Drawing – Falguni Mahanty (Class VII)

The annual newsletter of Convergence, 4th Issue, July 2026

আমাদের সকলের পরম শ্রদ্ধেয়া অধ্যাপিকা ড. ঋতা চট্টোপাধ্যায় (আর,সি ম্যাডাম)থেকে ঋতা দি -হয়ে ওঠার এই জার্ণি কোন একদিনে তৈরি হয় নি| বহুদিনের শ্রদ্ধা, সান্নিধ্য, বিশ্বাস আর ভরসা থেকেই এই সম্পর্কের উত্তরণ| সময়টা মোটামুটি ২০০২-০৩ হবে, আমরা তখন এম. এ. প্রথমবর্ষ| বোধহয় তার দু‘ এক বছর আগে অধ্যাপিকা ঋতা চট্টোপাধ্যায়(আর.সি ম্যাডাম) রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যাদবপুরে আসেন| সেমেস্টার সিস্টেম তখন চালু হয় নি, সম্ভবত, দ্বিতীয় পত্রে সংস্কৃত দুটি নাটক পাঠ্য ছিল- একটি মৃচ্ছকটিকম, অন্যটি উত্তররামচরিতম| মৃচ্ছকটিকম পড়াবেন আর.সি ম্যাডাম আর উত্তররামচরিতম পড়াতেন এন.বি ম্যাডাম| সকলের প্রিয় এন.বি ম্যাডাম- অধ্যাপিকা নন্দিতা দি(বন্দ্যোপাধ্যায়)| সত্যি-এককথায় অসাধারণ, কোন তুলনা নেই| যেমন পড়াতেন তেমনি স্নেহবাত্সল্যভাব ছিল সবার প্রতি| বিভাগে পি,পি ম্যাডাম যেমন অতিশয় সাদামাটা, ভীষণ কড়া প্রকৃতির, ঠিক তার বিপরীতে আর.সি ম্যাডাম ছিলেন খুবই ঠাণ্ডা স্বভাবের, সাজগোজে অত্যন্ত পরিপাটি এবং খুব সুন্দর, দেখলেই কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার মত! তাঁর গাড়ি থেকে শাড়ি, পেন বা ডায়েরি সবকিছুতেই একটা ম্যাচিং ম্যাচিংভাব থাকতো| সবেতেই ছিল একটা আভিজাত্যের ছাপ| চলন বলন একেবারে বিদেশী স্টাইলে| পড়াশুনা থেকে নানা কাজে কর্মেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত ধীর, স্থির ও খুতখুঁতে স্বভাবের| মৃচ্ছকটিকের তিনি আমাদের গোটা কয়েক ক্লাস নিয়েছিলেন| খুব ধরে ধরে পড়াতেন, খুব সুন্দর বোঝাতেন| খুব ভালো লাগতো ওঁনার ক্লাস করতে| ম্যাডাম বলতেন না বুঝতে পারলে সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞাসা করতে, তাঁর কথায় -‘আমারা পডেছি বিষ্ণুপদ ভট্টাচার্য, কালীপদ তর্কাচার্যদের মত বিখ্যাত সব পণ্ডিতদের কাছে, আর তোমারা পড়ছ আমাদের কাছে| খুব সত্ত্বর সবাইকে আপন করে নেওয়ার একটা মনোভাব ছিল তাঁর, সকলের প্রায় নামেই চিনতেন, কিন্তু ম্যাডাম আসতেন কম, বহুদিন একেবারে আসেনও নি| তারপর একদিন বি.জি ম্যাডাম এসে জানালেন এবার থেকে উনিই মৃচ্ছকটিকের ক্লাস নেবেন| সকলের মনেহল- ‘ইস ভালোই তো ছিল, আবার বি.জি. ম্যাডাম! কারণ বি.জি ম্যাডামের কাছে আগে আমরা অভিজ্ঞানশকুন্তল, কারক, ভাষাতত্ত্ব, মেঘদূত সবই পড়েছি| আসলে উনি একটু রাশভারি প্রকৃতির| একটু এদিক ওদিক হলেই গেলো, একেবারে চারতলা থেকে ছুড়ে ফেলার হুমকি| আচ্ছা, কেন ক্লাস নেবেন না আর.সি ম্যাডাম? খোঁজখবর নিয়ে জানাগেল ম্যাডামের স্বামী না কী খুবই অসুস্থ| কী আর করা যাবে! আমারা আর আর. সি. ম্যাডামকে পেলাম না| পরে পি.জি টু-তে গিয়ে আমার স্পেশাল পেপার অন্য হয়েযায়| আর.সি ম্যাডাম ছিলেন কাব্যে স্পেশাল, আমি চলেযাই স্মৃতি ও এপিগ্রাফি গ্রুপে| যদিও কাব্য ভালোই লাগত বরাবর| যাইহোক, পড়াকালীনই শুনেছিলাম একজন পি.এইচ.ডি স্কলার দাদাকে নাকী আর.সি ম্যাডাম আর পি.এইচ.ডি করাবেন না, কারণ সে নাকী ওঁনার নোটপত্র কীসব চুরি করেছে, না, ম্যাডামের সঙ্গে কিছু একটা বাজে ব্যবহার করেছে| যাইহোক, তখন বুঝতে পারিনি বা বোঝার চেষ্টাও করেনি কিছু| কিন্তু স্কলারদের নিয়ে এইধরণের সমস্যা ম্যাডামের আজীবন পিছু ছাড়েনি- বোধহয় এখান থেকেই তার সূচনা ছিল| আমারা এম. এ. পাস করেই এস.এস.সি দিয়ে স্কুলে চাকরি করতে চলেগেলাম| তাই আর.সি. ম্যাডামের সঙ্গে আর সেভাবে কোন যোগাযোগ ছিল না|
যাদবপুরে ফিরে আসলাম ২০০৯ সালে, এসিস্ট্যান্ট প্রফেসার হিসাবে| প্রথম প্রথম আমার বসার ঘর ছিল না কয়েক বছর| ক্লাস নেওয়ার পর একদিক ওদিক করে কখন যে কার ঘরে গিয়ে বসে পড়তাম তার ঠিক নেই| যেখানেই থাকি নির্দিষ্ট সময়ে চায়ের আড্ডায় অবশ্যই থাকা চাই| চায়ের আড্ডা বশত অধ্যাপিকা শর্বাণীদির তত্ত্বাবধানে| একে একে সবাই জড়ো হতেন সেখানে| জানাগেল-প্রদ্যোত বাবু, শর্বাণী দি, ঋতা দি সকলেই বন্ধু ছিলেন- কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসমেট| অনেক সময় ঋতা দি নিজের ফ্লাক্সে স্পেশাল চা নিয়েও চায়ের আড্ডায় চলে আসতেন| কী নেই সেই আড্ডায়? সেখানে নানান আলোচনায় বাড়ির কথা থেকে শাস্ত্রের কথা মিলেমিশে সব একাকার হয়ে যেত| মাঝে মধ্যে বিজয়া দির রসালো গল্পে হাসির রোল পড়ে যেত সবার মধ্যে, সকল গুরুজনদের মাঝে আমার মুখ টিপে হাসি ছাড়া গত্যন্তর ছিল না| আমার অস্বস্তির হাসিতে ঋতা দি মৃদু হেসে যেন কিছুটা সমাল দেওয়ার জন্য বলতেন -‘বিজয়া তুমি এবার থামবে? তোমার মুখে তো কিছু আটকায় না| দেখছো না এখানে দেবদাস আছে| দেবদাস তুই কিন্তু বড়োদের কথায় একদম কান দিস না|’ আমিও সকলের সামনে বসেই বলতাম –‘না দিদি| একদম না|’ প্রথম প্রথম আমি চা খেতাম না, ওঁনাদের সকলের পীড়াপীড়িতেই চা খাওয়ার অভ্যেসটা তৈরি হয়ে যায়|
