ব্রায়ান কাতর দৃষ্টিতে এই দুই মহিলার দিকে মাঝে মাঝে তাকাচ্ছে। আমাকে দেখে সহসা রাগ নিয়ে ইসাবেলা বললেন, আপনি কি আমরা যতক্ষণ না ফিরি ব্রায়ানের কাছে একটু থাকতে পারবেন? তাঁর রাগের কারণ ধরতে না পারলেও স্বাভাবিক স্বরে বললাম, না পারার তো কোনো কারণ নেই।
আমার উত্তর পেয়ে ইসাবেলা এবার ফেটে পড়ে বললেন, আমরা রেইন আর গিলকে বলেছিলাম, তোমরা তো গল্পই করবে, তো, আমরা যতক্ষণ না ফিরি, তোমরা নাহয় ব্রায়ানের কাছেই বসে গল্পটা কোরো! ওদের কাণ্ডজ্ঞান দেখুন, কাউকে কিচ্ছুটি না বলে, ব্রায়ানকে একা ফেলে, দু’জনেই কোথায় কেটে পড়েছে – ননসেন্স! ইসাবেলার রাগের কারণটা এবার বোঝা গেল।
ব্রায়ানের পায়ের ঘা বিশ্রীরকমের বেড়েছে, মনে হয় ক্যান্সারের পচনের মতো একটা ব্যাপার শুরু হয়েছে। এই মুহূর্তে তার কেবল শুশ্রূষাই প্রয়োজন। এই পরিস্থিতিতে ইসাবেলা অস্থির হতেই পারেন। তিনি একা নন, বেটিনাও। ইসাবেলা যখন রাগ দেখালেন, তখন বেটিনা চুপ করে থেকে ইসাবেলার রাগকে যেন সমর্থনই করলেন। ঘরের মধ্যে তেমন আলো হাওয়া নেই দেখে ইসাবেলা ও বেটিনা দু’জনে মিলে ধরাধরি করে এবার কার্পেট সমেত ব্রায়ানকে তুলে নিয়ে ডাইনিংরুম, টি-রুম পেরিয়ে পার্কের ম্যাপল গাছের ছায়ায় গিয়ে নামালেন। এখন ইসাবেলা হেসে বললেন, আপনি দোলনায় দোল খেতে পারেন, যত খুশি চা পান করতে পারেন যতক্ষণ না আমরা ফিরছি, কেমন!
তাঁরা বেরিয়ে পড়লেন। সানফ্লাওয়ার ভ্যালির সামনে দিয়ে যে পিচ রাস্তা গেছে সেই রাস্তা ধরে আপে ও ডাউনে এগিয়ে যাবেন তাঁরা। এই রাস্তার উপরে যেখানে কোনো শাখা রাস্তা মিশেছে, বা, যেখান থেকে কোনো শাখা রাস্তা বেরিয়ে গেছে সেইসব সংযোগস্থলে, সানফ্লাওয়ার ভ্যালি পৌঁছানোর পথনির্দেশিকার প্ল্যাকার্ড পুঁতবেন তাঁরা। এতে আজকের অনুষ্ঠানে প্রথমবারের জন্য যাঁরা যোগ দিতে আসবেন তাঁদের ড্রাইভিংয়ের সুবিধা হবে।
দেখা গেল, ইসাবেলার কথা মতোই আমি দোলনায় বসে চায়ে সুখের চুমুক দিচ্ছি। গ্রীষ্মদুপুরের বেশ একটা জোরালো অথচ মিষ্টি হাওয়া উঠেছে, আকাশ যতটা পরিষ্কার হতে পারে ততটাই পরিষ্কার। এই পরিবেশে ব্রায়ান কিছুটা সুস্থ বোধ করল, তার আচ্ছন্নতা কিছুটা কমল। এক একবার চোখ খুলে তাকালও। আমি মাঝে মাঝে কার্পেটে টান দিয়ে, সরে যাওয়া ছায়ার দিকে তাকে সরিয়ে দিতে থাকলাম। তাতে সে খুশি হচ্ছিল। গতকালের বিকেল থেকে তার দিকে কেউই আর তাকাবার সময় পাচ্ছেন না। সব মিলিয়ে তার এখন খুব সঙ্কট।
দোলনায় বসে সানফ্লাওয়ার ভ্যালির গেটটা পরিষ্কার দেখা যায়। ইসাবেলা ও বেটিনার পথ চেয়ে নজর রেখেছি সেইদিকে। তাঁরা না ফিরলে আমি নড়তে পারছি না। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গেট দিয়ে অতিথিদের আনাগোনাও বাড়ল। কেউ গেটের বাইরে গাড়ি পার্ক করছেন, কেউ গাড়ি নিয়ে সোজা ভিতরে এসে ফাঁকা জায়গায় পার্ক করছেন। দেখতে দেখতে গাছের ছায়া সরতে সরতে পাঁচ ফুট দূরে সরে গেল। আমিও কার্পেটের কোণা ধরে টেনে ব্রায়ানকে পাঁচ ফুট সরিয়ে দিয়েছি। এখন একেবারে দোলনার নিচে এসে গেছে সে। তার আর যন্ত্রণা নেই, ওষুধের প্রভাবে সে ঘুমোচ্ছে এখন।
আজ লাঞ্চের ব্যবস্থা নেই। ভারী ব্রেকফাস্টের আয়োজন ছিল সকালে। তার পরেও কারুর খিদে পেলে সে মনের মতো কিছু খাবার ডাইনিং টেবিলেই পেয়ে যাবে। ফলমূল, বেকারির পাউরুটি, চিকেন ফ্রাই – এইসব বস্তু প্রচুর পরিমাণে রাখা আছে সেখানে। আজকের মূল খাওয়া বিকেল ছটায় এ্যাম্ফি থিয়েটারের লনের বুফে ডিনারে। সকলের জন্যই উন্মুক্ত আমিষ নিরামিষ দু’ধরনের ডিনার থাকবে। ডিনারের সুষ্ঠু ব্যববস্থাপনার জন্য সেখানে নিযুক্ত থাকবেন আজকের ভল্যান্টিয়াররা। তাঁদের সহযোগিতা করবেন এখানকার এমা, দেব, হ্যাওলি, ল্যারি, মর্গ্যান, মিসেস ভিক্টর, মেলোডি ও মার্গ্রেট। শুনছি যে, এই নির্জন আবাসে আজ শিল্পী কুশীলব বাদ দিয়েও বেশ কয়েকশো মানুষের উপস্থিতি ঘটবে। সানফ্লাওয়ার ভ্যালির পক্ষে এই সমাগমকে বড়োসড়ো সমাগমই বলা যায়।
বেলা দুটোয় ইসাবেলা ও বেটিনা ফিরলেন। তাঁদের মেজাজ এখন অনেকটাই হাল্কা। গাড়ি থেকে নেমেই তাঁরা সোজা এলেন পার্কে। ব্রায়ান তখন আরামে ঘুমোচ্ছে। দু’জনেই আমাকে অনেক করে ধন্যবাদ দিয়ে, ব্রায়ানের গায়ে হাত বুলোতে থাকলেন। আদর খেয়ে ঘুম ভেঙে স্বাভাবিক দৃষ্টিতে ব্রায়ান তাকাল তাঁদের দিকে। ইসাবেলা আক্ষেপ করে আমাকে বললেন, দুঃখিত, আপনাকে অনেকক্ষণ আটকে রাখলাম। আপনাকে অনেক, অনেক ধন্যবাদ। আপনি এবার নিশ্চিন্তে যেখানে খুশি যান। আমি স্মিত হাসলাম। তাঁরা দু’জনে ব্রায়ানের কার্পেট স্টেচার বওয়ার মতো দু’দিক থেকে ধরে তাকে বিল্ডিংয়ের ভিতরে নিয়ে গেলেন।
এতক্ষণে এ্যাম্ফি থিয়েটার জমে উঠেছে ভেবে, এবার সেখানেই হাজির হলাম। আপেল গাছের নিচে ফোদের দলের আফ্রিকান ড্রাম বিটিংয়ের আসর রীতিমতো জমে উঠেছে ফেখলাম, তাঁরা বাজাতে বাজাতে নাচছেন, শ্রোতা দর্শকরারেও অনেকটা দূর দিয়ে ঘিরে চওড়া বৃত্তরচনা করে, চারধারে গোল হয়ে বাজনাও শুনছেন, এবং, নাচছেনও। বৃত্তটা চওড়া হওয়ার জন্য যাঁরা দূরে দাঁড়িয়ে-বসে আছেন, অনুষ্ঠানটা তাঁদের কারুরই নজরের আড়াল হচ্ছে না। মাঠও সমতল নয়, অনেকটা উটের পিঠের মতো সবদিকে ঢালযুক্ত, সেইজন্য একটা প্রাকৃতিক গ্যালারি সৃষ্টি হয়েছে। মাঠের মাঝখানে একটা ঢাউস চেয়ারে হেলান দিয়ে, আধ-শোয়া হয়ে বসে আছেন পেন্সিল গিফট করনেওলা ডেভিস। তিনি এক হাতে বোতল উঁচু করে থেকে থেকে বিয়ারে চুমুক দিচ্ছেন, আর, অন্য হাতে ধরে আছেন জ্বলন্ত সিগারেট।
