হায় গো দরদী -পরমেশ গোস্বামী
গানের বাণী ও সুরের সমন্বয় রবীন্দ্রনাথের গানকে বিশেষ বৈশিষ্ট্য দিয়েছে। এইজন্য তাঁর প্রায় সব গানই শ্রোতাদের বিশেষ মনোযোগ দাবি করে। আজকে আপাতত তাঁর দুটি গান নিয়ে আমার অভিজ্ঞতার কথা বলব। প্রথম গানটা হল,
তোমার আসন শূন্য আজি, হে বীর পূর্ণ করো,
ঐ যে দেখি বসুন্ধরা কাঁপল থরোথরো।
বাজল তূর্য আকাশপথে– সূর্য আসেন অগ্নিরথে আকাশপথে,
এই প্রভাতে দখিন হাতে বিজয়খড়্গ ধরো।
ধর্ম তোমার সহায়, তোমার সহায় বিশ্ববাণী।
অমর বীর্য সহায় তোমার, সহায় বজ্রপাণি।
দুর্গম পথ সগৌরবে তোমার চরণচিহ্ন লবে সগৌরবে–
চিত্তে অভয় বর্ম, তোমার বক্ষে তাহাই পরো॥
এই গানটা শুনে প্রথমে আমার মনে প্রশ্ন জেগেছিল যে, বীরকে তেজোদীপ্ত স্বরে আবাহন না করে কেন এমন নরম সুরে সম্বোধন করা হচ্ছে! মনে মনে তার কারণ খুঁজতে খুঁজতে এক অদ্ভুত সত্যের আভাস পেয়েছিলাম।
১৯২৯ সালের ১৩ই সেপ্টেম্বর স্বাধীনতাসংগ্রামী বিপ্লবী যতীন্দ্রনাথ দাস দীর্ঘ ৬৩ দিন অনশনের পর দাস মৃত্যুবরণ করেন। যে সময় তাঁর অনশন চলছিল শান্তিনিকেতনে সেইসময় কবির তত্ত্বাবধানে তপতী নাটকের মহড়া চলছিল। এই মৃত্যুসংবাদ পাওয়া মাত্রই কবি মহড়া বন্ধ করে উঠে গেলেন এবং আহত, অস্থির ও পীড়িত মন নিয়ে সেই রাত্রেই লিখে ফেলেছিলেন যে গান সেটা হল –
সর্ব খর্বতারে দহে তব ক্রোধদাহ—
হে ভৈরব, শক্তি দাও, ভক্ত-পানে চাহো।
দূর করো মহারুদ্র যাহা মুগ্ধ, যাহা ক্ষুদ্র—
মৃত্যুরে করিবে তুচ্ছ প্রাণের উৎসাহ।।
দুঃখের মন্থনবেগে উঠিবে অমৃত,
শঙ্কা হতে রক্ষা পাবে যারা মৃত্যুভীত।
তব দীপ্ত রৌদ্র তেজে নির্ঝরিয়া গলিবে যে
প্রস্তরশৃঙ্খলোন্মুক্ত ত্যাগের প্রবাহ।।
কিন্তু এই গানের মেজাজে বীরের যে ছবি ফুটে উঠল তা সম্ভবত ঠিক তাঁর মনের মতোটি হল না। সাময়িক আঘাতের প্রতিক্রিয়ার তীব্রতায় গানের শুরুতেই ‘সর্ব খর্বতারে’ উচ্চারণটা ঘটে গেল তারসপ্তকের ‘গা’-এর অবলম্বনে। ক্রমশ বক্তব্য ‘যখন দূর করো মহারুদ্র যাহা মুগ্ধ যাহা তুচ্ছ’ – এইখানে পৌঁছাল, তখন স্বর তারসপ্তকের ‘পা’ অবধি চলে গেল। অনুমান করা যায় যে কবি তখন ভীষণ উত্তেজিত ছিলেন, হয়ত বলের বিরুদ্ধে বলকে দাঁড় করাতেই তাঁর মন চাইছিল। এমনকি ‘প্রস্তরশৃঙ্খলমুক্ত ত্যাগের প্রবাহ’-র মতো খটমট বাক্যকেও সুরের আগুনে গলিয়ে নেবার স্পর্ধা অনুভব করলেন! সব মিলিয়ে গানের মধ্যে একটা লম্ফঝম্প ভাব প্রকাশ পেয়েই গেল।