ঋতাদির সুগার ছিল অত্যন্ত পরিমাণে, নির্দিষ্ট সময়ে ইনসুলিন নিতে হত তাঁর, তাই হয়তো নিয়ম করে কিছুটা খাওয়ার অভ্যেস ছিল| কখনো তিনি হয়তো নিজের ঘরে একান্তে বসে চা খাচ্ছেন-এমন সময় কোন কিছু জানতে বা এমনি হয়তো গেছি| উনি বলতেন- ও দেবদাস! বোস!’ -বসলাম| ‘কিখবর বল?’ না দিদি এমনি এলাম| ঋতা দি খাচ্ছেন বা খেতে যাওয়ার আগে যেন আমার সম্মতি নিতেই বলতেন- “আমি একটু খাচ্ছি রে! খাবি একটু?” আমি বলতাম -না দিদি| তবুও উনি নিজের স্যান্ডুইস থেকে কিছুটা কেটে দিয়ে বলতেন- এই নে খা| -একটু অস্বস্তি হলেও ওঁনার কথা রাখতে নিতাম| আবার যেহেতু উনি সুগার ফ্রি চা খেতেন, আমি তা খেতাম না| তাই উনি আবার সুগার ফ্রি কয়েকটা বড়ি মিশিয়ে দিতেন আমার চায়ের সঙ্গে| খেতে খেতে কতো না গল্প হত কে জানে| জিজ্ঞাসা’ করতেন- পি.এইচ.ডি কাজ কতদূর? আমি বলতাম-চলছে, তিনি বিষয় জিজ্ঞাসা করতেন, খুটিয়ে বাড়ির খবরাখবর নিতেন, বাড়িতে কে কে কেমন আছেন? বাড়িতে যাই কী না? ইত্যাদি| এভাবে নানান গল্পগুজবের মাঝে কবে যে তাঁর অতি স্নেহের ও বিশ্বাসের পাত্র হয়ে গিয়েছিলাম তা কে জানে? খাওয়ার আগে সামনে কেউ থাকলে তার সম্মতি নিয়ে খাওয়ার যে ভদ্রতাবোধ তখন কিছু না বুঝতে পারলেও এখন আমার স্কলারদের সামনে কিছু খেতে গেলে দিদির কথাই যেন মনে পড়ে আর সকলের সঙ্গে একটু ভাগ করে খাওয়ার আনন্দটাও উপভোগ করি|
ঋতা দি-কে খুব ভালোকরে চিনতে পেরেছিলাম ওঁনার সঙ্গে একটি রিফ্রেসার কোর্সের কো-অর্ডিনেটর হওয়ার সূত্র ধরে| তখন একুশ দিন ধরে এই কোর্সটি চলত| কিন্তু তার পরিকল্পনা হত তারও প্রায় একমাস দেড়মাস আগে থেকে| রিফ্রেসার কোর্সের কোন পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না আমার| কিন্তু এসব কিছু না ভেবে অভিজ্ঞ কেউ না থাকতে চাওয়ায় ঋতাদির সঙ্গে আমাকেই যুগ্ম ভাবে কো অর্ডিনেটর রাখা হয়| সদ্য জয়েন করার পর ঋতা দির মত ব্যক্তির সঙ্গে এই কাজে রত হওয়া ছিল আমার মত একজন খামখেয়ালি ও আনকোরা ব্যক্তির পক্ষে অতি চ্যালেঞ্জিং একটা ব্যাপার| সর্বদা ভয়ে ভয়ে থাকতাম, কখন যে কী ভুল করে ফেলি! যেহেতু সেই অর্থে কিছুই জানি না| দিদি যেসব প্লান পরিকল্পনা করতেন, আমাকে বলতেন, আর আমি বুঝি না বুঝি সায় দিয়ে বলতাম- ঠিক আছে দিদি| এভাবে চলত সবকিছু| কোথায় কোর্সটি হবে? তার জায়গা ঠিক করা থেকে বক্তা ঠিক করা, পেন, ব্যাগ দেওয়া- সব আলোচনাই হত একের পর এক| তারপর কী খাওয়া দাওয়া হবে? রিসোর্সপারসনদের কতকরে সাম্মানিক দেওয়া হবে? কত কো-অর্ডিনেটর ফি? হিসাবপত্র কীভাবে পেশ করতে হবে? সবকিছুর একটা নিয়মও বলে দেওয়া হল কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে| দিদি তাঁর ডায়রিতে একের পর এক সব নোট করে রাখতেন, আর আমাকে কী কী পরবর্তীদিনে করতে হবে তার একটা নির্দেশও দিতেন| সেগুলি যথাসাধ্য পালন করার চেষ্টা করেছিলাম মাত্র| এত সাজিয়ে-গুছিয়ে কাজ করার মানসিকতা-সত্যি দিদির কাছ থেকে বহু কিছু শেখার ছিল|
দিদির পরিচিতি লেভেল ছিল অন্যমাত্রায়| রিসোর্সপারসন হিসাবে কাদের কে উনি ডাকেন নি? প্রথিতযশা ভাইস-চ্যান্সেলর হিসাবে রাধাবল্লভ ত্রিপাঠী, পবিত্র সরকার, সুরঞ্জন দাস থেকে শুরু করে রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত, সোহিনী সেনগুপ্ত, সৌমিত্র বসু, অলোকানন্দা রায়, মহুয়া মুখোপাধ্যায়, নন্দিনী ভৌমিক বহু সেলিব্রটি, সুকান্তচৌধুরী, সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়, বাসব চৌধুরীর মত বহু শিক্ষাবিদ-এই রিফ্রেসার কোর্সে রিসোর্সপারসন হিসাবে ছিলেন, তেমনি বহুগুণী অধ্যাপক/ অধ্যাপিকাও এই কোর্সে অংশগ্রহণ করেছিলেন- সবমিলিয়ে মণিকাঞ্চন যোগে ঐ কোর্সটি সত্যিই অতিপ্রাণবন্ত ও হৃদয়গ্রাহী হয়েছিল তা আজও কেউ অস্বীকার করতে পারেন না| আর এই সবকিছুর মূলে ছিল ঋতাদির সুপরিকল্পনা, আর আমার ছিল সেটাকে বাস্তবায়িত করার অদম্য প্রয়াস- সবমিলেমিশে খুব ভালোই অভিজ্ঞতা হয়েছিল| এতসব বিশিষ্টব্যক্তিদের উপস্থিতি, তাঁদের থাকা-খাওয়ার যথাযোগ্য ব্যবস্থা করতে দিদি কোন কার্পণ্য করতেন না কখনো| এমন কী যেসব ক্ষেত্রে অফিসিয়ালি বাধ্যবাধকতা থাকত সেসব দিদি নিজে থেকেই খরচা করতেন| দিদি বলতেন- ‘আমি যখন বাইরে যাই, ওঁনারা আমাকে সবকিছুই স্পেশাল ব্যবস্থা করেন, আমি তো অত কিছু করতে পারবো না, কিন্তু যতটা পারি- চেষ্টা করি| তারপর -“আপরিতোষাদ্বিদুষাং ন সাধু মন্যে প্রয়োগবিজ্ঞানম|’ পণ্ডিতব্যক্তিদের সন্তোষবিধান না হওয়া পর্যন্ত আমাদের কার্য কতটা সফল হল তা বোঝা যাবে না|
দিদির অতি কাছ থেকে তাঁর সততা ও সরলতাকে উপলব্ধি করেছি| সম্মাননীয় ব্যক্তিদের কীভাবে সম্মান করতে হয় তা দিদির আতিথেয়তা থেকে বুঝেছি| আর একটা জিনিষ খুব শিক্ষণীয়, তা হল তাঁর কৃতজ্ঞতাবোধ, যেকোন কাজে ছোট হোন বা বড়- কারও কাছ থেকে তিনি যা কিছু সহযোগিতা পেয়েছেন অকৃপণ চিত্তে তা তিনি স্বীকার করেছেন| এছাড়া দিদির ছিল অতুলনীয় কর্মনিষ্ঠা| ঐ বয়সেও চোখের যা পরিস্থিতি, অত্যধিক সুগার প্রভৃতিতেও কর্মে লেগে থাকা ও কাজটি যাতে সর্বাঙ্গীণ সুন্দর হয় তার জন্য নিরন্তর লেগে থাকার মনোভাব, কর্মে তত্পরতা, গভীর মনোনিবেশ ও একাগ্রতা- একজন শিক্ষার্থী হিসাবে, নবীন অধ্যাপক হিসাবে আমার কাছে সেসব ছিল অতি শিক্ষণীয় বিষয়| কী করে কোন অনুষ্ঠানকে কত সুন্দর করে তোলা যায়, কোন অনুষ্ঠান করতে হলে কত খুটিনাটি বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হয় তা ঋতা দির সঙ্গে না থাকলে জানা সম্ভব হত না| এসব কাজের মধ্য দিয়ে একটা আত্মবিশ্বাস গড়ে ওঠে| সেই আত্মবিশ্বাস আর অভিজ্ঞতা থেকেই হয়তো পরবর্তীকালে বহু সেমিনার সফলভাবে সম্পন্ন করতে পেরেছি|
