বিষ্ণুভূষণ – রূপক বিশ্বাস
সত্যি কথা বলতে কি, প্রথমদিকে বিষ্ণুভূষণের ওপর আমার কেমন যেন একটা রাগই ছিল। ফিজিক্স অনার্সের মেরিট লিস্ট বেরোতেই আমরা চমকে উঠেছিলাম। সুদীপ ফার্স্ট হয়নি। আমাদের প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকেও অন্য কেউ ফার্স্ট হয়নি, এমন কি কলকাতার কোন কলেজেরও কেউ নয়। ফার্স্ট হয়েছে মেদিনীপুরের এক অজ্ঞাতনামা কলেজের কে এক বিষ্ণুভূষণ গড়াই। বিষ্ণুর ওপর তখনই আমার কেমন একটা রাগ হয়েছিল। অস্বীকার করতে পারি না, ওকে দেখার জন্য একটা প্রবল আগ্রহও অনুভব করেছিলাম।
আমরা অনেকেই রেডিও ফিজিক্সে ভর্তি হলাম। লিস্টে বিষ্ণুরও নাম দেখলাম। প্রথমদিন ক্লাসে এন সি সবাইয়ের পরিচয় নিচ্ছিলেন। যে ছেলেটি নিজেকে বিষ্ণুভূষণ বলে পরিচয় দিল তাকে দেখে আমি নিতান্ত নিরাশ হলাম। বেঁটে ক্ষয়া ক্ষয়া চেহারা, ইস্ত্রি না করা হাফ হাতা সাদা সার্টের মধ্যে থেকে দুটো রোগা রোগা হাত বেরিয়ে এসেছে। সবুজ রঙের একটা সস্তা টেরিকটের প্যান্টের মধ্যে সার্টটা গোঁজা। না, এগুলো দেখে আমি হতাশ হই নি। আমি হতাশ হলাম তার মুখ দেখে। মুখে বুদ্ধির চিহ্নমাত্র নেই। যেটা আছে সেটাকে অনেকে বলবে সরলতার ছাপ। তবে আমার নিজস্ব অভিজ্ঞতায় দেখেছি এই সমস্ত তথাকথিত সরল লোকেরা অনেক সময়ই বেশ জটিল হয়, কখনো কখনো কুটিলও বটে। তবে বিশেষ ঘটনার মুখোমুখি না হলে সেটা বেরিয়ে আসে না।
ক্লাস শুরু হওয়ার কয়েকদিন পরের কথা। এন সি বোর্ডে একটা কঠিন ডিডাকশন করছেন। সবাই মন দিয়ে টুকছে, কিন্তু কেউই বিশেষ কিছু বুঝছে বলে মনে হয় না। শুধু বিষ্ণুভূষণ খানিকটা টোকার পর বোর্ডের দিকে চেয়ে বসে আছে। একটু পরে এন সি থামলেন। বোর্ডের দিকে ভ্রূ কুঁচকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। ইতিমধ্যে বিষ্ণু উঠে দাঁড়িয়েছে। সেদিকে চোখ পড়তেই এন সি বললেন, ‘কি, কিছু বলবে?’