যেহেতু কাঙ্ক্ষিত বীরের এইরকম ছবি এঁকে তাঁর মন ঠিক তেমন ভরেনি, তাই এই গানটি লেখার দু’একদিনের মধ্যেই তিনি ‘প্রলয়নাচন নাচলে যখন আপন ভুলে, হে নটরাজ’ গানটি লিখে নতুন করে সুরে ফুটিয়ে তুলতে চাইলেন তাঁর মনের মতো বীরের ছবি। সেই করতে গিয়ে ‘সর্ব খর্বতারে দহে তব ক্রোধদাহ’ গানটিতে যে চড়া ভাব ছিল তা এখানে অনেকটা শান্ত ও সৌম্য হয়ে উঠল বটে। ভৈরবের ক্রোধদাহের প্রার্থনা আর নেই এখানে। এখানে এমন আশ্বাসে ভরা বাণীও এলঃ ‘রবির আলো ছাড়া পেল আকাশ পারে/ শুনিয়ে দিল অভয়বাণী ঘর ছাড়ারে।/ আপন স্রোতে আপনি মাতে সাথি হল আপন সাথে/ সব-হারা যে সব পেল তার কূলে কূলে।’
‘প্রলয়নাচন নাচলে যখন’ গানটা লিখে অনেকটাই নিজের স্বভাবে ফিরেছিলেন যেন, তবু পুরোপুরি আরামটা তখনও যেন হয়নি। এই গানটি রচনার সম্ভবত পরের দিনই তিনি ‘তোমার আসন শূন্য আজি হে বীর পূর্ণ করো’ গানটি লিখে বসলেন।
কী ছন্দে এই বীরকে কবি সম্বোধন করলেন? ‘তোমার আসন’ এর ‘তোমার’ উচ্চারণটা ‘সা’-এ স্থির থাকল, তারপর আসনটাকে একটু উঁচু স্বরে উচ্চারণ করে সেটাকে তুলে ধরা হল, অর্থাৎ বোঝানো হল যে, উঁচু-র আসন শূন্য রয়েছে। এতে উঁচু আসনটি যে শূন্য রয়েছে তা চোখে পড়ল। কবি প্রার্থনা করলেন যে সেই বীর এসে এই শূন্য আসনটি ‘পূর্ণ’ করুন। এই পূর্ণ শব্দটিতে কোমল স্বর লেগে গেল। অনুমান হয় যে কবি করুণার আবাহন করছেন, ক্ষমতার স্তব করছেন না।
গানটির ‘পূর্ণ করো’, ‘বিজয়খড়্গ ধরো’, এবং, ‘বক্ষে তাহাই পরো’ – এই বাক্যাংশগুলিতে ‘করো’, ‘ধরো’ এবং, ‘পরো’ এই ক’টি ক্রিয়াপদ রয়েছে। ‘করো’-র উচ্চারণ কোমল নি থেকে শুরু হয়ে কোমল গা ছুঁয়ে দীর্ঘ মাত্রায় উচ্চারিত হয়ে উঁচু থেকে নিচে গিয়ে আবার উঁচুতে ফিরে গেল। স্বরের এই প্রবাহকে যদি ছবিতে ন্যস্ত করা যায় তাহলে মনে হবে যেন স্বরপুঞ্জ ঘিরে ফুলের মতো একটা আদল তৈরি হল। কিংবা যেন শাঁখের মতো কিছু একটা বেজে উঠল। কিংবা করুণায় নত, কিন্তু গৌরবে উন্নত, বুদ্ধের মতো কোনো মুখচ্ছবি ফুটে উঠল।
সেই বীর শূন্য আসন পূর্ণ করলে কবি তাঁকে বলবেন ‘বিজয়খড়্গ ধরো।’ কবি জানেন যে ধর্ম এই বীরের সহায়। তাঁর সহায় বিশ্বের ‘বাণী’। ‘দুর্গম পথ’-এ তাঁর চরণচিহ্ন পড়বে ‘সগৌরবে’। সেই বীরকে সম্বোধন করে তিনি বলবেন, ‘চিত্তে অভয় বর্ম, তোমার বক্ষে তাহাই পরো।’ তিনি জানেন যে সেই বীরের চিত্তে অভয় বর্মই থাকে, সেটাই তাঁর বক্ষে ধারণ করা যথেষ্ট হবে। এই ‘ধরো’ আর ‘পরো’ – এই দুটি ক্রিয়াপদকেই অনুনয়ের সুরে স্বরের শেষ অংশকে উঁচু পর্দায় সরলভাবে উচ্চারণ করলেন ওঠা-পড়া-বিহীন স্বরে।
অর্থাৎ এই গানে উচ্চারিত তিনটি ক্রিয়াপদের উচ্চারণেই শান্ত ও মধুর ভাবকে রক্ষা করলেন তিনি।
