সংস্কৃতসাহিত্যাকাশে কালিদাস ও রবীন্দ্রনাথ, দুই প্রতিভার পুনর্মূল্যায়ন- একটি পর্যবেক্ষণ – ড. অভিষেক দাস 

কালিদাস এমনি এক বিরল প্রতিভা, যিনি দেশ-কালের উর্ধ্বে উঠে জ্ঞানের আলোর পরিপূর্ণতাকে স্পর্শ করেছিলেন। স্বীয় রচনায় বৌদ্ধিক ও আধ‍্যাত্মিক সাফল্যের মণিকাঞ্চনযোগ নির্মাণ করতে পেরেছিলেন, তাই বহু শতাব্দী অতিক্রান্ত হলে ও পাঠকসমাজ সশ্রদ্ধ চিত্তে তাঁকে স্মরণ করে আসছে। কালিদাস রয়েছেন ভারতীয় সংস্কৃতির মূলে। ডাকটিকিট থেকে  সন্মানপ্রদান এমনকি কালিদাস মহোৎসব সাড়ম্বরে পালনের মধ্যে দিয়ে সে কথা স্পষ্ট। তাঁর কাব‍্যের সুরভি অনাগতকাল পর্যন্ত বিস্তৃত থাকবে।

রবীন্দ্রনাথ ছিলেন একজন বিখ্যাত কবি, দার্শনিক, নাট্যকার, অভিনেতা, উপন্যাস-লেখক, প্রবন্ধ, ছোটগল্পের রচয়িতা, সমালোচক, গায়ক, চিত্রশিল্পী, শিল্পী, গানের রচয়িতা, আদর্শ শিক্ষকের পাশাপাশি নৃত্য-নাট্যকার। তিনি বৈদিক সাহিত্য, স্মৃতি, তন্ত্র, দর্শন, মহাকাব্য, ধ্রুপদী সংস্কৃত সাহিত্য, ইতিহাস, পুরাণ, পালি, প্রাকৃত, অবদানশতক ইত্যাদির উপর ভিত্তি করে সৃষ্টির মালা গেঁথেছেন।

তাঁর প্রধান সৃষ্টি বাংলায় হলেও সমস্ত আধুনিক ভারতীয় ভাষায় অনূদিত। শৈশবে তিনি উপনিষদ থেকে মন্ত্র পাঠ করতেন এবং উপনয়নের পরে গায়ত্রী মন্ত্র পাঠের সময় তিনি মুগ্ধ হন। সংস্কৃত সাহিত্যের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা, তাঁর পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিলেন, যিনি তাঁকে গীতা এবং গীতগোবিন্দমের প্রতি তাঁর আগ্রহ বৃদ্ধি করেছিলেন। পণ্ডিত রামসর্বস্ব ভট্টাচার্য তাঁকে অভিজ্ঞানশকুন্তলম্ এর পাঠ দেন।

সাংস্কৃতিক পরিবেশের প্রভাবে তিনি শান্তিনিকেতনে আশ্রম স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন এবং সংস্কৃত সাহিত্যের কিছু গ্রন্থ যেমন রঘুবংশম্, কুমারসম্ভবম্ ইত্যাদি অনুবাদ করেন। তিনি রামায়ণের উপর ভিত্তি করে দুটি গীতিকাব্য বাল্মীকি-প্রতিভা এবং কালমৃগয়া রচনা করেন। আবার, বাল্মীকি-প্রতিভা সংস্কৃতে অনুবাদ করেছেন ডক্টর বি. রাঘবন, সাহিত্য আকাদেমি, নিউ দিল্লি, ১৯৬৬ থেকে সংস্কৃত রবীন্দ্রমে প্রকাশিত হয়|

রবীন্দ্রনাথের সুরে বর্ষার বেদগান অচ্ছা বদাতবসং বহুশ্রুত। শ্লোকটি ঋগ্বেদের (৫.৮৩.১) একটি অত্যন্ত সুপ্রসিদ্ধ ও সুন্দর মন্ত্র, যাতে বৃষ্টি ও মেঘের দেবতা পর্জন্যের স্তুতি করা হয়েছে।

পর্জন্য উত্সব বা বর্ষা মঙ্গলের জন্য এই মন্ত্রে সুরারোপ করেছেন রবীন্দ্রনাথ –

अच्छा वद तवसं गीर्भिराभिः स्तुहि पर्जन्यं नमसा विवास। कनिक्रदहृषभो जीरदानू रेतो दधात्योषधीषु गर्भम् ।।১

 অন্যত্র রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন-

‘ মেঘদূত ছাড়া নববর্ষার কাব্য কোন সাহিত্যে কোথাও নাই। ইহাতে অন্তর্বেদনা নিত্য কালের ভাষায় লিখিত হইয়া গেছে। প্রকৃতির সাংবাত্সরিক মেঘোত্সবের অনির্বচনীয় কবিত্বগাথা মানবের ভাষায় বাঁধা পড়িয়াছে।’২

ভালো অনুবাদ শুধুমাত্র মূলরচনার প্রতিনিধিত্ব করে না। বরং অনুবাদকের ব‍্যক্তিত্বের স্বাদ পাঠককে করায়। সাহিত্যের উদ্দেশ্য হল আনন্দ সৃষ্টি। রবীন্দ্রনাথ যখন মেঘদূতের অনুবাদ করলেন, সেই অনূদিত সাহিত‍্য শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। রসিকসমাজ তাতে তৃপ্ত হয়েছে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘মানসী’ কাব্যগ্রন্থের বিখ্যাত ‘মেঘদূত’ কবিতায় কালিদাসের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে  সেই ‘আষাঢ়ের প্রথম দিবস’-কে স্মরণ করে লিখেছিলেন –

“কবিবর , কবে কোন বিস্মৃত বরষে 
কোন্ পুণ্য আষাঢের প্রথম দিবসে 
লিখেছিলে মেঘদূত ! মেঘমন্দ্র শ্লোক
বিশ্বের বিরহী যত সকলের শোক 
রাখিয়াছে আপন আঁধার স্তরে স্তরে 
সঘনসংগীতমাঝে পুঞ্জীভূত ক’রে ৷
ছিন্ন করি কালের বন্ধন 
সেই দিন ঝরে পড়েছিল অবিরল 
চিরদিবসের যেন রুদ্ধ অশ্রুজল 
আর্দ্র করি তোমার উদার শ্লোকরাশি ৷
ভারতের পূর্বশেষে 
আমি বসে আছি সেই শ্যামবঙ্গদেশে 
যেথা জয়দেব কবি কোন্ বর্ষাদিনে 
দেখেছিল দিগন্তের তমালবিপিনে 
শ্যামচ্ছায়া , পুর্ণ মেঘে মেদুর অম্বর ৷
আজি অন্ধকার দিবা , বৃষ্টি ঝরঝর ,
দূরন্ত পবন অতি — আক্রমণে তার 
অরণ্য উদ্যতবাহু করে হাহাকার ৷”৩

কালিদাসের কাব্য ও নাটকের সৌন্দর্য, বিশেষ করে ‘শকুন্তলা’ ও ‘মেঘদূত’, রবীন্দ্রনাথকে গভীরভাবে মুগ্ধ করেছিল। তিনি কালিদাসের সাহিত্য নিয়ে ‘প্রাচীন সাহিত্য’ গ্রন্থে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন এবং ‘চৈতালি’ কাব্যে ‘কালিদাসের প্রতি’ কবিতাটি রচনা করে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন।