‘স্যার মাঝখানের স্টেপে একটা ভুল রয়েছে।’
ঠিক কোন স্টেপে ভুলটা হয়েছে এন সি ধরতে পারছিলেন না। বিষ্ণুকে বোর্ডে ডাকলেন। বিষ্ণু ভুলটা দেখিয়ে দিয়ে চলে আসছিল। হঠাৎ এন সি -র কী মনে হল, বললেন, ‘তুমি ডিডাকশনটা করতে পারবে?’ বিষ্ণু কিছু না বলে চকটা তুলে নিল এবং একবারও না থেমে ডিডাকশনটা শেষ করে ফেলল। সেই শুরু। মাস খানেক পর থেকে, এন সি-র মুখে বিষ্ণু ছাড়া আর কোন কথা নেই। অন্য প্রফেসররাও কিছু দিনের মধ্যেই বিষ্ণুকে চিনে ফেললেন। তবে ছাত্ররাই বোধহয় ছাত্রদের সবচেয়ে বেশি চেনে, হয়ত প্রফেসরদের চেয়েও বেশি। ততদিনে আমরা বুঝে গেছি যে, বিষ্ণুর সঙ্গে সুদীপের কোন তুলনাই হয় না। সুদীপও পড়াশুনায় খুব ভাল, অত্যন্ত মেধাবী ছেলে। কিন্তু হাজার চেষ্টা করলেও ও কোনদিন বিষ্ণু হতে পারবে না। বিষ্ণু অন্য জিনিস। বি টেক ফার্স্ট ইয়ারেই বিষ্ণু কয়েকটা পেপার পাবলিশ করল। সেগুলো আমাদের বোধগম্য হল না, কিন্তু প্রফেসররা চমকে উঠলেন। বি টেক-এর সেকেন্ড ইয়ারে বিষ্ণু আর এক কাণ্ড করল। একটা পেপারে দেখাল কীভাবে কম্পিউটারে কিছু কিছু ক্যালকুলেশনের সময় অনেক কমিয়ে দেওয়া যায়। চারিদিকে হৈ হৈ পড়ে গেল। আই বি এম, আই এস আই-এর হোমড়া- চোমড়ারা ছুটে এলেন বিষ্ণুর বক্তৃতা শুনতে। বিষ্ণু বি টেক-এ ফার্স্ট হল, সুদীপ সেকেন্ড। বিষ্ণু ভর্তি হল এম টেক-এ। উদ্দেশ্য এন সি-র আন্ডারে রিসার্চ করা। এম টেকের ফার্স্ট ইয়ারে এম আই টি থেকে এন সি-কে বলে পাঠাল রিসার্চের জন্য এক জনের নাম রেকমেন্ড করে পাঠানোর জন্য। এন সি বিন্দুমাত্র চিন্তা না করে বিষ্ণুর নাম পাঠালেন। বিষ্ণু যাবে অবশ্য এম টেক শেষ করে।
এম টেকের ফার্স্ট ইয়ারের পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর আমরা কয়েকজন বিষ্ণুকে ধরলাম সিনেমা দেখানোর জন্য। এক রবিবার দুপুরে, আমরা সদলবলে গেলাম মিনারে ‘সোনার কেল্লা’ দেখতে। সিনেমা শেষে, হল থেকে বেরিয়ে অমর বলল, ‘চ, আমার মাসির বাড়ি যাওয়া যাক। মাসির সঙ্গে একটু দরকার আছে, আর চা-টাও জুটে যাবে ওখানে। তারপর আড্ডা হবে অন্য কোথাও।’
‘তোর মাসির বাড়িটি কোথায়?’ অসীম জানতে চাইল।
‘এই তো কীর্তি মিত্র লেনে।’
‘তোর মাসির মুখ দেখার জন্য আমি অদ্দূর হাঁটতে পারব না। মাসতুতো বোন-টোন থাকে তো বল।’
অমর কোন উত্তর দিল না, শুধু একটু মুচকি হাসল।
মাসির বাড়ির বাইরের ঘরে ঢুকেই অমর হাঁক দিল, ‘ঝুমা,ঝুমা।’ একটা বছর ১৮/১৯-র মেয়ে বেড়িয়ে এল।
‘কী হল! চেঁচাচ্ছ কেন?’
‘যা, আমাদের জন্যে চা নিয়ে আয়।’
‘ওরে বাবা। আমার একদম সময় নেই। সুপ্তির সঙ্গে সিনেমা যাব বলে।’
‘সিনেমা! কোথায়?’
‘দর্পণা। ‘দিল কা পেয়ার’।’
‘হা। ওর তো টিকিটই পাওয়া যাচ্ছে না।’
‘আমি আগে থেকেই টিকিট কাটিয়ে রেখেছি। দেখবে?’
ঝুমা টিকিট নিয়ে এল। অমর গম্ভীর মুখে টিকিটটা পরীক্ষা করে প্যান্টের পকেটে পুরল।
‘এই অমরদা কী হচ্ছে কি! দাও টিকিটটা।’
‘দেব দেব, চা-টা নিয়ে আয় আগে।’ ঝুমা ধুপধাপ করে চা করতে চলে গেল।
চা-টা খেয়ে, বাইরে বেরিয়ে অসীম ঘোষণা করল ওর কোন চান্স নেই। আমরা সমস্বরে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেন?’