হ্যাঁ, যেকথা হচ্ছিল যে, ঐ রিফ্রেসার কোর্সটির বিষয় ছিল ‘সৌন্দর্যতত্ত্ব|’ টানা একুশদিনের এতবড় একটা অনুষ্ঠানে যাতে কারো একঘেয়ামী না লাগে তারজন্য বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে যেমন বিবিধ বিষয় ঠিক করা এবং সেই অনুসারে সেই বিষয়ে পারদর্শী, স্বনামধন্য ব্যক্তিরাও এসে তাঁদের বক্তব্য বা প্রয়োগকলা প্রদর্শন -এককথায় অনবদ্য| রিসোর্সপারসনদের প্রতিটি বক্তব্যের শেষে একটা সুন্দর মূল্যায়ন করে সমগ্র অনুষ্ঠানটিকে একটি অন্যমাত্রায় পৌঁছে দিতেন ঋতা দি| দিদির মননে চিন্তনে মিশেছিল কালিদাস ও রবীন্দ্রনাথের ভাবনা| তিনি যে অতভালো রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে জানতেন তা অনেকেই হয়তো জানতেন না| সত্যি অসাধারণ সুর, তাল, লয় ছন্দ সম্পর্কিত ধারণা ছিল তাঁর| কেউ বেসুরো গান গাইলেই হেসে ফেলতেন| বিভাগের অনেককিছু কাজ হয়তো দিদি এডিয়ে চলতেন বা উপযাজক হিসাবে কাজের দায়িত্ব নিতেন না, তবে তিনি কোন কাজের দায়িত্ব যদি একবার নিতেন বা বিশেষত একাডেমিক কাজের ক্ষেত্রে তাহলে সেই দায়িত্ব যে কত নিষ্ঠার সঙ্গে তিনি পালন করতেন তা তাঁর সান্নিধ্যে না থাকলে উপলব্ধি করা যেত না|
ঋতা দির স্নেহ-বাত্সল্য মনে রাখার মত| তবে এবিষয়ে তাঁর ক্ষেত্রে একটা অভিযোগ হল- তিনি যাকে স্নেহ করবেন, তার প্রতি অন্যজন যদি একটু দরদ দেখাতেন তাতে যেন দিদির একটু মান-অভিমান হত| সেজন্য হয়তো তিনি অনেক সময় মুখভার করে থাকতেন, বা তার প্রতি কিছুটা হলেও একটু তীর্যকভঙ্গিতে কথা বলতেন| অনেকে সেটা বুঝতেই পারতো না বা অন্যভাবে নিত হয়তো, বা তাঁকে এড়িয়ে চলত| দিদির স্নেহের বন্ধনে কেউ আবদ্ধ হলে তাঁর জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করে যেতেন কীভাবে অন্তত তার সামন্য হলেও একটু উপকার করা যায়| শিউলী দিকেও খুব স্নেহ করতেন ঋতা দি| শিউলী দির কথায়- তাঁর যখন ম্যাটার্নিটি লিভ চলছিল ঋতা দি নিজেই গিয়ে তাঁর বাড়িতে পরীক্ষার খাতা পৌঁছে দিয়েছিলেন| এতকিছুর মধ্যে প্রতিবছর আমার মেয়ে দিশারীর জন্মদিন দিদি মনে করিয়ে দিতেন, কখনো বা তাঁর জন্য বিশেষ কিছু উপহারও পাঠিয়ে দিতেন| সত্যি ভাবাযায়? যতটা সম্ভব চেষ্টা করেছি তাঁর কথার অবাধ্য না হতে, যেকোনভাবে সেই স্নেহের বন্ধন অটুট রাখতে|
ঋতাদির বিনয়মাহাত্ম্য, আত্মমর্যাদা ও মানবিকতাবোধের কথা বলে শেষ করা যাবে না| তিনি যেমন সবাইকে সম্মান করতেন, ভালোবাসতেন, তেমনি কারো কাছ থেকে কোন অপ্রত্যাশিত অপমান তিনি কোনোভাবেই সহ্য করতে পারতেন না| কেউ একটু ভারি ম্যাজাজে কিছু বললে বা এড়িয়ে চললে তিনি ভীষণ আঘাত পেতেন| যদি কয়েকদিন দিদির সঙ্গে দেখা না হত হঠাত দেখা হলে তিনি বলতেন- ‘কীরে দেবদাস তোর কী কিছু হয়েছে? না, আমি আবার কী করলাম?” ইত্যাদি| এমন অনেক ঘটনায় অনেক সময় বলতেন আবার অনেক সময় বলতেন না কিছুই| চুপচাপ হয়ে যেতেন-একান্তে হয়তো বড়ই কষ্ট পেতেন| তাঁর কথা থেকে বোঝা যেত তিনি বড় আঘাত পেয়েছেন- তিনি যাদের উপর বেশি ভরসা করতেন, যাদের বেশি ভালোবাসতেন, যাদের বিশ্বাস করতেন, একান্তভাবে নিজের করে নিতেন তাঁদের কাছ থেকে| তাঁর অধীন গবেষকদের তিনি নতুন নতুন বিষয় বলেছেন, পথ দেখিয়েছেন কীভাবে কাজ করতে হয়| তাঁর পরিচিত সকলের কাছে তাদের পরিচিতি করে দিয়েছেন, নিজের ভাব-ভাবনা তিলে তিলে দান করেছেন, প্রয়োজনে আর্থিক সহায়তা করেছেন- তারাই শেষপর্যন্ত তাঁর সাথে খারাপ ব্যবহার করেছেন| অবজ্ঞা করেছেন, অবহেলা করেছেন, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেছেন, সর্বোপরি তাঁর নানাভাবে বদনাম করেছেন| দিদি এটা মেনে নিতে পারেন নি, কোনভাবেই| কথা প্রসঙ্গে এসব বলতে বলতে তিনি কখনো সখনো অঝোরে কেঁদেও ফেলেছেন| সেই মানুষটা পৃথিবীতে আজ আর নেই, কিন্তু যা্দের জন্য দিদির এই অকারণে চোখের জল পড়েছে তারা নিশ্চয়ই ভালো আছেন| ভালো থাকবেন -এটাই স্বাভাবিক| কারণ তিনি তো মনেপ্রাণে কখনোই তাঁদের কোন ক্ষতি চান নি তাই| যাদের তিনি বেশি ভালোবেসেছেন, অসহায় ভেবেছেন, অর্থিক সহায়তা করেছেন, তারাই তাঁর সঙ্গে বেশি প্রতারণা করেছেন| তাঁর ভালো মানষিকতার সুযোগ নিয়েছেন, তাঁর অপ্রকাশিত গবেষণাকে নিজের বলে প্রচার চালানোর চেষ্টা করেছেন| সর্বোপরি যাদের তিনি নিজের বাড়িতে যাতাযাতের সুযোগ দিয়েছেন, আর্থিক সাশ্রয়ের কিছু ব্যবস্থা করেছেন তাঁর অবর্তমানে তাঁরা কত জিনিষ আত্মসাত করেছেন তার ঠিক নেই| ছিঃ| ধ্বিকার জানাই এহেন মানুষের সান্নিধ্যে থেকে এরূপ নীচ মানষিকতা ছিল যাদের তাদেরকে|
দিদির কাছ থেকে যেটা শেখার তা হল গুরুজনদের প্রতি শ্রদ্ধা আর গুণীজনদের কদর করা| তিনি বলতেন- ‘কর্তারঃ সুলভা লোকে বিজ্ঞাতারস্তু দুর্লভাঃ|’ এই জগতে অনেক গুণীজন আছেন কিন্তু তাদের সমাদর জানানো লোকজনের বড়ই অভাব| দিদি নিজেই ছিলেন একজন গুণীব্যক্তি, তাই তিনি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, বক্তৃতায়, নিজের লেখার মাধ্যমে তিনি সর্বদা গুণিজনদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছেন| সাধারণ জিনিসগুলি তাঁদের বর্ণনায় অসাধরণ বলে অনুভূত হয়েছে| যেন তাঁর চেতনার রঙে পান্না হত সবুজ চুনি হয়ে উঠত রাঙা হয়ে| বহু সংস্কৃত পণ্ডিতদের অনালোচিত কাজকর্ম, সৃষ্টিসম্ভারকে তিনি প্রচারের আলোকে নিয়ে এসেছিলেন| সেগুলি নিয়ে আলোচনা করতে, গবেষণা করতে পরবর্তী প্রজন্মকে পথ দেখিয়েছেন| আধুনিক সংস্কৃত সাহিত্যচর্চার তিনি এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে দিয়েছেন নতুন গবেষকদের কাছে|
শুধুতাই নয়, নতুন প্রজন্মকে নানাভাষায় শিক্ষিত করতে, কবিতা, গান নাটক প্রভৃতি বিষয়ে পারদর্শী করে তুলতে ‘কনভারজেন্স’ নামে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভাবনা ভেবেছেন| তিনি আজ সশরীরে হয়তো নেই, কিন্তু তিনি বেঁচে আছেন তাঁর কাজের মাধ্যমে, তাঁর ভাবনার মাধ্যমে, তাঁর বহু সৃষ্টিকর্মের মাধ্যমে| তিনি মহাভারতের এই কথাকে খুবই গুরুত্ব দিয়ে বলতেন–‘ন হি মনুষ্যাৎ শ্রেষ্ঠতরং কিঞ্চিৎ| মানুষের থেকে এই জগতে কিছুই বড় নয়| মানুষের ভালোর জন্য তিনি যেমন আজীবন ভেবেছেন, সেই মানুষের কর্মের, মানুষের গুণের, মানুষের সৃষ্টির জয়গানই গেয়েছেন তাঁর আধুনিক সংস্কৃত সাহিত্য গবেষণাকর্মের মাধ্যমে| কিন্তু সেই মানুষেরা বা পরবর্তী প্রজন্ম ঋতাদির মহানুভবতার ও গবেষণাকর্মের মূল্যায়ন কতটা করছেন? বা করবেন? সেটাই এখন ভাবার বিষয়|