চেয়ারটা ডেভিস সঙ্গে করেই নিয়ে এসেছেন। সেটা হাওয়া ভরা চেয়ার। হাওয়া খুলে নিলে সেটা প্লাস্টিক শিট। চেয়ার বলতে দুটো হাতল, আর, পিছনে ঠেস দেওয়ার একটা হাওয়ার তাকিয়া। হাতলগুলোও হাওয়ার তাকিয়া, প্রতিটি তাকিয়া পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত। ডেভিসের ঠিক পিছনে বসেছেন বছর ত্রিশেক এক সুন্দরী। সুন্দরীর নিজের লাইটার খারাপ হওয়ায়, ডেভিসের লাইটারটা চাইলেন। ডেভিস বিয়ারের বোতল পাশে রেখে, এবং, সিগারেট ঠোঁটে চেপে রেখে তাঁর চেয়ারে পাশ ফিরে শুলেন। লাইটার হাতছাড়া না করে, সেটিকে ফস করে জ্বালিয়ে নায়িকার দিকে মেলে ধরলেন। নায়িকা মুখে সিগারেট নিয়ে ঝুঁকে নিজের সিগারেট ধরিয়ে নিয়ে, ডেভিসকে ‘থ্যাংকস’ দিলেন। ডেভিস নায়কোচিত ভঙ্গিতে একটা স্মিত হাসি ছাড়লেন। ডেভিসকে দেখে মজা লাগল, তাঁর সঙ্গে আলাপ করবার ইচ্ছা হল।
একটা ফাইবারের চেয়ার টেনে নিয়ে, আমি ডেভিসের পাশে গিয়ে বসলাম। শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর, ডেভিস আমাকে সিগারেট অফার করলেন। সেটা না নেওয়ায় তখন একটা চকোলেট দিলেন। জানলাম যে, তিনি পঞ্চাশ মাইল দূর থেকে আসছেন। সংসারে তাঁর কে কে আছেন প্রশ্ন করতে, তিনি বললেন যে, সবাই চোর বলে তিনি কাউকে বিয়ে করতে পারেন নি, এবং, বিয়ে করেন নি বলে তাঁর ছেলেমেয়ে হয় নি। তিনি একটা পেন্সিল কারখানার মালিক। গান শুনতে এসেছেন এখন, কিন্তু ভয় যে, এই ফাঁকে বাড়িতে কেউ তালা না ভাঙে। আমার দিকে আঙুল তুলে চোখে একটা চড়া দুষ্টু হাসি নিয়ে বললেন যে, তাঁর ধারণা যে আমার মতোই দেখতে শুনতে একেবারে নিপাট ভদ্রলোকরাই সুযোগ বুঝে বাড়ির তালা ভাঙে। তাঁর কথায় অপমানিত বোধ করব, না মজা পাব, বুঝে উঠতে পারলাম না।
সানফ্লাওয়ার ভ্যালি জুড়ে আজ যে উৎসবের মেজাজ, তাতে ডেভিসের মতো একজন মানুষকে পেয়ে উৎসাহ বাড়ল আমার।
আর কিছুক্ষণ পরেই, ঠিক বিকেল পাঁচটায়, শুরু হবে গানের অনুষ্ঠান। গান যাঁরা গাইবেন, তাঁরা কেউই মূলস্রোতের শিল্পী নন। তাঁরা গাইবেন কান্ট্রি সংস, আমরা যাকে লোকগীতি বলি আর কি। তার মধ্যে গণসঙ্গীতজাতীয় গানও থাকবে। আমেরিকান ইন্ডিয়ান শিল্পীরাও যোগ দেবেন, তাঁরা আদিবাসীদের গান গাইবেন। প্রথম শিল্পী মাইক জনসন ও সম্প্রদায়। তাঁরা মঞ্চে থাকবেন ছটা অবধি। ছটা থেকে সাতটা অবধি চলবে বুফে ডিনার। একক শিল্পীরা একের পর এক মঞ্চে উঠবেন ডিনারের পর। ভিক্টর নিয়েতো তাঁর দল নিয়ে সাড়ে আটটায় মঞ্চে উঠবেন। অর্থাৎ আমিও ওই সময় মঞ্চে উঠব। এই নিয়ে নার্ভাস বোধ হতে লাগল।
পৌনে পাঁচটায় এলেন বিল ও জেনেট। তাঁদের আজকের চেহারা কালকের থেকে পুরো আলাদা। সভাস্থলের লোকজনকে এক একবার কঠিন দৃষ্টিতে লক্ষ করছেন, এবং, কেউ সম্ভাষণ করলে দেঁতো হেসে সৌজন্য সারছেন তাঁরা। ব্যতিক্রম কেবল আমি। আমার চোখে চোখ পড়তে, তাঁরা স্বাভাবিকভাবে হাসলেন। ইশারায় তাঁদের কাছে ডাকলেন আমাকে। তাঁরা ঘাসের উপরই বসেছিলেন। আমি তাঁদের পাশে গিয়ে বসলাম। বিল মাথা ঝুঁকিয়ে আমার কানে কানে বললেন, তাহলে আজকের অনুষ্ঠান শেষ হলেই আমরা বেরুচ্ছি, এবং, আপনি আমাদের সঙ্গে যাচ্ছেন। আমি বললাম, একদম।
মঞ্চে মাইক জনসন ও তাঁর দল উঠেছেন। গানের মাঝখানে হঠাৎ বাজনা থামিয়ে মাইক অডিয়েন্সকে বললেন, এখানে যাঁরা প্রেমে পড়ে আছেন, তাঁরা হাত তুলে জানান দিন। তিনি অডিয়েন্সের এক দিক থেকে আরেক দিকে তাঁর নজর ঘোরাতে থাকলেন। নির্দিষ্ট লক্ষ্যে তাঁর দৃষ্টি দাঁড়িয়ে গেলে, সকলেই মঞ্চের দিক থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকালেন। আমিও তাকালাম। দেখলাম, আপেল গাছের চওড়া ডালের আনুভূমিক অংশে পা ঝুলিয়ে, অনেকটা রাধাকৃষ্ণের মতো, গিল ও রেইন পাশপাশি বসা এবং তাদের দু’জনেরই হাত তোলা। মাইক মঞ্চ থেকে তাদের অভিনন্দন জানিয়ে বললেন, পরের গানটা তোমাদের জন্য। তখনই মঞ্চের সব বাজনা বেজে উঠল। মাইক ডিগবাজি খেয়ে মঞ্চের বিপরীত প্রান্তে চলে গিয়ে, সাপ যেমন ফণা তুলে ধরে তেমনিভাবে ফণা তুলে, চড়া গলায় গান ধরলেন। শ্রোতাদের মধ্যে অনেকেই মঞ্চের ঠিক নিচে ফাঁকা জায়গাটায় উদ্দাম নৃত্য জুড়লেন। নাচিয়েদের মধ্যে গিলের বাবা জেসন, এবং, রেইনের মা মেলডিকেও দেখলাম।
ঘড়ি না দেখেও এখানকার মানুষ সময়ানুবর্তী। আজও দেখলাম এত নাচানাচি পরেও মাইকের গান শেষ হল ঠিক ছটায়, আর, তখনই সকলে বুফেতে যোগ দিলেন। একে অন্যের সঙ্গে কথা বলতে বলতে, খোলা মাঠে ঘুরে ঘুরে সকলে ডিনার করতে থাকলেন, আমিও। কিন্তু, মঞ্চে উঠে আমার গান আছে বলে নার্ভাস লাগছে, মুখ দিয়ে কথা সরতে চাইছে না। ভিক্টর নিয়েতো ও তাঁর দলের প্রায় সবাইই আমেরিকান রুচির সঙ্গে পরিচিত, তাঁদের কথা আলাদা, কিন্তু আমার আমেরিকার শ্রোতাদের রুচি সম্বন্ধে কোনো ধারণাই নেই। একটাই ক্ষীণ ভরসা এইটা নিয়ে যে, যদি আমার গাওয়ায় খামতি ঘটে তাহলে ভিক্টর তাঁর যন্ত্রানুসঙ্গে সেটা কিছুটা হয়তো সামলে দেবেন। গতকাল ওঁদের বাজনার সঙ্গে আমার গান চমৎকার মিলে গিয়েছিল।