‘দেখছিস না, কেস বিষ্ণুর সঙ্গে। একদম নীরবে, চোখে চোখে কথা।’
তারপর দুদিন বিষ্ণু কলেজে এল না। বিষ্ণু কোনদিন কলেজ কামাই করে না। আমরা একটু চিন্তিত হয়ে পড়লাম। তারপর দিন বিষ্ণু এল। মুখটা একদম শুকিয়ে গেছে। আমরা জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী হয়েছে, রে?’ প্রথমে কিছুতেই কিছু বলবে না। অনেক জেরার পর শেষকালে প্রকাশ পেল যে, বিষ্ণু ঝুমার প্রেমে পড়েছে। কথাটা শুনে, অসীম সেই যে হো হো করে হাসতে শুরু করল, সে হাসি আর থামে না। এদিকে বিষ্ণুর চোখ ছলছল করছে, যে কোন মুহূর্তে কেঁদে ফেলতে পারে। আমি তাড়াতাড়ি অসীমকে ধমক দিয়ে থামিয়ে দিলাম।
বিষ্ণুকে বললাম, ‘যা, তুই ক্লাসে যা। আমরা ক্যান্টিন থেকে ঘুরে যাচ্ছি।’ বিষ্ণু চলে গেল। অসীমের হাসি তখনও থামেনি। আমি অসীমকে বললাম, ‘খুব তো হাসছিস, এখন কী হবে?’
‘কী আর হবে; দু-চার দিন পরে সব ঠিক হয়ে যাবে।’
দু-চার দিন পরে, কিন্তু সব ঠিক হল না। পরের তিনদিন বিষ্ণু কলেজেই এল না। একদিন বিকেলে আমরা ওর বাড়িতে ছুটলাম। ও তখন আমহার্স্ট স্ট্রিটে একটা ঘর নিয়ে থাকত, নিজেই রান্না করে খেত। গিয়ে দেখি ও একটা চাদর চাপা দিয়ে জানলার দিকে তাকিয়ে বিছানায় শুয়ে আছে। গায়ে হাত দিয়ে দেখি গা গরম, বেশ জ্বর আছে। আমাদের দেখে বলল, ‘ঝুমাকে না পেলে আমি মরে যাব।’ অমর ওকে অনেক করে বোঝাল – তুই ঝুমাকে কী বিয়ে করবি! ওতো রাজেশ খান্না, ধর্মেন্দ্র, জিনাত আমন, হেমা মালিনী ছাড়া আর কিছুই জানে না। কোন রকমে হায়ার সেকেন্ডারিটা টপকেছে, পার্ট ওয়ান পার হতে পারবে কিনা যথেষ্ট সন্দেহ আছে। কিন্তু অমরের বোঝানো, অসীমের ধমকানি কিছুতেই কিছু হল না। বিষ্ণুর সেই এক কথা – ‘ঝুমাকে না পেলে আমি মরে যাব।’
বিষ্ণুর বাড়ি থেকে বেড়িয়ে হাঁটতে হাঁটতে কফি হাউসে এসে পড়েছি। কয়েক কাপ কফি ধ্বংসের পর ঠিক হল যে, আগামীকাল অমর মাসির বাড়ি গিয়ে ঝুমাকে একটু হিন্টস দিয়ে দেখবে। কিন্তু পরের দিন অমরের মুখ দেখেই আমরা বুঝলাম, কেস কেঁচে গেছে। ঝুমা নাকি বলেছে, ঐ ক্যাবলা ছেলেটাকে বিয়ে করতে যাব কোন দুঃখে। অমর বলল, ‘তবে একটু আশা আছে। মাসিমা ব্যাপারটায় খুব ইন্টারেস্টেড।’ কয়েকদিন আমাদের ক্লাস-ফ্লাস মাথায় উঠল। বিষ্ণু কলেজে আসছে না। অমর ঘুম থেকে উঠেই মাসির বাড়িতে ফিট- ঝুমাকে বোঝানোর চেষ্টা করছে। মাঝে মাঝে কলেজে আসছে। ক্যান্টিনে লেটেস্ট ডেভেলপমেন্ট নিয়ে আলোচনা চলছে। বিকেলে আমরা আবার তিনজন ছুটছি বিষ্ণুর বাড়িতে, ওকে যথাসম্ভব ডিসকারেজ করছি। চার দিনের দিন দুপুর বেলা অমর হঠাৎ লাফাতে লাফাতে এসে ঘোষণা করল, ‘গুরু হয়ে গেছে, ঝুমা রাজী হয়েছে।’ আমরা তৎক্ষণাৎ ছুটলাম বিষ্ণুর বাড়িতে।