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য- অধ্যাপিকা ড. ঋতা চট্টোপাধ্যায়ের স্মরণে অন্বীক্ষা (সম্পাদনা-অধ্যাপক ড. তপনশংকর ভট্টাচার্য্য ও অধ্যাপিকা ড. কাকলী ঘোষ) যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০২৩ সালে প্রকাশিত হয়েছে| ঋতায়ণী, (সম্পাদনা-অধ্যাপিকা ড. তপতী মুখার্জী, অধ্যাপক ড. অরুণরঞ্জন মিশ্র ও অধ্যাপক ড. শুভ্রজিত সেন ) সংস্কৃত পুস্তক ভাণ্ডার থেকে ২০২৫ সালে প্রকাশিত হয়েছে|
………………………
ড. দেবদাস মণ্ডল, সহ-অধ্যাপক, সংস্কৃত বিভাগ, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়
নার্সিসাসের আরশি হতে
দাঁড়িয়ে ছিল জল
বাড়ন্ত কলকাতার বুকে
এখনও টলটল।
নগর জীবন ব্যস্ত শহর
ছুটন্ত তার মন
জল বলে তুই ছুটিস নে আর
কান পেতে ঐ শোন্—
মৃদুমন্দ হাওয়ার সাথে
পড়ন্ত বিকেলে
থির হয়ে তুই দাঁড়াস যদি
চক্ষু দুটি মেলে
পরিয়ে দেব মায়া কাজল
মাতিয়ে দেব মন
জলের টানে সকাল হবে
বিকেল উচাটন।
ইচ্ছে হবে আদুল গায়ে
জলের পাশে বসি
কালো জলের আলো মেখে
জল-যমুনায় মিশি।
মন যদি চায় কলস ভরে
জল নিয়ে যাস ঘরে
জলের বুকে মুখটি দেখে
জল রেখো অন্তরে।।
মমতা সরকার —প্রাক্তন অধ্যাপিকা, সম্মিলনী মহাবিদ্যালয়, জুড়ে থাকতে ভালবাসেন সঙ্গীত ও সাহিত্যের বহুবিধ চর্চায়, প্রিয় কাজ— বই পড়া, কবিতা পাঠ,অনুষ্ঠান সঞ্চালনা, লেখালিখি।










Samit Basak (52 years)
Computer Professional
শুক্লাম্বরা বীণাপাণি
বিদ্যা করেন দান।
বিদ্বানদের বুদ্ধি দিয়ে
রক্ষা করেন মান।
মুক্তাহার দোলে তাঁর
বক্ষস্থলমাঝে,
তাঁর হাসিতেই মুক্ত ঝরে
সংসার ও সমাজে।
কর্মে তাঁর আলোর আভা,
জ্ঞানেই তাঁর শোভা।
অবিদ্যাকে দূরে সরান,
যে করে তাঁর সেবা।
তিনিই পরম জ্যোতির্ময়ী,
দেন সবারে মুক্তি।
চির অবিচল তাঁর পদতলে
ভক্তগণের ভক্তি।
অর্পিতা সিংহ চৌধুরী
কনভারজেন্স,সংস্কৃত ভাষা শিক্ষিকা, আগষ্ট 2024 থেকে
উদার আকাশ মধুর বাতাস
সোনালী রোদের মিষ্টি আভাস।
কুহু কুহু ডাক আমের ঐ শাখে
কৃষ্ণচূড়া লাল পথের ই বাঁকে।
পলাশ রাঙা যে সেই রঙ মেখে
মনকে রাঙাতে যায় যেন ডেকে।
প্রাণে লাগে দোলা দোদুল ছন্দে
ময়ূরী নাচছে বনেতে আনন্দে
যত চুপ কথা গোপনে বিজনে
প্রকাশে উন্মুখ আজ এই ক্ষণে।
ফুল বলে ডেকে জীবনে জীবন
যোগ করে চলো হয়ো না উন্মন।
নদীর জলেতে ওঠে যে লহরী
বলে-সেই ধন্য যে পায় মাধুরী।
_____________________________________________________________________________________
পরিচিতি
নিমাই চন্দ্র দাস
শিক্ষাগত যোগ্যতা – সংস্কৃত ও বাংলায় এম.এ। বি.এড। মহামহোপাধ্যায় গোপীনাথ কবিরাজ পুরস্কার প্রাপ্ত। প্রাচীন কলা কেন্দ্র চন্ডীগড় থেকে রবীন্দ্রসঙ্গীত বিশারদ।
হাওড়া টাউন স্কুলের সংস্কৃত ও বাংলা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক।
কবিতা লেখার শুরু বিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকে। প্রথম মুদ্রিত ও প্রকাশিত কবিতা ‘সন্ধ্যা’। নানা পত্রিকায় লেখালেখি। লিটল্ ম্যাগাজিনের সঙ্গে যোগ।
সন্দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত অভয়ারণ্যের বিভীষিকা। সম্পাদক ছিলেন সত্যজিৎ রায়।
প্রথম প্রকাশিত কবিতা সংকলন ‘কবিতা কুসুম’।
গল্প সংকলন –
১. প্রথম ফোটা ফুল (১৩৮১)
২. গল্পমালা ( গল্প সংকলন, ১৪১১)
৩. হিল্লোল (কাব্যগ্রন্থ, ১৪১০)
৪. আবরণ ( উপন্যাস, ১৩৮২)
৫. ছড়া ছবিতে জীবজন্তু (১৪১২)
৬. দেবী তীর্থ বৈষ্ণোদেবী ( ভ্রমণ কাহিনী, ২০১৫)
৭. সেকালের দুর্গম তীর্থে একালের যাত্রী (ভ্রমণ কাহিনী, ২০২৫)
The suburb where I grew up in, remained quite uneventful throughout the year. Aside from a few stray rumours and formulaic gossip, not much drama cropped up around there. Until the summers arrived and the gravel roads began sticking to the soles of people’s shoes and the metal fence that surrounded a tiny rugged field started to look like vibrating tuning forks from afar, during the daytime.
Summers in the suburbs are notoriously long, irksome and humid. The affluent ones are somewhat shielded by air conditioning while the rest struggle to cope with the effects of the hot exhaust air being belched out of a variety of cooling devices. The summer heat has a certain intoxicating effect on everyone. One can see people losing their temper the moment they step out of their homes, losing control of their motor skills if they stayed in the sun too long, and chugging lots of fluid after they are back inside the comfort of their homes. Even cats and dogs, forgetting their fabled animosity, are seen huddled inside whatever nook and cranny is available that provides respite from the very real heat.
Emotions are at an all time high during suburban summers. With decreasing attention span and patience, the only thing that can successfully pacify a hot-headed, sweaty person is a plate of perfectly ripe mangoes, maybe with the lure of a second helping as well.
The mangoes, the sticky and grungy feeling, the high temperatures was quite commonplace in our semi-town. The unique event arrived a little later in the season.