মহাকবি কালিদাসের প্রতি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গভীর শ্রদ্ধা ও মুগ্ধতার প্রকাশ ঘটেছে তাঁর অমর কবিতা “কালিদাসের প্রতি”-তে। ১৮৯৬ সালে (আশ্বিন ১৩০৩ বঙ্গাব্দ) প্রকাশিত ‘চৈতালী’ কাব্যগ্রন্থে এই কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত হয়।কবিতাটিতে রবীন্দ্রনাথ কালিদাসকে কোনো রাজসভার সাধারণ কবি হিসেবে দেখেননি, বরং তাঁকে অলকার চিরানন্দময় অধিবাসী হিসেবে কল্পনা করেছেন। কবি সুন্দরভাবে বর্ণনা করেছেন কীভাবে বর্ষার মেঘের মৃদঙ্গ ধ্বনি ও বিদ্যুতের ছন্দে মহাদেব যখন তাণ্ডব নৃত্য করতেন, তখন কালিদাস কৈলাসে বসে বন্দনা গান গাইতেন। গান শেষে দেবী পার্বতী প্রসন্ন হয়ে তাঁর নিজের কানের ময়ূরের পালক (বর্হ) কালিদাসের চূড়ায় বা মাথায় পরিয়ে দিতেন।

আজ তুমি কবি শুধু, নহ আর কেহ—
কোথা তব রাজসভা, কোথা তব গেহ,
কোথা সেই উজ্জয়িনী—কোথা গেল আজ
প্রভু তব, কালিদাস, রাজ-অধিরাজ।
কোনো চিহ্ন নাহি কারো। আজ মনে হয়
ছিলে তুমি চিরদিন চিরানন্দময়
অলকার অধিবাসী। সন্ধ্যাভ্রশিখরে
ধ্যান ভাঙি উমাপতি ভূমানন্দভরে
নৃত্য করিতেন যবে, জলদ সজল
গর্জিত মৃদঙ্গরবে, তড়িৎ চপল
ছন্দে ছন্দে দিত তাল, তুমি সেই ক্ষণে
গাহিতে বন্দনাগান—গীতিসমাপনে
কর্ণ হতে বর্হ খুলি স্নেহহাস্যভরে
পরায়ে দিতেন গৌরী তব চূড়া-‘পরে।৪

কালিদাসের কাব্যকে যথাযথ ভাবে স্পর্শ করতে পেরেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। কালিদাসের সৃষ্টিকে অবলম্বন করে রবীন্দ্রনাথ যে নতুন সৃষ্টি করেছেন, তাও কালোত্তীর্ণ হয়েছে।

 কালিদাস উত্তরমেঘে লিখলেন-

হস্তে লীলাকমলমলকে বালকুন্দানুবিদ্ধং।
নীত্বা লোধ্রপ্রসবরজসা পাণ্ডুতামাননশ্রীঃ।।
চূড়াপাশে নবকুরুবকং চারুকর্ণে শিরীষং।
সীমন্তে চ তদুপগমজং যত্র নীপং বধূনাম্। ৭১
রবীন্দ্রনাথের ভাষায় –
মুখে তার লোধ্ররেণু, লীলাপদ্ম হাতে,
কর্ণমূলে কুন্দকলি, কুরুবক মাথে,
তনুদেহে রক্তাম্বর নীবিবন্ধে বাঁধা,
চরণে নুপূরখানি বাজে আধা আধা।
বসন্তের দিনে
ফিরেছিনু বহুদূরে পথ চিনে চিনে।৫

 রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘কল্পনা’ কাব্যগ্রন্থের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবিতা হলো ‘স্বপ্ন’।  ১৩০৪ বঙ্গাব্দের ৯ই জ্যৈষ্ঠ বোলপুরে বসে কবি এই কবিতাটি রচনা করেন। এই রোমান্টিক কবিতায় মহাকালের পটভূমিতে এক অপরূপ কাল্পনিক ও স্বপ্নময় পরিবেশ ফুটে উঠেছে, যেখানে কবি তাঁর পূর্বজন্মের প্রিয়তমাকে খুঁজতে উজ্জয়িনীপুর ও শিপ্রানদীর তীরে ফিরে যান।স্বপ্নের প্রেক্ষাপট ও মূলভাব এই কবিতায় কবি এক মায়াময় জগতের কল্পনা করেছেন। তাঁর মানসচেতনায় ভেসে ওঠে অতীতকালের উজ্জয়িনী নগরী, যেখানে মহাকাল মন্দিরে গম্ভীর মন্দ্রে সন্ধ্যারতি বাজছে। কবির অবচেতন মন সেই প্রাচীন বসন্তের দিনে, জনশূন্য পথে পূর্বজন্মের প্রথমা প্রিয়ার স্মৃতি রোমন্থন করে। কবিতাটি যেন নিছকই এক স্বপ্ন, যার মাধ্যমে প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যের প্রতি কবির গভীর অনুরাগ ও রোমান্টিক সৌন্দর্যচেতনা প্রকাশিত হয়েছে।কবিতার উল্লেখযোগ্য পংক্তি-

“দূরে বহুদূরে স্বপ্নলোকে উজ্জয়িনীপুরেখুঁজিতে গেছিনু কবে/ শিপ্রা নদী পারে মোর পূর্বজনমের প্রথমা প্রিয়ারে।”৬

 রবীন্দ্রনাথ বারে বারে মানসপথে হেঁটে বেরিয়েছেন, ফিরে গেছেন কালিদাসের যুগে। দুজনেই সৌন্দর্যের পূজারী। দুজনেই বিরহের মধ্যে প্রেমের পূর্ণতা দেখেছেন। কালিদাস নিজেই যেন বিরহী যক্ষ। বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো অবস্থান করেছেন।

রবীন্দ্রনাথের মধ্যে বিরহী সত্তার করুণ রাগিনী নব নব সুরে বেজে উঠেছে।

রজনীর অন্ধকার 
উজ্জয়িনী করি দিল লুপ্ত একাকার।
দীপ দ্বারপাশে 
কখন নিবিয়া গেল দুরন্ত বাতাসে।
শিপ্রা নদী তীরে 
আরতি থামিয়া গেল শিবের মন্দিরে।৭

কালিদাসের জীবনী নিয়ে বহু জনশ্রুতি রয়েছে। সেই সব কাহিনী নিয়ে বিংশশতাব্দীর সংস্কৃতসাহিত্যসাধকেরা সংস্কৃত ভাষায়  একাধিক কাব‍্য রচনা করেছেন। যেমন  নিত‍্যানন্দ মুখোপাধ‍্যায়, রমা চৌধুরী প্রমুখ। অনুবাদের ভাষা সরল সংস্কৃত, সহজবোধ‍্য, আকর্ষণীয়। অনুষ্টুপাদি ছন্দে রচিত  বিভিন্ন শ্লোক উপমা, রূপক, শ্লেষ প্রভৃতি অলংকারে অলংকৃত। প্রসাদাদি গুণে সজ্জিত। 

মহাকবি কালিদাসের ‘অভিজ্ঞান শকুন্তলম’ নাটকটি পড়ে মুগ্ধ হয়ে বিশ্বখ্যাত জার্মান কবি ও সাহিত্যিক ইয়োহান ভোলফগাং ফন গ্যেটে (Johann Wolfgang von Goethe) বিখ্যাত প্রশংসা-কবিতাটি রচনা করেন ।গ্যেটের বিখ্যাত উক্তিটি এখানে প্রণিধানযোগ্য –

Wills du die Blüthe des frühen, die Früchte des späteren Jahres,Wills du was reizt und entzückt, wills du was sättigt und hält,Wills du den Himmel, die Erde, mit Einem Namen begreifen;Nenn’ ich, Sakuntala, Dich, und so ist Alles gesagt.