ডিনার মিটিয়েও আমি বিল ও জেনেটের পাশেই ঘাসের উপরে বসে রইলাম। এঁরা এখনও জানেন না যে, একটু বাদে আমিও মঞ্চে উঠব। ওঁদের বলি নি, কারণ ওঁরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত হলেও আজ আগাগোড়াই ওঁদের একটু ছাড়া-ছাড়া ভাব। এইটা দেখে একসময় বিলকে জিজ্ঞেসই করে বসলাম, কোনো কারণে আপনি কি এখন চিন্তিত আছেন? বিল ম্লান হেসে বললেন, সেরকম কিছু নয়। অনুষ্ঠান তো ভালই হচ্ছে – তবে, তবে … আমি আপনাকে পরেই বলব। বুঝতে পারলাম যে, কোনো একটা বিষয়ে তাঁর বেশ অসন্তোষ ঘটেছে। রহস্যের আঁচ পেয়ে আমার কৌতূহল বেড়ে গেল। আপাতত তা সংবরণ করে অনুষ্ঠানই দেখতে থাকলাম।
দেখলাম ওদিকে ডেভিস এখন চেয়ারের উপর তাঁর পেন্সিল ও চকোলেটে ভর্তি ব্যাগটা রেখে দিয়ে পায়চারি করতে করতে অনুষ্ঠান দেখছেন। যে সুন্দরী তাঁর কাছে সিগারেট ধরিয়েছিলেন তিনি অনুষ্ঠানে একা এসেছেন, সানফ্লাওয়ার ভ্যালির কেউই তাঁকে চেনেন না। এত সুন্দরী ও কমবয়সী কোনো মহিলা এদেশেও সচরাচর একা ঘোরেন না। বস্তুত সুন্দরীকে পায়চারি করতে দেখেই ডেভিসও তাঁর পাশে পাশে পায়চারি করছেন। জলের খালি বোতল ফেলার জন্য সুন্দরী যখন গারবেজ ক্যান খুঁজছেন, তখন তাঁর হাত থেকে বোতলটা একরকম ছিনিয়ে নিয়ে, তাঁকে টপকে ডেভিস সেটা ছুঁড়ে ফেললেন গারবেজের বাক্সে। ডেভিসের কাছ থেকে এই উপকারটা পেয়েই সুন্দরী দ্রুতবেগে পুনরায় ফিরে গেলেন নিজের চেয়ারে।
সুন্দরী নিজের চেয়ারে বসে পড়লে, ডেভিসও পায়চারি থামিয়ে ফিরে গেলেন নিজের চেয়ারে। তাঁর শখের চেয়ারটাকে এবার ঘাসের উপর পিছলে নিয়ে পিছনে সরিয়ে নিয়ে গেলেন সুন্দরীর চেয়ারের পাশে। সুন্দরী খুশি হলেন, কি বিরক্ত হলেন, বোঝা গেল না। ডেভিস মধ্যবয়সী হলেও কম সুপুরুষ নন। তাঁর প্রথম দর্শনে নারীদেরও যে মুগ্ধতা ঘটে এমন তিনি অভিজ্ঞতা করে থাকবেন। সুন্দরী রাজহাঁসের মতো ঘাড় তুলে অনুষ্ঠান দেখছিলেন। পরস্পরের খুব কাছাকাছি বসেও তাঁদের মধ্যে একটা দূরত্ব থেকেই গেল। দু’জনের চেয়ারের উচ্চতা আলাদা, ডেভিসের চেয়ার মাটি-লগ্ন – প্রায় একটা বিছানার মতো। অসমান উঁচু চেয়ারে বসে কথা বলার সুবিধা নেই বলে, ডেভিস তাঁর মাথাটা সুন্দরীর চেয়ারের দিকে পুরোপুরি হেলিয়ে দিলেন। কিন্তু মাথা বেশিক্ষণ শূন্যে থাকতে পারে না, একসময় তা সুন্দরীর কোলে আশ্রয় নিল। সুন্দরী বিনা বাক্যব্যয়ে, সহজভাবেই নিজের চেয়ারটা মঞ্চের দিকে আরও পাঁচ ছয় ফুট এগিয়ে নিলেন। একা হয়ে গিয়ে ডেভিস এবার পায়ের উপর পা তুলে, একটা সিগারেট ধরালেন।
ইসাবেলা থেকে শুরু করে বেটিনা অবধি সকলেই এই অনুষ্ঠানে হাজির, নেই শুধু প্রৌঢ়া ন্যান্সি। কাল বিকেলেই তাঁকে একবারের জন্য দেখেছি। মিস্টার ফোদে যে আপেল গাছের নিচে বাজিয়েছিলেন সেইখানে বসেছেন ইসাবেলা আর বেটিনা, তাঁদের পাশে ব্রায়ান। তাঁদের দু’জনেরই আজ জবরদস্ত সাজ, এমন সাজ তাঁদের আগে কখনও দেখি নি। সেই আপেল গাছের তলাতেই একটু দূরে বসেছেন হ্যাওলি, দেব। হাতে কারুকার্যখচিত একটা লাঠি, জিন্স ও টি-শার্ট পরে মার্গ্রেটও আছেন অডিয়েন্সে। দুই পাশে তাঁর দুই মেয়ে। মেয়েরা থাকেন মিলওয়াকিতে। মায়ের প্রতিষ্ঠানের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়ে সানফ্লাওয়ার ভ্যালিতে অতিথি হিসেবে এসেছেন তাঁরা। ওই আপেল গাছের ধারেকাছেই রয়েছেন ন্যান্সি ছাড়া সানফ্লাওয়ার ভ্যালির সব সদস্যই। এমা ওই গাছতলায় নেই, কিন্তু তিনিও এই অডিয়েন্সেই আছেন।
আপেল গাছের নিচে যাঁরা বসেছেন, তাঁরা সকলেই এমার বেড়ালের পরিচিত। যেখানে ইসাবেলা ও বেটিনা বসেছেন, সেখানে আপেল গাছের ঠিক উপরের একটা ডালে, দু’হাত দু’পা দিয়ে সেই ডালটাকে কোলবালিশের মতো জড়িয়ে ধরে, চোখ মঞ্চের দিকে রেখে, সেই বেড়াল অনুষ্ঠান দেখছে। মাঝেমাঝে সে সানফ্লাওয়ার ভ্যালির সদস্যদের সঙ্গে সংকেতে আলাপ চালাচ্ছে, এবং, ঘাড় ঘুরিয়ে এমার উপরে নজরও রাখছে। এমা বসেছেন মাঠের মাঝখানে। অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ফিলাডেলফিয়া থেকে এমার বয়ফ্রেন্ড এসেছেন। এমার সাজ আজ সবাইকে ছাড়িয়েছে। এমনিতেই তাঁর শরীর জুড়ে ট্যাটুর ফোয়ারা, তার সঙ্গে আজ যুক্ত হয়েছে মেটাল অক্সাইডের বড়ো বড়ো কানের দুল, গলার হার, হাতের বালা ইত্যাদি।
(৪)
মঞ্চে এখন গান গাইছেন জেসন মুন ও তাঁর দল। জেসনের গান বাজনা-নির্ভর নয়, তাঁর গানে আছে কথা ও সুর নিয়ে হাজার পরীক্ষা-নিরীক্ষা। পাশ্চাত্য সঙ্গীতে জ্ঞান না থাকলে সে-সবের স্বাদ পাওয়া মুস্কিল। এককালে মার্কিন মিলিটারিতে উচ্চপদে চাকরি-করা, এবং, গানের টানে সেই চাকরি ছেড়ে-দেওয়া এই জেসন গানের মাধ্যমে সমাজের মূলস্রোতের মিথ্যাচারের বিরুদ্ধেই বক্তব্য রাখেন। তিনি আমার পরিচিত বলে, না বুঝলেও তাঁর গান মন দিয়ে শুনলাম।
দেখতে দেখতে সওয়া আটটা বাজল। আমার গলা শুকিয়ে এসেছে, মঞ্চে ওঠার সময় হল বলে। আমার মঞ্চে ওঠবার কথা ভিক্টরের দল ছাড়া আর কেউ জানেন না। এবার গ্রিনরুমে হাজির হয়ে যে গান দুটো গাইব সেগুলোর অনুবাদ ভিক্টরের হাতে দিয়ে বললাম, আমার গানের ভাষা কেউ বুঝবে না, তাই আমি গান ধরার আগে আপনি যদি গানের মানেটা অডিয়েন্সকে ইংরিজিতে বলে দেন তাহলে খুব ভাল হয়। ভিক্টর গানের কথাগুলো মন দিয়ে পড়ে নিয়ে, কাগজটা ভাঁজ করে পকেটে রাখলেন।
এখন আমাকে অডিয়েন্সে ফিরে যেতে দেখে ভিক্টর বাধা দিয়ে বললেন, যাচ্ছেন কোথায় – এক সঙ্গেই মঞ্চে উঠতে হবে। আমি ইতস্তত করলে তিনি বোঝালেন, এখানে আলাদা করে কোনো শিল্পীকে একক অনুষ্ঠান করবার জন্য ডাকা যায় না। আপনাকে আমাদের সঙ্গেই মঞ্চে উঠতে হবে, আপনি আমাদের দলের লোক। অতএব তাঁর কথামতো যথাসময়ে তাঁর দলের সঙ্গে আমিও মঞ্চে উঠলাম। যে যার জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়বার পর ভিক্টর হাতে স্পিকার নিয়ে গুড ইভনিং বলতেই তুমুল হাততালি শুরু হল। হাততালি থামলে ভিক্টর ঝাড়া গলায় গান ধরলেন।