Just like bougainvillea petals that sprout from the tips of the branches, the most queer looking shops cropped up during the last week of the first month of the year, according to the Bengali calendar. This was only the teaser to the actual bloom that was coming our way. The shops were a mere structure fashioned out of bamboo and huge water-proof plastics and were home to mountains of fried snacks like sand-roasted peanuts, salty cashews, green peas that were definitely not naturally tinted and many more. Men in sleeveless shirts with holes in them spent the whole day tending to their sweet and savoury goodies. No one really knew where these men or their shops came from or even bothered to ask. We simply accepted their appearance like we accepted the flora and fauna of the summer season.
On the very first day of the hottest month of the year a tiny fair sprung up on the people back home— like a pink periwinkle shrub growing on a random patch of the ground, its head jutting out in between tar and bricks. This was no surprise for the folks, rather a highly curated annual affair cued right in time when the heat became unbearable and the humans craved some distraction while they waited for the first signs of rain.
More than the fair itself it’s the anticipation that excited me more. First, van-loads of bamboo and canvas were unloaded followed by pieces of metal structure that would be assembled into merry-go-rounds for kids followed by the wares that the sellers would be putting on display soon. The rugged field that looked like a bald spot on the map, would become the epicentre of all the fair-action.
The actual fair lasted for only three days but the days leading up to it and the days after the frenzy had passed, fuelled our quiet town’s grapevine for weeks. It wasn’t too shabby for the suburb-mice and their much awaited Cinderella moment. At the strike of the metaphorical gong the crowd arrived in multitudes. Human bodies packed into narrow streets and alleyways. Public transport was banned for several hours in the evening while the highly public event remained in full swing. The only priority was the fair and all those who came to make it the biggest sensation of the year.
The fair was a living, breathing creature that let its presence known from quite a distance. The local club, handling the logistics, would be blasting welcome greetings and warnings, over giant megaphones, lining the main street, all in the same breath which could be heard from at least half a mile away. As one stepped closer to the grounds, one became a part of the creature. No matter how many times one had the fortune to experience this affair, everyone had this starry-eyed look on their faces as they scanned the shops to begin the haul.
And there was a lot to choose from.
Kitchen equipment and imitation jewellery were always a big hit. The women couldn’t get enough of the tea cups. When I was younger I would get impatient with the waiting while my mother tried to choose between two black cups. As I grew up I realised the activity was weirdly calming and eventually joined the club. Fake flowers to adorn the fake wood vases, toy fans imported from China, miniature statues of superheroes like Spiderman and Gautam Buddha sitting side by side, keychains— everything that was cheap and in trend were on display for sale.
Good business and fussy children aside, there was one other constant— street food. There were the staples, ice cream booths, multicoloured popsicles corner, nine chat shops with thirty seven kinds of mixtures between them with varying degrees of hot and tart flavours, momo dumplings with underwhelming fillings, egg rolls, pop corn and cotton candy stalls and hot jalebis for dessert. Fair food came with a fair bit of gamble and the prerequisite of a tough tummy.
The real fun, however, was in the stroll, preferably in amicable company. The right company meant you could let the extrovert drive a hard bargain, let the tasteful one pick the prettier necklace, let the famished lead the group to the faloodah man’s cart and promise to be there at the same time next year.
The entire neighbourhood would be in attendance, without fail. That was the law. It was sometimes hard to believe so many people lived where I lived. They took casual leaves from work, called off classes, missed out on appointments and cut corners on domestic duties to gather at this yearly spectacle called a fair.
Esha Ganguly
17.06.26
Esha is an aspiring journalist. She is a part-time introvert and a full-time dreamer who sees the world through the lens of her favourite authors and filmmakers. She often seeks refuge in her “mind place” and music while figuring out life in all its chaos and glory— with a head full of stories to tell and a book in her bag, for company.
চুল তার মেঠো বাদামের খোসার রঙের।
তার পিছু নিতে গিয়ে বহুবার পথ হারিয়েছি—সেই ঘন পাইন বনে! সেখানে যেতে হলে পাহাড়িয়া সোঁদা গন্ধের চড়াই বেয়ে, খালি পায়ে হাঁটতে হয়।
সেই মেয়েটা বিনুনি দুলিয়ে চা বাগানের ভেতর দিয়ে চলে যায়।
অচেনা কিছু ছড়ানো ফুল রাস্তার উপর মাড়িয়ে যায় দরজায় দাঁড়ানো অকাল প্রেম। কখনো হাসে, কখনো কানে গুঁজে নেয়, আবার কখনো দূরে ফেলে দেয় খেয়ালি ধাঁচে। ধর্ম থেকে তুলে ধরা অধর্মের শরীরে চর্বির পাহাড় আর অদ্ভুত অহংকার!
বুকের মাটির ভিতর চিরকালই শিকড়-বাকড়ের ঘর; সিঁড়িগুলো মিশে গেছে আকাশের নীলে।
আমার সিঁড়ি লাগে না।
এমনটাই হয়—মধ্যবিত্ত বেকার রাত্রের আকাশের চাঁদ আকাশেই থাকে, কেবল নিজের অস্তিত্বের আয়নায় জোকার হেসে যায়।
Name- Soumi Saha,
Address- Annadapally, Bolpur, Birbhum
Library and Information Science Professional
Teaching a girl
what “shame” is
Must be the first step
for her to be
as docile and effacing;
and quite efficient
in clipping her wings,
just the right amount
for her to think
that It is her duty –
to uphold the dictum
of what society
terms as “modesty”
under the guise
of a sinister way
of controlling her Being.
She knows not to question
as her very body is
the source of shame!
So paramount and
so insidious a belief,
Always left scrambling
for ways to prove
her innocence
and her “purity”
in this conceited
make-believe-system
of centuries old patriarchy.
Ms. Tanushree Mandal is a passionate educator and mentor. She holds an M.A. in English from Diamond Harbour Women’s University, and a B.Ed. from Baba Saheb Ambedkar Education University.
সত্যি কথা বলতে কি, প্রথমদিকে বিষ্ণুভূষণের ওপর আমার কেমন যেন একটা রাগই ছিল। ফিজিক্স অনার্সের মেরিট লিস্ট বেরোতেই আমরা চমকে উঠেছিলাম। সুদীপ ফার্স্ট হয়নি। আমাদের প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকেও অন্য কেউ ফার্স্ট হয়নি, এমন কি কলকাতার কোন কলেজেরও কেউ নয়। ফার্স্ট হয়েছে মেদিনীপুরের এক অজ্ঞাতনামা কলেজের কে এক বিষ্ণুভূষণ গড়াই। বিষ্ণুর ওপর তখনই আমার কেমন একটা রাগ হয়েছিল। অস্বীকার করতে পারি না, ওকে দেখার জন্য একটা প্রবল আগ্রহও অনুভব করেছিলাম।
আমরা অনেকেই রেডিও ফিজিক্সে ভর্তি হলাম। লিস্টে বিষ্ণুরও নাম দেখলাম। প্রথমদিন ক্লাসে এন সি সবাইয়ের পরিচয় নিচ্ছিলেন। যে ছেলেটি নিজেকে বিষ্ণুভূষণ বলে পরিচয় দিল তাকে দেখে আমি নিতান্ত নিরাশ হলাম। বেঁটে ক্ষয়া ক্ষয়া চেহারা, ইস্ত্রি না করা হাফ হাতা সাদা সার্টের মধ্যে থেকে দুটো রোগা রোগা হাত বেরিয়ে এসেছে। সবুজ রঙের একটা সস্তা টেরিকটের প্যান্টের মধ্যে সার্টটা গোঁজা। না, এগুলো দেখে আমি হতাশ হই নি। আমি হতাশ হলাম তার মুখ দেখে। মুখে বুদ্ধির চিহ্নমাত্র নেই। যেটা আছে সেটাকে অনেকে বলবে সরলতার ছাপ। তবে আমার নিজস্ব অভিজ্ঞতায় দেখেছি এই সমস্ত তথাকথিত সরল লোকেরা অনেক সময়ই বেশ জটিল হয়, কখনো কখনো কুটিলও বটে। তবে বিশেষ ঘটনার মুখোমুখি না হলে সেটা বেরিয়ে আসে না।
ক্লাস শুরু হওয়ার কয়েকদিন পরের কথা। এন সি বোর্ডে একটা কঠিন ডিডাকশন করছেন। সবাই মন দিয়ে টুকছে, কিন্তু কেউই বিশেষ কিছু বুঝছে বলে মনে হয় না। শুধু বিষ্ণুভূষণ খানিকটা টোকার পর বোর্ডের দিকে চেয়ে বসে আছে। একটু পরে এন সি থামলেন। বোর্ডের দিকে ভ্রূ কুঁচকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। ইতিমধ্যে বিষ্ণু উঠে দাঁড়িয়েছে। সেদিকে চোখ পড়তেই এন সি বললেন, ‘কি, কিছু বলবে?’