বাংলায় সেই উক্তিটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিম্নোক্তভাবে অনুবাদ করেছেন:”কেহ যদি তরুণ বৎসরের ফুল ও পরিণত বৎসরের ফল, কেহ যদি মর্ত্য ও স্বর্গ একত্রে দেখিতে চায়, তবে ‘শকুন্তলা’য় তাহা পাইবে।”রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘প্রাচীন সাহিত্য’ নামক প্রবন্ধ গ্রন্থের ‘শকুন্তলা’ প্রবন্ধে এই অসাধারণ উদ্ধৃতিটি ব্যবহার করে কালিদাসের কাব্যের সার্থকতা ও সৌন্দর্যের বিশ্লেষণ করেছিলেন।৮

 তথ্যসূত্র 

১. ঋগ্বেদ ৫.৮.৩.১

২. রবীন্দ্রনাথরচনাবলী, চতুর্থখণ্ড; সুলভ সংস্করণ, বিশ্বভারতী, পৌষ ১৪১০

৩. মেঘদূত, মানসী

৪. কালিদাসের প্রতি, চৈতালি 

৫. ৭১ নং শ্লোক, উত্তরমেঘ, মেঘদূত, কালিদাস।  রবীন্দ্রনাথের অনুবাদ -স্বপ্ন, কল্পনা।

৬. স্বপ্ন, কল্পনা 

৭. স্বপ্ন, কল্পনা 

৮. Ancient Classics: Goethe on Shakuntala https://share.google/5v3AFibWJecBOpQ3q

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনুবাদ -সমালোচনা-সাহিত্য-–-প্রাচীন-সাহিত্য6শকুন্তলা-BengaliSEM-4CC-9-by-HR.pdf https://share.google/6LV4aV8LVH9mleDV3


ড. অভিষেক দাস 
সহকারী অধ্যাপক
সংস্কৃত বিভাগ
বিবেকানন্দ কলেজ ঠাকুরপুকুর
কলকাতা ৬৩

Remembering Ma: From the Editor’s Desk of Conversations

A warm welcome to the 4th issue of Conversations, the annual newsletter of Convergence.  The first newsletter came out in September 2022, a month after ma was no more. Thereafter, remembering ma’s birthday on 19th July, every year, I have been trying to commemorate it in several ways. In July 2023, we brought out the 2nd issue of Conversations. In July 2024, we didn’t bring out Conversations, but instead, published a collection of ma’s articles titled “Collection of Articles on Modern Sanskrit : Volume 1”. Last year, we brought out the 3rd issue of  Conversations. This year, on 19th July 2026, we are bringing out the 4th issue. 

In fact this year, we are holding the 1st Annual Program of Convergence on 19th July – which is going to be a physical event! Since Convergence had been operating as a virtual platform for various course/lectures etc., the teachers and students haven’t met each other. So many, who are able to come physically to Kolkata on 19th July, are really looking forward to meeting each other. So am I!

The event will take place at the Convergence Office-cum-Library, which is at our house in New Town. And there will be people coming from quite a distance like Medinipur, Bolpur, and Murshidabad, and also Baruipur and Diamond Harbour. 

In fact, a small group of students from Gururkul who have recently started taking our online English language course here at Convergence have volunteered to sing/perform Mangalacharan on 19th. 

I will be felicitating the teachers, without whose constant dedication and support, continuing Convergence would be impossible. I will be handing over hard copies of certificates to students who will be coming to the program.

I have also invited the contributors to Conversations to be present and I would request them to please say a few words. That brings us to Conversations!

Like the previous issues, this issue is also entirely online. On the top of the page, you will find tabs like Archive (which contains links to the last three issues of Conversations), Summary (which contains the summary of activities of Convergence for the past few years), Students (which lists the students of Convergence for the past sessions in our various courses), and Convergence (which will take you to the main homepage of Convergence), Photo Gallery (which displays some of my clicks) other than links to Articles, Poems, and Paintings.

Like before, it was sheer pleasure and a great privilege to go through the deep, thought-provoking, and enlightening articles that were submitted. The poems were equally deep! There have been contributions from the Convergence teachers (Swati Parrack, Moumita Ghosh, Shabana Nasreen, Tanushree Ghosh, Arpita Sinha Choudhury), as well as others (Debdas, Mondal,  Paramesh Goswami,  Rupak Biswas, Esha Ganguly) who have contributed before. In fact, Paramesh-da has contributed three articles this time, on varied topics like the Walden Lake, his personal experience amongst American tribals, as well as his philosophical contemplation on a couple of Tagore’s songs. An absolute treat for readers!

Happily, there have been contributions by others as well – Ria Mondal (who has been a dedicated Convergence student taking all the levels of the German and Sanskrit courses – 5 levels of German course and 4 levels of Sanskrit  course), Abhishek Das (who had been a student in the first batch of the German class), Soumi Saha (who has been working at our Library), and last but not the least Nimaichandra Das (who is Abhishek Das’s father).

Murali Monohar Chakraborty (14 years) has sketched ma – and Bishal has (10) has sketched several others. Sroutatwisha’s drawings of her own characters are truly astounding!

Last but not the least, this online newsletter, homepage and all technical support is provided by Samit Basak of Bengal Computers who has very patiently paid attention to my innumerable requests, incorporating small changes in the presentation and the content of the newsletter as well as the homepage. 

Kindly circulate links to this issue, and previous issues of Conversations, our homepage, our courses, our lectures etc. for wide dissemination of our work. Hope you will consider contributing to all future issues of Conversations. 

I hope you will continue to be by my side with all your blessings, support and wishes, the way you have been beside Ma, in her journey heading Convergence. 

Happy conversing!

Soumyanetra

10th July 2026

আঁধার রাতের অরুন্ধতী – রিয়া মন্ডল

প্রতি রাতে অতিথি হয়ে আসে সে
সর্পিল এক বিশালাকার আকাশগঙ্গায় যাকে খুঁজে মরি
সেই যে অশরীরী
এক ঝাঁক নক্ষত্রের মাঝে সে অনুভববেদ্য নয়,
পৃথিবীর বুকে দাঁড়িয়ে তোমার সংশয় যার প্রতি
তোমার রাতের আকাশে সে অনাহূত অতিথি, অরুন্ধতী।
অসীম সেই চাহিদার মাঝে তোমার সংশয়ের
পরিণতি সেই সত্যে
যা মেঘের আড়ালে লুকিয়ে,
অরুন্ধতী, তুমি তো জেগে আছ!
বিপুল ধূলিকণার শরীরাকাশে তুমি সূক্ষ্ম অথচ গভীর
পৃথিবীর চক্ষু উন্মীলিত হয়েও তোমায় দেখতে পায়নি।
শত যুদ্ধ, শত অবিচার, শত শত আন্দোলনে ওরা খোঁজেনি তোমায়
তোমার সহযাত্রী তারকা জানে তুমি শাশ্বত,
যুগ যুগ ধরে যে আলো জ্বালিয়ে যায় মনীষীগণ
শত প্রচেষ্টায় তার শিখা আজ উর্দ্ধগামী
তবু তুমি জান, অরুন্ধতী
এক পক্ষের সত্যকে গ্রহণ করে যে মানুষ আজ মহান
তারা তারকাখচিত রাত দেখেনি
আগুন জ্বালানোর পূর্বে দু’চোখে তোমায় খোঁজেনি
তুমি আজও ঋষির চোখে দৃশ্যমান
মনুষ্যজন্মের মতই তোমার অস্তিত্ব স্বতঃসিদ্ধ
অরুন্ধতী, তুমি নিঃসীম আঁধারে আলো জ্বেলে রেখো
চেয়ে আছে যে শত শত নির্ঘুম চোখ তোমা পানে!