ভিক্টরের প্রথম দফার গান শেষ হলে, তিনি শ্রোতাদের কাছে আমার পরিচয় দিয়ে স্পিকারে আমার নাম ঘোষণা করলেন পরবর্তী শিল্পী হিসেবে। আলোকিত মঞ্চ থেকে অন্ধকার অডিয়েন্সে কে কোথায় কি করছেন বোঝা যায় না, তবু মনে হল ব্রায়ান যেখানে শুয়ে আছে সেখান থেকে উৎসাহভরা দু’চারটে সিটির আওয়াজ এল। আরও দু’একটা উৎসাহব্যঞ্জক সিটির আওয়াজ এদিক সেদিক থেকেও এল। আমার গান প্রথম লাইনটা পেরোলেই মঞ্চে নাচানাচি, দাপাদাপি শুরু হল। ওমরের হাতে একতারার মতো যে জিনিসটা ছিল সেটাকেই বাউলের মতো বাজিয়ে সে মঞ্চ জুড়ে লাফাতে লাগল। ভিক্টরের কাছে ছিল গুপিযন্ত্রের মতো একটা জিনিস – সেইটা তিনি বাউলের মতো বাজালেন। গান শেষ হতেই ভিক্টর যখন দ্বিতীয় গানটার মুখবন্ধ করতে যাবেন, অমনি সেই আপেল গাছের নিচের থেকে আবার দু’তিনটে গলার ‘ওয়ান মোর, ওয়ান মোর’ আওয়াজ আসতে লাগল।
আমার গানের পরে দলের বাকি গানগুলো হয়ে গেলে আমরা মঞ্চ থেকে নেমে এলাম। স্টেজ থেকে নামতেই বেটিনা ও ইসাবেলা আমাকে অভিনন্দন জানিয়ে আলিঙ্গন করলেন। আমার গান উতরে গেছে দেখে আমার আহ্লাদের সীমা রইল না। ঘড়িতে তখন সাড়ে নটা। অনুষ্ঠান চলবে আরও আধঘন্টা। ভিক্টরের দলবল রাতেই মিলওয়াকি ফিরবেন বলে তাঁরা সদলবলে গাড়িতে চড়ে বসলেন। ডাইনিংরুমে দশটার পর বিল আমার জন্য অপেক্ষা করবেন, আমি তাই ভিক্টরের গাড়িতে উঠে পড়লাম। তিনি আমাকে মেন বিল্ডিংয়ের পাশে নামিয়ে দিয়ে গেলেন।
এতক্ষণের স্নাবয়িক উত্তেজনায় ক্লান্ত হয়ে ভাবলাম হাতে যেটুকু সময় আছে তাতে এক কাপ চা পান করে বিলের সঙ্গে বেরিয়ে পড়তে পারব। মেন বিল্ডিংয়ের কাছে পৌঁছে দেখি, লনের উপর একটা ক্যাম্পার ভ্যানের পাশে ডেভিস পায়চারি করছেন একা। আমাকে দেখেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে তিনি বললেন, এই-যে, এখানে আপনি! আপনার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। বলেই, ফস করে একটা সিগারেট ধরালেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এক কাপ চা চলবে? তিনি বললেন, ও ইয়েস!
দু’কাপ চা নিয়ে দু’জনে ডাইনিংরুমে বসলাম। ডেভিসকে জিজ্ঞেস করলাম তিনি রাতে সানফ্লাওয়ার ভ্যালিতেই থাকবেন কিনা। তিনি বললেন, ওরে বাপরে, আমাকে ফিরতেই হবে, নাহলে চোরে বাড়ির তালা ভাঙবে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনি গাড়ি এনেছেন? তিনি বললেন, ওই তো, লনে রেখেছি।
চায়ে চুমুক দিয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করি তাঁর কী জরুরি কথা আমাকে বলবার ছিল। তিনি উদ্বিগ্ন মুখে আমাকে বললেন, ওই ভিক্টর আর জেসনের সঙ্গে সাবধানে মেলামেশা কোরো, ওরা চোর। ওরা মোটেও পরিবেশ সচেতন নয়, ওরা গাছ কাটে, ওরা … আমার বাধায় ডেভিস থেমে গেলেন। আমি বললাম, ওঁদের সঙ্গে আমার দেখাই হয় দু’চার বছর বাদে বাদে। এখানে এলে তবেই, তাও দু’একদিনের জন্যই। একটু থেমে বললাম, আমাকে তো এখন বেরোতে হবে। ওই যে বিল গ্রিনডিয়ার আছেন-না, ওঁর সঙ্গে এখুনি আমায় বেরোতে হবে। দাঁড়ান, আমার ব্যাগটা নিয়ে আসি।
ডাইনিং রুমের পাশের মিউজিয়াম কাম লাইব্রেরিতে আমার ব্যাগটা রাখা ছিল। সেখান থেকে সেটা নিয়ে এসে ডেভিসকে বললাম, চলুন। বিল এই ডাইনিং রুমের দিকে এলেই তাঁকে আমি ধরে নোব এই ভেবে ডাইনিংরুমের বাইরে এলাম। বাইরে এসে ডেভিসকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনার গাড়ি কোনটা? তিনি লনে পার্কিং করা ক্যাম্পার ভ্যানটা দেখালেন। আমি অবাক হয়ে বললাম, একা বেরুলেও আপনি এই ক্যাম্পার ভ্যান নিয়ে বেরোন নাকি? তিনি বললেন, আমার আর গাড়ি নেই। আমি বললাম, এই গাড়ির যা দাম তাতে তো পাঁচটা গাড়ি হয়ে যেত! তিনি শুকনো হেসে বললেন, এই ভ্যানটারই প্রয়োজন আমার। আমি বললাম, কি রকম? তিনি বললেন, আমি কখনও বাড়ির বাইরে রাত কাটাই না। আমার অনেক বড়ো বাড়ি আছে একটা, সেখানে অনেক তালাচাবি। সারাদিন কাজকর্ম করে বাড়ি ফিরে অত চাবিতালা খুলতে পারি না। তখন বাড়িরই লনে এই ক্যাম্পার ভ্যানে রাত কাটাই! আর অত বড়ো বাড়ি পরিষ্কার রাখাও দায়, এটা মোটামুটি কারুর সাহায্য না নিয়ে নিজেই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা যায়।
খানিক পরে এ্যাম্পি থিয়েটারের অনুষ্ঠান শেষ হয়ে যেতে সানফ্লাওয়ার ভ্যালি থেকে গাড়িগুলো একে একে বেরিয়ে যেতে শুরু করল। বিলের গাড়ি মেন বিল্ডিংয়ের দিকে বাঁক নিচ্ছে দেখে হাত তুলে দাঁড় করালাম। ডেভিসকে বিদায় জানিয়ে বিলের গাড়ির দিকে এগোলাম। বিল গাড়ি থেকে নেমে সামনের সিটের দরজা খুলে দাঁড়ালেন। গাড়িতে উঠতে যাব যেই, পিছন থেকে ডেভিস জোরে হাঁক দিয়ে বললেন, এক মিনিট দাঁড়ান। আমি থমকে দাঁড়ালাম। ডেভিস ছুটে এসে আমার হাতে একটা কাগজের প্যাকেট ধরালেন। প্যাকেটের মুখ ফাঁক করে দেখলাম সেই চারটে পেন্সিল, একটা পেন্সিল কাটার, উইসকনসিন স্টেটের একটা ম্যাপ, এবং, একটা বড়ো চকোলেট। তাঁকে জড়িয়ে ধরে বললাম, আবার দেখা হবে। তিনি বিলকে দেখিয়ে আবেগ নিয়ে আমাকে বললেন, এঁর সঙ্গ সুসঙ্গ, ইনি চোর নন, নিজের খাদ্য নিজে উৎপাদন করেন। তাঁর কথায় বিল হোহো করে হেসে উঠলেন।