‘স্যার মাঝখানের স্টেপে একটা ভুল রয়েছে।’
ঠিক কোন স্টেপে ভুলটা হয়েছে এন সি ধরতে পারছিলেন না। বিষ্ণুকে বোর্ডে ডাকলেন। বিষ্ণু ভুলটা দেখিয়ে দিয়ে চলে আসছিল। হঠাৎ এন সি -র কী মনে হল, বললেন, ‘তুমি ডিডাকশনটা করতে পারবে?’ বিষ্ণু কিছু না বলে চকটা তুলে নিল এবং একবারও না থেমে ডিডাকশনটা শেষ করে ফেলল। সেই শুরু। মাস খানেক পর থেকে, এন সি-র মুখে বিষ্ণু ছাড়া আর কোন কথা নেই। অন্য প্রফেসররাও কিছু দিনের মধ্যেই বিষ্ণুকে চিনে ফেললেন। তবে ছাত্ররাই বোধহয় ছাত্রদের সবচেয়ে বেশি চেনে, হয়ত প্রফেসরদের চেয়েও বেশি। ততদিনে আমরা বুঝে গেছি যে, বিষ্ণুর সঙ্গে সুদীপের কোন তুলনাই হয় না। সুদীপও পড়াশুনায় খুব ভাল, অত্যন্ত মেধাবী ছেলে। কিন্তু হাজার চেষ্টা করলেও ও কোনদিন বিষ্ণু হতে পারবে না। বিষ্ণু অন্য জিনিস। বি টেক ফার্স্ট ইয়ারেই বিষ্ণু কয়েকটা পেপার পাবলিশ করল। সেগুলো আমাদের বোধগম্য হল না, কিন্তু প্রফেসররা চমকে উঠলেন। বি টেক-এর সেকেন্ড ইয়ারে বিষ্ণু আর এক কাণ্ড করল। একটা পেপারে দেখাল কীভাবে কম্পিউটারে কিছু কিছু ক্যালকুলেশনের সময় অনেক কমিয়ে দেওয়া যায়। চারিদিকে হৈ হৈ পড়ে গেল। আই বি এম, আই এস আই-এর হোমড়া- চোমড়ারা ছুটে এলেন বিষ্ণুর বক্তৃতা শুনতে। বিষ্ণু বি টেক-এ ফার্স্ট হল, সুদীপ সেকেন্ড। বিষ্ণু ভর্তি হল এম টেক-এ। উদ্দেশ্য এন সি-র আন্ডারে রিসার্চ করা। এম টেকের ফার্স্ট ইয়ারে এম আই টি থেকে এন সি-কে বলে পাঠাল রিসার্চের জন্য এক জনের নাম রেকমেন্ড করে পাঠানোর জন্য। এন সি বিন্দুমাত্র চিন্তা না করে বিষ্ণুর নাম পাঠালেন। বিষ্ণু যাবে অবশ্য এম টেক শেষ করে।
এম টেকের ফার্স্ট ইয়ারের পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর আমরা কয়েকজন বিষ্ণুকে ধরলাম সিনেমা দেখানোর জন্য। এক রবিবার দুপুরে, আমরা সদলবলে গেলাম মিনারে ‘সোনার কেল্লা’ দেখতে। সিনেমা শেষে, হল থেকে বেরিয়ে অমর বলল, ‘চ, আমার মাসির বাড়ি যাওয়া যাক। মাসির সঙ্গে একটু দরকার আছে, আর চা-টাও জুটে যাবে ওখানে। তারপর আড্ডা হবে অন্য কোথাও।’
‘তোর মাসির বাড়িটি কোথায়?’ অসীম জানতে চাইল।
‘এই তো কীর্তি মিত্র লেনে।’
‘তোর মাসির মুখ দেখার জন্য আমি অদ্দূর হাঁটতে পারব না। মাসতুতো বোন-টোন থাকে তো বল।’
অমর কোন উত্তর দিল না, শুধু একটু মুচকি হাসল।
মাসির বাড়ির বাইরের ঘরে ঢুকেই অমর হাঁক দিল, ‘ঝুমা,ঝুমা।’ একটা বছর ১৮/১৯-র মেয়ে বেড়িয়ে এল।
‘কী হল! চেঁচাচ্ছ কেন?’
‘যা, আমাদের জন্যে চা নিয়ে আয়।’
‘ওরে বাবা। আমার একদম সময় নেই। সুপ্তির সঙ্গে সিনেমা যাব বলে।’
‘সিনেমা! কোথায়?’
‘দর্পণা। ‘দিল কা পেয়ার’।’
‘হা। ওর তো টিকিটই পাওয়া যাচ্ছে না।’
‘আমি আগে থেকেই টিকিট কাটিয়ে রেখেছি। দেখবে?’
ঝুমা টিকিট নিয়ে এল। অমর গম্ভীর মুখে টিকিটটা পরীক্ষা করে প্যান্টের পকেটে পুরল।
‘এই অমরদা কী হচ্ছে কি! দাও টিকিটটা।’
‘দেব দেব, চা-টা নিয়ে আয় আগে।’ ঝুমা ধুপধাপ করে চা করতে চলে গেল।
চা-টা খেয়ে, বাইরে বেরিয়ে অসীম ঘোষণা করল ওর কোন চান্স নেই। আমরা সমস্বরে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেন?’
‘দেখছিস না, কেস বিষ্ণুর সঙ্গে। একদম নীরবে, চোখে চোখে কথা।’
তারপর দুদিন বিষ্ণু কলেজে এল না। বিষ্ণু কোনদিন কলেজ কামাই করে না। আমরা একটু চিন্তিত হয়ে পড়লাম। তারপর দিন বিষ্ণু এল। মুখটা একদম শুকিয়ে গেছে। আমরা জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী হয়েছে, রে?’ প্রথমে কিছুতেই কিছু বলবে না। অনেক জেরার পর শেষকালে প্রকাশ পেল যে, বিষ্ণু ঝুমার প্রেমে পড়েছে। কথাটা শুনে, অসীম সেই যে হো হো করে হাসতে শুরু করল, সে হাসি আর থামে না। এদিকে বিষ্ণুর চোখ ছলছল করছে, যে কোন মুহূর্তে কেঁদে ফেলতে পারে। আমি তাড়াতাড়ি অসীমকে ধমক দিয়ে থামিয়ে দিলাম।
বিষ্ণুকে বললাম, ‘যা, তুই ক্লাসে যা। আমরা ক্যান্টিন থেকে ঘুরে যাচ্ছি।’ বিষ্ণু চলে গেল। অসীমের হাসি তখনও থামেনি। আমি অসীমকে বললাম, ‘খুব তো হাসছিস, এখন কী হবে?’