রিয়া মন্ডল
গবেষিকা, দর্শন বিভাগ, গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়।

Go back to where you belong: There is no There There – Moumita Ghosh

“We made art and culture out of the mud and the asphalt and the concrete.”

The phrase relies on the assumption that individuals have a single, static place of origin. In reality, human history is defined by migration, cultural exchange, and globalization.Psychologically, belonging is a fundamental human need. True belonging is not restricted by borders, ethnicity, or nativity. Instead, it is found where individuals feel safe, esteemed , and cherished for their contributions. It is tied to shared human values, civic participation, and mutual respect rather than the geographic lottery of where one was born. Ultimately, the assertion of where someone belongs is best defined by the individual rather than imposed by society. 

If we read Namesake, we can understand how a migrated family urged to gain their individual belongingness. The mother Ashima always believes that only Kolkata can give her that, on the other hand her husband, Ashoke, although misses his ‘home’, remains a bit confused and crowded himself in echoing the culture of New York City….

In ‘There There’, Tommy Orange rips away the stereotype of the “historical” Indian to show what it feels like to belong to a place that tries to pretend you do not exist. For Orange’s characters, it means their original homes were taken, altered, and paved over so much that the “there” they belong to no longer exists…

Lisa Ko’s novel ‘The Leavers’ ,Deming Guo is an 11-year-old boy living in the Bronx with his mother, Polly, an undocumented Chinese immigrant. One day Polly leaves for work and never comes home. Adrift, Deming is eventually adopted by two white professors. The new family moves to upstate New York, and Deming is renamed Daniel, sparking a search for identity and cultural history…

The Last Lesson” is a poignant short story by Alphonse Daudet, set during the Franco-Prussian War. Franz, who usually dislikes his French classes, arrives at school dreading a scolding for not preparing his participle lesson. Instead, he finds the atmosphere solemn, his teacher M. Hamel dressed in his finest Sunday clothes, and the village elders seated at the back of the room as a sign of respect as that was the last of their French learning. M. Hamel delivers a moving speech explaining that their native language is a “key to their prison”….

Brené Brown’s research, notably in her TED talk and writings like ‘Braving the Wilderness’, argues that true belonging is not passive; it requires the courage to stand alone, self-acceptance, and vulnerability. Similarly, bell hooks writes about the power of inclusive, emotionally attached communities where everyone’s unique background and voice is valued.

Nora Krug’s graphic memoir, “ Belonging: A German Reckons with History and Home” , explores cultural and ancestral belonging by investigating her family’s involvement in World War II. It asks how geography and inherited history shape our personal identity.

David Whyte’s poem “The House of Belonging” treats belonging as an inner temple of adult aloneness—a fundamental place of origin that starts with connecting to oneself. He writes, 

“This is the temple of my adult aloneness and I belong to that aloneness as I belong to my life. 

There is no house like the house of belonging.” 

Jibanananda Das is the ultimate poet of Bengali nature and spatial belonging. His poem– “Abar Asibo Phire” (I Shall Return Again) views belonging as an eternal connection to the geography of Bengal that even death cannot break. While Nazrul is known as the “Rebel Poet,” his writings on belonging focus heavily on communal harmony and collective human identity.

“হিন্দু না ওরা মুসলিম ?” ওই জিজ্ঞাসে কোন্ জন?

কান্ডারী ! বল ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা’র”

(“Who asks if they are Hindu or Muslim? Captain! Say instead that humans are drowning, the children of my mother!). On the other hand Rabindranath Tagore’s concept of belongingness rejects narrow political borders, instead viewing connection as a spiritual harmony between the individual, the natural world, and global humanity.In his short story ‘The Homecoming’, he highlights the deep human need for unconditional love. He portrays a young boy who gets physically and emotionally separated from his village, demonstrating how a lack of emotional support completely breaks the human spirit.

“মা, আমার ছুটি হয়েছে মা, এখন আমি বাড়ি যাচ্ছি।”(Mother, the holidays have come, mother; I am going home now.) This is the final utterance of Phatik. 

There are thousands of writings which show how it feels if you are not valued for yourself. Nowadays we’re shifting towards synthetic belonging. AI fundamentally changes how we relate to our own roots by acting as both a mirror and a filter. This root refers to both our cultural trajectory as a community and our individuality. 

Belongingness is far more than a comforting feeling; it is a fundamental human necessity that drives our social structures and individual well-being. Throughout life, the search for acceptance within families, cultures, and peer groups shapes our identity and mental health. While the modern world often fosters isolation, actively building inclusive spaces allows individuals to thrive. Ultimately, true belonging is a two-way street: it requires communities to open their doors with empathy, and individuals to embrace their authentic selves. Therefore if you ask me what does it mean to me, I would say—

“হৃদয়ের যে কোণে অভিনয় লাগে না, সেটাই আমাদের আপন ঠিকানা।”

(The corner of the heart where no acting is required, that is our true address.)


Moumita Ghosh is a teacher at St Joseph’s school, Murshidabad. She loves to learn new languages. She has been associated with Convergence right from its inception, and has been an extremely committed teacher of German at Convergence. She teaches the language at different levels here.

Resurrection -Shabana Nasreen

The crows feast on mutilated bodies-
Bodies- as soft as petals,
munching and chewing-
their flesh that taste of bullets and burning grief.
Bodies-
Thirteen inches, twenty-six inches, and thirty and nine
Lie motionless and maimed.
Far across the border,
The radio cries, “Save Children! Save Children!”
The skeletons remain,
waiting for the rain,
to get dissolved into the soil
and bloom as flowers again.


Shabana Nasreen is a Research Scholar in the Department of English, Diamond Harbour Women’s University. She is also a Guest Faculty in the Department of English, Jadavpur University. She has presented papers at several national and international seminars and has published research articles in Web of Science Indexed, UGC Care Listed and Peer-Reviewed Journals. She has been a dedicated teacher of English at Convergence since July 2023, and teaches the language at various levels.