(৫)
গেট থেকে বেরিয়ে মনরো কাউন্টির কান্ট্রি লাইব্রেরির রাস্তা ছেড়ে বাঁ দিকের ছোটো রাস্তায় আমাদের গাড়ি উঠল। এই রাস্তা ওয়াইল্ডক্যাট মাউন্টেন স্টেট পার্কের পাশ দিয়ে যায়। রাস্তা কোথাও সোজা নয়, আঁকাবাঁকা। এই বাঁ দিকে বেঁকছে, তো পরক্ষণেই ডান দিকে। চারদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার। গাড়ির হেডলাইটের আলোটুকু মাত্র সম্বল। অন্ধকারে হেডলাইটের আলো মুহূর্মুহূ দিক পরিবর্তন করে প্রেইরির ক্ষেতে আছড়ে আছড়ে পড়ছে। ঝোপঝাড়ের উপর চকিত আলো পড়ে, জঙ্গলটা যেন উল্টো দিক থেকে লাফিয়ে আমাদের ঘাড়ে এসে চড়তে চাইছে। শিরশিরে অনুভূতি হচ্ছিল তাতে। মিনিট দশেক এইরকম গিয়ে এক জায়গায় বাঁ দিকে একটা রাস্তা বেরিয়ে গেল। সেই রাস্তার মুখে গাড়ি থামিয়ে বিল বললেন, কিকাপু ভ্যালি রিজার্ভ স্টেট ন্যাচারাল এরিয়ায় ঢুকছি। আবার গা ছমছমে অনুভূতি হল আমার।
বাঁ দিকের রাস্তায় না গিয়ে গাড়ি এগুলো সোজা। আরও মিনিট দশেক পরে এক এ্যামিশ অঞ্চল পেরিয়ে আবার অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে গিয়ে একটা ফার্ম হাউসে পৌঁছালাম। পাহাড়ের উপর থেকে উপত্যকার ঢাল বেয়ে অল্প নেমে বিলের ফার্ম হাউস। বাড়িটা বড়োসড়ো, তবে আসবাবপত্রের বাহুল্যবর্জিত। এখানকার পক্ষে সময়টা গভীর রাত হওয়ায় জেনেট জিজ্ঞেস করলেন, এখন আপনি কিছু ড্রিঙ্ক করবেন, নাকি সোজা ঘুমুতে যাবেন। আমি শিশুর কণ্ঠ নকল করে মজা করে বললাম, ঘুমুতে। তাঁরা হাসলেন। বিল বললেন, খুব ভাল। তুমি আমেরিকানদের ফলো করো না। ভাল। – চলো তোমাকে তাহলে তোমার বাড়িতেই ড্রপ করে দিই।
পাহাড়ি রাস্তায় ঢাল বেয়ে, আরও অল্প একটু নেমে, একটা সাদা বাড়ির সামনে গাড়ি দাঁড়াল। জেনেট দৌড়ে গিয়ে বাড়ির বারান্দা পেরিয়ে উপত্যকামুখী ঘরের দরজা খুলে তার সামনে দাঁড়ালেন। অনেকগুলো ঘর নিয়ে সেই বাড়ি। ভিতরের দিকের একটা ঘরে আমাকে নিয়ে গিয়ে বললেন, এই ঘরে আপনি ঘুমাতে পারেন। জানালা দিয়ে হাল্কা চাঁদের আলোয় উপত্যকাটা চোখে পড়ছে। ঘরের এক কোণে টেবিল চেয়ার। টেবিলের উপর একটা বড়ো জামবাটিতে কিছু আপেল, কালো আঙুর, কমলালেবু ও কলা রয়েছে। বাটিটা দেখিয়ে জেনেট বললেন, খিদে পেলে ওইগুলো খেতে পারেন। অন্যপাশে ফ্রিজটা দেখিয়ে বললেন, ওর মধ্যে ওয়াইন আছে। পান করতে পারেন। বাড়িতে ফায়ার প্লেসও দেখলাম। সেটার দিকে আঙুল তুলে জেনেটকে জিজ্ঞেস করলাম, এটা চালু রাখতে তো প্রচুর কাঠ লাগে, না? তিনি বললেন, কাঠের তো অভাব নেই!
তাঁরা চলে গেলে, আলো নিভিয়ে জানালায় দাঁড়িয়ে জায়গাটাকে চাঁদের আলোয় দেখলাম। আভাসে মনে হল চারদিকে পাহাড়, মাঝখানে গোল উপত্যকা কড়াইয়ের ঢালের মতো নেমে গেছে। রাত্তিরটুকু ঘুমিয়ে নিয়ে পরের দিন অন্ধকার থাকতেই বেরিয়ে পড়লাম। কিছু দূর এগোবার পরেই ভোরের আলো ফুটল। পাকদণ্ডী বেয়ে নামতে নামতে উপত্যকার প্রায় নিম্নতম এলাকায় চলে গেলাম। একেবেরে নিচে অবধি যেতে পারলাম না। সেখানে উঁচু নিচু পাথর। উল্টোপথে আমার বাড়ির কাছে ফিরতে পাহাড়ের মাথায় রোদের আলো পড়ল। সেই আলোয় দেখলাম আমার বাড়ির দেওয়ালে বাইসন, হরিণ ও অন্যান্য প্রাণীদের মুখের ছবি আঁকা। ছবিগুলো বাস্তবানুগ নয়। কল্পনার মিশেলে রীতিমতো শিল্পবস্তু হয়ে উঠেছে সেগুলো।
এখান থেকে তিনশো মিটার মতো দূরে আরও একটা বাড়ির দেওয়ালের গায়ে এইরকম আঁকা দেখেছি। যে বাড়িতে আমি রয়েছি আর সেই বাড়িটা হুবহু একরকম। দুটো বাড়িতেই কেউ বাস করেন না। উপত্যকার আর একটু উপরে বিলের বাড়ি। এগুলো ছাড়া এই উপত্যকায় আর কোনো বাড়ি নেই। নিচের দিকে সিনেমা হলের মতো টালির ছাউনি একটা বিল্ডিং। বিলের বাড়ির সামনে গিয়ে দেখলাম উঠান সংলগ্ন কাঠের গোলায় বিল নিজে কাঠ চেরাই করছেন। জেনেটও রয়েছেন তাঁর সঙ্গে। বাড়ির সামনে আমাকে দেখে বিল চিৎকার করে সুপ্রভাত জানিয়ে সঙ্গে সঙ্গে মেশিন বন্ধ করে দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন।
বিস্মিত হয়ে আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, এত সকালেই কাজে লাগেন? তিনি হোহো করে হাসলেন। প্রায় সব কথাতেই তাঁর উচ্চহাসির উদ্রেক ঘটে। হাসি সামলে বললেন, আমাদের সব সময় কাজ এবং সব সময় বিশ্রাম। জেনেটকে জিজ্ঞেস করুন তিনি এখানে কী করছেন। জেনেটের মুখ লাল হল। বিলের কথা চাপা দিয়ে তিনি বললেন, চা চলবে? বলেই বাড়ির ভিতরে চলে গেলেন। তাঁর পিছু পিছু আমরাও গেলাম। সোফায় বসে আমি বিলকে জিজ্ঞেস করলাম, এই এত বড়ো উপত্যকায় কি আপনিই পরিবার নিয়ে থাকেন! বিল কিছুটা উপহাসের সুরে বললেন, পরিবার আর কোথায়? আছি শুধু আমি আর জেনেট। আর হ্যাঁ, ডেয়ারিতে থাকেন স্টুয়ার্ট, ব্যস।
আমি ভাবলাম পরিবারের প্রসঙ্গ তোলাটা ঠিক হয় নি আমার। সন্তান না থাকায় অনেকে দুঃখে থাকেন। প্রসঙ্গ পালটে জেরি মান্দেরের কথা আনলাম। সেটা কাজে দিল। তিনি বললেন ছেলেবেলায় তাঁর দুই ছেলেই জেরির ভক্ত ছিল, কিন্তু যেই তারা গার্লফ্রেন্ডদের সঙ্গে থাকতে লাগল, তখনই পালাল কানাডায়। এখন বুঝলাম যে এখানে বিলের বাড়ি ছাড়া অন্য দুটো বাড়ি তাঁর দুই ছেলের। কাল রাতে আমি যে বাড়িটায় ছিলাম সেটা বড়ো ছেলের, আর আরেকটু নিচের বাড়িটা ছোটো ছেলের। দুই ছেলে সন্তানের পিতা অবধি হয়ে গেছে। জেনেটের বয়স কত তাহলে? দেখে তো চল্লিশের বেশি লাগে না!