‘কী আর হবে; দু-চার দিন পরে সব ঠিক হয়ে যাবে।’
দু-চার দিন পরে, কিন্তু সব ঠিক হল না। পরের তিনদিন বিষ্ণু কলেজেই এল না। একদিন বিকেলে আমরা ওর বাড়িতে ছুটলাম। ও তখন আমহার্স্ট স্ট্রিটে একটা ঘর নিয়ে থাকত, নিজেই রান্না করে খেত। গিয়ে দেখি ও একটা চাদর চাপা দিয়ে জানলার দিকে তাকিয়ে বিছানায় শুয়ে আছে। গায়ে হাত দিয়ে দেখি গা গরম, বেশ জ্বর আছে। আমাদের দেখে বলল, ‘ঝুমাকে না পেলে আমি মরে যাব।’ অমর ওকে অনেক করে বোঝাল – তুই ঝুমাকে কী বিয়ে করবি! ওতো রাজেশ খান্না, ধর্মেন্দ্র, জিনাত আমন, হেমা মালিনী ছাড়া আর কিছুই জানে না। কোন রকমে হায়ার সেকেন্ডারিটা টপকেছে, পার্ট ওয়ান পার হতে পারবে কিনা যথেষ্ট সন্দেহ আছে। কিন্তু অমরের বোঝানো, অসীমের ধমকানি কিছুতেই কিছু হল না। বিষ্ণুর সেই এক কথা – ‘ঝুমাকে না পেলে আমি মরে যাব।’
বিষ্ণুর বাড়ি থেকে বেড়িয়ে হাঁটতে হাঁটতে কফি হাউসে এসে পড়েছি। কয়েক কাপ কফি ধ্বংসের পর ঠিক হল যে, আগামীকাল অমর মাসির বাড়ি গিয়ে ঝুমাকে একটু হিন্টস দিয়ে দেখবে। কিন্তু পরের দিন অমরের মুখ দেখেই আমরা বুঝলাম, কেস কেঁচে গেছে। ঝুমা নাকি বলেছে, ঐ ক্যাবলা ছেলেটাকে বিয়ে করতে যাব কোন দুঃখে। অমর বলল, ‘তবে একটু আশা আছে। মাসিমা ব্যাপারটায় খুব ইন্টারেস্টেড।’ কয়েকদিন আমাদের ক্লাস-ফ্লাস মাথায় উঠল। বিষ্ণু কলেজে আসছে না। অমর ঘুম থেকে উঠেই মাসির বাড়িতে ফিট- ঝুমাকে বোঝানোর চেষ্টা করছে। মাঝে মাঝে কলেজে আসছে। ক্যান্টিনে লেটেস্ট ডেভেলপমেন্ট নিয়ে আলোচনা চলছে। বিকেলে আমরা আবার তিনজন ছুটছি বিষ্ণুর বাড়িতে, ওকে যথাসম্ভব ডিসকারেজ করছি। চার দিনের দিন দুপুর বেলা অমর হঠাৎ লাফাতে লাফাতে এসে ঘোষণা করল, ‘গুরু হয়ে গেছে, ঝুমা রাজী হয়েছে।’ আমরা তৎক্ষণাৎ ছুটলাম বিষ্ণুর বাড়িতে।
বিষ্ণু যথারীতি চাদর চাপা দিয়ে বিছানায় শুয়ে আছে। অমর তাড়াতাড়ি ভেতরে ঢুকে বলল, ‘এই বিষ্ণু, ঝুমা রাজী হয়েছে।’ বিষ্ণু ধড়মড় বিছানায় উঠে বসে, ওর সেই লাজুক হাসি হেসে বলল, ‘আমি জানতাম, সেদিন ওর চোখ দেখেই বুঝেছিলাম, ও আমাকে ভালোবাসে।’ আমি কলেজ টিমের উইকেট কিপার ছিলাম। রিফ্লেক্সটা সেদিন খুব কাজে লেগেছিল। বিষ্ণুর ঘরের চৌকাটের কাছ থেকেই অসীমের মুখে হাত চাপা দিয়ে ওকে বাইরে নিয়ে চলে গেলাম। ও দু হাতে আমার হাতটা ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বলল, ‘তুই আমায় ছেড়ে দে, আমাকে একটু হাসতে দে, নইলে পেট ফেটে মরে যাব।’
আমার ওপর ভার পড়ল, বিষ্ণুর বাবাকে ব্যাপারটা জানানোর। অমর পারবে না। এই কদিনের টানাপোড়নে ও ভীষণ ক্লান্ত বলে জানাল। আর অসীমের ওপর বিষ্ণুর তেমন ভরসা নেই। অগত্যা আমি। আমি অবশ্য বিষ্ণুর বাড়ি যাওয়ার সময় অসীমকে সঙ্গে নিলাম। কারণ আমি জানতাম, অসীমের উপস্থিত বুদ্ধি আমার চেয়ে অনেক বেশি। বিষ্ণুরা মেদিনীপুরের বেশ অবস্থাপন্ন পরিবার। কিন্তু পরিবারের কেউই, মায় বিষ্ণুর ভাইবোনেরা পর্যন্ত, স্কুলের গণ্ডি পেরোয়নি। এর মধ্যে থেকে বিষ্ণু যে কীভাবে বেরিয়ে এসেছে, সেটা ভগবানই জানেন। বিষ্ণুর বন্ধু শুনে ওর বাবা আমাদের খুব সমাদর করে নিয়ে গিয়ে বসালেন। লোক ডাকিয়ে এনে গাছ থেকে ডাব পাড়ালেন, পুকুর থেকে মাছ ধরালেন। আম, জাম, পেয়ারা, কলাও এসে গেল বাগান থেকে। কিন্তু দুপুরবেলা খাওয়া-দাওয়ার পর আসল কথাটা বলতেই, উত্তেজনায় চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে গর্জন করে উঠলেন বিষ্ণুর বাবা, ‘কী দিতে পারবে ঐ মেয়ের বাবা? বিষ্ণুর বিয়ে দিয়ে অন্তত এক লাখ ক্যাশ ঘরে আনব। অন্য জিনিসের কথা তো বাদই দিলাম।’ ভদ্রলোক তখনও দাঁড়িয়েই আছেন। আমি ঠিক এদিক দিয়ে আক্রমণের আশঙ্কা করিনি, একটু হকচকিয়ে গেলাম। অসীম একবার আড়চোখে আমার মুখটা দেখে নিল। তারপর খুব শান্ত কণ্ঠে ভদ্রলোককে বলল, ‘কিন্তু আপনি আর বাধা দিয়ে কী করবেন, ওরা তো রেজেস্ট্রি করেই ফেলেছে। তবে আপনার কোন অনুষ্ঠান করার ইচ্ছে থাকতে পারে তাই…’ ভদ্রলোক ধপ করে চেয়ারে বসে পড়লেন। বাঁ হাতে কপালটা চেপে ধরলেন।
এরপর বিষ্ণুর বাবা পর পর কয়েকদিন কলকাতায় এলেন। আমাদের মধ্যস্ততায় ঝুমাদের বাড়ির সঙ্গে কথাবার্তা সমস্ত পাকা হয়ে গেল। মাস তিনেক পরে বিয়ে হবে। আমরা বরানগরে দু ঘরের একটা ছোট ফ্ল্যাট যোগাড় করে দিলাম। বিয়ের পর ওরা ওখানেই থাকবে। পয়সাকড়ির কোন অসুবিধে হল না। বিষ্ণুর বাবা ওর মাসোহারাও অনেক বাড়িয়ে দিলেন। বিষ্ণু আবার কলেজে আসা-যাওয়া শুরু করল। আমরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। তখন যদি দেখতে পেতাম ভবিষ্যতের গর্ভে কী লুকিয়ে আছে।
প্রথম মাসে বিষ্ণুর আচরণে খুব অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। মাঝে মাঝে কলেজ কেটে সিনেমা – অবশ্যই হিন্দি সিনেমা – দেখতে যেত ঝুমার সঙ্গে। আমরা ইয়ার্কি মারলেও ওটাকে খুব সিরিয়াসলি নিইনি। বিষ্ণুর মত জিনিয়াসের রোজ ক্লাস না করলেও চলে।
এরও মাসখানেক পরের ঘটনা। সায়েন্স কলেজের সিঁড়ি দিয়ে নামছি। ঝর্ণাদি আমায় ডাকলেন। ঝর্ণাদি এন সি-র আন্ডারে রিসার্চ করেন। আমাদের কলেজের দীপকদার সঙ্গে ওঁর বিয়ে হয়েছে। দুজনেই খুব ভালো পড়াশুনায়। দীপকদা তখন এক বছরের জন্য আমেরিকায় গেছেন। ঝর্ণাদি অত্যন্ত সপ্রতিভ। সেদিন দেখি উনি হাসছেন, রীতিমত হাসছেন, হাসি চেপে রাখতে বেশ কষ্ট হচ্ছে। বললেন, “‘একটু আগে বিষ্ণু এসেছিল আমার কাছে।’
‘বিষ্ণু! ও তো আজ ক্লাসে আসেনি।’ আমি বললাম।
ঝর্ণাদি ও প্রসঙ্গে না গিয়ে বললেন, ‘ল্যাবোরেটারিতে কাজ করছিলাম, এমন সময় বিষ্ণু এসে হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, “দীপকদা আপনাকে ছেড়ে এতদিন আছেন কী করে?” আচমকা প্রশ্নটা শুনে আমি একটু ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। সামলে নিয়ে বললাম, ‘‘আসলে এ কথাটা কোনদিন ভেবে দেখেনি।’’ তারপরেই ও বলল, ‘‘আপনার খুব কষ্ট হয় না?’’ আমি ওর মুখের দিকে ভাল করে তাকিয়ে দেখলাম। না, ঠাট্টা করছে না। আমি মুখটাকে খুব গম্ভীর করে বললাম, ‘‘হ্যাঁ ভাই, ভীষণ কষ্ট হয়।’’ ও বিজ্ঞের মত মাথা নাড়ল। তারপর জানলার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘‘ঝুমারও তাহলে নিশ্চয়ই খুব কষ্ট হচ্ছে। ও দার্জিলিং গেছে ওদের বাড়ির লোকেদের সঙ্গে, তাই পাঁচদিন আমার সঙ্গে ওর দেখা হবে না।’’ এই সমস্ত বলে বিষ্ণু চলে যাচ্ছিল, হঠাৎ দরজার কাছ থেকে ফিরে এসে বলল, ‘‘আচ্ছা ঝর্ণাদি, একেই কি বিরহ বলে?’”