সঙ্কট কালে যখন সব কিছু ওলটপালট হয়, জগৎ তোলপাড় হয়, তখন বীরের নেতৃত্ব না হলে চলে না। সেই সময় যদি দেখা যায় বীরের আসন শূন্য, তখন নৈরাজ্যের সমূহ সম্ভাবনা। আকাশপথে তখন যদি তূর্যও বাজে, সূর্যও যদি তখন ‘অগ্নিরথে আকাশপথে’ আসেন, তবু বীরের আসন শূন্য থাকলে কেবল মারামারি হানাহানিই হয়, যুদ্ধজয়ের গৌরব অর্জন হয় না।
‘সর্ব খর্বতারে দহে তব ক্রোধদাহ’ গানটিতে হাঁকডাক করে প্রচলিত বীরত্বের যে বন্দনা তিনি করেছেন তাকে চিরকালীন বীরত্বব্যঞ্জক কোনো ভাবে প্রকাশ করবার যে তাগিদ তাঁর মনে জেগেছিল সেটা ‘প্রলয়নাচন নাচলে যখন আপন ভুলে হে নটরাজ’ গানটি লিখেও পুরোপুরি মেটেনি। কিন্তু ‘তোমার আসন শূন্য আজি হে বীর পূর্ণ করো’ গানটির মাধ্যমে চিরকালীন বীরত্বের জয়গান গেয়ে নিজের স্বভাবধর্ম রক্ষা করে তিনি যেন শান্তি পেলেন। তাঁর কাছে আলেকজান্ডার বা জুলিয়াস সিজার প্রকৃত অর্থে বীর নন, তার কাছে বীর হলেন নিরস্ত্র বুদ্ধই। মনে হয় ‘তোমার আসন শূন্য আজি হে বীর পূর্ণ করো’ গানটার মধ্যে দিয়ে তিনি যেন বুদ্ধকেই বরণ করতে চাইলেন।
পরের গানটা হল —
কোন্ সে ঝড়ের ভুল
ঝরিয়ে দিল ফুল,
প্রথম যেমনি তরুণ মাধুরী মেলেছিল এ মুকুল, হায় রে॥
নব প্রভাতের তারা
সন্ধ্যাবেলায় হয়েছে পথহারা।
অমরাবতীর সুরযুবতীর এ ছিল কানের দুল, হায় রে॥
এ যে মুকুটশোভার ধন।
হায় গো দরদী কেহ থাক যদি শিরে দাও পরশন।
এ কি স্রোতে যাবে ভেসে– দূর দয়াহীন দেশে\
কোন্খানে পাবে কূল, হায় রে॥
এই গানটা ছেলেবেলাতেই শুনেছিলাম কিন্তু মনে তখন কোনো দাগ কাটেনি। শুধু অন্যান্য গানের তুলনায় এটি শুনতে কেবল কেমন যেন লেগেছিল। সেই কেমন যেন লাগাটা অস্পষ্টভাবে মনের অতলে কোথায় যেন সঞ্চিত হয়েই ছিল। ঘটনার কোনো পূর্বাপর নেই, একদিন হঠাতই এক অস্থানে গানটি যেন আমায় অধিকার করে বসল। সেই ঘটনাটি এবার বলি।
কিছুকাল আগে একসময় আমি আমেরিকার এক শহর থেকে আরেক শহর, এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রাম চষে বেড়াচ্ছি। ফিলাডেলফিয়ায় এ্যামট্র্যাক ট্রেনে চড়ে ল্যাঙ্কেস্টার স্টেশনে পৌঁছেছি। ট্রেন ল্যাঙ্কেস্টার পৌঁছানোর আগে রেললাইনের দুই ধারে মাইলের পর মেইল জমিতে পুরনো পদ্ধতিতে চাষবাস হচ্ছে চোখে পড়ল। লাঙলে জোতা চাষের ঘোড়া মাঠের উপরে ছুটছে, তাঁর পিছু পিছু তাগড়াই যুবক আমিশ চাষী হাল ধরে ছুটে ছুটে মাটি এফোঁড়ওফোঁড় করে চলেছে। এমন দৃশ্য জীবনে কখনও দেখিনি।