জেনেট চা নিয়ে এলে তাঁকে বললাম, আপনাকে দেখে তো মনে হয় আপনি এখনও বিয়ে করতে পারেন, সেখানে আপনার দুটো নাতি? জেনেট হেসে উঠলেন। হাসির তোড়ে যা বললেন তাতে জানলাম যে, এই দুই ছেলে তাঁর নয়, বিলের। বিলের দুই বান্ধবীর গর্ভে এই দুই ছেলের জন্ম। বিলের বয়স এখন পঁয়ষট্টি, তাঁর চল্লিশ। আজ থেকে চার বছর আগে ফার্মের কাজে জেনেট এখানে যোগ দেন। পরে বিলের সঙ্গে প্রেম। স্টুয়ার্টকে পাওয়ার পর তাঁর হাতে ফার্মের দায়িত্ব দিয়ে জেনেট বিলের সঙ্গে একত্র বসবাস করতে এই বাড়িতে চলে আসেন। তাঁদের এখন একটিই স্বপ্ন, সেটি হল একটি সন্তানলাভ করা। তবেই তাঁরা এই ফার্ম টিকিয়ে রাখার উৎসাহ পাবেন, নাহলে নয়।
শুনলাম যে আমার খাতিরে আজ ডেয়ারির স্টুয়ার্ট ও তাঁর দলবল লাঞ্চের নেমতন্নে আসবেন। স্টুয়ার্ট সঙ্গে নাচের দল আনবেন আমেরিকান ইন্ডিয়ানদের নাচের নমুনা দেখাতে। যথাসময়ে তাঁরা এলেন মাথায় মুরগির ঝুঁটির মতো পালক গুঁজে, কানের দু’পাশে শিং লাগিয়ে। বাজনার যন্ত্রগুলো আমাদের সাঁওতালদের মাদলের মতো, কিন্তু, তাঁদের নাচ অতি ক্ষিপ্র। লাঞ্চের সময় বিলকে জিজ্ঞেস করলাম, কাল সানফ্লাওয়ার ভ্যালির অনুষ্ঠানে অত বিরক্তমুখে ছিলেন কেন। বিল ভুরু কুঁচকে তাচ্ছিল্যভরে বললেন, বিরক্ত হব না? তুমি যদি জানতে এই বনজঙ্গলের, পাহাড়ের আর জমির মালিক ছিল তোমারই নিকট পূর্বপুরুষ, আর তাঁদের পাইকিরি হারে খুন করে যে আমেরিকাগিরি চলে তার উপর তোমার ধিক্কারই জন্মাত – বিশেষত আনন্দ ও ফূর্তির দিনে। বেশিদিন আগে নয়, এই চার পাঁচ পুরুষ আগেই গোটা অন্টারিও কাউন্টিটাই আমার পূর্বপুরুষের অধিকারে ছিল।
লাঞ্চের পরে স্টুয়ার্ট সহ নাচের দল এবং জেনেট, বিল আর আমি টানা আড্ডা দিলাম। সন্ধ্যার অল্প আগে বিল আমাকে সানফ্লাওয়ার ভ্যালির পাইন কটেজে নামিয়ে দিয়ে গেলেন।(সমাপ্ত)
গানের বাণী ও সুরের সমন্বয় রবীন্দ্রনাথের গানকে বিশেষ বৈশিষ্ট্য দিয়েছে। এইজন্য তাঁর প্রায় সব গানই শ্রোতাদের বিশেষ মনোযোগ দাবি করে। আজকে আপাতত তাঁর দুটি গান নিয়ে আমার অভিজ্ঞতার কথা বলব। প্রথম গানটা হল,
তোমার আসন শূন্য আজি, হে বীর পূর্ণ করো, ঐ যে দেখি বসুন্ধরা কাঁপল থরোথরো। বাজল তূর্য আকাশপথে– সূর্য আসেন অগ্নিরথে আকাশপথে, এই প্রভাতে দখিন হাতে বিজয়খড়্গ ধরো। ধর্ম তোমার সহায়, তোমার সহায় বিশ্ববাণী। অমর বীর্য সহায় তোমার, সহায় বজ্রপাণি। দুর্গম পথ সগৌরবে তোমার চরণচিহ্ন লবে সগৌরবে– চিত্তে অভয় বর্ম, তোমার বক্ষে তাহাই পরো॥
এই গানটা শুনে প্রথমে আমার মনে প্রশ্ন জেগেছিল যে, বীরকে তেজোদীপ্ত স্বরে আবাহন না করে কেন এমন নরম সুরে সম্বোধন করা হচ্ছে! মনে মনে তার কারণ খুঁজতে খুঁজতে এক অদ্ভুত সত্যের আভাস পেয়েছিলাম।
১৯২৯ সালের ১৩ই সেপ্টেম্বর স্বাধীনতাসংগ্রামী বিপ্লবী যতীন্দ্রনাথ দাস দীর্ঘ ৬৩ দিন অনশনের পর দাস মৃত্যুবরণ করেন। যে সময় তাঁর অনশন চলছিল শান্তিনিকেতনে সেইসময় কবির তত্ত্বাবধানে তপতী নাটকের মহড়া চলছিল। এই মৃত্যুসংবাদ পাওয়া মাত্রই কবি মহড়া বন্ধ করে উঠে গেলেন এবং আহত, অস্থির ও পীড়িত মন নিয়ে সেই রাত্রেই লিখে ফেলেছিলেন যে গান সেটা হল –
সর্ব খর্বতারে দহে তব ক্রোধদাহ— হে ভৈরব, শক্তি দাও, ভক্ত-পানে চাহো। দূর করো মহারুদ্র যাহা মুগ্ধ, যাহা ক্ষুদ্র— মৃত্যুরে করিবে তুচ্ছ প্রাণের উৎসাহ।। দুঃখের মন্থনবেগে উঠিবে অমৃত, শঙ্কা হতে রক্ষা পাবে যারা মৃত্যুভীত। তব দীপ্ত রৌদ্র তেজে নির্ঝরিয়া গলিবে যে প্রস্তরশৃঙ্খলোন্মুক্ত ত্যাগের প্রবাহ।।
কিন্তু এই গানের মেজাজে বীরের যে ছবি ফুটে উঠল তা সম্ভবত ঠিক তাঁর মনের মতোটি হল না। সাময়িক আঘাতের প্রতিক্রিয়ার তীব্রতায় গানের শুরুতেই ‘সর্ব খর্বতারে’ উচ্চারণটা ঘটে গেল তারসপ্তকের ‘গা’-এর অবলম্বনে। ক্রমশ বক্তব্য ‘যখন দূর করো মহারুদ্র যাহা মুগ্ধ যাহা তুচ্ছ’ – এইখানে পৌঁছাল, তখন স্বর তারসপ্তকের ‘পা’ অবধি চলে গেল। অনুমান করা যায় যে কবি তখন ভীষণ উত্তেজিত ছিলেন, হয়ত বলের বিরুদ্ধে বলকে দাঁড় করাতেই তাঁর মন চাইছিল। এমনকি ‘প্রস্তরশৃঙ্খলমুক্ত ত্যাগের প্রবাহ’-র মতো খটমট বাক্যকেও সুরের আগুনে গলিয়ে নেবার স্পর্ধা অনুভব করলেন! সব মিলিয়ে গানের মধ্যে একটা লম্ফঝম্প ভাব প্রকাশ পেয়েই গেল।
যেহেতু কাঙ্ক্ষিত বীরের এইরকম ছবি এঁকে তাঁর মন ঠিক তেমন ভরেনি, তাই এই গানটি লেখার দু’একদিনের মধ্যেই তিনি ‘প্রলয়নাচন নাচলে যখন আপন ভুলে, হে নটরাজ’ গানটি লিখে নতুন করে সুরে ফুটিয়ে তুলতে চাইলেন তাঁর মনের মতো বীরের ছবি। সেই করতে গিয়ে ‘সর্ব খর্বতারে দহে তব ক্রোধদাহ’ গানটিতে যে চড়া ভাব ছিল তা এখানে অনেকটা শান্ত ও সৌম্য হয়ে উঠল বটে। ভৈরবের ক্রোধদাহের প্রার্থনা আর নেই এখানে। এখানে এমন আশ্বাসে ভরা বাণীও এলঃ ‘রবির আলো ছাড়া পেল আকাশ পারে/ শুনিয়ে দিল অভয়বাণী ঘর ছাড়ারে।/ আপন স্রোতে আপনি মাতে সাথি হল আপন সাথে/ সব-হারা যে সব পেল তার কূলে কূলে।’
‘প্রলয়নাচন নাচলে যখন’ গানটা লিখে অনেকটাই নিজের স্বভাবে ফিরেছিলেন যেন, তবু পুরোপুরি আরামটা তখনও যেন হয়নি। এই গানটি রচনার সম্ভবত পরের দিনই তিনি ‘তোমার আসন শূন্য আজি হে বীর পূর্ণ করো’ গানটি লিখে বসলেন।
কী ছন্দে এই বীরকে কবি সম্বোধন করলেন? ‘তোমার আসন’ এর ‘তোমার’ উচ্চারণটা ‘সা’-এ স্থির থাকল, তারপর আসনটাকে একটু উঁচু স্বরে উচ্চারণ করে সেটাকে তুলে ধরা হল, অর্থাৎ বোঝানো হল যে, উঁচু-র আসন শূন্য রয়েছে। এতে উঁচু আসনটি যে শূন্য রয়েছে তা চোখে পড়ল। কবি প্রার্থনা করলেন যে সেই বীর এসে এই শূন্য আসনটি ‘পূর্ণ’ করুন। এই পূর্ণ শব্দটিতে কোমল স্বর লেগে গেল। অনুমান হয় যে কবি করুণার আবাহন করছেন, ক্ষমতার স্তব করছেন না।