রাজা রামমোহন রায়: একটি পর্যালোচনা  – স্বাতী পারেখ

রাজা রামমোহন রায়ের জন্মের  দুইশত বাহান্ন বছর অতিক্রান্ত। এই পুণ্যভূমি ভারতে বহু মনীষী ও যুগমানবের মতো রামমোহনের আবির্ভাবও উল্লেখযোগ্য এবং ঐতিহাসিক। তবু রামমোহন রায়ের মনীষা, ভাবধারা ও পূর্ণাঙ্গ জীবনকাহিনি সাধারণ মানুষের মধ্যে বহুল প্রচারিত হয়নি। জনসাধারণের মধ্যে তিনি ব্রাহ্মধর্মের প্রবক্তা ও দেশ থেকে সতীদাহ প্রথা নিবারণের পথপ্রদর্শক রূপেই খ্যাত হয়েছেন। তাঁর জীবনের নানা কর্মকাণ্ডের সঙ্গে পরিচয় খুব বেশি লোকের নেই। আধুনিক ভারতের পুনর্জাগরণের সূচনা যিনি করেছিলেন, তিনিই কিন্তু রাজা রামমোহন রায়। ‘রাজা’ উপাধিটি তিনি লাভ করেন দিল্লির বাদশা বাহাদুর শাহের (দ্বিতীয়) কাছ থেকে।

আড়াইশো বছরেরও পূর্বে যখন রামমোহন রায় জন্ম গ্রহণ করেছিলেন, তখন যে ভারতবর্ষ ছিল তার থেকে আজ ভারত জ্ঞানে-বিজ্ঞানে অনেক উন্নত। রামমোহন সমাজকে উন্নত করার চেষ্টা করে গেছেন আজীবন। সমাজ সংস্কারের কাজে যে কোনও বাধাকে তিনি অতিক্রম করে গেছেন তাঁর ক্ষুরধার যুক্তি ও মেধার সহায়তায়। দৃঢ় চিত্তের জন্য তিনি তাঁর সাধনায় অবিচল থেকেছেন। ধর্ম ও সমাজ সংক্রান্ত অন্যায়-অবিচারের প্রতিবাদ এবং যুক্তি দিয়ে সত্য উদঘাটনের চেষ্টায় তাঁকে অনেক বক্রোক্তি সহ্য করতে হয়েছিল, এমনকি পরিবার পরিজন থেকে পরিত্যক্ত হয়েছিলেন, তবু তিনি তাঁর সিদ্ধান্তে অটল থেকেছেন। দেশের লোক তো দূরের কথা, তাঁর নিকট পরিজন— পিতা-মাতা স্বয়ং তাঁর বিরোধিতা করেছেন। যাঁরা যুগপ্রবর্তক হয়ে আসেন যুগ তাঁদের চিনতে পারে না, বুঝতে পারে না। রামমোহন কার্যত ঈশ্বরে অবিশ্বাসী ছিলেন না, শুধু ধর্মের মিথ্যা খোলস দূর করতে চেয়েছিলেন। ধর্মান্ধতার বন্ধন থেকে মুক্তির জন্য বিজ্ঞানভিত্তিক ও যুক্তিবাদী শিক্ষার প্রসারের চেষ্টা করেছিলেন তিনি আর এই চেষ্টাই তাঁর আধুনিকতার প্রমাণ। তাই নিঃসন্দেহে এ কথা বলা যায় যে ভারতবর্ষে আধুনিকতার জনক ছিলেন রামমোহন।

রামমোহন যে সময়ে জন্মেছিলেন,  সে সময়টা খুব‌ই গুরুত্বপূর্ণ। ভারতে তখন মধ্যযুগের শেষ আর আধুনিক যুগের শুরু, সেই সন্ধিক্ষণে রামমোহনের শুভ আবির্ভাব। রামমোহন কোনও ধর্মগুরু ছিলেন না,  তিনি বিভিন্ন ভাষা শিখে বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ গভীরভাবে অধ্যয়ন করে ধর্মের সত্য রূপটি  উপলব্ধি করতে চেয়েছিলেন, অন্যদের তা জানাতে চেয়েছিলেন। সব ধর্মগ্রন্থের মূল কথা এক:  ঈশ্বর এক এবং অদ্বিতীয়। কিন্তু ধর্মগুরুরা অহেতুক আচার-বিচারকে প্রাধান্য দিয়ে, ধর্মের দোহাই দিয়ে মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেছেন, যার ফলস্বরূপ সারা পৃথিবীতে মারামারি, হানাহানি, শারীরিক ও মানসিক কষ্টের সূত্রপাত। 

শুধু ভারতেই নয়, ইংলন্ডের সমাজেও তখন পরিবর্তনের ঢেউ উঠেছে। শিল্প বিপ্লবের শুরু হয়েছে। ভারতে বাদশাহী আমলের শেষ পর্যায় ও  ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির স্থাপন। দেশে তখন ইংরেজদের শাসন কায়েম হয়েছে; জাতিভেদ, নানারকম ধর্মীয় অনুশাসন, কুসংস্কার, অশিক্ষা, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, কুলীনপ্রথা, স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রীদের সহমরণের ধর্মীয় পুণ্যলাভের নামে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা, ব্রাহ্মণ-পুরোহিতদের দাপট, অন্ত্যজ গরীব মানুষদের হীন চোখে দেখা ইত্যাদি নানারকম সামাজিক অবক্ষয় চলছিল।  এমতাবস্থায় রামমোহনের জন্ম হল গোঁড়া হিন্দু ব্রাহ্মণ পরিবারে।

 ১৭৭২ সালের (মতান্তরে ১৭৭৪)  ২২শে মে হুগলি জেলার খানাকুল-কৃষ্ণনগরের রাধানগর গ্রামে  রামমোহন জন্মগ্রহণ করেন। পিতা রামকান্ত রায় ছিলেন পরম বৈষ্ণব এবং মা (ফুলঠাকুরাণী) তারিণী দেবী  ছিলেন শৈব পরিবারের। তারিণী দেবী প্রচণ্ড ব্যক্তিত্বময়ী ছিলেন। পুত্র রামমোহন মায়ের ব্যক্তিত্বময় ও জেদি চরিত্রটি লাভ করেছিলেন। তৎকালীন সমাজে বহুবিবাহের রীতি অনুযায়ী রামকান্তের তিনটি বিবাহ।  প্রথমা স্ত্রী সুভদ্রা নিঃসন্তান ছিলেন। দ্বিতীয়া স্ত্রী তারিণী দেবীর দুই পুত্র ও এক কন্যা: জ্যেষ্ঠ জগমোহন ও কনিষ্ঠ পুত্র রামমোহন।  তৃতীয়া স্ত্রী রামমণিদেবী রামলোচন রায়ের মাতা ছিলেন।

তদানীন্তন সময়ে রামমোহনের পরিবারের অনেকেই মুর্শিদাবাদের মুসলমান রাজসরকারের অধীনে চাকরি করতেন। সেই সুবাদে রামমোহনের পিতা রামকান্ত রায় প্রচুর ধনসম্পত্তির অধিকারী হয়েছিলেন। রামমোহনের প্রপিতামহ কৃষ্ণচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় নবাবের কাছ থেকে সম্মানসূচক ‘রায় রায়ান’ উপাধি লাভ করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে রামমোহনের বংশ রায়ান বাদ দিয়ে ‘রায়’ উপাধি ব্যবহার করতেন।

প্রচলিত বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহের প্রথা অনুযায়ী রামমোহনেরও  বাল্যবয়সে তিনটি বিবাহ হয়। প্রথম বিবাহ হয় রামমোহনের আট বছর বয়সে, স্ত্রীর বয়স অজানা এবং তিনি অকালপ্রয়াত। নয় বছরে রামমোহনের দ্বিতীয় বিয়ে। এক বছরের মধ্যে পিতা রামমোহনের তৃতীয় বিবাহ দিয়ে দেন। শৈশবে বংশের রীতি অনুযায়ী রামমোহন কৃষ্ণভক্ত ছিলেন। কিন্তু অল্পবয়স থেকে কাশী, পাটনা, তিব্বত ইত্যাদি নানা স্থানে গিয়ে আরবী, ফার্সী, উর্দু, সংস্কৃত শাস্ত্র পড়ে তিনি হিন্দু ধর্মের পৌত্তলিকতার প্রতি আস্থা হারান। গোঁড়া হিন্দু ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তান হয়ে পৌত্তলিকতায় অবিশ্বাসী হওয়াতে ধর্মপ্রবণ মাতা-পিতা তা মেনে নিতে পারলেন না। পুত্র দুর্দান্ত মেধাবী, তরুণ বয়সেই বিভিন্ন ভাষায় পারদর্শী হয়ে উঠলেন। তবু পিতা-মাতা বিধর্মী পুত্রকে গৃহ থেকে নির্মমভাবে বিতাড়িত করেন। তাতে যেন ‘শাপে বর’ হল। তিনি আরও গভীরভাবে হিন্দু ধর্মের গূঢ় তত্ত্ব জানতে আগ্রহী হলেন।