ট্রেন এসে পৌঁছাল ল্যাকেস্টার স্টেশনে। স্টেশন প্লাটফর্মটা বড়সড়, কিন্তু প্লাটফর্মে কিন্তু আমি ছাড়া আর অন্য কোনো জনপ্রাণী নেই। একটা বেঞ্চে একা বসে পড়লাম। কিছুক্ষণ পরে এক আমেরিকান পরিবার এসে বসল পাশের এক বেঞ্চে। রয়েছে স্বামী স্ত্রী ও তিনটি সন্তান। দুটি মেয়ে, একটি ছেলে। তারা বয়ঃসন্ধির বয়সে পৌছায়নি এখনও। পরিবারটির সঙ্গে লটবহর রয়েছে প্রচুর। অনেকগুলো স্যুটকেস, হোল্ডারে ভরা বিছানাপত্তর, এবং অজস্র টুকিটাকি জিনিস। লটবহরের ধরন দেখে বুঝলাম যে এঁরা চাষি পরিবার। এটা বুঝলাম এই কারণেও যে আমি আগেই জানতাম যে পেনসিলভেনিয়ার এই ল্যাঙ্কেস্টার অঞ্চলটি আমিশ সম্প্রদায় বসবাস করে।
দম্পতি ও শিশুগুলির মুখচোখ আর হাবভাব দেখে মনে হল তারা প্রমোদ ভ্রমণে কিংবা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে ক’দিনের জন্য বেড়াতে যাচ্ছে না। তারা সাদা চামড়ার আমেরিকান হলেও তাদের চেহারা ও সঙ্গের লটবহর দেখে মনে হল তারা গরিব মানুষই। একজন গড়পড়তা আমিশ মানুষ সচরাচর গরিবই হন। কারণ তাদের ধর্মাশ্রিত সামাজিক প্রথা অনুসারে তারা আমেরিকায় বাস করেও আজও ক্লাস নাইনের বেশি পড়াশোনা করে না, সরকারি বেসরকারি চাকরিবাকরিও করে না। তাদের দিন চলে চাষবাস ও পশুপালন এবং আনুসঙ্গিক কাজকর্ম করে। এমন ধরনের জীবিকায় থেকে খুব কম মানুষই ধনবান হতে পারে।
এরা নতুন ঠিকান সন্ধান করে অজানার উদ্দেশে পাড়ি দিচ্ছে এমন অনুমান করে কর্তাটির সঙ্গে আলাপ জমালাম। আলাপ হতে জানলাম যে আমার অনুমানই ঠিক। এখন তারা যাবে এই পেনসিলভানিয়া প্রদেশেরই পিটসবার্গের শহরতলির এক আমিশ গ্রামে যেখানে তারা নতুন বসতি স্থাপনের চেষ্টা করবে। এদের দেখে এবং এদের গন্তব্যের ধরন অনুমান করে এবং এই মুহূর্তে এদের আশা ও বেদনার স্পর্শ পাওয়ামাত্রই ওই ‘কোন সে ঝড়ের ভুল ঝড়িয়ে দিল ফুল’ গানটি আমার মনের সবটা জুড়ে অনুরণিত হতে লেগে গেল।
প্লাটফর্মে পিটসবার্গগামী টেনটা ঢুকল। আমরা একই কামরায় উঠে পড়লাম। ছানাপোনা সমেত পরিবারটি বসল সামনের দিকের সারিতে, পিছনে জানালার ধার বেছে আমি বসলাম নতুন পথের নতুন নতুন দৃশ্য দেখতে দেখতে এগোব বলে। বাইরের দৃশ্য দেখে চলেছি কিন্তু সমস্ত মন জুড়ে ওই ‘কোন সে ঝড়ের ভুল’ গানটা বেজেই চলেছে। জানালার ধারে বসে গানটা নিচু গলায় গাইছিলামও।
গানটির কথা একটু বলি। এটি কবির শেষ বয়সের রচনা, তাঁর বয়স তখন সাতাত্তর। গানটি কীর্তনাঙ্গের। অবশ্য কীর্তনাঙ্গের গান তিনি সারা জীবনই বেঁধেছেন। কীর্তনাঙ্গের সুর তাঁর বিশেষ প্রিয়ই ছিল। তবে গানের শব্দের মান রেখে সেগুলির উপর তিনি যে সুরের ছোঁয়া দিতেন তাতে তাঁর রচিত এই ধরনের গানগুলিতেও অনেক ক্ষেত্রে রবীন্দ্রায়ন ঘটে যেত। যেমন ঘটে গেছে এই গানেও।