বিষ্ণু যথারীতি চাদর চাপা দিয়ে বিছানায় শুয়ে আছে। অমর তাড়াতাড়ি ভেতরে ঢুকে বলল, ‘এই বিষ্ণু, ঝুমা রাজী হয়েছে।’ বিষ্ণু ধড়মড় বিছানায় উঠে বসে, ওর সেই লাজুক হাসি হেসে বলল, ‘আমি জানতাম, সেদিন ওর চোখ দেখেই বুঝেছিলাম, ও আমাকে ভালোবাসে।’ আমি কলেজ টিমের উইকেট কিপার ছিলাম। রিফ্লেক্সটা সেদিন খুব কাজে লেগেছিল। বিষ্ণুর ঘরের চৌকাটের কাছ থেকেই অসীমের মুখে হাত চাপা দিয়ে ওকে বাইরে নিয়ে চলে গেলাম। ও দু হাতে আমার হাতটা ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বলল, ‘তুই আমায় ছেড়ে দে, আমাকে একটু হাসতে দে, নইলে পেট ফেটে মরে যাব।’
আমার ওপর ভার পড়ল, বিষ্ণুর বাবাকে ব্যাপারটা জানানোর। অমর পারবে না। এই কদিনের টানাপোড়নে ও ভীষণ ক্লান্ত বলে জানাল। আর অসীমের ওপর বিষ্ণুর তেমন ভরসা নেই। অগত্যা আমি। আমি অবশ্য বিষ্ণুর বাড়ি যাওয়ার সময় অসীমকে সঙ্গে নিলাম। কারণ আমি জানতাম, অসীমের উপস্থিত বুদ্ধি আমার চেয়ে অনেক বেশি। বিষ্ণুরা মেদিনীপুরের বেশ অবস্থাপন্ন পরিবার। কিন্তু পরিবারের কেউই, মায় বিষ্ণুর ভাইবোনেরা পর্যন্ত, স্কুলের গণ্ডি পেরোয়নি। এর মধ্যে থেকে বিষ্ণু যে কীভাবে বেরিয়ে এসেছে, সেটা ভগবানই জানেন। বিষ্ণুর বন্ধু শুনে ওর বাবা আমাদের খুব সমাদর করে নিয়ে গিয়ে বসালেন। লোক ডাকিয়ে এনে গাছ থেকে ডাব পাড়ালেন, পুকুর থেকে মাছ ধরালেন। আম, জাম, পেয়ারা, কলাও এসে গেল বাগান থেকে। কিন্তু দুপুরবেলা খাওয়া-দাওয়ার পর আসল কথাটা বলতেই, উত্তেজনায় চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে গর্জন করে উঠলেন বিষ্ণুর বাবা, ‘কী দিতে পারবে ঐ মেয়ের বাবা? বিষ্ণুর বিয়ে দিয়ে অন্তত এক লাখ ক্যাশ ঘরে আনব। অন্য জিনিসের কথা তো বাদই দিলাম।’ ভদ্রলোক তখনও দাঁড়িয়েই আছেন। আমি ঠিক এদিক দিয়ে আক্রমণের আশঙ্কা করিনি, একটু হকচকিয়ে গেলাম। অসীম একবার আড়চোখে আমার মুখটা দেখে নিল। তারপর খুব শান্ত কণ্ঠে ভদ্রলোককে বলল, ‘কিন্তু আপনি আর বাধা দিয়ে কী করবেন, ওরা তো রেজেস্ট্রি করেই ফেলেছে। তবে আপনার কোন অনুষ্ঠান করার ইচ্ছে থাকতে পারে তাই…’ ভদ্রলোক ধপ করে চেয়ারে বসে পড়লেন। বাঁ হাতে কপালটা চেপে ধরলেন।