গানটির ‘পূর্ণ করো’, ‘বিজয়খড়্গ ধরো’, এবং, ‘বক্ষে তাহাই পরো’ – এই বাক্যাংশগুলিতে ‘করো’, ‘ধরো’ এবং, ‘পরো’ এই ক’টি ক্রিয়াপদ রয়েছে। ‘করো’-র উচ্চারণ কোমল নি থেকে শুরু হয়ে কোমল গা ছুঁয়ে দীর্ঘ মাত্রায় উচ্চারিত হয়ে উঁচু থেকে নিচে গিয়ে আবার উঁচুতে ফিরে গেল। স্বরের এই প্রবাহকে যদি ছবিতে ন্যস্ত করা যায় তাহলে মনে হবে যেন স্বরপুঞ্জ ঘিরে ফুলের মতো একটা আদল তৈরি হল। কিংবা যেন শাঁখের মতো কিছু একটা বেজে উঠল। কিংবা করুণায় নত, কিন্তু গৌরবে উন্নত, বুদ্ধের মতো কোনো মুখচ্ছবি ফুটে উঠল।
সেই বীর শূন্য আসন পূর্ণ করলে কবি তাঁকে বলবেন ‘বিজয়খড়্গ ধরো।’ কবি জানেন যে ধর্ম এই বীরের সহায়। তাঁর সহায় বিশ্বের ‘বাণী’। ‘দুর্গম পথ’-এ তাঁর চরণচিহ্ন পড়বে ‘সগৌরবে’। সেই বীরকে সম্বোধন করে তিনি বলবেন, ‘চিত্তে অভয় বর্ম, তোমার বক্ষে তাহাই পরো।’ তিনি জানেন যে সেই বীরের চিত্তে অভয় বর্মই থাকে, সেটাই তাঁর বক্ষে ধারণ করা যথেষ্ট হবে। এই ‘ধরো’ আর ‘পরো’ – এই দুটি ক্রিয়াপদকেই অনুনয়ের সুরে স্বরের শেষ অংশকে উঁচু পর্দায় সরলভাবে উচ্চারণ করলেন ওঠা-পড়া-বিহীন স্বরে।
অর্থাৎ এই গানে উচ্চারিত তিনটি ক্রিয়াপদের উচ্চারণেই শান্ত ও মধুর ভাবকে রক্ষা করলেন তিনি।
সঙ্কট কালে যখন সব কিছু ওলটপালট হয়, জগৎ তোলপাড় হয়, তখন বীরের নেতৃত্ব না হলে চলে না। সেই সময় যদি দেখা যায় বীরের আসন শূন্য, তখন নৈরাজ্যের সমূহ সম্ভাবনা। আকাশপথে তখন যদি তূর্যও বাজে, সূর্যও যদি তখন ‘অগ্নিরথে আকাশপথে’ আসেন, তবু বীরের আসন শূন্য থাকলে কেবল মারামারি হানাহানিই হয়, যুদ্ধজয়ের গৌরব অর্জন হয় না।
‘সর্ব খর্বতারে দহে তব ক্রোধদাহ’ গানটিতে হাঁকডাক করে প্রচলিত বীরত্বের যে বন্দনা তিনি করেছেন তাকে চিরকালীন বীরত্বব্যঞ্জক কোনো ভাবে প্রকাশ করবার যে তাগিদ তাঁর মনে জেগেছিল সেটা ‘প্রলয়নাচন নাচলে যখন আপন ভুলে হে নটরাজ’ গানটি লিখেও পুরোপুরি মেটেনি। কিন্তু ‘তোমার আসন শূন্য আজি হে বীর পূর্ণ করো’ গানটির মাধ্যমে চিরকালীন বীরত্বের জয়গান গেয়ে নিজের স্বভাবধর্ম রক্ষা করে তিনি যেন শান্তি পেলেন। তাঁর কাছে আলেকজান্ডার বা জুলিয়াস সিজার প্রকৃত অর্থে বীর নন, তার কাছে বীর হলেন নিরস্ত্র বুদ্ধই। মনে হয় ‘তোমার আসন শূন্য আজি হে বীর পূর্ণ করো’ গানটার মধ্যে দিয়ে তিনি যেন বুদ্ধকেই বরণ করতে চাইলেন।
পরের গানটা হল —
কোন্ সে ঝড়ের ভুল ঝরিয়ে দিল ফুল, প্রথম যেমনি তরুণ মাধুরী মেলেছিল এ মুকুল, হায় রে॥ নব প্রভাতের তারা সন্ধ্যাবেলায় হয়েছে পথহারা। অমরাবতীর সুরযুবতীর এ ছিল কানের দুল, হায় রে॥ এ যে মুকুটশোভার ধন। হায় গো দরদী কেহ থাক যদি শিরে দাও পরশন। এ কি স্রোতে যাবে ভেসে– দূর দয়াহীন দেশে\ কোন্খানে পাবে কূল, হায় রে॥
এই গানটা ছেলেবেলাতেই শুনেছিলাম কিন্তু মনে তখন কোনো দাগ কাটেনি। শুধু অন্যান্য গানের তুলনায় এটি শুনতে কেবল কেমন যেন লেগেছিল। সেই কেমন যেন লাগাটা অস্পষ্টভাবে মনের অতলে কোথায় যেন সঞ্চিত হয়েই ছিল। ঘটনার কোনো পূর্বাপর নেই, একদিন হঠাতই এক অস্থানে গানটি যেন আমায় অধিকার করে বসল। সেই ঘটনাটি এবার বলি।
কিছুকাল আগে একসময় আমি আমেরিকার এক শহর থেকে আরেক শহর, এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রাম চষে বেড়াচ্ছি। ফিলাডেলফিয়ায় এ্যামট্র্যাক ট্রেনে চড়ে ল্যাঙ্কেস্টার স্টেশনে পৌঁছেছি। ট্রেন ল্যাঙ্কেস্টার পৌঁছানোর আগে রেললাইনের দুই ধারে মাইলের পর মেইল জমিতে পুরনো পদ্ধতিতে চাষবাস হচ্ছে চোখে পড়ল। লাঙলে জোতা চাষের ঘোড়া মাঠের উপরে ছুটছে, তাঁর পিছু পিছু তাগড়াই যুবক আমিশ চাষী হাল ধরে ছুটে ছুটে মাটি এফোঁড়ওফোঁড় করে চলেছে। এমন দৃশ্য জীবনে কখনও দেখিনি।
ট্রেন এসে পৌঁছাল ল্যাকেস্টার স্টেশনে। স্টেশন প্লাটফর্মটা বড়সড়, কিন্তু প্লাটফর্মে কিন্তু আমি ছাড়া আর অন্য কোনো জনপ্রাণী নেই। একটা বেঞ্চে একা বসে পড়লাম। কিছুক্ষণ পরে এক আমেরিকান পরিবার এসে বসল পাশের এক বেঞ্চে। রয়েছে স্বামী স্ত্রী ও তিনটি সন্তান। দুটি মেয়ে, একটি ছেলে। তারা বয়ঃসন্ধির বয়সে পৌছায়নি এখনও। পরিবারটির সঙ্গে লটবহর রয়েছে প্রচুর। অনেকগুলো স্যুটকেস, হোল্ডারে ভরা বিছানাপত্তর, এবং অজস্র টুকিটাকি জিনিস। লটবহরের ধরন দেখে বুঝলাম যে এঁরা চাষি পরিবার। এটা বুঝলাম এই কারণেও যে আমি আগেই জানতাম যে পেনসিলভেনিয়ার এই ল্যাঙ্কেস্টার অঞ্চলটি আমিশ সম্প্রদায় বসবাস করে।
দম্পতি ও শিশুগুলির মুখচোখ আর হাবভাব দেখে মনে হল তারা প্রমোদ ভ্রমণে কিংবা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে ক’দিনের জন্য বেড়াতে যাচ্ছে না। তারা সাদা চামড়ার আমেরিকান হলেও তাদের চেহারা ও সঙ্গের লটবহর দেখে মনে হল তারা গরিব মানুষই। একজন গড়পড়তা আমিশ মানুষ সচরাচর গরিবই হন। কারণ তাদের ধর্মাশ্রিত সামাজিক প্রথা অনুসারে তারা আমেরিকায় বাস করেও আজও ক্লাস নাইনের বেশি পড়াশোনা করে না, সরকারি বেসরকারি চাকরিবাকরিও করে না। তাদের দিন চলে চাষবাস ও পশুপালন এবং আনুসঙ্গিক কাজকর্ম করে। এমন ধরনের জীবিকায় থেকে খুব কম মানুষই ধনবান হতে পারে।
এরা নতুন ঠিকান সন্ধান করে অজানার উদ্দেশে পাড়ি দিচ্ছে এমন অনুমান করে কর্তাটির সঙ্গে আলাপ জমালাম। আলাপ হতে জানলাম যে আমার অনুমানই ঠিক। এখন তারা যাবে এই পেনসিলভানিয়া প্রদেশেরই পিটসবার্গের শহরতলির এক আমিশ গ্রামে যেখানে তারা নতুন বসতি স্থাপনের চেষ্টা করবে। এদের দেখে এবং এদের গন্তব্যের ধরন অনুমান করে এবং এই মুহূর্তে এদের আশা ও বেদনার স্পর্শ পাওয়ামাত্রই ওই ‘কোন সে ঝড়ের ভুল ঝড়িয়ে দিল ফুল’ গানটি আমার মনের সবটা জুড়ে অনুরণিত হতে লেগে গেল।