গানটি শুরু হবার একটু পরেই গানের চরণ যখন ‘প্রথম যেমন তরুণ মাধুরী মেলেছিল এ মুকুল হায় রে’ অংশে এসে পৌঁছাল তখনই বেজে উঠল খোলের বোল। সেই বোল এত স্পষ্ট তা যেন কানে বেজে উঠল।
গানটি নিচু গলায় গাইতে গাইতে আমি ক্রমশ মজে উঠতেও থাকলাম। গাইতে গাইতে যখন ‘নব প্রভাতের তারা সন্ধ্যাবেলায় হয়েছে পথহারা’-য় পৌঁছেছি তখন সুরের ঠাট একেবারে রাবীন্দ্রিক। এখন যেন কীর্তনকে খুঁজে পাচ্ছি না! ‘নবপ্রভাতে’ যে তারা আকাশে শোভা পেত সেই তারা ‘সন্ধ্যাবেলায় হয়েছে পথহারা’ – এই সংবাদটা খুব আবেগের সঙ্গে উঁচু পর্দায় দেওয়া হল। বোঝাই যায় যে এই তারার পথ হারানোর ব্যথাটা বেশ গুরুতর। কিন্তু প্রকৃতি যেমন যুগপৎ নির্মম ও মধুরকে অবলীলায় পাশাপাশি স্থান দিয়ে দিতে পারে তেমনি এই বেদনাদায়ক সংবাদটুকু দেবার অব্যবহিত পরেই অপূর্ব মুন্সিয়ানার সঙ্গে আরোপিত সুরের কৌশলে নটীনৃত্যের পেলব অঙ্গভঙ্গী ফুটে উঠল পরের লাইন ‘অমরাবতীর সুরযুবতীর এ ছিল কানের দুল’-এ। এই পেলব অঙ্গভঙ্গির বন্দনায় আবার বেজে উঠল খোলের বোল!
কবিকে অনেক সময় একদিকে যেমন ছবির নেশা পেয়ে বসে, অন্যদিকে নাচের নেশাও তাঁকে পেয়ে বসে। এই গানের গীতিকার কবি তিনটি নৃত্যনাট্যের যখন রূপ দেন তখন তাঁর বয়স পঁচাত্তর পেরিয়ে গিয়েছিল। এই গানটি তিনি তাঁর রচিত নৃত্যনাট্য মায়ার খেলায় ব্যবহার করেছেন।
এতক্ষণ তো গানটি রবীন্দ্রসঙ্গীত ও কীর্তনের মধ্যে দিয়ে একভাবে আপন খেয়ালে চলছিল, এবং কতকগুলি ব্যথার কথা জানিয়ে যাচ্ছিল শুধু। যেমন, ফুল যখন তার তরুণ মাধুরী বিকশিত করতে যাবে সেই সময় সেটি কোনো এক ঝড়ের ভুলে সেটির ঝরে পড়া। তারপর নবপ্রভাতের তারার সন্ধ্যাবেলায় বিরহে দিশাহারা হয়ে যাওয়া। সেই ফুল নাকি অমরাবতীর সুরযুবতীর কানের দুল ছিল।
কিন্তু যখন সঞ্চারীতে এসে পৌঁছান গেল তখন গানের মধ্যেকার মূল আর্তিটা প্রকাশ পেয়ে উঠল। এখানে এসে জানা গেল যে, যে-ফুলটা ঝরে গেছে সেটা বাস্তবত কোনো মুকুটে শোভা পাবার মতন ধন। তাকে এমনভাবে ভূমিতলে পড়ে-থাকা অবস্থায় দেখতে পাওয়াটা খুব বেদনাদায়ক। সেজন্য তিনি নিচু গলায় মিনতির সুরে এখানে আবেদন করলেন, ‘হায় গো দরদী কেহ থাক যদি শিরে দাও পরশন।’
কিন্তু মিনতিটুকু জানিয়েই ক্ষান্ত হাওয়া গেল না। সংশয় ভরা মনে উঁচু পর্দায় আবার হাহাকার ধ্বনি উঠল – ‘এ কি স্রোতে যাবে ভেসে– দূর দয়াহীন দেশে।’ ট্রেনের কামরায় বসে আমিও তখন ছিন্নমূল এই পরিবারটিকে দেখতে পাচ্ছি, আর দেখতে পাচ্ছি ‘দূর দয়াহীন দেশে’ কোথায় ভেসে যাচ্ছে এই মুকুটশোভার ধন! এই ব্যাকুল প্রশ্ন রাবীন্দ্রিক সুরেই উচ্চারিত হল কিন্তু এখনই নির্মম উদাসীন প্রকৃতির খেয়ালে এই ব্যাকুল প্রশ্নের পরেই আবার অকস্মাৎ গানটির স্বাভাবিক চলনকে স্তম্ভিত করে দিয়ে ওই তীব্র প্রশ্নাত্মক অবস্থাতেই ফুটে উঠল নির্দায় খোলের বোল্ -‘কোন্খানে পাবে কূল, হায় রে॥‘