ঝর্ণাদি হাসতে হাসতে একটু বেসামাল হয়ে গিয়েছিলেন, সিঁড়িটা ধরে সামলে নিলেন।
যখন বিষ্ণুর বিয়ের কথাবার্তা চলছে, তখন আমরা ওদের দুজনের বিবাহ পরবর্তী জীবনের পরস্পরের সঙ্গে আলোচনার টপিক নিয়ে কিঞ্চিত চিন্তিত ছিলাম। তাই তখন ঠিক হয়েছিল যে, রেডিও-ফিজিক্স ডিপার্টমেন্ট থেকে আমরা বিষ্ণুকে একটা বিশেষ যন্ত্র উপহার দেব, যার দুদিকে থাকবে দুটো টেলিফোন। আর মাঝখানে থাকবে এক ব্ল্যাক বক্স। একদিকের টেলিফোনে জীনাত আমনের ঠিকুজি-কুষ্টি পড়লে অন্যদিকে সলিড স্টেট ফিজিক্সের লেকচার শোনা যাবে। আবার অন্যদিকে স্যাটেলাইট কমিউনিকেশন সম্বন্ধে বললে, এ প্রান্তে ধর্মেন্দ্রর পূর্বতন এবং বর্তমান প্রেমিকাদের নাড়ি-নক্ষত্র জানা যাবে। কিন্তু বিয়ের ঠিক আগে, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অনেকেই ঐ যন্ত্রের উপযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলল। তাই আমরা ঐ যন্ত্রটা না দিয়ে একটা প্রেশার কুকার এবং রান্না-বান্নার কিছু সরঞ্জাম উপহার দিলাম।
বিয়ের পর বিষ্ণু মাস খানেক কলেজেই এল না। পনেরো দিনের মাথায় অমর দুপুর বেলায় একবার ওদের বাড়ি গিয়েছিল। দূর থেকে দেখে, ঝুমা দোতলার ব্যালকনিতে বসে চুল শুকোচ্ছে আর বিষ্ণু একটু দূরে একটা মোড়ায় বসে নিবিষ্ট চিত্তে তাই দেখছে। এক মাস পরে অবশ্য বিষ্ণু কলেজে আসা শুরু করল। তবে রোজ আসত না – এই সপ্তাহে তিন চার দিন আর কি। সেশান্যাল কাজ জমা দেয় না সময়মত। প্রায়ই লাস্ট ডেট পেরিয়ে যায়, বিষ্ণু নির্বিকার। প্রফেসরদের যে বিরক্তিটা চাপা ছিল, এবার সেটা প্রকাশ্যেই দেখা দিতে লাগল। ব্যাপারটা চরমে উঠল, যেদিন এন সি আমাকে ডেকে পাঠালেন। এন সির ঘরে গিয়ে দেখি সুদীপ বসে আছে। এন সি সুদীপকে বললেন, ‘তাহলে, ঐ কথাই রইল।’ সুদীপ আমার দিকে তাকিয়ে একটু হেসে বেরিয়ে গেল। সুদীপ খুবই ভালো ছেলে, তবে ওকে আমার কোনকালেই তেমন পছন্দ হয় না। মনে হয় ওর মনভোলানো হাসি, মার্জিত ব্যবহার, সুন্দর কথাবার্তার পেছনে একটা সুক্ষ্ম শঠতা লুকিয়ে আছে। এন সি আমাকে বসতে বললেন না, ড্রয়ার থেকে একটা ল্যাব রিপোর্ট বার করে আমার হাতে দিলেন। বিষ্ণুর রিপোর্ট। দুপাতা উল্টেই আমি চমকে উঠলাম। আগোছালো ভাবে স্টেপল করা সিটগুলোর মধ্যে ওটা কীভাবে এসেছিল, ভগবান জানেন। সিটটাতে অত্যন্ত অপটু হাতে একটা মেয়ের ছবি আঁকা আর তার চারপাশে সমস্ত পাতা জুড়ে কয়েকশো বার ঝুমার নাম লেখা। এন সি এক ঝটকায় সেটা কেড়ে নিলেন, ছুঁড়ে ফেললেন ওয়েস্ট পেপার বাস্কেটের মধ্যে। একটু পরে নিজেকে সামলে নিয়ে গম্ভীরভাবে বললেন, আমি ভাবছি বিষ্ণুর বদলে সুদীপকেই এম আই টি-তে পাঠাব।
আমি কোন কথা না বলেই বেরিয়ে এলাম। বিষ্ণুকে তখন সামনে পেলে কী হত জানি না। একটা অন্ধ রাগ আমার মধ্যে গজরাচ্ছিল। বিষ্ণুর জায়গায় আমি সুদীপকে কিছুতেই কল্পনা করতে পারছিলাম না। ব্যাপারটার একটা হেস্তনেস্ত করার জন্য আমি বিষ্ণুর বাড়ি ছুটলাম। সন্ধেবেলায় বরানগরে পৌঁছে দেখি বিষ্ণুর ফ্ল্যাটে তালা ঝুলছে। পাশের ফ্ল্যাটের ভদ্রমহিলা বললেন, ওরা গেছে ‘তিন দুষমন’ দেখতে। পরের দিন গিয়ে দেখি, সেদিনও ফ্ল্যাট তালাবন্ধ। এদিন পাশের বাড়ির ভদ্রমহিলাও কোন সাহায্য করতে পারলেন না। সেদিন আমি ঠিক করেছি কিছুতেই ফিরে যাব না। যত রাত্রিই হোক বিষ্ণুর সঙ্গে দেখা করব। বরানগরে আমার আর এক বন্ধু থাকে। তার বাড়িতেই বসে রইলাম আর এক ঘণ্টা অন্তর এসে দেখে যেতে লাগলাম বিষ্ণু ফিরেছে কিনা। রাত সাড়ে দশটার সময় দেখি, বিষ্ণুর ফ্ল্যাটে আলো জ্বলছে। বিষ্ণুকে কীভাবে গালাগাল দেব সেটা মনে মনে গুছিয়ে নিয়ে ওপরে উঠে গেলাম। দরজা খোলা, বাইরের ঘরে বিষ্ণু নেই। বেডরুমে গিয়ে দেখি বিষ্ণু বিছানার ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে কাঁদছে। ডাকতেই ধড়মড় করে উঠে বসল। বিষ্ণুর সে মূর্তি দেখে আমি চমকে উঠলাম। চুলগুলো উসকোখুসকো। শুকনো মুখ। লাল ফোলা ফোলা চোখ। আমি কেন জানি না, হঠাৎ জিজ্ঞেস করলাম, ‘ঝুমা কোথায়?’ বিষ্ণু এমন করে ‘নেই’ বলল যে, একটা আশঙ্কায় আমার সর্ব শরীর কেঁপে উঠল। বিষ্ণু আমাকে জড়িয়ে ধরে হাঁউমাঁউ করে কেঁদে উঠল। আমি অনেক কষ্টে ওর কাছ থেকে যা উদ্ধার করলাম তা হল- ঝুমা দিন সাতেকের জন্য বাপের বাড়ি গেছে। বিষ্ণু তখনও আমার কাঁধে মাথা রেখে সমানে কেঁদে চলেছে। আমার যা বলার ছিল বিষ্ণুকে, যা অনেকবার মনে মনে পুনরাবৃত্তি করে প্রায় মুখস্থ হয়ে গেছে, তার কিছুই বলা হল না। আমি বিষ্ণুর পিঠে হাত রেখে সামনের দিকে তাকিয়ে রইলাম। ড্রেসিং টেবিলের ওপর রাখা ঝুমার ছবিটা চোখে পড়ল। ঝুমা হাসছে। তবে সে হাসির অর্থ আমি বুঝতে পারলাম না।
রূপক বিশ্বাস
ইঞ্জিনিয়ার। যাদবপুর। কর্মজীবন থেকে অবসর নিয়েছেন।