প্লাটফর্মে পিটসবার্গগামী টেনটা ঢুকল। আমরা একই কামরায় উঠে পড়লাম। ছানাপোনা সমেত পরিবারটি বসল সামনের দিকের সারিতে, পিছনে জানালার ধার বেছে আমি বসলাম নতুন পথের নতুন নতুন দৃশ্য দেখতে দেখতে এগোব বলে। বাইরের দৃশ্য দেখে চলেছি কিন্তু সমস্ত মন জুড়ে ওই ‘কোন সে ঝড়ের ভুল’ গানটা বেজেই চলেছে। জানালার ধারে বসে গানটা নিচু গলায় গাইছিলামও।
গানটির কথা একটু বলি। এটি কবির শেষ বয়সের রচনা, তাঁর বয়স তখন সাতাত্তর। গানটি কীর্তনাঙ্গের। অবশ্য কীর্তনাঙ্গের গান তিনি সারা জীবনই বেঁধেছেন। কীর্তনাঙ্গের সুর তাঁর বিশেষ প্রিয়ই ছিল। তবে গানের শব্দের মান রেখে সেগুলির উপর তিনি যে সুরের ছোঁয়া দিতেন তাতে তাঁর রচিত এই ধরনের গানগুলিতেও অনেক ক্ষেত্রে রবীন্দ্রায়ন ঘটে যেত। যেমন ঘটে গেছে এই গানেও।
গানটি শুরু হবার একটু পরেই গানের চরণ যখন ‘প্রথম যেমন তরুণ মাধুরী মেলেছিল এ মুকুল হায় রে’ অংশে এসে পৌঁছাল তখনই বেজে উঠল খোলের বোল। সেই বোল এত স্পষ্ট তা যেন কানে বেজে উঠল।
গানটি নিচু গলায় গাইতে গাইতে আমি ক্রমশ মজে উঠতেও থাকলাম। গাইতে গাইতে যখন ‘নব প্রভাতের তারা সন্ধ্যাবেলায় হয়েছে পথহারা’-য় পৌঁছেছি তখন সুরের ঠাট একেবারে রাবীন্দ্রিক। এখন যেন কীর্তনকে খুঁজে পাচ্ছি না! ‘নবপ্রভাতে’ যে তারা আকাশে শোভা পেত সেই তারা ‘সন্ধ্যাবেলায় হয়েছে পথহারা’ – এই সংবাদটা খুব আবেগের সঙ্গে উঁচু পর্দায় দেওয়া হল। বোঝাই যায় যে এই তারার পথ হারানোর ব্যথাটা বেশ গুরুতর। কিন্তু প্রকৃতি যেমন যুগপৎ নির্মম ও মধুরকে অবলীলায় পাশাপাশি স্থান দিয়ে দিতে পারে তেমনি এই বেদনাদায়ক সংবাদটুকু দেবার অব্যবহিত পরেই অপূর্ব মুন্সিয়ানার সঙ্গে আরোপিত সুরের কৌশলে নটীনৃত্যের পেলব অঙ্গভঙ্গী ফুটে উঠল পরের লাইন ‘অমরাবতীর সুরযুবতীর এ ছিল কানের দুল’-এ। এই পেলব অঙ্গভঙ্গির বন্দনায় আবার বেজে উঠল খোলের বোল!
কবিকে অনেক সময় একদিকে যেমন ছবির নেশা পেয়ে বসে, অন্যদিকে নাচের নেশাও তাঁকে পেয়ে বসে। এই গানের গীতিকার কবি তিনটি নৃত্যনাট্যের যখন রূপ দেন তখন তাঁর বয়স পঁচাত্তর পেরিয়ে গিয়েছিল। এই গানটি তিনি তাঁর রচিত নৃত্যনাট্য মায়ার খেলায় ব্যবহার করেছেন।
এতক্ষণ তো গানটি রবীন্দ্রসঙ্গীত ও কীর্তনের মধ্যে দিয়ে একভাবে আপন খেয়ালে চলছিল, এবং কতকগুলি ব্যথার কথা জানিয়ে যাচ্ছিল শুধু। যেমন, ফুল যখন তার তরুণ মাধুরী বিকশিত করতে যাবে সেই সময় সেটি কোনো এক ঝড়ের ভুলে সেটির ঝরে পড়া। তারপর নবপ্রভাতের তারার সন্ধ্যাবেলায় বিরহে দিশাহারা হয়ে যাওয়া। সেই ফুল নাকি অমরাবতীর সুরযুবতীর কানের দুল ছিল।
কিন্তু যখন সঞ্চারীতে এসে পৌঁছান গেল তখন গানের মধ্যেকার মূল আর্তিটা প্রকাশ পেয়ে উঠল। এখানে এসে জানা গেল যে, যে-ফুলটা ঝরে গেছে সেটা বাস্তবত কোনো মুকুটে শোভা পাবার মতন ধন। তাকে এমনভাবে ভূমিতলে পড়ে-থাকা অবস্থায় দেখতে পাওয়াটা খুব বেদনাদায়ক। সেজন্য তিনি নিচু গলায় মিনতির সুরে এখানে আবেদন করলেন, ‘হায় গো দরদী কেহ থাক যদি শিরে দাও পরশন।’
কিন্তু মিনতিটুকু জানিয়েই ক্ষান্ত হাওয়া গেল না। সংশয় ভরা মনে উঁচু পর্দায় আবার হাহাকার ধ্বনি উঠল – ‘এ কি স্রোতে যাবে ভেসে– দূর দয়াহীন দেশে।’ ট্রেনের কামরায় বসে আমিও তখন ছিন্নমূল এই পরিবারটিকে দেখতে পাচ্ছি, আর দেখতে পাচ্ছি ‘দূর দয়াহীন দেশে’ কোথায় ভেসে যাচ্ছে এই মুকুটশোভার ধন! এই ব্যাকুল প্রশ্ন রাবীন্দ্রিক সুরেই উচ্চারিত হল কিন্তু এখনই নির্মম উদাসীন প্রকৃতির খেয়ালে এই ব্যাকুল প্রশ্নের পরেই আবার অকস্মাৎ গানটির স্বাভাবিক চলনকে স্তম্ভিত করে দিয়ে ওই তীব্র প্রশ্নাত্মক অবস্থাতেই ফুটে উঠল নির্দায় খোলের বোল্ -‘কোন্খানে পাবে কূল, হায় রে॥‘
দুটি ভিন্ন ধারার সুরকে এমন সংক্ষিপ্ত পরিসরে পরস্পরের মধ্যে এমন দ্রবীভূত করে দেবার সামর্থ্যটা যেন ঐতিহাসিক!
গানটি যখন লেখা হয় তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আসন্ন এবং আগামী অনেক যুদ্ধের ছায়া আকাশে ঘনিয়ে উঠছিল। এই পর্বে কবি মানুষের জীবনের সবব্যাপী দুঃখ ও অমঙ্গলের বিষয়ে অতীব সচেতন হয়ে উঠেছিলেন,
ট্রেন ত্বরিত গতিতে এগিয়ে চলল অজানা পিটসবার্গের দিকে। গানটি আপনমনে গাইতে গাইতে আমার কেবলই মনে হতে লাগল যে এক লেলিহান ও নিরীশ্বর প্রশ্নকে কী করে ধরা গেল কীর্তনের মধুর বোলে? আমার বিস্ময়ের সীমা রইল না।
Paramesh Goswami, a mechanical engineer from IIT Kharagpur by training, is a renowned writer and scholar. He has penned his concerns for the environment on various platforms. Some of his books are: দ্বা সুপর্ণা (1992), আবার বৃন্দাবন (2011), Rhapsody of Rabindra Sangeet (2018), Glimpses (2020), এমনি করে ঘুরিব দূরে (2022). He is also the co-author of প্রগতি মরীচিকা (2006), জল (2014), and আদালত-মিডিয়া-সমাজ এবং ধনঞ্জয়ের ফাঁসি (2016) and other thought-provoking books. His wanderlust has taken him to all parts of the world but his writings are far removed from conventional travelogues. His experiences in distant lands and with varied people have literally made him a world citizen and he moves effortlessly across contours of not just physical features of the world, but also the human mind and emotions. His realisations and feelings can best be summarised in his own words, “পৃথিবীর তিন ভাগ জল আর এক ভাগ স্থল, এই কথা প্রায় সকলেই জানি, কিন্তু মানুষের মনের মধ্যে যে তিন ভাগ ভালোবাসা আর এক ভাগ ঔদাসিন্য আছে এই সত্যটা অন্তত আমার তেমন করে জানা ছিলো না ” (from the Introduction in his book এমনি করে ঘুরিব দূরে (2022)). Rabindra sangeet is his soulmate – he loves listening to and singing them.