দুটি ভিন্ন ধারার সুরকে এমন সংক্ষিপ্ত পরিসরে পরস্পরের মধ্যে এমন দ্রবীভূত করে দেবার সামর্থ্যটা যেন ঐতিহাসিক!
গানটি যখন লেখা হয় তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আসন্ন এবং আগামী অনেক যুদ্ধের ছায়া আকাশে ঘনিয়ে উঠছিল। এই পর্বে কবি মানুষের জীবনের সবব্যাপী দুঃখ ও অমঙ্গলের বিষয়ে অতীব সচেতন হয়ে উঠেছিলেন,
তুমি স্থির সীমাহীন নৈরাশ্যের তীরে
নির্বাক অপার নির্বাসনে।
অশ্রুহীন তোমার নয়নে
অবিশ্রাম প্রশ্ন জাগে যেন-
কেন, ওগো কেন!
ট্রেন ত্বরিত গতিতে এগিয়ে চলল অজানা পিটসবার্গের দিকে। গানটি আপনমনে গাইতে গাইতে আমার কেবলই মনে হতে লাগল যে এক লেলিহান ও নিরীশ্বর প্রশ্নকে কী করে ধরা গেল কীর্তনের মধুর বোলে? আমার বিস্ময়ের সীমা রইল না।
Paramesh Goswami, a mechanical engineer from IIT Kharagpur by training, is a renowned writer and scholar. He has penned his concerns for the environment on various platforms. Some of his books are: দ্বা সুপর্ণা (1992), আবার বৃন্দাবন (2011), Rhapsody of Rabindra Sangeet (2018), Glimpses (2020), এমনি করে ঘুরিব দূরে (2022). He is also the co-author of প্রগতি মরীচিকা (2006), জল (2014), and আদালত-মিডিয়া-সমাজ এবং ধনঞ্জয়ের ফাঁসি (2016) and other thought-provoking books. His wanderlust has taken him to all parts of the world but his writings are far removed from conventional travelogues. His experiences in distant lands and with varied people have literally made him a world citizen and he moves effortlessly across contours of not just physical features of the world, but also the human mind and emotions. His realisations and feelings can best be summarised in his own words, “পৃথিবীর তিন ভাগ জল আর এক ভাগ স্থল, এই কথা প্রায় সকলেই জানি, কিন্তু মানুষের মনের মধ্যে যে তিন ভাগ ভালোবাসা আর এক ভাগ ঔদাসিন্য আছে এই সত্যটা অন্তত আমার তেমন করে জানা ছিলো না ” (from the Introduction in his book এমনি করে ঘুরিব দূরে (2022)). Rabindra sangeet is his soulmate – he loves listening to and singing them.
Please email your comments/suggestions to soumyanetra.convergence@gmail.com