এরপর বিষ্ণুর বাবা পর পর কয়েকদিন কলকাতায় এলেন। আমাদের মধ্যস্ততায় ঝুমাদের বাড়ির সঙ্গে কথাবার্তা সমস্ত পাকা হয়ে গেল। মাস তিনেক পরে বিয়ে হবে। আমরা বরানগরে দু ঘরের একটা ছোট ফ্ল্যাট যোগাড় করে দিলাম। বিয়ের পর ওরা ওখানেই থাকবে। পয়সাকড়ির কোন অসুবিধে হল না। বিষ্ণুর বাবা ওর মাসোহারাও অনেক বাড়িয়ে দিলেন। বিষ্ণু আবার কলেজে আসা-যাওয়া শুরু করল। আমরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। তখন যদি দেখতে পেতাম ভবিষ্যতের গর্ভে কী লুকিয়ে আছে।
প্রথম মাসে বিষ্ণুর আচরণে খুব অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। মাঝে মাঝে কলেজ কেটে সিনেমা – অবশ্যই হিন্দি সিনেমা – দেখতে যেত ঝুমার সঙ্গে। আমরা ইয়ার্কি মারলেও ওটাকে খুব সিরিয়াসলি নিইনি। বিষ্ণুর মত জিনিয়াসের রোজ ক্লাস না করলেও চলে।
এরও মাসখানেক পরের ঘটনা। সায়েন্স কলেজের সিঁড়ি দিয়ে নামছি। ঝর্ণাদি আমায় ডাকলেন। ঝর্ণাদি এন সি-র আন্ডারে রিসার্চ করেন। আমাদের কলেজের দীপকদার সঙ্গে ওঁর বিয়ে হয়েছে। দুজনেই খুব ভালো পড়াশুনায়। দীপকদা তখন এক বছরের জন্য আমেরিকায় গেছেন। ঝর্ণাদি অত্যন্ত সপ্রতিভ। সেদিন দেখি উনি হাসছেন, রীতিমত হাসছেন, হাসি চেপে রাখতে বেশ কষ্ট হচ্ছে। বললেন, “‘একটু আগে বিষ্ণু এসেছিল আমার কাছে।’
‘বিষ্ণু! ও তো আজ ক্লাসে আসেনি।’ আমি বললাম।
ঝর্ণাদি ও প্রসঙ্গে না গিয়ে বললেন, ‘ল্যাবোরেটারিতে কাজ করছিলাম, এমন সময় বিষ্ণু এসে হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, “দীপকদা আপনাকে ছেড়ে এতদিন আছেন কী করে?” আচমকা প্রশ্নটা শুনে আমি একটু ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। সামলে নিয়ে বললাম, ‘‘আসলে এ কথাটা কোনদিন ভেবে দেখেনি।’’ তারপরেই ও বলল, ‘‘আপনার খুব কষ্ট হয় না?’’ আমি ওর মুখের দিকে ভাল করে তাকিয়ে দেখলাম। না, ঠাট্টা করছে না। আমি মুখটাকে খুব গম্ভীর করে বললাম, ‘‘হ্যাঁ ভাই, ভীষণ কষ্ট হয়।’’ ও বিজ্ঞের মত মাথা নাড়ল। তারপর জানলার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘‘ঝুমারও তাহলে নিশ্চয়ই খুব কষ্ট হচ্ছে। ও দার্জিলিং গেছে ওদের বাড়ির লোকেদের সঙ্গে, তাই পাঁচদিন আমার সঙ্গে ওর দেখা হবে না।’’ এই সমস্ত বলে বিষ্ণু চলে যাচ্ছিল, হঠাৎ দরজার কাছ থেকে ফিরে এসে বলল, ‘‘আচ্ছা ঝর্ণাদি, একেই কি বিরহ বলে?’”