রামমোহন রায়কে আজ আমাদের আরো ভালভাবে জানবার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। আজও আমরা তাঁর চিন্তাধারাকে প্রকৃত উপলব্ধি করতে পারি নি। দেশ ও দেশের জনসাধারণকে কোন্ উত্তরণের পথে তিনি নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, তা তাঁর কৈশোর থেকে বাকি জীবনচর্যার মাধ্যমে বোঝা যাবে।
      
রামমোহন জীবনের প্রথম চৌদ্দ বছর রাধানগরে ছিলেন। সেখানকার গুরুমহাশয়ের পাঠশালায় বাংলা শেখার সঙ্গে সঙ্গে একজন মৌলভীর কাছে ফারসি শেখেন। ফারসি ভাষায় ব্যুৎপত্তি লাভের জন্য তাঁকে তৎকালীন ইসলামি শিক্ষার পীঠস্থান পাটনায় পাঠানো হয়। তিনি সেখানে কোরান ও ইসলাম ধর্মতত্ত্ব আয়ত্ত করেন। ফারসি ভাষায় সুফিদের গ্রন্থ পাঠ করে তাঁর মনে প্রচলিত ধর্ম সম্পর্কে নানারকম প্রশ্ন জাগে। চৌদ্দ বছর বয়সে রামমোহন নন্দকুমার বিদ্যালংকার, যিনি পরবর্তীকালে ‘হরিহরানন্দ তীর্থস্বামী কূলাবধূত’ নামে খ্যাত হন, তাঁর কাছে সংস্কৃত শাস্ত্র এবং তন্ত্র শাস্ত্র শিক্ষা লাভ করেন। পাটনা থেকে ফিরে তিনি হিন্দুদের মূর্তিপূজা আর হিন্দু সমাজের নানা সংস্কার সম্বন্ধে বই লেখেন। হিন্দুদের মূর্তিপূজা সম্পর্কিত ব‌ই লেখার ফলস্বরূপ গোঁড়া রক্ষণশীল পিতার বিরাগভাজন হতে হল তাঁকে। বাড়ি থেকে পিতা কর্তৃক বিতাড়িত হয়ে তিনি বিভিন্ন স্থান ঘুরতে ঘুরতে তিব্বত যান, সেখানে বৌদ্ধধর্ম শাস্ত্রে জ্ঞানার্জন করেন। সেখানেও লামার সঙ্গে বিবাদ হয়, যেহেতু তিনি লামাকে জীবন্ত দেবতারূপে মানতে পারেন নি। সেখানে তাঁর জীবন সংশয় হয়। তিব্বত থেকে ফিরলে বাবা রামকান্ত পুত্রকে পুনরায় গৃহে প্রবেশাধিকার দেন। এবার তিনি বারাণসী গিয়ে হিন্দুশাস্ত্র অধ্যয়ন করলেন এবং অতি অল্প সময়ে স্মৃতি, পুরাণ ইত্যাদি শাস্ত্রে অগাধ জ্ঞান অর্জন করেন।

এরপরেই শুরু হয় রামমোহনের দ্বন্দ্ব। আশৈশব পারিবারিক বৈষ্ণব ধর্মে লালিত তাঁর মনে পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে এক নিরাকার শক্তির অনুভূতি পরিব্যাপ্ত হয়। মাঝে মধ্যেই পিতার সঙ্গে তর্ক-বিতর্ক হত। রামমোহনের হিন্দু ধর্মের সকল কুসংস্কার ও কুপ্রথার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোয় ক্রুদ্ধ ও দুঃখিত পিতা পুনরায় রামমোহনকে গৃহ থেকে বিতাড়িত করেন।

 ১৮০৩ সালে পিতা রামকান্তের মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পূর্বে পিতা তিন সন্তানের মধ্যে সম্পত্তি ভাগ করে দিয়ে যান। কিন্তু পুত্র পিতা প্রদত্ত সম্পত্তি গ্রহণ করেন নি। পুত্র প্রকাশ্যে পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে মতবাদ প্রকাশ করাতে ক্রুদ্ধ জননী বিধর্মী পুত্রকে আইনের সাহায্যে সম্পত্তিচ্যুত করার জন্য সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেন। রামমোহন মামলায় জয়ী হন। তিনি যে বিধর্মী তা প্রমাণিত হয় নি। রামমোহন বন্ধু গর্ডন সাহেবকে বিলাতে থাকাকালীন চিঠি লিখেছিলেন, তাতে তিনি তাঁর জীবন কাহিনি সংক্ষেপে লেখেন: “আমার সমস্ত তর্ক বিতর্কে আমি কখন হিন্দুধর্মকে আক্রমণ করি নাই। উক্ত নামে যে বিকৃত ধর্ম প্রচলিত, তাহাই আমার আক্রমণের বিষয় ছিল।” তিনি প্রাচ্য দর্শনকে শ্রদ্ধা জানিয়ে পাশ্চাত্য শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে ভারতের পুনর্জাগরণ সম্ভব বলে মনে করেছিলেন। তাঁর ধর্মীয় চিন্তা ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে তিনি ইসলাম, সুফিবাদ ও খ্রিস্টধর্ম এবং উপনিষদের একেশ্বরবাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন।

প্রথমে রামমোহন মুর্শিদাবাদে উডফোর্ড সাহেবের সহযোগী, তারপর তিনি ডিগবি সাহেবের বাবু বা দেওয়ান রূপে রামগড়, যশোর, ভাগলপুর এবং রংপুরে কাজ করেছেন। ১৮১৪ সাল পর্যন্ত ডিগবি সাহেবের অধীনে চাকরি করার সময়ে তিনি ইংরেজি ভালোভাবে শেখেন। ইংরেজি পত্র-পত্রিকা ও অন্যান্য লেখা পাঠ করে তিনি ইংলন্ডের শিল্পবিপ্লবের সময়ের চিন্তাধারা সম্পর্কে অবহিত হন।