ঝর্ণাদি হাসতে হাসতে একটু বেসামাল হয়ে গিয়েছিলেন, সিঁড়িটা ধরে সামলে নিলেন।
যখন বিষ্ণুর বিয়ের কথাবার্তা চলছে, তখন আমরা ওদের দুজনের বিবাহ পরবর্তী জীবনের পরস্পরের সঙ্গে আলোচনার টপিক নিয়ে কিঞ্চিত চিন্তিত ছিলাম। তাই তখন ঠিক হয়েছিল যে, রেডিও-ফিজিক্স ডিপার্টমেন্ট থেকে আমরা বিষ্ণুকে একটা বিশেষ যন্ত্র উপহার দেব, যার দুদিকে থাকবে দুটো টেলিফোন। আর মাঝখানে থাকবে এক ব্ল্যাক বক্স। একদিকের টেলিফোনে জীনাত আমনের ঠিকুজি-কুষ্টি পড়লে অন্যদিকে সলিড স্টেট ফিজিক্সের লেকচার শোনা যাবে। আবার অন্যদিকে স্যাটেলাইট কমিউনিকেশন সম্বন্ধে বললে, এ প্রান্তে ধর্মেন্দ্রর পূর্বতন এবং বর্তমান প্রেমিকাদের নাড়ি-নক্ষত্র জানা যাবে। কিন্তু বিয়ের ঠিক আগে, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অনেকেই ঐ যন্ত্রের উপযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলল। তাই আমরা ঐ যন্ত্রটা না দিয়ে একটা প্রেশার কুকার এবং রান্না-বান্নার কিছু সরঞ্জাম উপহার দিলাম।
বিয়ের পর বিষ্ণু মাস খানেক কলেজেই এল না। পনেরো দিনের মাথায় অমর দুপুর বেলায় একবার ওদের বাড়ি গিয়েছিল। দূর থেকে দেখে, ঝুমা দোতলার ব্যালকনিতে বসে চুল শুকোচ্ছে আর বিষ্ণু একটু দূরে একটা মোড়ায় বসে নিবিষ্ট চিত্তে তাই দেখছে। এক মাস পরে অবশ্য বিষ্ণু কলেজে আসা শুরু করল। তবে রোজ আসত না – এই সপ্তাহে তিন চার দিন আর কি। সেশান্যাল কাজ জমা দেয় না সময়মত। প্রায়ই লাস্ট ডেট পেরিয়ে যায়, বিষ্ণু নির্বিকার। প্রফেসরদের যে বিরক্তিটা চাপা ছিল, এবার সেটা প্রকাশ্যেই দেখা দিতে লাগল। ব্যাপারটা চরমে উঠল, যেদিন এন সি আমাকে ডেকে পাঠালেন। এন সির ঘরে গিয়ে দেখি সুদীপ বসে আছে। এন সি সুদীপকে বললেন, ‘তাহলে, ঐ কথাই রইল।’ সুদীপ আমার দিকে তাকিয়ে একটু হেসে বেরিয়ে গেল। সুদীপ খুবই ভালো ছেলে, তবে ওকে আমার কোনকালেই তেমন পছন্দ হয় না। মনে হয় ওর মনভোলানো হাসি, মার্জিত ব্যবহার, সুন্দর কথাবার্তার পেছনে একটা সুক্ষ্ম শঠতা লুকিয়ে আছে। এন সি আমাকে বসতে বললেন না, ড্রয়ার থেকে একটা ল্যাব রিপোর্ট বার করে আমার হাতে দিলেন। বিষ্ণুর রিপোর্ট। দুপাতা উল্টেই আমি চমকে উঠলাম। আগোছালো ভাবে স্টেপল করা সিটগুলোর মধ্যে ওটা কীভাবে এসেছিল, ভগবান জানেন। সিটটাতে অত্যন্ত অপটু হাতে একটা মেয়ের ছবি আঁকা আর তার চারপাশে সমস্ত পাতা জুড়ে কয়েকশো বার ঝুমার নাম লেখা। এন সি এক ঝটকায় সেটা কেড়ে নিলেন, ছুঁড়ে ফেললেন ওয়েস্ট পেপার বাস্কেটের মধ্যে। একটু পরে নিজেকে সামলে নিয়ে গম্ভীরভাবে বললেন, আমি ভাবছি বিষ্ণুর বদলে সুদীপকেই এম আই টি-তে পাঠাব।
আমি কোন কথা না বলেই বেরিয়ে এলাম। বিষ্ণুকে তখন সামনে পেলে কী হত জানি না। একটা অন্ধ রাগ আমার মধ্যে গজরাচ্ছিল। বিষ্ণুর জায়গায় আমি সুদীপকে কিছুতেই কল্পনা করতে পারছিলাম না। ব্যাপারটার একটা হেস্তনেস্ত করার জন্য আমি বিষ্ণুর বাড়ি ছুটলাম। সন্ধেবেলায় বরানগরে পৌঁছে দেখি বিষ্ণুর ফ্ল্যাটে তালা ঝুলছে। পাশের ফ্ল্যাটের ভদ্রমহিলা বললেন, ওরা গেছে ‘তিন দুষমন’ দেখতে। পরের দিন গিয়ে দেখি, সেদিনও ফ্ল্যাট তালাবন্ধ। এদিন পাশের বাড়ির ভদ্রমহিলাও কোন সাহায্য করতে পারলেন না। সেদিন আমি ঠিক করেছি কিছুতেই ফিরে যাব না। যত রাত্রিই হোক বিষ্ণুর সঙ্গে দেখা করব। বরানগরে আমার আর এক বন্ধু থাকে। তার বাড়িতেই বসে রইলাম আর এক ঘণ্টা অন্তর এসে দেখে যেতে লাগলাম বিষ্ণু ফিরেছে কিনা। রাত সাড়ে দশটার সময় দেখি, বিষ্ণুর ফ্ল্যাটে আলো জ্বলছে। বিষ্ণুকে কীভাবে গালাগাল দেব সেটা মনে মনে গুছিয়ে নিয়ে ওপরে উঠে গেলাম। দরজা খোলা, বাইরের ঘরে বিষ্ণু নেই। বেডরুমে গিয়ে দেখি বিষ্ণু বিছানার ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে কাঁদছে। ডাকতেই ধড়মড় করে উঠে বসল। বিষ্ণুর সে মূর্তি দেখে আমি চমকে উঠলাম। চুলগুলো উসকোখুসকো। শুকনো মুখ। লাল ফোলা ফোলা চোখ। আমি কেন জানি না, হঠাৎ জিজ্ঞেস করলাম, ‘ঝুমা কোথায়?’ বিষ্ণু এমন করে ‘নেই’ বলল যে, একটা আশঙ্কায় আমার সর্ব শরীর কেঁপে উঠল। বিষ্ণু আমাকে জড়িয়ে ধরে হাঁউমাঁউ করে কেঁদে উঠল। আমি অনেক কষ্টে ওর কাছ থেকে যা উদ্ধার করলাম তা হল- ঝুমা দিন সাতেকের জন্য বাপের বাড়ি গেছে। বিষ্ণু তখনও আমার কাঁধে মাথা রেখে সমানে কেঁদে চলেছে। আমার যা বলার ছিল বিষ্ণুকে, যা অনেকবার মনে মনে পুনরাবৃত্তি করে প্রায় মুখস্থ হয়ে গেছে, তার কিছুই বলা হল না। আমি বিষ্ণুর পিঠে হাত রেখে সামনের দিকে তাকিয়ে রইলাম। ড্রেসিং টেবিলের ওপর রাখা ঝুমার ছবিটা চোখে পড়ল। ঝুমা হাসছে। তবে সে হাসির অর্থ আমি বুঝতে পারলাম না।
রূপক বিশ্বাস
ইঞ্জিনিয়ার। যাদবপুর। কর্মজীবন থেকে অবসর নিয়েছেন।