১৮১৪ সালে রামমোহন কলকাতায় এসে বসবাস শুরু করলেন। সেই সময় থেকেই প্রকৃতপক্ষে তিনি তাঁর জীবনের সময়, অর্থ, শরীর ও মন দেশ ও দশের মঙ্গলের জন্য উৎসর্গ করলেন। ১৮১৫ সালে তিনি তাঁর মানিকতলার বাসভবনে  ‘আত্মীয় সভা’ নামে একটি সভা গঠন করেন। অল্পবয়স থেকেই রামমোহন প্রচলিত ধর্মের অসারতা উপলব্ধি করেছিলেন। খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারকেরা ভারতের জনসাধারণকে বর্বর, অসভ্য ভাবতেন, তাদের সভ্য করার উদ্দেশ্যে খ্রিস্টান ধর্মমত প্রচার করতেন। রামমোহন উপলব্ধি করলেন এমন ধর্ম থাকা উচিত যাতে ঈশ্বরের মূর্তি থাকবে না, ভেদবিচার থাকবে না, অথচ তার মূল থাকবে ভারতের সুপ্রাচীন ধর্মীয় সংস্কৃতিতে। মূর্তি বিরোধী অভেদতত্ত্ব প্রচারের উদ্দেশ্যেই তাঁর এই ‘আত্মীয় সভা’ গঠন। নিরাকার ঈশ্বরের প্রার্থনা করার জন্য রামমোহনের উদ্যোগে ১৮২৮-এ ‘ব্রাহ্মসমাজ’ প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮১৫ থেকে ১৮১৭ সালের মধ্যে রামমোহন বেদান্ত গ্রন্থ, কেনোপনিষদ, ঈশোপনিষদ, কঠোপনিষদ, মান্ডুক্যোপনিষদ, মুন্ডকোপনিষদ ইত্যাদি  বাংলা অনুবাদ সহ পুস্তকাকারে প্রকাশ ও প্রচার করেন। তিনি বেদান্ত ও উপনিষদকে ধর্ম ও সমাজ সংস্কারের কাজে অস্ত্র রূপে গ্রহণ করেন। হিন্দু ধর্মের মূলে কী আছে তা জানার জন্য নিজে শাস্ত্র অধ্যয়ন করে তিনি দেখলেন, বেদান্তে বা উপনিষদে জাতিভেদ, বর্ণভেদ, মূর্তিপূজা সমর্থিত হয় নি। বেদান্ত মতে ঈশ্বর জগৎময় এক অদৃশ্য সত্তা, সমস্ত প্রাণী ও সমস্ত পদার্থে তা পরিব্যাপ্ত। প্রচলিত ধর্মের বিরুদ্ধে রামমোহনের সংগ্রামের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল পরাধীন ভারতে অশিক্ষা, কুসংস্কারাচ্ছন্ন, ধর্মের মোহাবিষ্ট ভারতীয়দের বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়ন সাধন। উন্নয়নকেই রামমোহন সর্বাধিক প্রাধান্য দিয়েছেন। তাই তিনি ১৮২৩ সালে গভর্নর জেনারেল লর্ড আমহার্স্টকে লেখা চিঠিতে এই দাবি জানান যে ভারতীয়দের প্রাচ্যবিদ্যা চর্চার সঙ্গে ইউরোপীয় জ্ঞান-বিজ্ঞানের  পরিচয় ঘটাতে হবে। ‘আত্মীয় সভা’র অধিবেশনে সিদ্ধান্ত হয়, ভারতীয় হিন্দুদের জন্য একটি উত্তম মানের স্কুল স্থাপন করা হবে। হিন্দু বিদ্যালয়ের জন্য শহরের গণ্যমান্য ও ধনীরা অর্থদানে রাজি হলেন কিন্তু সেই উদ্যোগ মাঝপথে থমকে গেল রামমোহনের ধর্মীয় সংস্কারমূলক মতামতে বিক্ষুব্ধ কিছু মানুষের বিরোধিতায়। তাঁরা ঘোষণা করলেন, রামমোহন যদি হিন্দু বিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকেন, তাহলে তাঁরা হিন্দু বিদ্যালয় স্থাপনে সহযোগী হবেন না। রামমোহন চান কর্ম, দেশের সর্বাত্মক উন্নতি। তাঁর জন্য কোনও মহৎ কার্য বাধা প্রাপ্ত হবে, তা তাঁর কাম্য নয়; তাই তিনি সরে দাঁড়ালেন হিন্দু বিদ্যালয় স্থাপনের কর্মকাণ্ডের থেকে। ভবিষ্যতে এই হিন্দু বিদ্যালয় ‘হিন্দু কলেজ’ বা ‘প্রেসিডেন্সি কলেজ’ রূপে জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রসিদ্ধ পীঠস্থান হয়। ১৮২২ সালে রামমোহন নিজের অর্থ ব্যয় করে হেদুয়া অঞ্চলে ‘এ্যাংলো হিন্দু স্কুল’ স্থাপন করেছিলেন।

শিক্ষা ছাড়া রামমোহন বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন সংবাদ মাধ্যমের প্রসারকে। নিজে তিনি তিনটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। মীরাৎ-উল-আখবার ফার্সিভাষায়, ইংরেজি ভাষায় ‘ব্রাহ্মনিকাল্ ম্যাগাজিন-ব্রাহ্মণ সেবধি’  এবং বাংলা ভাষায় ‘সংবাদ কৌমুদী’। শুধু সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠাই নয়, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা খর্বের ব্যাপারেও তিনি প্রতিবাদ করেন। লর্ড ওয়েলেসলি সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করলে তিনি তার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠেন।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও ছিল তাঁর সজাগ দৃষ্টি।  তিনি বুঝেছিলেন ইংরেজ কোম্পানির শাসনকালে দেশের মানুষের দারিদ্র্য বেড়ে চলেছে। বিদেশী মূলধনে ভারতে শিল্পোন্নয়নের সম্ভাবনা হতে পারে এই ভাবনায় তিনি ও তাঁর সহযোগী বন্ধুরা (যেমন দ্বারকানাথ ঠাকুর) নীল চাষকে সমর্থন করেছিলেন। রামমোহন জমিদারি ব্যবস্থায় কিছু সংস্কার সাধনের চেষ্টা করেন। নিজে বড় তালুকদার হয়েও জমিদারদের, তালুকদারদের এবং রাজস্ব আদায়কারীদের প্রজাশোষণের কথা তুলে ধরেছিলেন।  তিনি চেয়েছিলেন জমিদারদের মতো প্রজাদের সঙ্গেও ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ হোক, তাহলে জমিদারদের উৎপীড়ন কমবে।

রামমোহনের সমাজ-সংস্কার প্রচেষ্টার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ  উদ্যোগ সাফল্য হল সতীদাহ নিবারণ। মুঘল সাম্রাজ্যের পতন ও ইংরেজদের এদেশে একাধিপত্য প্রতিষ্ঠার পরে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে সতীদাহ বৃদ্ধি পেয়েছিল। রামমোহনের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা জগমোহনের মৃত্যুর পর তাঁর দ্বিতীয়া স্ত্রীকে সহমরণে যেতে হয়েছিল। এ ঘটনা রামমোহনকে দগ্ধ করে।  তিনি সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে প্রথাটি বন্ধ করতে চেয়েছিলেন। হিন্দুশাস্ত্র ঘেঁটে বের করেছিলেন, কোথাও পতির মৃত্যুর পর স্ত্রীদের সহমরণের কথা উল্লিখিত হয় নি। রামমোহনের নিরলস প্রচেষ্টার পরিণামস্বরূপ ১৮২৯ সালে লর্ড বেন্টিক সতীদাহকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে ঘোষণা করলেন ও আইন প্রণয়ন করে চিরতরে তা বন্ধ করলেন।

ধর্ম, শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারে রামমোহনের যেমন আগ্রহ, তেমনি ইউরোপ, আমেরিকার গণতান্ত্রিক কার্যকলাপ সম্পর্কেও ছিল সমান আগ্রহ। বিদেশের খবরাখবরও তিনি রাখতেন। তিনটি কারণে তিনি ইংল্যান্ড সফর করেন।  প্রথম কারণটি হল তৎকালীন দিল্লির সম্রাট দ্বিতীয় আকবরের পক্ষ থেকে ইংল্যান্ডের রাজার হাতে স্মারকলিপি প্রদান। স্মারকলিপিতে ছিল দিল্লির নিকটবর্তী কতকগুলি জমিদারির রাজস্বে বাদশাদের নিজের অধিকারের স্বীকৃতি আদায় করা।   দ্বিতীয় কারণ সতীদাহ প্রথা নিবারণ বিষয়ক একটি স্মারকলিপি ইংল্যান্ডের ‘হাউস অব কমন্সে’ দাখিল করা। তৃতীয়ত, ‘হাউস অব কমন্সে’র আসন্ন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সনদ পুনঃপ্রদান বিষয়ক আলোচনায় যোগ দেওয়া। ইংল্যান্ডে তিনি যথেষ্ট সম্মান অর্জন করেছিলেন। সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতার দেশ ফ্রান্স সম্পর্কে রামমোহনের কৌতূহল ছিল। ১৮৩২ সালে তিনি প্যারিস যান এবং স্বয়ং রাজা লুই তাঁকে সম্মানিত করেন। ফ্রান্স থেকে তিনি ব্রিস্টলে ফিরে আসেন, সেখানে থাকাকালীন তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। ১৮৩৩ সালে ২৭ সেপ্টেম্বর ব্রিস্টলে এই মহামানবের জীবনদীপ চিরতরে নির্বাপিত হল। ভারতমাতার কৃতী সন্তানকে শেষ সম্মান জানানোর সুযোগ আর ভারতবাসী পেল না।

সময়ের দাবি মেনে রাজা রামমোহন রায়ের সমাজ সংস্কার বর্তমান সময়েও প্রাসঙ্গিকতা হারায় নি। ঊনবিংশ শতাব্দীতে কুসংস্কারের বিরুদ্ধে, জাতিভেদের বিরুদ্ধে, ধর্মধ্বজীদের বিরুদ্ধে রামমোহনের বিদ্রোহ যেমন দুঃসাহসিক পদক্ষেপ ছিল, তেমনি বর্তমান সময়েও তাঁর প্রাসঙ্গিকতা প্রবলভাবে উপলব্ধ হয়। এই একবিংশ শতাব্দীতে যখন প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানে দেশ অগ্রসরমান, তখন আরো বেশি বেশি আমরা ধর্মকে, পৌত্তলিকতাকে প্রাধান্য দিচ্ছি। ধর্মের সারবস্তুতে মনোযোগী না হয়ে আচার বিচারকে প্রাধান্য দিচ্ছি। “সবার উপরে মানুষ সত্য” ভুলে গিয়ে দেশের নেতারা ধর্ম নিয়ে পড়েছেন,  ধর্মের বাহানা দিয়ে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধিতে মন দিয়েছেন। দেশের মঙ্গল, দেশের মানুষের মঙ্গল চিন্তা বাহুল্যমাত্র। রাজা রামমোহন রায় সম্পর্কে যত পড়ছি, তত বিস্মিত হচ্ছি। কোন ধাতুর মানুষ ছিলেন তিনি? মনের মধ্যে নানা প্রশ্ন জেগে উঠছে। একবিংশ শতাব্দীর ভারতের মানুষের দিকে তাকিয়ে দেখি, ভারতবাসীর মনোজগতে বিশেষ পরিবর্তন আসে নি, সংস্কার হয় নি। সতীদাহ প্রথা নেই, কিন্তু পণের জন্য ও নানা কারণে আজ‌ও মেয়েদের পুড়িয়ে মারা হয়। মেয়েরা অন্দরমহল থেকে তাদের কর্মজগত বহির্বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে পেরেছে। স্থলে, জলে, অন্তরীক্ষে মেয়েরা তাদের মেধা ও শক্তির পরিচয় দিচ্ছে, পুরুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলছে। তবু মেয়েদের নিরাপত্তা নেই। সভ্যতার উন্নতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ধর্ষণ, নারী নির্যাতন। ভারতীয় রাজনীতিতে আজ ঘুণ ধরেছে। রামমোহন চেয়েছিলেন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের শিক্ষার মিলন, যুক্তিবাদ, “ধর্মের বেশে মোহ” যেন এসে না ধরে; অথচ বাস্তবে দেখি জনসাধারণ বিজ্ঞানকে ছেড়ে, যুক্তিকে বাদ দিয়ে মাদুলি, কবচ, ধাগা ধারণেই বিশ্বাসী। ভীরুপ্রাণ আমরা কঠিন অসুখ থেকে মুক্তি পেতে ডাক্তারের পরিবর্তে যাই মা মনসার থানে, ওঝার কাছে। বিপদ থেকে রক্ষা পেতে করি মানত। যত দুর্বল হচ্ছি ততই বেড়ে চলেছে কালী, শিব, দুর্গা, কৃষ্ণ ছাড়াও অসংখ্য দেবদেবীর শরণাপন্ন হওয়া। হাসপাতাল, বিদ্যায়াতনের বদলে বড় বড় মন্দির তৈরিতে ব্যস্ত হচ্ছি। আমাদের দেশে যুগ যুগ ধরে এত মহাপুরুষ, মনীষী থাকা সত্ত্বেও আমরা তাঁদের দেখিয়ে দেওয়া পথে চলি না। এখনো আবার যদি আমরা রাজা রামমোহন রায়ের চর্চা করি, আবার আমরা ফিরে পাব আমাদের মনোবল, আত্মবিশ্বাস ও সৎসাহস— যার ওপর ভিত্তি করে আমরা ও আমাদের নবীন প্রজন্ম  গৌরবময় নব্য ভারতের দিকে অগ্রসর হতে পারবে।  যদি ধর্মপ্রাণ ভারতীয়রা যুক্তিগ্রাহ্য ধর্মাচরণ করে এবং রামমোহনের চিন্তাধারাকে অনুধাবন করতে পারে, তবে নিশ্চিতভাবে আমাদের মেধা ও শক্তিকে যথাযথ কাজে লাগিয়ে আমরা বিশ্বে অনুসরণকারী দেশ রূপে গণ্য হতে পারব। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যথার্থই রামমোহনকে   “ভারতপথিক  বলে অভিহিত করেছিলেন। রাজা রামমোহন রায় অবশ্যই ছিলেন প্রকৃত মানব দরদী।

রামমোহন রায় সম্পর্কিত প্রবন্ধ লিখতে গিয়ে আমি যে সব তথ্য জেনে উপকৃত হয়েছি, তা পেয়েছি তিনটি গ্রন্থ থেকে। সর্বপ্রথম উল্লেখ করতে হয় শ্রী নগেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘মহাত্মা রাজা রামমোহন রায় জীবন চরিত’। দ্বিতীয় ব‌ইটি শ্রী তাপস ভৌমিকের সম্পাদনায় ‘কোরক’ প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত ‘সার্ধ-দ্বিশতবর্ষে রামমোহন রায়’ এবং তৃতীয় ব‌ইটি রাজা ভট্টাচার্যের দ্বারকানাথ ঠাকুরকে অবলম্বন করে রচিত উপন্যাস ‘দ্বারকানাথ: পরাধীন দেশের রাজপুত্র’।   


Swati Parrack has done her M. Phil in Sanskrit, Degree and Diploma in German and Hindi languages. She has been associated with Convergence right from its inception and has been teaching German at various levels here.

1 2 3